শৈশব, কৈশোরে নানা বাড়ি বেড়ানো দিনগুলির কথা মনে পড়লে হৃদয় আন্দোলিত হয়। স্মৃতি জাগানিয়া দীর্ঘশ্বাস অস্ফুট শব্দ তোলে- আহা, সোনালী দিনগুলি আমার!

 

আমার নানা বাড়ি বেড়ানোর প্রধান আকর্ষণ ছিল- মতি মামা। মতি মামা আমার আপন মামা না। সে আমার মামার পড়শি ভাই। সেই হিসেবে আমি তাকে মামা বলে ডাকতাম। আমরা দুজন সমবয়সী, এমন কি একই ক্লাসে পড়তাম। আমি মামা বাড়ি যেতে মুখিয়ে থাকতাম মূলত মতি মামার সান্নিধ্য লাভের আশায়।

 

সুশ্রী, হৃষ্টপুষ্ট স্বাস্থ্যের অধিকারী মতি মামার গলার আওয়াজ ছিল অদ্ভুত রকমের মাধুর্যময়। নিজের গায়ের রং কাল বলে আমার মনঃকষ্ট ছিল, ছিল কিছু বিড়ম্বনাও। ক্লাস থ্রীতে যখন পড়ি একদিন স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ক্লাসের স্যার আমাকে গরু পিটা করে ছেড়েছিলেন। আমার অপরাধ- আমি নাকি বিড়ি খেয়ে খেয়ে ঠোঁট কাল করে ফেলেছি। প্রায় পঞ্চাশ বছরের অধূমপায়ী জীবনে আজও আমি বুঝতে পারি না- স্যার কেন একবার ভাবলেন না একজন কাল মানুষের ঠোঁট কালো হওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

এই বিশ্রী আমি সুদর্শন, রুপবান মতিমামার খুব ভক্ত ছিলাম। মতি মামার কবিতা লিখার হাত বড় সুন্দর ছিল। প্রাকযৌবনে তার লেখা স্বরচিত প্রেমের কবিতা শোনার আমি খুব ভাল শ্রোতা ছিলাম, তার সুমিষ্ট গলার আবৃত্তি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।

 

 

কাল বা বাস্তবতার থাবায় বন্দী হয়ে নানা বাড়ি বেড়ানোর আগের উন্মাদনা আর নিজের মধ্যে টের পাই না। মাঝে মধ্যে আমার মা মামা বাড়ি যান। একদিন মামা বাড়ি থেকে এসে মা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন- মতিটা আর বাঁচবে নারে!

 

মতি মামা! অনেক দিন মতি মামার সাথে আমার দেখা সাক্ষাত নেই। শুনেছিলাম সিভিল এভিয়েশনে ভাল একটা চাকুরী করে সে। আমার প্রিয় সেই মতি মামা আর বাঁচবে না!  

 

ক্যান্সার! মতি মামার ক্যান্সার হয়েছে। একটা চোখ, কয়েকটা দাঁতসহ তুলে ফেলতে হয়েছে মুখের এক অংশের মাংস। খুব বীভৎস হয়ে গেছে তাঁর চেহারা। ভয়ে কাছের লোকজনও তাঁর কাছে যায় না। এমনকি ডাক্তারদেরকেও অবাক করে দিয়ে মতি মামা এখন বেঁচে আছে।

 

আগে দেখেছি চৈত্রের উদাস দুপুরে আমাদের গ্রামগুলিতে মর্মর ধবনি তুলে, হাজারটা রকমারি গাছের শুকনা পাতা উড়িয়ে বাতাসের ঘূর্ণি ক্রমশঃ প্রকাণ্ড আর আকাশমুখি হতে হতে মাঠ ঘাট ছাড়িয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বয়ে যেত। আমার বুকের মাঝে একটা প্রকাণ্ড কষ্টের বাউকুড়ালি বয়ে যায়- মতি মামার সুশ্রী মুখটা প্রতিদিনই আমার হৃদয় আকাশে আরও অনেক অনেক প্রকট, সুস্পষ্ট হয়ে উঠে!