জমিদার অসীম বাবু। তাঁর তুলনা নাই। তাঁর দয়ায় বেঁচে থাকে তাঁর কর্মী সবাই। তাই বলে কিছু দিতে তিনি বাধ্য নন। অনেক পরীক্ষা দিয়ে হয় প্রমোশন। কর্মচারীদের মধ্যে যারা তাঁর কথা মানে না তাদের সতর্ক করতে তিনি পাঠালেন তাঁর বিশ্বস্ত প্রতিনিধি নকুল বাবুকে। নকুল বাবু বললেন, আমি তোমাদের শান্তির কথা বলতে এসেছি। তারা বললো, আমরাতো শান্তিতেই আছি। তিনি বললেন, তোমরা নিজেদের প্রশংসায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছ। তারা বললো, মালিকের কি প্রশংসার অভাব? তিনি ভয় দেখালেন, মালিকের অবাধ্য হলে পরিণামে পেতে হবে শাস্তি। ভীরুরা যোগ দিল। তিনি বললেন, যারা আমার কথা শুনবে তাদের জন্য আছে পুরষ্কার। লোভীরা যোগ দিল। তিনি বললেন, সম্পদের অধিকার মালিক পক্ষের। লুটেরারা যোগ দিল। দল একটু বড় হলে তিনি বললেন, যারা দলে যোগ দেয় নি তাদের উপর আক্রমণ কর। যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ ও যুদ্ধে প্রাপ্ত মহিলাদের ভাগ করে নাও। এসব দেখে কামুকেরা দলে যোগ দিল।

একদিন মালিক দেখা করতে চাইলে নকুল বাবু গেলেন। বললেন, সেখানে আপনার ইচ্ছা বাস্তবায়ন হচ্ছে। নকুল বাবু এসে বললেন, মালিক নতুন নিয়ম দিয়েছেন। যারা আমার দলে থাকবে না তাদের বিচার হবে। শুরু হলো দলাদলি। নষ্ট হলো শান্তি। তবু তিনি বললেন, আমি শান্তি দিতে এসেছি। শান্তিপ্রিয় কর্মীরা ভাবলো, নিশ্চয় মালিক ন্যায় বিচার করবেন। আমরাতো মালিকের প্রশংসাই করি। মালিক বলেছিলেন তিনি সব খবর রাখেন। তাহলে আমাদের ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।

প্রোজেক্ট শেষ হলো। দেখা গেলো সব হিসাব এলোমেলো। মালিক জানতে চাইলো আসল ঘটনা। নকুল বাবু নিজের দলের লোকদের দেখিয়ে বললেন, এরা আপনার নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। অন্যরা তা পালন করেনি। আমি বারবার বলেছি। ওরা আমার কথা শুনেনি। শান্তিপ্রিয় কর্মীরা কিছু বলতে যাবে তখন নকুল বাবু বললেন, ওরা অবিশ্বাসী। তখন সমস্বরে নকুল বাবুর দলের লোকরা সাক্ষ্য দিল, হ্যাঁ ওরা অবিশ্বাসী। ওরা গাছ, পাথরের সাথে আপনাকে তুলনা করেছে। তখন সমস্বরে নকুল বাবুর দলের লোকরা সাক্ষ্য দিল, হ্যাঁ ওরা তুলনা করেছে। ওরা আপনার বিষয়ে তর্ক করেছে। লোকরা সাক্ষ্য দিল, হ্যাঁ ওরা তর্ক করেছে।

বিচারপতি দেখলেন গণতন্ত্রের শর্ত মতে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে। যদিও অন্যরা চুপ করে ছিল। তবুও সাক্ষীর কথা মানতেই হবে। সংবিধানে এমনই লেখা আছে। তিনি ঘোষণা করলেন, ওদের প্রোজেক্ট থেকে বের করে দাও। সব সুবিধা বন্ধ করে দাও। আর তোমরা যারা নিয়ম মেনেছ তাদের সুবিধা বাড়িয়ে দেয়া হলো। এই অবস্থা দেখে একজন শান্তিপ্রিয় কর্মী বললো, আমরা শুনেছিলাম আপনি দয়ালু। এই কি আপনার দয়ার নমুনা। তখন সমস্বরে নকুল বাবুর দলের লোকরা বললো, ও ওদের মাথা নষ্ট করেছে। ওকে কঠোর শাস্তি দিন। অসীম বাবু আদেশ দিলেন, ওর মাথা গুড়িয়ে দাও। নকুল বাবুর দলের লোকরা ওকে হত্যা করলো। এসব দেখে একজন বললো, আমরা শুনেছিলাম আপনি সব খবর রাখেন। তখন সমস্বরে নকুল বাবুর দলের লোকরা বললো, ও ওদের বিপথগামী করেছে। ওকে কঠোর শাস্তি দিন। অসীম বাবু আদেশ দিলেন, ওর জিহ্বা কেটে নাও। নকুল বাবুর দলের লোকরা ওকে হত্যা করলো।

অসীম বাবু চলে গেলেন। নতুন প্রোজেক্ট শুরু হলো। নকুল বাবু ম্যানেজার। দলের অন্যরা কেউ অফিসার, কেউ তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হলো। শান্তিপ্রিয় কর্মীরা না খেতে পেয়ে একে একে মৃত‌্যুবরণ করলো। আর মরতে মরতে বলে গেল, এই অবিচারের ফল অবশ্যই পেতে হবে। কর্মফল বৃথা যায় না। বুদ্ধিমান লোভীরা দেখলো নকুল বাবু তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে। তাঁদের ব্যবহার করে জমিদারের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে। তখন তারা তাদের মেয়ে এশাকে কাজে লাগাল।আর এশা তার বাবাকে ম্যানেজার বানানোর জন্য ধীরে ধীরে নকুল বাবুকে হত্যা করলো। নকুল বাবু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো এশার কোলে।কেউ কেউ সন্দেহ করলো। শুরু হলো অশান্তি। অসীম বাবুর লোক এল। এশা তাকে ম্যানেজ করলো। এশার বাবা হলো ম্যানেজার।

সুযোগসন্ধানী উৎপল বাবু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। ভেঙে দিলেন নিয়ম শৃঙ্খলা। তৈরি করলেন নিজেদের আরাম আয়েশের নিয়ম। বললেন, অসীম বাবুর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন তারা। নকুল বাবুর মেয়ের জামাই অনিল বাবু বাঁধ সাধলেন। তাঁকে বিতারিত করা হলো। হত্যা করা হলো তাঁর সন্তানদের। তবু তারা বললো আমরা শান্তির কথা বলছি।কিছুকাল এভাবে গেল। ভীরুরা সাহসী হল। সত্য কথা প্রকাশ পেল। তখন সব দায়িত্ব উৎপল বাবুদের হাতে। সত্যবাদীদের মুখ বন্ধ করতে প্রচুর অর্থব্যয় ব্যয় করে একদল বক্তা তৈরী করলো। যাদের কাজ হলো নকুল বাবু সম্পর্কে অস্বাভাবিক অসম্ভব সব বক্তব্য প্রদান করা।

দাদু গল্প শেষ করে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, তারা কিছু বুঝেছে কি না। একদল খুব বাহবা দিল, একদল খুব ঘৃণা প্রকাশ করলো। একদল বললো আমরা আপনাকে একজন বিশ্বাসী, জ্ঞানী মনে করতাম। কিন্তু আজ আপনার গল্প শুনে বুজলাম আপনি অন্তরে একজন অবিশ্বাসী রয়ে গেছেন। দাদু হেসে বললেন এর অর্থ হলো এই রূপক গল্পের কিছুই তোমরা বুঝতে পারনি। তখন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি ওদের একটু বুঝিয়ে বল।

আমি ওদের বললাম আপনারা যা ভাবছেন গল্পটা মোটেই তা নয়। এটি পরিবেশ বিপর্যয়ের একটি রূপক গল্প। এখানে অসীম বাবু বলতে আকাশকে, জমিদারী বলতে বায়ুমণ্ডলকে, প্রোজেক্ট বলতে ষড়ঋতুকে, কর্মচারী বলতে ঊনপঞ্চাশ রকম বায়ুকে, নকুল বাবু বলতে পানিকে বুঝানো হয়েছে। আকাশ আসলে বায়ুমণ্ডলের একটা স্তর। বিভিন্ন মণ্ডলে বায়ু ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় থাকে। এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যেতে হলে তাকে হালকা বা ভারী হতে হয়। এই নিয়ম মেনে সাগরের জল বাষ্প হয়ে উপরে উঠে। আবার বৃষ্টি হয়ে নীচে নেমে আসে। এর ব্যতিক্রম হলে উঠে ঝড়, আসে জলোচ্ছ্বাস, হয় ভূমিকম্প এর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতিটি দুর্যোগে কিছু বনজ সম্পদ, কিছু খনিজ সম্পদ সাগরে গিয়ে মিশে যা সাগরস্থ প্রাণী ও উদ্ভিদদের আকর্ষণ করে। অসীম বাবুর আসা বলতে বজ্রপাতের শব্দকে, নকুল বাবুর দলের লোকের সাক্ষ্য বলতে ঘুর্ণিঝড়ের শব্দকে বোঝানো হয়েছে। শান্তিপ্রিয় দুজন কর্মী হল বড় গাছ যেগুলো বজ্রপাত ও ঘুর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়। গাছ বাতাস দেয় তাই গাছের মৃত্যুকে কর্মচারীর মৃত্যু বলা হয়েছে, এশা মাটির প্রতীক, যা পানির উৎস নদীকে ভরাট করে নদীর মৃত্যুর কারণ হয়। উৎপল বাবু হল শৈবাল যা স্রোতহীন পানিতে জন্মে। অনিল বাবু পাহাড়ী ঝর্ণা যা শেষ পর্যন্ত পানি বহন করে। একদল বক্তা হল তারা, যারা জমে উঠা চর দখল করে আর অস্বীকার করে এখানে একটা নদী ছিল।

এ গল্পের মর্মার্থ দাদু আমাকে আগে বলেছে। তাই আমি জানি। কিন্তু ভেঙে না বললে এ গল্পে যে কেউ বিভ্রান্ত হবে। ঠিক যেমন আমরা বেদ এর ভেদ বুঝি না, অজ্ঞ হয়ে যজ্ঞ করি, আর মর্ম না বুঝে ধর্ম পড়ি। রামায়ণ, মহাভারতের মতো সব গ্রন্থে অনেক সাংকেতিক ভাষা থাকে। আমরা তা না বুঝে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলি।

প্রচলিত ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ সমুহের মধ্য হতে নিজেদের গড়া কিছু শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে, শুধু নিজেরা বুঝার জন্য যে ভাষা তৈরী করা হয়, সে ভাষাকেই সাংকেতিক ভাষা বলা হয়। প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টেরই নিজস্ব সাংকেতিক ভাষা আছে। পুলিশ, বিডিআর, চোর, ডাকাত, হকার, মাদকসেবী, মাদকব্যাবসায়ী, পতিতা, এমন কি কণ্ঠ শিল্পী ও চিত্র শিল্পীরাও, নিজস্ব আলাদা আলাদা সাংকেতিক শব্দের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। একটি ডিপার্টমেন্টের ব্যাবহৃত সাংকেতিক শব্দগুলি আপনাদের অবগতির জন্য উপাস্থপন করছি।

তারা-খাবারকে-খিটনি, সুন্দরকে-হারক, খারাপকে-বিলা, টাকাকে-চতি, ১০কে-দয়লা, ৫০কে-হাফগজ, ১০০কে-গজ, ১০০০কে-থান, নারীকে-বাচকি, পুরুষকে-বাইচকা, দেহব্যাবসায়ীকে-বিলাবাচকি, ক্ষুধালাগাকে-খিটনিবিলা, কথাবলাকে-সোল, জিজ্ঞাসাকে-সোলাও, মদকে-কিটা, গাজাকে-ঝুপশি বলে থাকে।

এখন এই ডিপার্টমেন্টের একজন, একটা চিরকুট অন্য এক জনের হাতে দিয়ে বলল, এই চিরকুটটা অমুকের কাছে পৌছে দিবে। চিরকুটের লেখাটি এরূপ।
চিরকুটটি পাওয়া মাত্র শফিকের নিকট হতে দয়লা থান চতি নিয়ে হারক দেখে একটা বিলাবাচকি, দুইটা কিটা, একগজ চতির ঝুপশি, আর চার জনের জন্য খিটনি নিয়ে আসবি। আমি কিন্তু খিটনিবিলা হয়ে বসে আছি। আর অবশ্যই বিলাবাচকি কত চতি চাই সোলায়ে নিবি।

এখন বলুন, ভাষার উপরে ডক্টরেট নিয়ে আসলেও কি এই চিরকুটের মর্মকথা বুঝা সম্ভব? না কি আভিধানিক অর্থে অনুবাদ করা সম্ভব?

ঋক বেদের ৬ সুক্ত এর ৫ ঋক এ একটি ঘটনার ঈঙ্গিত আছে-পণিঃ নামক অসুরেরা দেবলোক হতে গাভী অপহরণ করে অন্ধকারে রেখেছিল, ইন্দ্র মরুৎদের সাথে তা উদ্ধার করেছিলেন। গাভীর অন্বেষনার্থ সরমা নাম্নী এক দেব কুক্কুরীকে নিযুক্ত করেছিলেন এবং সরমা অসুরদের সাথে বন্ধুত্ব করে গাভীর অনুসন্ধান পেয়েছিল।

আসলে এ বৈদিক উপাখ্যানটি প্রাত:কালে প্রকৃতি সম্বন্ধীয় একটি উপমা মাত্র। সরমা ঊষার একটি নাম। দেবগণের গাভীগণ অর্থাৎ সূর্যরশ্মি সমুদয় অন্ধকার দ্বারা অপহৃত হয়েছে। দেবগণ ও মানুষেরা তাদের উদ্ধারের জন্য ব্যস্ত হয়েছেন। অবশেষে ঊষা দেখা দিলেন। তিনি বিদ্যুৎগতিতে, গন্ধ পেয় কুক্কুরী যেরূপ যায় সেরূপ ইতস্ততঃ ধাবমান হতে লাগলেন। তিনি সন্ধান নিয়ে ফিরে এলে আলোকদেব ইন্দ্র প্রকাশ হয়ে অন্ধকারের সাথে যুদ্ধ করলেন এবং তাদের দুর্গ হতে সে দেবগাভী উদ্ধার করলেন।

এখানেও পণ্ডিতেরা বেশী বুঝে দেব দেবীদের গন্ধ খুঁজে। মতবাদের দ্বন্দে পড়ে জ্ঞানের দুয়ার বন্ধ করে। এদের কথায় হাসতে থাকি। আর ভাবতে থাকি, অনুবাদের সবটা ফাঁকি।