কিছু মানুষ থাকে যারা খেলতে ভালবাসে। কিছু মানুষ ভালোবাসে জিততে। কেউ জয় অর্জনের জন্য থাকে অপেক্ষায়। আর কেউ জয়কে কেড়ে নিতে হয় বেপরোয়া। একজন প্রেমিক, দস্যু অন্যজন। ক্ষ্যাপা দুজনেই। এ গল্পের চরিত্র আল আহসানও ছিল এক ক্ষ্যাপাই। পরবাসে বাঙালি যেমন মিথের মতো স্মৃতিচারণ করে পদ্মার ইলিশের। আল আহসানও স্ত্রী জয়তুনের কাছে স্মৃতিচারণে কিংবা 'মাকাল ফল' কটাক্ষের প্রতিবাদে কখনো সখনো খ্যাপাটে দিনের কথা বলে। ব্যাডমিন্টন, হ্যাণ্ডবল, ফুটবল, টেবিল টেনিস, লম্বালাফ, উচ্চলাফ, মোরগের লড়াই, বউচি, হাডুডু, দৌড়-পলি মাটির ফসলের মতো কত না খেলায় ছুঁয়েছিল সফলতা। নিজে নিজেই প্র্যাকটিস করে শিখেছিল বাউন্সার, লেগ কাটার, রির্ভাজ সুইং, অফ কাটার, ইয়র্কার । ছয়টা বল ছয় রকমের ডেলিভারি দিয়ে, কখনোবা হ্যাটট্রিক করে চমকে দিয়েছিল উত্তরপাড়া থেকে কন্ঠনগর, কন্ঠনগর থেকে গোঁসাইপুর, গোঁসাইপুর থেকে নানুয়ারবাজার, নানুয়ারবাজার থেকে ধর্মসাগরের পাড়। একেকটা জয় উদ্বুদ্ধ করেছিল তাকে। স্বপ্ন দেখিয়েছিল এক প্রজাপতিরঙা ভবিষ্যতের। একদিন কাঁপিয়ে দেবে পৃথিবীর সকল কিংবদন্তি স্টেডিয়াম।

আচমকা ঝড়ে যেমন ঝরে যায় বাবুইয়ের ঘর। আল আহসানের স্বপ্নও ঝরে যায় চৌদ্দশত সাত বঙ্গাব্দের দগদগে বৈশাখে। সাতশ কুড়ি মার্কস পেয়েও ন'মাসের ছোট ভাই-বন্ধু-সহপাঠী আল ইমরানের মতো হাইস্কুল পেরুনো হলো না ওর। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের দুই আর শূন্য তাকে দিয়ে গেল ঘরহারা বাবুইয়ের শূন্যতা। এই পরাজয় যেন জাহাজের কোথাও ছোট এক কুহরের মতো, যেখানে ঐ দিঘল জাহাজেরই নিয়তি লেখা থাকে নিস্তব্ধ অন্ধকারে। 'ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে!'- এই স্বপ্নে বিলীন আব্বার লাথি, মারও যে মাঠ থেকে দূরে রাখতে পারেনি আল আহসানকে। কোন কোন দিন জানালার শিক গলেই পালিয়েছে মাঠের ঘোরে। সেই বিকেলের মাঠটাই হয়ে গেল রূপকথা এক কিংবা মরীচিকা।

এক, তিন, সতেরো বছরে প্রভূত সম্ভাবনাকে অতলে ডুবিয়ে আল আহসান অবশেষে থিতু হয় গড়পড়তা মানুষের জীবনে। ঢাকায় তার নতুন সাকিন। শুধু মীরপুর স্টেডিয়াম আর কাঁপিয়ে দেয়া হয় না তার। এনজিওতে কাজ করে। পোস্ট কেরানির হলেও মেজাজী ম্যানেজার নুরুননাহার হালদারের ডান-বাম দুটো হাতই ও। দুটো হাতে বাজে বলে ব্যস্ততাও যেমন, সুখের পায়রাও জুটেছে দু,এক-- মায়াবতী সংসারী বউ, এক শিশু মুখ। সম্পাদক মমিনুল ভাই প্রায়ই আমার লেখা নিয়ে অনুযোগ করেন- 'চরিত্রের বর্ণনা দিতে পারেন না!' ছবি আঁকায় বরাবরই ঘটিরাম আমি। নাক-মুখ বসাতে পারি কিন্তু চেহারার আদল দিতে পারিনি কোনদিনই। তবে এটুকু জানাতে পারি ঘটকালির দিনগুলোতে ম্যানেজার নুরুননাহার বলেছিলেন- 'তোমাকে দেখেই ওদের পছন্দ হবে।' ভালোলাগার অভাব ছিল না কোনকালেই আল আহসানের। শুধু এক সময় খেলা ভালোবাসত বলে আর কারো ভালোবাসা দখল নিতে পারেনি জমাট মাঠে। তারপর জীবনের টানাপোড়েনে বিরানই থেকে গেছে তার প্রেমের জমিন। তাই এতদিনে ওর সবটাই পেয়েছে স্ত্রী জয়তুন। তবু মাঝে মাঝে জয়তুনের মনে হয় কিছু একটা যেন নেই- সেই প্রথম প্রেমের স্বাদ। দুটো একটি দুঃখবিলাস ছাড়া সংসার পাগল আল আহসানকে পেয়ে সুখীই জয়তুন।

আল আহসান বিকেলে সুঢৌল ভুড়ি দুলিয়ে বাড়ি ফেরে। কদমতলীর পথে দুটো একটা ঝিঙে ফুল দেখে মুগ্ধ হয়, মুগ্ধ হয় পাটোয়ারী মিলসের পেছনের ঝিলে ফুটে থাকা লাল শাপলায়। ইহসান মিঞার দোকানে লোকেরা খেলা দেখে, গ্যাঞ্জাম করে। আল আহসান কোলাহল এড়িয়ে চলে যায় বিকেল ঢেকে রাখা বাড়ির পথে। ওর হাতে নীলরঙা বেলুন, অন্য হাতের ব্যাগ থেকে উকিঁ দেয় দুটো তিনটে সব্জি, মাছের মরা চোখ। আল আহসানের লাগাম পড়ানো চোখ তখন খুঁজে আজমানের তাজ। ছোটবেলায় বু'জীর মুখে শোনা সেই আজমান গাজী যে শিখেনি হেরে যেতে। প্রাসাদ তার ঘিরে ফেলেছে দস্যুবাহিনী। তিনশ দিনের যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজিত গাজী লুকিয়ে রাখে সাত কন্যা। যাদের কোনদিন আর খুঁজে পায়নি কেউ। অবশেষে শেষ পরিণতিতে পরাস্ত গাজী 'শির দেব, তবু তাজ দেব না' হুংকার তুলে রক্তাক্ত তলোয়ার চালায় নিজের গলায়। বু'জী বলতো গাজীর সাত মেয়ে আজও দূর্লভ ক্ষণে দেখা দেয় রঙধনু হয়ে আর পশ্চিমের আকাশে ঐ যে লাল ওটা গাজীর রক্ত। ঐখানে ঝিলিক দেয় অপরাজেয় আজমানের তাজ। কে জানে এসব সত্য কিনা। তবু প্রতিদিন আল আহসান খুঁজে বেড়ায় আজমানের তাজ।

কোন এক কবি লিখেছিল- স্বপ্নের নাম জেনো উঠোন। সত্যি, মহুয়া স্বপ্নের মতোই দোল খায় উঠোনের সবুজ মাচায় কুমড়োর ফুল। কুকুর নরম স্বরে চেঁচায়, বারান্দায় লিলুয়ার হাওয়ার মতো মেয়ে ডাকে- বা বা, বখাটে বাতাস তোলপাড় করে নীলরঙা বেলুন। মেয়ের হাতে দুপুরে ফেরিওয়ালা থেকে কেনা লালরঙা বল। বেলুন ধরবে বলে তুলতুলে হাত খসে একটু একটু করে গড়িয়ে যায় বল আল আহসানের পায়ের কাছে। আল হাসান থমকে যায়। এ যেন গাজী আজমানের কাটা মাথা। দূর বাঁশঝাড় থেকে হি হি করে হেসে উঠে কোন কালের স্বপ্নের প্রেতাত্না। সে হাসিতে চমকে উঠে আল আহসান। চমকে উঠি আল আহসানকে বয়ে বেড়ানো আমিও। আজকাল বিকেল গড়ালেই একই দৃশ্য দেখি- হি হি করে হেসে উঠা বাঁশবাগান, গাজী আজমানের কাটা মাথা, সবুজ মাচায় কুমড়োর ফুল, বখাটে বাতাস তোলপাড় করে কার যেন নীলরঙা বেলুন...