বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৫ জুলাই ১৯৮১

যুথীর ভয়

  • advertisement

    যুথীর ভয়

     

     

    বালতি ভর্তি সাপ কিলবিল করছে।

    গোসল করতে গেলেই এমনটা মনে হয় যুথীর। মগ দিয়ে পানি তুলতে গেলেই বুঝি গোটা দশেক সাপ পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে তার হাত বেয়ে ওঠে যাবে। ঘটনাটা অন্ধকারে আরো বেশী ঘটে।

     

    এর নাম কি? স্নেক ফোবিয়া? নাহ এমন কেন হবে। অন্য সময়তো তার সাপের কথা মনে হয় না। সাপ দেখলেও তেমন একটা ভয় লাগে না। ভয়টা কেবল গোসল করার সময়। আচ্ছা সে ঝর্ণা দিয়ে গোসল করার চেষ্টা করলেইতো হয়! কিন্তু বাথরুমে ঢুকার পর ঝর্ণার কথা মনে আসে না কেন?

     

    ঠিক এই কারনেই সে বিকালের আগে আগে গোসল সেরে নেয়। আজ কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধা হয়ে গেল। বাসায় নাই বিদ্যুৎ। আই পি এস এর লাইন বাথরুমে দেয়া হয়নি। অথচ গোসল করা ছাড়া কোন গতি নাই। বাস থেকে পানের পিক মিসানো কফ এসে সরাসরি তার হাতে লেগেছে। যুথী কিছুক্ষন হাতের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ভেউ ভেউ করে কেঁদে দিল। রিক্সাওয়ালা খুব আন্তরিকতার সাথে বল্লো, আফা আপনে বন্, ওর কফ আমি ওরে দিয়া চাটামু।

     

    যুথি অস্বস্তির সাথে অবাক হয়ে রিক্সায় বসে আছে। জ্যাম ছুটে গেছে। রিক্সাওয়ালা দোড়াচ্ছে বাসের পিছনে। যুথীর থেমে থাকা রিক্সার পিছনের গাড়িগুলো একের পর এক হর্ণ দিয়ে যাচ্ছে। ও কি করবে? রিক্সা থেকে নেমে দাড়াবে? ঘিন্না ও বিরক্তিতে যুথী আবারো ভ্রু কুঁচকে কাঁদতে শুরু করলো।

     

    এত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি পার হয়ে এখন ঠান্ডা পানি দিয়ে ফ্রেস একটা গোসল দিতে পারলেই হয়। এ ন্যাচেরাল বাথ নাথিং ইন বিটুইন বডি এন্ড ওয়াটার।

     

    যুথি হালকা অন্ধকারেই গোসল করতে ঢুকলো। বালতির পানিতে হাত দিয়েই ভয়ে সে অস্থির। বালতির পানিতো ঠান্ডা! সাপের গা নাকি ঠান্ডা হয়। সাপের রক্ত যে ঠান্ডা হয় তাও সে জানতো না। তার বান্ধবী শেফালির কাছ থেকে শুনা। শেফালি চুপচাপ ছেলেদেরকে দেখতে পারে না। সে নম্র ভদ্র টাইপ ছেলে দেখলেই বলবে - সর্পবালক, স্নেক হ্যাজ কোল্ড ব্লাড।

     

    কিছুক্ষন চুপচাপ দাড়িয়ে থেকে যুথীর আবারো কান্না পাচ্ছে। গা গুলায়ে ঘিন্না লাগছে। কিন্তু ফ্রেস যে হবে তা ও পারছে না। এর নাম ফোবিয়া, স্নেক ফোবিয়া। যুথি কতক্ষণ দাড়িয়ে ছিলো তা মনে নেই। হঠাৎ করেই বাথরুমের লাইট জ্বলে ওঠলো। আহারে আলোতে বুঝি এত স্বস্তি! যুথি বালতির পানিটা ফেলে দিয়ে নতুন করে পানি ছেড়ে দিলো। নাও মিশন ফর দা ন্যাচেরাল বাথ...

     

    এখন ফ্রেস লাগছে। যুথী গুনগুন করে গান ধরলো, দূর কোন পরদেশে তুমি চলে যাইবারে / বন্ধুরে, তুমি কবে আইবারে...। আচ্ছা সে যে এত ভালো গান গায় তা কি কেউ জানে? নাহ জানে না। সে কাউকে জানাবেও না। তার যেদিন "তুমি কবে আইবারে" জিজ্ঞাসা করার মত কেউ হবে সেদিন সেদিন সে গাইবে।

     

    যুথী মনে মনে বল্লো, তবু সমস্যা হ্যাজ। সেই "তুমি" যদি গান বিমুখ অথবা  বধিরই হয়! ইস্ক মোহাব্বাত কখন কার সাথে হয়ে যায় তা কিছুই বলা যায় না। হিন্দিতে গান আছে না, হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা, না জানে কিসপে আয়েগা...। আচ্ছা আওয়ারা অর্থ কী? নাহ্ শেফালীর মত হিন্দি সিরিয়াল না দেখলেই নয়। এত সুন্দর সুন্দর গানের দুই একটা শব্দের অর্থ না জানলে মনে হয় গন্তব্যের মাঝে একটা ব্রিজ বুঝি ভাংগা। গন্তব্যে না পৌছানোর দুঃখ অনেক। যাদের অভিজ্ঞতা আছে তারা বুঝে।

     

    যে প্রেম হয়ে যায় সে প্রেমে সমস্যা নাই। সমস্যা বাধে সেই প্রেমে যে প্রেম হয়েই আছে অথচ টেরই পাওয়া যাচ্ছে না। হয়ে থাকা প্রেমের টের পাওয়া যায় ভাঙ্গনের ব্যাথা অনুভব করার পর। তখন ইট ইজ ঠু লেট।

     

    ইট ইজ ঠু লেটের মত হয়ে যাওয়া কিছু কি যুথীর আছে? না থাকার সম্ভাবনাই বেশী। তাহলে গোসল করতে গেলে সাপের চিন্তা মাথায় আসতো না। চিত্ত জুড়িয়া থাকিতো সে। যুথী ফিক করে হেসে দিলো। এত রোমান্টিক একটা ভাবনাও এসে মিশলো সাপের চিন্তার সাথে?

     

    করা যায় কি?  ঘটনাটা নিয়ে যে সে কারো সাথে আলোচনা করে নি তা না। মা'কে সাপের ভয়ের কথা সে বলেছে। বলে লাভের লাভ হয়েছে কোন এক মুখে গন্ধওয়ালা হুজুরের ফু দেওয়া পানি গিলতে হয়েছে তিন দিন। শেফালিকেও বলেছিলো। শেফালি দুইটা বুদ্ধি দিয়েছে। প্রথমটা সেমি এডাল্ট আর পরেরটা এডাল্ট টু দি পাওয়ার এভারেষ্ট। একটা ওয়েতেও এই ভয় কাটানোর চেষ্টা করার সাহাস যুথীর নাই।

     

    আজ বাংলা ক্লাশ। মহিন স্যার নেন। আজ ক্লাশ নিতে আসলেন কালো কুচকুচে এক টিচার। কিছুটা শর্ট, রোগা পটকা টাইপ। চোখে গান্ধীজির মত গোল চশমা। চশমার কারেন বয়স গেছে কমে। মনে হচ্ছে হাই স্কুলে পড়ে। তিনি যে শিক্ষক তা কেউ মনেই করেনি! ক্লাশে ঢুকে মার্কার দিয়ে হোয়াইবোর্ডে তিনি লিখলেন, রবীন্দ্রনাথ - ড. সফিকুল ইসলাম। এরপর আঙ্গুল দিয়ে ডায়াসের উপর টক টক করে দুই তিনবার শব্দ করলেন। রোল কল করলেন। ক্লাশ অন্য দিনের চেয়েও আজ মনে হয় একটু বেশীই নিরব হয়ে গেলো। বাহ্ ভালোইতো কন্ট্রোলিং পাওয়ার! বয়স ও স্বাস্থ্যের গুনে যে ক্লাশ নিরহ বয়ে গেলো তা তো নিশ্চয়ই না। ব্যাটার নাম কি ড. সফিকুল ইসলাম?

     

    সফিক প্রথম বাক্যটি বল্লেন, আমার নাম ড. সফিকুল ইসলাম না। যুথী মনে মনে বল্লো, বাহ্ বাঘের বাচ্চা, গুড ষ্টারটিং। তিনি একটা হাসি দিয়ে বোর্ডের কাছে গেলেন। মোনালিসা টাইপ একটা হাসি মুখে মাখিয়ে রেখে বলা শুরু করলো, রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের ডক্টরেট না। তাঁর "বর্ষার গানে বিরহ" বিষয় নিয়ে রিসার্স করে সফিক সাহেব পিএইডি পেয়েছেন। ড. সফিক কে তা তোমাদের না চিনলেও হবে। এখানে ড. আকমল বা গোলাপী যাই দাও সমস্যা নাই। আমার উদ্দ্যেশ্য ছিলো তোমাদেরকে বুঝানো, যারা সাহিত্যে পড়েন তারাই যে সাহিত্যে ভালো করবেন তা না। বরং  ফিল্ড অব ইন্টারেষ্ট যার যাতে বেশী তাতে তিনি ভালো করবেন।  এবার মূল কথায় আসি। আমি বাংলায় পড়া লোক নই। ফিল্ড অব ইন্টারেষ্টও আমার বাংলা না। আমি কেমিষ্ট্রির মানুষ। ফিল্ড অব ইন্টারেষ্টও আমার কেমিষ্ট্রি। তাই আমি তোমাদের বাংলা ক্লাশটা ভালো ভাবে নিবো তার কোন সম্ভাবনা মনে হয় নাই। বোর্ডে নাম দুটো লেখার কারন, আমি রবীন্দ্রনাথও নই, ড. সফিকও নই। আমি নেপাল। ছেলেমেয়েদের নাম ভেবেচিন্তে রাখার মত পরিবার থেকে আমি আসিনি। নিতান্তই নিম্নবিত্ত একটা পরিবারে আমার জন্ম। তবে নামটা কেন বিদেশী হয়ে গেল তার কারন আমি অনুসন্ধান করেও পাইনি। মহিন স্যার অসুস্থ্, তিনি চিকিৎসা করাতে ইন্ডিয়া গেছেন। তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত আমিই তোমাদের বাংলা ক্লাশ নিবো। অবশ্য তোমরা যদি আমাকে পছন্দ করো।

     

    নেপাল বোর্ড থেকে সরে এবার ক্লাশের দুই সাড়ি বেঞ্চের মাঝ দিয়ে হেটে হেটে রুমের মাঝখানে এসে থামলেন। সবার আই কন্টাক্ট নেবার চেষ্টা করে বল্লেন, সাস্থ্য লেখতে যফলা আছে কিন্তু সুন্থ লেখতে যফলা নেই। এই বিষয়টা তোমরা খেয়াল করে দেখেছ?

     

    নেপাল যুথীর পাশে দাড়িয়ে খুব পরিচিত স্বরে বল্লেন, যুথী তুমি খেয়াল করে দেখেছিলে এর আগে?

     

    ধক্ করে ওঠলো ভিতরটা। হ্যাঁ না কিছুই না বলে চমকে ওঠলো সে। যুথী মোটেও ভাবেনি তার নাম মনে রেখে টিচার তাকে এমন পরিচিত স্বরে জিজ্ঞাসা করবেন।

     

    যুথীর পাশ থেকে সরে গিয়ে অন্য একটা বেঞ্জের একজন ছেলের দিকে তাকিয়ে নেপাল জিজ্ঞাসা করলো, পনির তুমি বলো, এই সহজ ব্যাপারটা এর আগে খেয়াল করেছো?

     

    ঘটনা কিছুই না। তবু যুথীর মন ভীষন খারাপ হয়ে গেলো। টিচার তো নাম ডাকার সময়ই সবার নাম মুখস্থ্য করে বসে আছেন! তিনি তো যুথীর দিকে আর ফিরেও তাকাচ্ছেন না! দুই একবার যা ও তাকালেন সেই দৃষ্টিতে পনিরও যা যুথীও তা।

     

    যুথী বার বার মনে মনে বলতে লাগলো, প্লিজ সেই "তুমি" যেন এই আপনি না হোন। যুথী অন্য কোন কথাই মনযোগ দিয়ে শুনলো না। কখন ক্লাশ শেষ হলো তাও খেয়াল হলো না। নেপাল যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন সবার সাথে সেও ওঠে দাড়ালো। যুথী বার বার মনে মনে বলতে লাগলো, প্লিজ না...

     

    বাড়ী ফিরে যুথী ঘরে বসে আছে তো বসেই আছে। কেবলই সে মনে করার চেষ্টা করছে, কেমন দেখতে লোকটা? কালো কিন্তু মায়াবী নাকি কালো কিন্তু স্মার্ট। আচ্ছা কালো কিন্তু দেখতে সুন্দর না এই চিন্তা কেন সে করছে না?

     

    যুথী গোসলে ঢুকলো। তার হাত পা কাঁপছে। সে কি তবে চাচ্ছে না, যে আজ তার স্নেক ফোবিয়া কাটুক? দেখা গেলো গোসলটা শেষ হয়ে গেলো অথচ সাপের কথা একবার মাথায়ও আসলো না। তহালে! আচ্ছা এর চাইতে কি শেফালীর দেখানো দু'টি রাস্তার প্রথমটা টেষ্ট করে দেখা ভালো হবে না? দেখা গেলো যুথীর নাম ধরে ডাকার তুচ্ছ একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে ঘোরের মধ্যে থাকবে আর এদিক দিয়ে আনমনেই গোসল হয়ে যাবে শেষ। তাহলে তার মনের ভিতর ধারনাটা আরো পাকা পোক্ত হবে যে ইনিই সেই "তুমি"। ব্যাটা বিয়ে সাদি করা কি না কে জানে! আচ্ছা শেফালীর প্রথম বুদ্ধিটায় রিস্ক কতটুকু?

     

    যুথী আবারো ঝিম ধরে বাথরুমে দাড়িয়ে আছে। যুথীর বাথরুমে যাওয়া মানে এক ঘন্টা। ঘটনা সবার জানা। আজ সে এক ঘন্টারএ বেশি দাড়িয়ে রইলো। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে যুথী একটু মুচকি হাসলো। সে জানে সে কি করবে...।

     

advertisement