বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৮০

সাদা লজ্জাবতী

  • advertisement

    জীব বিজ্ঞানের ক্লাসে মাসুদ স্যার একটি ব্যাঙ অপারেশন করে তার দৈহিক গঠন দেখিয়েছিলেন। সেই দেখা থেকেই ত্বহা ত্বসীনের অন্তরে ডাক্তার হবার বাসনা। বাসায় ফিরে দু’জনেই ব্যাঙের খোঁজে নিজেদের নিয়োজিত করল। কেননা অনুশীলনটা এখন থেকে করলে হাতে যশ আসবে। তাই ঘরের চারকোণে, বাড়ির আশেপাশে ও পুকুর পাড়ে হন্ন হয়ে খুঁজেও ব্যাঙের দেখা মিললনা তাদের।

    পরদিন ক্লাসে স্যারের নিকট থেকে জানতে চায় ব্যাঙ কোথায় পাওয়া যায় ? স্যার বলেন, পুকুর পাড়ে বেশি থাকলেও তা ধরা মুশকিল। ঝোপে, জঙ্গলে বা পুরাতন বাড়িতে অনায়াসে পাওয়া যাবে এবং তা পাকড়াও করাও সহজ। আর ব্যাঙ শিকারে দিনের চেয়ে রাত বেশ উপযোগী। তবে এখন ব্যাঙের শীতনিদ্রার সময় তাই তেমন একটি চোখে না পড়াটাই স্বাভাবিক।

    ত্বহা ত্বসীন মহা খুশি। ব্যাঙের সন্ধান পেয়ে গেছে। তাদের গাঁয়ের শেষ প্রান্তেই ঝোপ, ঝোপের পরেই জঙ্গল আর জঙ্গলের মধ্যখানে জনশূন্য একটি দোতলা পুরাতন পাকা ঘর আছে। ঘরটি এক সময় বৃটিশদের রঙমহল ছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করে ইংরেজগণ এটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। কথিত আছে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকেই সে বাড়িটি ইংরেজরা ছেড়ে চলে যায়। তারপর সেখানে আর কেহ বসবাস করেছিল কিনা সে তথ্য কারো জানা নেই।

    দুই ভাই মনস্থির করল তারা ব্যাঙ ধরতে রাতে ঐ জঙ্গল বাড়িতে যাবে। শুরু হয় মিশন। আনুমানিক রাত নয়টা। আলো অন্ধকার রাত। ত্বহা ত্বসীন যাত্রা শুরু করে। সঙ্গে একটি পলিথিনের ব্যাগ ও একটি ম্যাচের বাক্স নেয়। গ্রামে একথা প্রচলিত যে, সঙ্গে ম্যাচ থাকলে কোন ভুত প্রেত সামনে আসেনা।

    উভয়ে হাটছে। ঝোপ অতিক্রম করতেই অদূরে ভয়ংকর আকৃতির একজন মানুষ স্থীর দাড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের গায়ে শিহরণ জাগে। গায়ের পশমগুলো সজারুর কাটার ন্যায় দাড়িয়ে যায়। ভয়ে পিছু হটবে এমন সময় তাদের মনেপড়ে তাদের সাথে ম্যাচ আছে। ভয় কিসের ? ভুত হলে আগুন দেখেই পালাবে। ত্বহার কাছ থেকে ত্বসীন ম্যাচটি নিয়ে একটি করে কাঠি জ্বালাচ্ছে আর এগুচ্ছে। কিন্তু লোকটি কিছুতেই এক বিন্দুও নড়ছেনা। যেই লোকটির কাছাকাছি চলে এল তখনই এক বন্যপ্রাণী ভয়ংকর শব্দে চেচিয়ে উঠলে তারা দৌড়াতে শুরু করে কয়েক কদম অগ্রসর হয়েই তা আর হলনা। লোকটির গায়ে ধাক্কা লেগে দু’জনে মাটিতে লুটে পড়ে। ত্বহা মাথা আর উঁচু করেনা। ত্বসীন একটু সাহস করে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখে সেটি একটি মুর্তি। বিষয়টি ত্বহাকে জানায়। ত্বহা উত্তরে জানায় সে ভয় পায়নি। বিষয়টা কি তা ভাবছিল। তবুও যেন দেহে প্রাণ ফিরে পেল। বুকে থুথু দিয়ে আবার চলতে থাকে।

    ঝোপ পেরিয়ে জঙ্গলের গজ বিশেক এগুতেই ত্বসীন হঠাৎ লাফিয়ে উঠে। বিশাল দেহী একটি সাপের লেজে সে পারা দিয়েছে। সাপটি ফানা তুলে তার দিকে তাক করে ফোঁস ফোঁস করছে। এরইমধ্যে ত্বসীন তার রান দু’টিতে গরম অনুভব করল। পকেটে থাকা ম্যাচটিও ভিজতে বাকি রইলনা। নিঃসংকোচেই বলি, এমন পরিস্থিতিতে সে হিশি করে দিয়েছিল। পানি পা গড়িয়ে নিচে পড়ছে যেই অনুভব করছে ইতোমধ্যে একটি বেজি সাপটির উপর ঝাপিয়ে পড়ে। সাপ বেজিটিকে একটি ছোবল মেরে পালিয়ে আতœরক্ষা পায়। ত্বসীন দেখে বেজিটি তার পায়ের পাশে থাকা একটি সাদা লজ্জাবতী গাছের ডালে কামড় দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিষমুক্ত হল। ত্বসীন ধারণা করল লজ্জাবতী গাছের উপর দাঁড়িয়ে ছিল বলেই সাপ তাকে কাটেনি। আর সাপে কাটার ঔষধ সাদা লজ্জাবতী গাছের ডাল এই তথ্য ত্বসীন পূর্ব থেকেই জানতো। ইহা ফুটপাতে সর্ব রোগের ঔষধ বিক্রেতা সাপুড়েদের নিকট শুনেছিল। সে এক খন্ড ডাল তুলে পকেটে নেয় যেন পরবর্তীতে সাপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

    অনেক চড়াই উৎরাই পাড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে তারা জঙ্গল বাড়ির সামনে এসে পৌঁছে। বাড়ির প্রবেশ পথে দেখে, রাস্তার দুই পাশে পিছন দিকে ফিরে আছে দু’টি বাঘ। দেখামাত্রই তারা চমকে যায়। এখন কী করবে ? এতদূর চলে এসেছে, আবার ফিরে যাবে ? না, এখন পিছু হটা যাবেনা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পিপিলিকার মত নিঃশব্দে অগ্রসর হতে লাগল। হাটার ধরণ এমন ছিল যেন নবাব বাড়ির সামনে দিয়ে হাটার সময় ছাতা বন্ধ করে জুতা খুলে বগলের তলে নিয়ে পায়ে আলতা মেখে মাথানত করে আলত হাটার মত অবস্থা। যাই হোক তারা সফল হল। বাঘ মামারা টের পেলনা। টের পাবে কি করে পাথরের বাঘ বলে কথা।

    ইউরেকা, বাড়িতে ঢুকা মাত্রই ব্যাঙের গেঁগো গেঁগো শব্দ তাদেও কানে আসে। কিন্তু ব্যাঙ না খুঁজে ত্বহা ভাবতে থাকে ব্যাঙেরতো এমন করুণ স্বরে ডাকার কথা নয় ! তাহলে !! ওরে বাবা, বিষাক্ত একটি সাপের মুখে ব্যাঙ। তারও চারপাশে আরো কয়েকটি সাপ ঘুরছে। ত্বহা এদৃশ্য দেখে ত্বসীনকে ইশারা দিয়ে দেখায়। দু’জনেই এক দৌড়ে মুহুর্তেই সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় পৌঁছতেই ত্বসীনের গায়ে কি যেন লাফিয়ে পড়ে। সে বিভৎস কন্ঠে চিৎকার দিয়ে গা ঝারা দিলে একটি ইদুরকে ছুটে পালিয়ে যেতে দেখে। দৌড়ে এসে দোতলার যে কক্ষে প্রবেশ করেছে তা এমন অন্ধকার যে, ইদুরের চোখ ছাড়া নিজেদেরকেও দেখতে পাচ্ছিলনা। আর ইতিপূর্বে যে কাজ করেছে ম্যাচের শলাও নিস্তেজ হয়ে গেছে।

    এদিক সেদিক তাকিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে ভেতরের কক্ষে কিঞ্চিৎ আলোর দেখা মিলে। হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে দেখে একটি পাথর আলো ছড়াচ্ছে। সম্ভবত এরূপ অসংখ্য পাথরের আলোতেই বৃটিশগণ রাত্রি যাপন করতেন। ত্বসীনের ইচ্ছা হল পাথরটি সঙ্গে নিয়ে আসতে। সেটিও দুঃসাধ্য ছিল, পাথরটি ছাদের সাথে ঝুলন্ত ছিল যা তার নাগালের বাহিরে। তাতে কি। পাশেই সিঁড়ি যুক্ত লম্বা একটি টুল দরজার সাথে হেলানো দেখতে পেল। দুই ভাই মিলে টুলটি টান দেয়ার সাথে সাথে দরজাটি ধপাশ করে পড়ে যায়। শুধুকি তাই , তারা সে সময়ে যে দৃশ্য দেখল সেটি আরও ভয়ংকর ও লোমহর্ষক। তারা দেখে, কয়েকটি কংকাল স্থীর দাড়িয়ে আছে। হয়ত বৃটিশগণ যাবার বেলায় বাইজিদের মেরে এখানে রেখে গেছে। ত্বসীন ভয়ে ভোঁ দৌড়। ত্বহাও দেয় দৌড়। এক দৌড়ে সিঁড়ির অপর প্রান্ত দিয়ে নিচ তলায়।

    একের পর এক কয়েকটি ভয়ংকর চিত্র তাদের সামনে পড়ায় তারা ভুলে যায় কেন এখানে এসেছে? শত চেষ্টায়ও মনে করতে পারছিলনা। অবশেষে ফেরতে মনস্থির করে ত্বহার পকেটে থাকা পলিথিনের ব্যাগটি ছুড়ে ফেলে। মুহুর্তেই একটি ব্যাঙ লাফিয়ে উঠতেই ত্বসীনের মনে পড়ল তারা কেন এখানে এসেছে। তারা ব্যাঙটিকে ধরার চেষ্টা করে এবং স্বার্থক হয়। এতে তাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। ব্যাঙটি হয়তো কিছু আহার করে ক্লান্ত। ত্বহা ব্যাঙটি হাতে তুলে নিয়ে এক কদম এগুতেই অদ্ভূত এক শব্দ শুনে। সম্ভবত একটি ভুত তাদের পিছু নিয়েছে। তারা দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। তাতেও ভুত তাদের পিছু ছাড়লনা। ভয়ে পূণরায় দৌড়াতে লাগল। ভুতের আগে কি কেহ দৌড়াতে পারে ? তারা দৌড়াচ্ছে, ভুত বাবাজিও তাদের পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে। তারা থামে, ভুতও থামে। পিছনে তাকিয়ে যা দেখে তাই ভুত মনে হয়। আবারও দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতে জঙ্গল, ঝোপ পেরিয়ে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় এসে থামে। দৌড়ে ও ভয়ে ক্লান্ত। তাদের বুক ধড়ফড় করছিল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাড়িয়ে রইল। ভুতেরও কোন সাড়াশব্দ নেই।

    এবার একটু স্থীর হয়ে বসার মনস্থির করে ত্বসীন যেই পা’টা নাড়াল অমনি ভুতের শব্দ শুনে গা বিদ্যুৎ এ শক খাওয়ার মত ঝিম ঝিম করতে লাগল। ভয়ে ভয়ে চোখ বাঁকা করে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে সঙ্গে নেয়া পলিথিনটা তার পায়ের সাথে আটকে আছে। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ থাকলেও সে মুচকী হাসে। আর স্বস্থির দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

    এবারের মিশন ব্যাঙের অপারেশন। ত্বহা ত্বসীন ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে একটি ছুরি ও চারটি পিন বের করে। ত্বহা ব্যাঙকে চিৎ করে চার পা পিন দ্বারা টেবিলের সাথে আটকে দিয়ে মাথা চেপে ধরে রাখে আর ত্বসীন ছুরি তলপেটে বসিয়ে দেয়। ইঞ্চি খানেক কাটতেই অদ্ভূত গোলাকার সোনালী বর্ণের একটি বস্তু দেখতে পায়। সেটি বের করতেই ব্যাঙ হাত পা গুটিয়ে এক ঝাকি দিয়ে ওঠে লাফিয়ে নিচে পড়ে লাফালাফি করছে। ত্বসীন বস্তুটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছে আর সেটির উপর আলোর ঝলক পড়লেই তীক্ষè আলোয় ঝলমল করছে।

    তা দেখে ত্বহা বলে এটি ব্যাঙের মোহর তথা সাত রাজার ধন।
    মোহরটি ব্যাঙের পেটে ছিল বিধায় শীতল অনুভব করল। তারা ভাবল একটু গরম করা দরকার।

    ঘরে স্টেপ ডাউন ট্রান্সফরমার ছিল যা দিয়ে বেশি ভোল্টেজকে কম ভোল্টেজে রূপান্তর করা যায়। ত্বসীন ট্রান্সফরমারটি নিয়ে চারটি রেকটিফায়ার ও একটি ক্যাপাসিটর কয়েকটি ক্যাবলের সাথে সংযুক্ত করে এসি থেকে ডিসিতে রূপান্তর করল। প্রক্রিয়াটি যথাযথ হয়েছে কিনা তা হাতে ধরে চেক করে নিল। এতে সে শক খেলনা। কেননা ট্রান্সফরমারটি ছিল দশ ভোল্টের। ত্বসীন জানতো মানুষের শরীরে ষাট ভোল্ট ধারণ ক্ষমতা থাকে। তাই ষাট ভোল্টের কম হলে মানুষ শক অনুভব করেনা।

    আর ত্বহা টচ লাইট থেকে একটি বাল্ব বের করে সেটা জালালো। তারপর একটি পাত্রের মুখ ছিদ্র করে তাতে লাইট সেট করে সেই পাত্রের ভেতর মোহরটি রেখে মুখ বন্ধ করে দিল।

    এতসব করতে করতে ভোর হয়ে যায়। তারা রাতের ঘটনা ও মোহরের কথা বাড়ির সকলকে জানালো। গুপ্ত ধনটির কথা একে একে গোটা গ্রামবাসী জানল। সবাই তাদের বাড়িতে এসে ভিড় জমাতে থাকে সেটা দেখার জন্য। এদিকে থানার লোকজনও এসে হাজির। তাদের বক্তব্য, গুপ্তধন রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এটি তারা নিয়ে যাবে ও প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরে পাঠিয়ে দেবে। ত্বহা ত্বসীন দিতে অসম্মতি জানালে তাদের এক ধমক দিয়ে চুপটি করে বসিয়ে রাখে।

    অতপর দারোগা পাত্রের মুখ খুলে ভিতরে হাত দিয়ে গোলাকার কিছু খুঁজে পাচ্ছিলনা। তবে কাঠিরমত কি যেন তার হাতে লাগলে সে সেটি তুলে আনল। ওরে বাবা, সে একটি বিষধর সাপের বাচ্চা তুলে আনল। ভয়ে চিৎকার দিয়ে ছুড়ে ফেলে লাফিয়ে উঠে। এদৃশ্য দেখে এলাকাবাসী দিক বেদিক ছুটাছুটি শুরু করে।

    ত্বহা ত্বসীন লজ্জাবনত হল। ত্বসীন বুদ্ধিকরে সকলের উদ্দেশ্যে বলল, “ভয় পেয়োনা, আমার নিকট সাদা লজ্জাবতীর ডাল আছে।”

advertisement