বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৮০

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

সমপ্রাণ

বিন আরফান.

  • advertisement





    এইতো সেদিনের কথা। সময়টা ছিল ২০০৬ সালের মার্চ মাসের দুই তারিখ। সেদিন বেশ ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছিল। আমার ঘরের ফ্যানটাও যেন তামাশা করছিল। ঘুরছিল ঠিকই কিন্তু ফ্যানের যে কাজ অর্থাৎ শরীর ঠান্ডা করা, তা হচ্ছিল না। শুধু অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ হচ্ছিল। সান্তনা বলতে ওইটুকুই। হঠাৎ গভীর রাতে বিদ্যুৎ উধাও। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। শরীরে ঘাম জমে তা শীতের শিশির বিন্দুর মত টলমল করছিল। ভীষন অস্বস্তি হচ্ছিল।

    একটু হলেও এই অস্বস্তি থেকে বাঁচার জন্য হাত পাখার বাতাস নিচ্ছিলাম। আমার পাশে শুয়ে ছিল আমার স্ত্রী। মাঝে মাঝে তার দিকেও পাখাটা ঘুরাচ্ছিলাম। ও হঠাৎ ক্ষেপে গেল, তুমি আসলেই পাষাণ। বাতাসটাও জোরে দিতে জাননা। বলেই স্ত্রী কান্না জুড়ে দিল।

    তার এরূপ আক্ষেপে অবশ্য আমার খারাপ লাগলোনা। আহারে বেচারা! নয় মাসের দ্ইু জমজ সন্তানকে গর্ভে নিয়ে ভ্যাপসা গরমে ছটফট করছিল। আমিও গরমে হাপাচ্ছিলাম, কিন্তু স্ত্রীর ভিতরের অস্থিরতার বিন্দুমাত্রও যেন আমাকে স্পর্শ করতে পারছিলনা। বরং ওর অস্থিরতা আমাকে ব্যাকুল করে তুলছিল।  এর কারন অবশ্য স্পষ্ট। আমাদের ছিল ভাললাগা আর ভালবাসার বিয়ে। তার উপর আমি নিজে ওকে পছন্দ করেছিলাম।

    এরকম পরিস্থিতিতে আমি ওর মাথায় পরম মমতায় হাত বুলাতে বুলাতে প্রশ্ন করলাম, খুব খারাপ লাগছে?

    ও কপট অভিমানের সুরে বলল, ধরবে না তুমি আমাকে। ঘুমাও। কেউ আমাকে বুঝতে চায়না। আমার কী যে যন্ত্রণা। আজ আমার মা যদি বেঁচে থাকতো।

    কথাগুলো বলে ও আবার কাঁদতে শুরু করে দিল।

    নিজেকে আমার অসহায়ের মত মনে হল। অনেক তোষামোদ করে ওর কান্না থামালাম। কিন্তু ওর মাতৃত্বকালীন যে যন্ত্রনা তা হয়তো আমি কিঞ্চিৎ পরিমানও অনুভব করতে পারছিলামনা। বাসায় মহিলা বলতে আমার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ছিলনা। ওর মা মৃত, বোন নেই। আর আমরা নিজে নিজে বিয়ে করে আলাদা থাকার ফলে আমারও নিকট আত্মীয় বলতে কেউ কাছে ছিলনা।

    খুব চেষ্টা করছিলাম নিজেকে সামলে রাখতে। কিন্তু মানুষতো। তাই ওর অস্থিরতা আর চেচামেচি মাঝে মধ্যে আমার প্রচন্ড বিরক্তির কারন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। আসলে ও চাইছিল আমাকে অবলম্বন করে একটু ভাল লাগার পরশ পেতে। একটু নির্ভরতা পেতে। কিন্তু আমার এলোমেলো মন পরিস্থিতিটা সামাল দেয়ার মত যথেষ্ট পরিপক্ক ছিলনা। বরং ধৈর্যের সীমা ভেঙ্গে মনে হচ্ছিল একটু ধমক দেই ওকে, এবার একটু থাম প্লিজ। কাল আমার অফিস আছে।

    কিন্তু মনের কথা মনেই রয়ে গেল। এতটা নিষ্ঠুর আমি কখনোই হয়তো হতে পারবোনা। তাই কথাগুলোও আর বলা হলনা। তাছাড়া আমি ছাড়া ওর যে আর কেউ নেই। আর যন্ত্রণাটাতো ওরই বেশি। অন্তত এটা ভেবেই আমি ক্ষান্ত হলাম। দু’এক কলম লেখা-পড়া শিখেছিলাম বলে মনে পড়লো সেই ছোটবেলায় শেখা কবিতার অংশবিশেষ, “চির সুখিজন ভ্রমে কি কখন, ব্যথিত ব্যথা বুঝিতে কি পারে....”

    স্ত্রীর প্রতি সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপা আর রহমত ছিল। যেহেতু আমি ছাড়া ওর আর আপন বলতে কেউ ছিলনা, তাই ওর ব্যথার মর্মটা আমাকে কিঞ্চিৎ বোঝানোর জন্যই হয়তো আমার হাটুর উপরের মাংস পেশিতে একটি ফোঁড়া হয়। আমি না বুঝে চুলকিয়ে অবস্থা আরো ভয়াবহ করি। অসহ্য ব্যথায় চিৎ হয়ে শুতে পারতাম না। ব্যথার তীব্রতায় কান্না পেলেও নিজেকে সামলে রাখতাম। স্ত্রী কোথা থেকে যেন ঔষধি গাছের পাতা সংগ্রহ করে তা পাটায় বেটে একরকমের ঔষধ বিকেলেই বানিয়ে  রেখেছিল। যেই আমি ব্যথার তিব্রতায় ছটফট করতে থাকি, আমার নড়াচড়ার ধরনে বুঝতে পারে আমি ব্যথিত তাই তাৎক্ষণিক বাটা ঔষধ আমার ক্ষত স্থানের চারপাশে লেপটে দেয়। তাতে আমি আরাম অনুভব করতে লাগলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ব্যথা বুঝি এর চেয়েও বেশি?

    ও আমার প্রশ্ন শুনে উচ্চস্বরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। কান্না জড়িত কন্ঠেই বলল, না আমার কিসের ব্যথা। তুমিতো আমার পাশেই আছ।

    কথাগুলো বলতে বলতে ও আমার বুকে মাথা রাখলো। আমিও ওর মাথায় পরম মমতায় আলতো হাত বুলাচ্ছিলাম। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও ‘আল্লারে’ বলে ভীষন ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠলো। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব। মনে হচ্ছিল আমার বুকের সবকটি হাড় ভেঙ্গে এক জায়গায় জড়ো হয়ে গেল। আমার চোঁখ দিয়ে পানি নয়, যেন রক্ত ঝরে পড়বে। ওর কি হল আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলামনা।

    চিৎকার চেচামেচি শুনে পাশের বাড়ি থেকে একজন ছুটে এলো। দুই জনে ধরে তাৎক্ষণিক আবাসিক হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। আরএমও দ্রুত এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে সিএমএইচ রেফার করে দিল। আমি দিশেহারা হয়ে পড়লাম। সংগে কি নেই, কি আছে, কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলামনা। সেই দিনই প্রথম উপলব্ধি করতে পারলাম, এই বিশাল পৃথিবীতে আমি আসলে খুবই একা।

    এ্যাম্বুলেন্সের বেডে শুয়ে থেকে স্ত্রী আমার কাছে জানতে চাইলো, আমি যদি মরে যাই তোমাকে কে দেখবে?

    তার এমন কথায় আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। অবাক হলাম, যার নিজের অবস্থা এতটা সঙ্গীন, সে কিনা আমাকে নিয়ে চিন্তিত। কতটা ভালবাসা থাকলে এমন প্রশ্ন করা যায়?

     চোখে আমার জল টলমল করছিল। বুকের ভিতর যেন একটি বিশাল কষ্টের পাথর জায়গা করে নিল। যে পাথর কাউকে দেখানোও যায়না আবার বয়ে বেড়ানোও যায়না। আমি সেই কষ্টের কথা তাকে বলতে পারলামনা। কিছু কিছু কষ্ট আসলে কাউকে দেখাতে নেই। শুধু নিরবে চোঁখের জল ফেলতে লাগলাম। তাছাড়া  মনে সংশয় ছিল ও যদি সাহস হারিয়ে ফেলে?

    আমি ওকে সাহস দেয়ার জন্য বললাম, তোমার কিছুই হবেনা। তুমি মা হবে। আমাদের ঘর আলোকিত হবে। দেখ, তখন আর আমরা একা থাকবোনা। সন্তানের কলকাকলিতে ঘরটা কানায় কানায় পূর্ণ হবে।

    স্ত্রী কিছুটা আহত স্বরে জানতে চাইলো, আমি কি মা ডাক শুনতে পারবো? মনে হয় আমি আর বাঁচবো না।

    ওর কথার উত্তর দিতে না দিতেই এ্যাম্বুলেন্স সিএমএইচের গেটে চলে এলো। একজন স্পেশালিস্ট গাড়ির সামনে চলে এলেন। সিস্টারকে দ্রুত সিজারের ব্যবস্থা করতে বলে আমাকে বললেন রক্ত সংগ্রহ করতে। তার পর তারা আমার স্ত্রীকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেলেন। যাবার সময় ও আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে অসহায়ের মত তাকিয়ে রইলো। আমার ভিতর তখন কি থেকে কি হয়ে গেল জানিনা। ও আমার চোঁখের আড়াল হবার পরেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলামনা। এতক্ষণের জমানো মেঘ যেন এবার শ্রাবণ ধারায় বর্ষন হতে লাগলো। হুহু করে কেঁদে উঠলাম। বেশ কিছুক্ষণপর মনটা একটু হালকা হল।

    রক্তের প্রয়োজনের কথা আমি ফোন করে আমার অফিসে জানিয়ে দিলাম। বাড়িতে কেউ আমার সাথে কথা বলেনা। কারন আমি বিয়ের পর থেকেই কারো সাথে যোগাযোগ রাখিনি। অন্য কোন কারনে নয়, লজ্জায়। কিন্তু সেদিনের সেই পরিস্থিতিতে সব যেন ভুলে গেলাম। মাকে ফোন করে কান্না জড়িত কন্ঠে বললাম, মা আজ লিপির (আমার স্ত্রীর নাম) সিজার হবে। রক্ত লাগবে। জমজ ছেলে, জানিনা বাঁচবে কিনা।

    কথাগুলো বলেই ফোন রেখে দিলাম। নিজেকে উদভ্রান্তের মত লাগছিল। ঘন্টাখানেক একের পর এক সিগারেট টানতে লাগলাম। বিবাহিত জীবনের সুখের ছোট ছোট অনেক স্মৃতি এলোমেলোভাবে মনে এসে ভিড় করতে লাগলো। একজন পুরুষের জীবনে তার স্ত্রী যে কত গুরুত্ব বহন করে তা বুঝতে পারছিলাম। এরই মধ্যে অফিসের তিনজন সহকর্মী এসে জানালো, রক্ত জমা দিয়ে এসেছি। চিন্তুা করোনা। সিজার হবে।

    শুনে সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠলো। আসলে সেনাবাহিনীতে ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ সর্বদা এই নীতি প্রচলিত। চাওয়া মাত্রই সব যেন মুহুর্তের মধ্যেই মিলে যায়।

    আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুক্ষনের মধ্যেই হাসপাতালে আমার মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়, স্বজন সবাই চলে এলো। মা জানতে চাইলো, আমার বৌমা কোথায়? আমি রক্ত দিয়ে এসেছি।

    মায়ের মুখে এমন কথা শুনে ভাল লাগায় আমার চোঁখ দুইটা যেন আবার ভিজে উঠলো।
    সিজারের প্রস্তুতি সম্পন্ন। শেষবারের মত আমি স্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। আমি ওকে আর কি সান্তনা দেব, উল্টো ও আমাকে সান্তনা দিয়ে বলল, চিন্তা করোনা। সবসময় নিজের দিকে খেয়াল রেখ। আর আমার সন্তানদের দেখো। জানি তোমার কষ্ট হবে। তবু চেষ্টা করো ওদের মানুষ করতে।

    আমি কিছু বলতে চাইলাম। কিন্তু পারলামনা। ডাক্তারের অনুরোধে আমাকে বাইরে যেতে হল।

    এরপর শুরু হল প্রতীক্ষার এক দীর্ঘ প্রহর। ওয়েটিংরুমে সাবই অস্থির। আমার ভিতরে যেন ভাংচুর শুরু হয়ে গেল। জীবনের সকল নেক কাজের কথা ভাবতে লাগলাম। শুধু বিনিময়ে স্ত্রীর জন্য পানাহ চাইছিলাম। হঠাৎ ভিতরে কামড় দিয়ে উঠল। সাদা গ্লাসে নির্মিত দেয়াল দ্বারা ওটি থেকে ডাক্তারকে বেরিয়ে আসতে দেখি। দেয়ালটি শব্দ প্রুফ বিধায় নবজাতকের কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলামনা। মনে ভয় ঢুকে গেল। আমি কি সব হারালাম ? এমনি সময় চির কাঙ্খিত সেই খবরটি পেলাম। আমার স্ত্রী মা হয়েছে! নার্সরা ওটি থেকে দু’টি চাঁদের মত ছেলে বের করে নিয়ে এলো। আমার মা ওদের কোলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো, আমি দাদী হয়েছি।

    আমি দৌঁড়ে স্ত্রীর কাছে গেলাম। ওর তখন জ্ঞান ছিলনা। ডাক্তার বললেন, সুস্থ্য আছে। শব্দ করবেননা। বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন।

    আমার মন মানছিলনা। তাই শব্দ না করার ওয়াদা করে ডাক্তারকে অনুরোধ করে আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। ওর যখন জ্ঞান ফিরলো তখন যেন আমি প্রাণ ফিরে পেলাম। কিন্তু ও কোন কথা বলতে পারছিলনা। আমাকে ঈশারায় বোঝাতে চাইলো, তুমি বাবা হয়েছ।
    আমি বললাম, না, তুমি মা হয়েছ।

    ও আমার কথায় মুচকি হাসলো। সেই হাসি এতটাই ভাল লাগার আর এতটাই নির্মল ছিল যে, তৎক্ষনাৎ আমার মনে হল, পৃথিবীতে এর চাইতে সুখের অনুভূতি আর কিছুতেই হতে পারেনা। কিছুতেই না।


advertisement

  • মাহাতাব রশীদ (অতুল)
    মাহাতাব রশীদ (অতুল) কি বলব !!!!চোখে পানি আসার সত্যিকারের গল্প.আপনার স্ত্রী ও মাকে ও বিন অরফান কে .........................................................................এক ...........................................................................................বিশাল ........  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
  • মাহ্ফুজা নাহার তুলি
    মাহ্ফুজা নাহার তুলি পড়তে পড়তে চোখে পানি এসে গেল...............দারুন.....অসাধারণ....
    প্রত্যুত্তর . ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
  • শরিফ হোসাইন সেলিম
    শরিফ হোসাইন সেলিম অনেকদিন পর পড়লাম, বাস্তবকে কাহীনিতে রুপান্তর অসাধারণ। পড়তে পড়তে কেঁদেই ফেলেছিলাম বোধহয়। তো এখন বাবুরা কেমন আছে? দোয়া করি বাবার নাম উজ্জল করুক।
    প্রত্যুত্তর . ১১ মে, ২০১২
    • বিন আরফান. আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে. আপনার জন্য ও তাই কামনা করছি. ভালো থাকবেন সতত .
      ১১ মে, ২০১২