কাজলা দিদি

 (যতীন্দ্রমোহন বাগচী)

 

 বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,

 মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?

 পুকুর ধারে লেবুর তলে,

 থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে,

 ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই,

 মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?

 

 সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো;

 দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?

 খাবার খেতে আসি যখন

 দিদি বলে ডাকি তখন,

 ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো?

 আমি ডাকি, তুমি কেন চুপটি করে থাকো?

 

 বল্ মা দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে?

 কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল বিয়ে হবে!

 দিদির মত ফাঁকি দিয়ে

 আমিও যদি লুকাই গিয়ে

 তুমি তখন একলা ঘরে কেমন ক'রে রবে?

 আমিও নাই---দিদিও নাই---কেমন মজা হবে!

 

 ভূঁই-চাঁপাতে ভরে গেছে শিউলী গাছের তল,

 মাড়াস্ নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল |

 ডালিম গাছের ফাঁকে ফাঁকে

 বুলবুলিটা লুকিয়ে থাকে,

 উড়িয়ে তুমি দিও না মা ছিঁড়তে গিয়ে ফল,

 দিদি যখন শুনবে এসে বলবি কি মা বল্ |

 

 বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,

 এমন সময় মাগো আমার কাজলা দিদি কই?

 লেবুর তলে পুকুর পাড়ে

 ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোপে ঝাড়ে,

 ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতো জেগে রই,---

 রাত্রি হোল মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?

 

২. যমুনাবতী

 এই কবিতাটি কবে পড়েছিলাম তা মনে নেই; তবে কবিতার কথা গুলো মনের সাথে গেঁথে গিয়েছিল। শোষণের বেড়াজালে আবদ্ধ প্রাণের সেই আকুতি ছুঁয়ে গিয়েছিল অবচেতন মনকেও।

 

যমুনাবতী

 (শঙ্খ ঘোষ)

 

 নিভন্ত এই চুল্লিতে মা

 একটু আগুন দে,

 আরেকটুকাল বেঁচেই থাকি

 বাঁচার আনন্দে!

 নোটন নোটন পায়রাগুলি

 খাঁচাতে বন্দী-

 দুয়েক মুঠো ভাত পেলে তা

 ওড়াতে মন দিই!

 

 হায় তোকে ভাত দেবো কী করে যে ভাত দেবো হায়

 হায় তোকে ভাত দিই কী দিয়ে যে ভাত দিই হায়

 

 ‘নিভন্ত এই চুল্লি তবে

 একটু আগুন দে,

 হাড়ের শিরায় শিখার মাতন

 মরার আনন্দে!

 দু’পারে দুই রুই কাতলার

 মারণী ফন্দী-

 বাঁচার আশায় হাত-হাতিয়ার

 মৃত্যুতে মন দিই!

 

 বর্গী না টর্গী না কংকে কে সামলায়

 ধার চকচকে থাবা দেখছো না হামলায়?

 যাস নে ও হামলায় যাসনে!

 কানা কন্যার মায়ের ধমনীতে আকুল ঢেই তোলে- জ্বলে না,

 মায়ের কান্নায় মেয়ের রক্তের উষ্ঞ হাহাকার মরেনা

 চললো মেয়ে রণে চললো!

 বাজে না ডম্বরু অস্ত্র ঝনঝন করে না জানলো না কেউ তা

 চললো মেয়ে রণে চললো!

 পেশীর দৃঢ় ব্যথ, মুঠোর দৃঢ় কথা, চোখের দৃঢ় জ্বালা সঙ্গে

 চললো মেয়ে রণে চললো!

 

 নেকড়ে-ওজর মৃত্যু এলো

 মৃত্যুরই গান গা-

 মায়ের চোখে বাপের চোখে

 দু’তিনটে গঙ্গা!

 

 দূর্বাতে তার রক্ত লেগে

 সহস্র সঙ্গী

 জাগে ধ্বক ধ্বক, যগ্গে ঢালে

 সহস্র মণ ঘি!

 

 যমনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে

 যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে

 বিষের টোপর নিয়ে!

 যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ-পথ দিয়ে

 দিয়েছে পথ গিয়ে!

 

 নিভন্ত এই চুল্লিতে আগুন ফলেছে!!

 

৩. রাত্রিঃ

 অমিয় চক্রবর্তীর এই কবিতাটা পড়েননি-এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। অনুভূতিকে নাড়া দেবার মত প্রেমের কবিতা।

 

রাত্রি

 (অমিয় চক্রবর্তী)

 

 অতন্দ্রিলা,

 ঘুমোওনি জানি

 তাই চুপিচুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে

 বলি,শোনো,

 সৌরতারা ছাওয়া এই বিছানায়

 -সূক্ষ্মজাল রাত্রির মশারি-

 কত দীর্ঘ দু-জনার গেল সারাদিন,

 আলাদা নিঃশ্বাসে -

 এতক্ষণে ছায়া-ছায়া পাশে শুই

 কী আশ্চর্য দু-জনে দু-জনা -

 অতন্দ্রিলা,

 হঠাৎ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোৎস্না,

 দেখি তুমি নেই।।

 

৪. চন্দ্রাভিলাষী নারীঃ

 প্রেম আর বিদ্রোহের অপূর্ব সমাহার এই কবিতায়। কিছুটা বৈপরীত্যও বুঝিবা আছে!

 

 চন্দ্রাভিলাষী নারী

 (মাকিদ হায়দার)

 

 পূর্ণিমাতে পূর্ণ হলো

 তোমার মনের সাধ

 তুমি অথৈ জলে খুঁজেছিলে

 পূর্নিমারই চাঁদ

 

 তুমি বাসতে ভাল জলের খেলা

 ভয়াল নদী সাঁঝের বেলা

 সেই জলের মাঝে খুঁজতে তুমি

 দুর গগনের সাঁঝের তারা

 মেঘের ছায়া

 নীল সাগরে ভাসিয়ে দিতে

 আমার অপরাধ

 তুমি অথৈ জলে খুঁজেছিলে

 পূর্নিমারই চাঁদ

 

 আজকে দেখ সবাই যেন

 ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে আছে

 প্রাণের ভয়ে জলের দিকে

 দাড়িয়ে আছে গাছের মত

 গভীর শোকে স্তব্ধ পায়ে

 নিঃস্ব জলের বুকের ভেতর

 দাড়িয়ে আছে অষ্টপ্রহর

 

 কিন্তু তবু দুঃখ আমার ভিন্নপ্রকার

 মুষ্টিমেয় কয়টি লোকে

 চালায় গাড়ি জ্বালায় বাতি

 দিন দুপুরে ইচ্ছেমত ছিটিয়ে কাঁদা

 শখের গাড়ি যাচ্ছে দেখো যাচ্ছে দেখো

 রাজার মত নিজের বাড়ি

 ছিটিয়ে থুথু

 আমরা যারা দাড়িয়ে আছি

 নিঃস্ব জলের বুকের ভেতর

 

 চতুর্দিকে চোখের নিচে শবের খেলা

 কলার পাতে নিজের ছেলে

 শুইয়ে দিয়ে ভাবছি শুধু

 এবার থেকে তোমার চোখে পড়িয়ে দেব

 কোন সে মায়ার ফাঁদ

 তুমি অথৈ জলে খুঁজেছিলে

 পূর্নিমারই চাঁদ!

 

৫. যাত্রাভঙ্গঃ

 এই কবিতাটা শুনলে কার সাধ্য যে যাবার পথে পা বাড়ায়! এমন আকুতি কি এই কবিতা ছাড়া আর কিছুতে মানায়? অধিকারের এই পিছুডাক!

 

যাত্রাভঙ্গ

 (নির্মলেন্দু গুন)

 

 হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে

 মন বাড়িয়ে ছুঁই,

 দুইকে আমি এক করি না

 এক কে করি দুই।

 

 হেমের মাঝে শুই না যবে,

 প্রেমের মাঝে শুই

 তুই কেমন কর যাবি?

 পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া

 আমাকেই তুই পাবি।

 

 তবুও তুই বলিস যদি যাই,

 দেখবি তোর সমুখে পথ নাই।

 

 তখন আমি একটু ছোঁব

 হাত বাড়িয়ে জড়াব তোর

 বিদায় দুটি পায়ে,

 তুই উঠবি আমার নায়,

 আমার বৈতরণী নায়।

 

 নায়ের মাঝে বসবো বটে,

 না-এর মাঝে শোবো,

 হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ

 দুঃখ দিয়ে ছোঁব।

 

 তুই কেমন করে যাবি?

 

৬. ছুটিঃ

 এই কবিতাটি খুব সহজ, অথচ এর আবেগটা লাগাম ছাড়া। সুমনের "যাবো অচেনায়" এলবামে কিছু আবেগী কবিতা আছে-যাকে নন্দনতাত্ত্বিকরা কবিতা বলতে গড়িমসি করেন, তাতে কি? হৃদয়স্পর্শী কবিতা বলে কথা!

 

ছুটি

 (সুমন চট্টোপাধ্যায়)

 

 তুমি বললেই হবে

 উল্টাবে কাজ পৃথিবীর আজ

 দারুণ অসম্ভবে।

 

 সূর্য উঠবে অস্ত যাবেনা

 রাত্তির আর পাত্তা পাবেনা

 এইতো সকাল সবে;

 

 তুমি বললেই হবে।

 

 ছুটবে ইঁদুর ধরতে বেড়াল

 বাঘের শ্বশুর হবেই শেয়াল

 ওলট পালট তবে;

 

 তুমি বললেই হবে।

 

 বোম্বেটে এক যুদ্ধ মন্ত্রী

 হবে বিলকুল শান্তিতন্ত্রী

 পায়রার কলরবে;

 

 তুমি বললেই হবে।

 

 আমি একমাস লিখবনা গান

 দেখবো দুজন নদীর উজান

 অনুভবে অনুভবে;

 

 তুমি বললেই হবে।

 

 চিনবেনা কেউ দুজনকে আর

 দু'খানি বেহালা অর্কেস্ট্রার,

 বাজায় হৃদয় দুটি,

 

 তুমি বললেই ছুটি।

 

৭. বাঁশিঃ

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাঁশি কবিতাটা যেন লিখার অক্ষর ছেড়ে মগজে ঠাঁই নেয়। হরিপদ কেরানীর একচিলতে থাকার ঘরটা আর তার যাপিত জীবন যেন ছাপোষা জীবনের মুখবন্ধ।

 

বাঁশি

 (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 

 কিনু গোয়ালার গলি।

 দোতলা বাড়ির

 লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর

 পথের ধারেই।

 লোনাধরা দেয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,

 মাঝে মাঝে স্যাঁতাপড়া দাগ।

 মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি

 সিদ্ধিদাতা গণেশের

 দরজার 'পরে আঁটা।

 আমি ছাড়া ঘরে থাকে আর একটি জীব

 এক ভাড়াতেই,

 সেটা টিকটিকি।

 তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,

 নেই তার অন্নের অভাব॥

 

 

 বেতন পঁচিশ টাকা,

 সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।

 খেতে পাই দত্তদের বাড়ির ছেলেকে পড়িয়ে।

 শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই,

 সন্ধ্যেটা কাটিয়ে আসি,

 আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।

 এঞ্জিনের ধস্ ধস্,

 বাঁশির আওয়াজ,

 যাত্রীর ব্যস্ততা,

 কুলির-হাঁকাহাঁকি।

 সাড়ে-দশ বেজে যায়,

 তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার॥

 

 ধলেশ্বরী-নদীতীরে পিসিদের গ্রাম---

 তাঁর দেওরের মেয়ে,

 অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।

 লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল---

 সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।

 মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,

 আমি তথৈবচ।

 

 ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া---

 পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর॥

 

 বর্ষা ঘনঘোর।

 ট্রামের খরচা বাড়ে,

 মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়।

 গলিটার কোণে কোণে

 জমে ওঠে, পচে ওঠে

 আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি,

 মাছের কান্‌কা,

 মরা বেড়ালের ছানা

 ছাইপাঁশ আরো কত কী যে।

 ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া

 মাইনের মতো,

 বহু ছিদ্র তার।

 আপিসের সাজ

 গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন,

 সর্বদাই রসসিক্ত থাকে।

 বাদলের কালো ছায়া

 স্যাঁত্‍‌সেঁতে ঘরটাতে ঢুকে

 কলে পড়া জন্তুর মতন

 মূর্ছায় অসাড়!

 দিনরাত, মনে হয়, কোন্ আধমরা

 জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।

 

 গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু---

 যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল,

 বড়ো বড়ো চোখ,

 শৌখিন মেজাজ।

 কর্নেট বাজানো তার শখ।

 মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে

 এ গলির বীভত্‍‌স বাতাসে---

 কখনো গভীর রাতে,

 ভোরবেলা আলো-অন্ধকারে,

 কখনো বৈকালে

 ঝিকিমিকি আলো-ছায়ায়।

 হঠাৎ সন্ধ্যায়

 সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,

 সমস্ত আকাশে বেজে ওঠে

 অনাদি কালের বিরহবেদনা।

 তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে

 এ গলিটা ঘোর মিছে

 দুর্বিষহ মাতালের প্রলাপের মতো।

 হঠাৎ খবর পাই মনে,

 আকবর বাদশার সঙ্গে

 হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।

 

 বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে

 ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে

 এক বৈকুণ্ঠের দিকে

 

 এ গান যেখানে সত্য

 অনন্ত গোধুলিলগ্নে

 সেইখানে বহি চলে ধলেশ্বরী,

 তীরে তমালের ঘন ছায়া;

 আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা ক'রে, তার

 পরনে ঢাকাই শাড়ি,

 কপালে সিঁদুর॥

 

৮. কবরঃ

 কবর কবিতাটি প্রথম দিন শুনে বিষন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। অপূর্ব কথার গাঁথুনীতে ছোট্ট বধুর আগমন আর চির প্রস্থানের গল্প বলা হয়েছে।

 

কবর

 (জসীম উদ্দিন)

 

 এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,

 তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

 এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,

 পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।

 এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,

 সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা!

 সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি

 লাঙল লইয়া খেতে ছুটিলাম গাঁয়ের ও পথ ধরি।

 যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত

 এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোরে তামাশা করিত শত।

 এমনি করিয়া জানি না কখন জীবনের সাথে মিশে

 ছোট-খাট তার হাসি ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।

 

 বাপের বাড়িতে যাইবার কাল কহিত ধরিয়া পা

 আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।

 শাপলার হাটে তরমুজ বেচি পয়সা করি দেড়ী,

 পুঁতির মালার একছড়া নিতে কখনও হত না দেরি।

 দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,

 সন্ধাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুরবাড়ির বাটে!

 হেস না হেস না মোন দাদু, সেই তামাক মাজন পায়ে,

 দাদি যে তোমার কত খুশি হত দেখিতিস যদি চেয়ে!

 নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, এতদিন পরে এলে,

 পথ পানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখি জলে।

 আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,

 কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালা!

 হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু,আয় খোদা! দয়াময়,

 আমার দাদরি তরেতে যেন গো ভেস্ত নসিব হয়।

 

 তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি

 যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।

 শত কাফনের, শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,

 গণিয়া গণিয়া ভুল করে গণি সারা দিনরাত জাগি।

 এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,

 গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।

 মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,

 আয়-আয় দাদু, গলাগলি ধরি কেঁদে যদি হয় সুখ।

 

 এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,

 কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।

 সেই ফালগুনে বাপ তোর এসে কহিল আমারে ডাকি,

 বাজান, আমার শরীর আজিকে কী যে করে থাকি থাকি।

 ঘরের মেঝেতে সপটি বিছায়ে কহিলাম বাছা শোও,

 সেই শে শোয়া তার শেষ হবে তাহা কী জানিত কেউ?

 গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,

 তুমি যে কহিলা বা-জানরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?

 তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,

 সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে!

 

 তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জড়ায়ে ধরি,

 তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিতে সারা দিনমান ভরি।

 গাছের পাতার সেই বেদনায় বুনো পথে যেতো ঝরে,

 ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।

 পথ দিয়া যেতে গেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,

 চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।

 আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,

 হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।

 গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,

 চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ।

 

 ঊদাসিনী সেই পল্লী-বালার নয়নের জল বুঝি,

 কবর দেশের আন্ধারে ঘরে পথ পেয়েছিল খুজি।

 তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,

 হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বিষের তাজ।

 মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, বাছারে যাই,

 বড় ব্যথা রল, দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;

 দুলাল আমার, যাদুরে আমার, লক্ষ্মী আমার ওরে,

 কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।

 ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গন্ড ভিজায়ে নয়ন জলে,

 কী জানি আশিস করে গেল তোরে মরণ ব্যথার ছলে।

 

 ক্ষণপরে মোর ডাকিয়া কহিল আমার কবর গায়

 স্বামীর মাথার মাথালখানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।

 সেই যে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,

 পরাণের ব্যথা মরে নাকো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।

 জোড়মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু ছায়,

 গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।

 জোনকি মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,

 ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।

 হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, রহমান খোদা! আয়;

 বেহেস্ত নসিব করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়!

 এখানে তোর বুজির কবর, পরীর মতন মেয়ে,

 বিয়ে দিয়েছিনু কাজিদের বাড়ি বনিয়াদি ঘর পেয়ে।

 এত আদরের বুজিরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে,

 হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।

 খবরের পর খবর পাঠাত, দাদু যেন কাল এসে

 দুদিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।

 শ্বশুর তাহার কশাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে

 অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।

 সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে ফোটে না সেথায় হাসি,

 কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিছে ভাসি।

 বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,

 কে জানিত হায়, তাহারও পরাণে বাজিবে মরণ বীণ!

 কী জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,

 এইখানে তারে কবর দিয়েছি দেখে যাও দাদু! ধীরে।

 

 ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেহ ভালো,

 কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।

 বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,

 পাতায় পাতায় কেঁপে উঠে যেন তারি বেদনার বীণ।

 হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়।

 আমার বুজীর তরেতে যেন গো বেস্ত নসিব হয়।

 

 হেথায় ঘুমায় তোর ছোট ফুপু, সাত বছরের মেয়ে,

 রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।

 ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কী জানি ভাবিত সদা,

 অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা!

 ফুলের মতন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,

 তোমার দাদির ছবিখানি মোর হদয়ে উঠিত ছেয়ে।

 বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,

 রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।

 

 একদিন গেনু গজনার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,

 ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায় পথের পরে।

 সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে।

 কী জানি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গেছে।

 আপন হস্তে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি,

 দাদু! ধর¬ধর¬ বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।

 এইখানে এই কবরের পাশে আরও কাছে আয় দাদু,

 কথা কস নাকো, জাগিয়া উটিবে ঘুম¬ভোলা মোর যাদু।

 আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে,

 

 ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিয়ে ঘন আবিরের রাগে,

 অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িত বড় সাধ আজ জাগে।

 মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সুকরুণ সুরে,

 মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূরে।

 জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান।

 ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যু ব্যথিত প্রাণ।

 

৯. অমলকান্তিঃ

 অমলকান্তি হতে চাইনি; এমন কথা বলাটা অন্যায় হয়ে যাবে। ছোটবেলায় বরং রোদ্দুর হবার ইচ্ছেটাই আমাকে বেশি টানতো।

 

অমলকান্তি

 (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)

 

 অমলকান্তি আমার বন্ধু,

 ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।

 রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,

 শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে

 এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,

 দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।

 

 আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।

 অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।

 সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!

 ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,

 জাম আর জামরুলের পাতায়

 যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।

 

 আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।

 অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।

 সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।

 মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;

 চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”

 আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

 

 আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,

 অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,

 যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,

 উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।

 অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।

 অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।

 সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে

 ভাবতে-ভাবতে

 যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।

 

১০. আয়নাঃ

 এই কবিতাটি পড়ার আগে নিজেকে কবিতা পড়ার জন্য প্রস্তুত করে নেই প্রতিবার। হারানো ছড়ানো পাগলের এই ঝিল্লি বাজনা কতদিন বেজেছে এই মনের মধ্যে!

 

আয়না

 (অমিয় চক্রবর্তী)

 

 হারানো ছড়ানো পাগল খুঁজচে

 ফিরে সে আপন হবে।

 আলোর টুকরো দীপ্তি চোখের;

 ভাঙ্গা-গান-ভাসা গানের কানকে ;

 সেই নাক,যার সুরভি বোধটা

 চামেলি বকুলে গেলো কোথায় ;

 ফিরে- ফিরে চায় তাই

 হায় হায় তার চেতনা-জড়ানো

 কত দিনরাত পিছু ডাকে কেঁদে- কেঁদে ।

 হারানো ছড়ানো পাগল ।

 

 জানে তার হাড় ধুলোয় উড়বে,

 কিছুই দেহের থাকবে না প্রাণকথা ;

 আরো আরো বুক সবই খ'সে ঝ'রে

 মিশে যায় মেঘে হাওয়ায় জলে ।

 নিভে যাবে মন আরো ।

 এখনই কোথায় লক্ষ ক্ষণের ছবি ?

 হাজার দুপুর, বেগুনি সন্ধ্যা, ভোরে নীল হাওয়া, তামসীর চাঁদ

 খেয়ালী খেলায় পাল তুলে গেছে পার ।

 ফিরিয়ে তবুও রাখবে, বাঁধবে, ঢাকবে,

 সাধবে-ভাবচে পাগল ।

 হারানো ছড়ানো পাগল ।

 

 হারানো ছড়ানো পাগল একলা

 দাঁড়ালো মাঠের ধারে-

 দূরে বুড়ো বট ঝিমন্ত-জাগা,

 ঝাঁ-ঝাঁ রোদ-লাগা, সবুজ ছন্দে স্থির ।

 একটু হাওয়ার মন্ত্র ।

 দেখচে পাগল প্রকাণ্ড চাকা

 নীল আঁকা বাঁকা দিগন্তের;

 প্রখর যন্ত্রে শুনচে ঝিল্লি বাজনা ।

 উঁচু সূর্যের অপারে শূন্য, সোনায় সাজানো;

 চেনা গ্রাম ঐ ঘোর অচেনার

 বিপুল আবেগ আনলো ।

 ঝনঝন ক'রে সৃষ্টিসুদ্ধ ভাঙচে, গড়চে, চলচে-

 কোথায় তুমুল শব্দ ?

 মাঝখানে তারি হঠাৎ পাগল মুখ দেখে চেনে আয়নায়

 আকাশে তাকিয়ে হাসে ।

 

 ভরা সন্ধ্যায় চুপ ক'রে ব'সে থাকে

 হারানো ছড়ানো পাগল ।

 

১১. অনির্বাণঃ

 অনির্বাণের কথা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই! সেই যে, চুরি যাওয়া আলোয় যে দেখা দিয়েছিলো দ্বিতীয়বারের মত! সেই গান থেকে ছেঁকে নেয়া কবিতাটা কি অসাধারণ!

 

অনির্বাণ

 (নচিকেতা চক্রবর্তী)

 

 অনির্বাণ আমার বন্ধু।

 অনির্বাণের সাথে যখন আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল,

 তখন সময়টা ছিল বড় অদ্ভুত!

 আমরা হাইওয়ের উপর দিয়ে, অনেক দূরে একটা অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছি;

 লাল আকাশ, সন্ধ্যে হয়ে আসছে-দুপাশে ফাঁকা মাঠ

 আমরা চা খাব বলে গাড়িটা দাঁড় করিয়েছি

 একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত চায়ের দোকানে;

 এমন সময় দেখতে পেলাম, লাল আকাশকে পেছনে রেখে,

 একটা ছেলে মাঠ পার হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।

 আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললঃ 'চিনতে পাচ্ছিস'?

 আমি বললামঃ 'না'।

 ও বলেঃ 'ভালো করে দেখ'।

 আমি সেই চুরি যাওয়া আলোতে ওকে চিনলাম-

 আমার বন্ধু অনির্বাণ।

 আমার চোখের সামনে পুরনো দিনগুলো ছায়াছবির মত ভেসে উঠছে।

 আমি ওকে প্রশ্ন করলামঃ 'অনির্বাণ, তুই এখানে!'

 ও বললোঃ 'তাইতো কথা ছিল বন্ধু। আমাদের তো এখানেই থাকার কথা ছিল।'

 আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।

 আমি খুব বোকার মত ওকে প্রশ্ন করলামঃ 'অনির্বাণ, কি করছিস এখন'?

 ও বললোঃ 'যা কথা ছিল বন্ধু; মানুষের মাঝখানেই আছি'।

 আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা। একটা অপরাধ বোধ আমাকে গ্রাস করছে।

 ও বললোঃ 'তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে'।

 আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম।

 ও জানালার কাছে এসে বললোঃ 'এখন তো তোর নাম হয়ে গেছে-তুই তো বিখ্যাত হয়ে গেছিস! সুখেই আছিস, কি বল?'

 আমার গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিয়েছে,

 অনির্বাণ আমার জীবন থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে।

 অনির্বাণের শেষ কথা গুলো আজোও আমার কানে আলপিনের মত বেঁধে-

 সুখেই আছিস...

 সুখেই আছিস...

 

১২. সেই গল্পটাঃ

 পাহাড় আর মেঘের ভালোবাসার গল্পটা শ্বাশ্বত। যে গল্পটা আজো চলছে অবিরত। সেই পাহাড়...সেই মেঘ...আড়িপাতা ঝরনা...!

 

সেই গল্পটা

 (পূর্ণেন্দু পত্রী)

 

 আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি

 শোন,পাহাড়টা, আগেই বলেছি ভালোবেসেছিল মেঘকে

 আর মেঘ কিভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে

 বানিয়ে ফেলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকড়া।

 সে তো আগেই শুনেছো

 সেদিন ছিল পাহাড়টার জন্মদিন

 পাহাড় মেঘকে বলল, আজ তুমি লাল শাড়ি পড়ে আসবে

 মেঘ পাহাড়কে বলল, আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেব চন্দন জলে

 ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরোম নদী

 পুরুষরা জ্বলন্ত কাঠ।

 সেইভাবেই সেইভাবেই মেঘ ছিল পাহাড়ের আলিঙ্গনের আগুনে

 পাহাড় ছিল মেঘের ঢেউ জলে

 হঠাৎ আকাশ জুড়ে বেজে উঠল ঝড়ের যত ঝম্ফ

 ঝাকড়া চুল উড়িয়ে ছিনতাইয়ের হুমকিতে ছুটে এল এক ঝাঁক হাওয়া

 মেঘের আঁচলে টান মেরে বলল

 ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে।

 এখনও শেষ হয়নি গল্পটা

 বজ্রের সঙ্গে মেঘের বিয়ে হয়ে গেল ঠিকই

 কিন্তু পাহাড়কে সে কোনদিনই ভুলতে পারলো না

 বিশ্বাস না হয়তো চিড়ে দেখতে পারো পাহাড়টার হাড়-পাজর

 ভেতরে থৈ থৈ করছে শত ঝরনার জল।

 

 

১৩. মেজাজঃ

 এই কবিতাটি একটি রূপক কবিতা। শাসকের স্বেচ্ছাচারিতা আর শাসিতের মৌন প্রতিবাদ...শেষে কিন্তু জিতলো শাসিতই। কালো ছেলের নাম রাখা হবে আফ্রিকা।

 

মেজাজ

 (সুভাষ মূখোপাধ্যায়)

 

 থলির ভেতর হাত ঢেকে

 শাশুড়ি বিড় বিড় ক'রে মালা জপছেন;

 বউ

 গটগট করে হেটে গেল।

 আওয়াজটা বেয়াড়া ; রোজকার আটপৌরে নয়।

 যেন বাড়িতে ফেরিওয়ালা ডেকে

 শখ করে নতুন কেনা হয়েছে।

 

 

 সুতরাং

 মালাটা থেমে গেল ; এবং

 চোখ দুটো বিষ হয়ে

 ঘাড়টাকে হেলিয়ে দিয়ে যেদিকে বউ যাচ্ছিল

 সেইদিকে ঢ'লে পড়ল।

 নিচের চোয়ালটা সামনে ঠেলে

 দাঁতে দাঁত লাগল।

 

 বিলক্ষণ রাগ দেখিয়ে

 পরমুহূর্তেই শাশুড়ির দাঁত চোখ ঘাড় চোয়াল

 যে যার জায়গায় ফিরে এল।

 তারপর সারা বাড়িটাকে আঁচড়ে-আঁচড়ে

 কলতলায়

 ঝমর ঝম খনর খন ক্যাঁচ ঘ্যাঁষঘিঁষ ক্যাঁচর ক্যাঁচর

 শব্দ উঠল।

 বাসনগুলো কোনদিন তো এত ঝঁঝ দেখায় না -

 বড় তেল হয়েছে।

 

 ঘুরতে ঘুরতে মালাটা দাঁড়িয়ে পড়ল।

 নোড়া দিয়ে মুখ ভেঙ্গে দিতে হয় -

 মালাটা একবার ঝাঁকুনি খেয়ে

 আবার চলতে লাগল।

 নাকে অস্ফুট শব্দ ক'রে

 থলির ভেতর পাঁচটা আঙ্গুল হঠাত

 মালাটার গলা চেপে ধরল।

 মি্নসের আক্কেলেরও বলিহারি !

 কোত্থেকে এক কালো অলক্ষুণে

 পায়ে খুরঅলা ধিঙ্গি মেয়ে ধ'রে এনে

 ছেলেটার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে চলে গেল।

 কেন ? বাংলাদেশে ফরসা মেয়ে ছিলনা ?

 বাপ অবশ্য দিয়েছিওল থুয়েছিল -

 হ্যাঁ দিয়েছিল !

 গলায় রসুড়ি দিয়ে আদায় করা হয়েছিল না ?

 

 এবার মালাটাকে দয়া ক'রে ছেড়ে দেয়া হল।

 শাশুড়ির মুখ দেখে মনে হচ্ছিল

 থলির ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে এইসময়ে

 কী যেন তিনি লুকোচ্ছিলেন।

 একটা জিনিস -

 ক'মাস আগে বউমা

 মরবার জন্যে বিষ খেয়েছিল।

 ভাশুরপো ডাক্তার না হলে

 ও-বউ এ-বংশের গায়ে ঠিক চুনকালি মাখাত।

 কেন ? অসুখ ক'রে মরলে কি হয় ?

 ঢঙ্গী আর বলেছে কাকে !

 

 হাতে একরাশ ময়লা কপড় নিয়ে

 কালো বউ

 গটগট গটগট ক'রে সামনে দিয়ে চলে গেল।

 নাঃ আর বাড়তে দেওয়া ঠিক নয়।

 'বউমা - '

 'বলুন।'

 উঁহু, গলার স্বরটা ঠিক কাছা-গলায়-দেওয়ার মত নয়

 বড্ড ন্যাড়া।

 হঠাত এই দেমাগ এল কোত্থেকে ?

 বাপের বাড়ির কেউ তো

 ভাইফোঁটার পর আর এদিক মাড়ায় নি ?

 

 বাড়িটা যেন ঝড়ের অপেক্ষায়

 থমথম করছে।

 ছোট ছেলে কলেজে ;

 মেজোটি সামনের বাড়ির রোয়াকে ব'সে

 রাস্তায় মেয়ে দেখছে ;

 ফরসা ফরসা মেয়ে -

 বউদির মত ভুশুন্ডি কালো নয়।

 বালতি ঠনঠনিয়ে

 বউ যেন মা-কালীর মত রণরঙিণী বেশে

 কোমড়ে আঁচল জড়িয়ে

 চোখে চোখ রেখে শাশুড়ির সামনে দাঁড়ালো।

 

 শাশুড়ির কেমন যেন

 হঠাত গা ছমছম করতে লাগল।

 তাড়াতাড়ি থলের মধ্যে হাতটা লুকিয়ে ফেলে

 চোখ নামিয়ে বললেন: আচ্ছা থাক, এখন যাও।

 বউ মাথা উঁচু ক'রে

 গটগট ক'রে চলে গেল !

 

 তারপর একা একা পা ছড়িয়ে ব'সে

 মোটা চশমায় কাঁথা সেলাই করতে করতে

 শাশুড়ি এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় হয়ে ভাবতে লাগলেন

 বউ হঠাত কেন বিগড়ে গেল

 তার একটা অন্তত তদন্ত হওয়া দরকার।

 

 তারপর দরজা দেবার পর

 রাত্রে

 বড় ছেলের ঘরে আড়ি পেতে

 এই এই কথা কানে এল -

 

 বউ বলছে : 'একটা সুখবর আছে।'

 পরের কথাগুলো এত আস্তে যে শোনা গেল না।

 খানিক পরে চকাস চকাস শব্দ,

 মা হয়ে আর দাঁড়াতে লজ্জা করছিল।

 কিন্তু তদন্তটা শেষ হওয়া দরকার -

 বউয়ের গলা ; মা কান খাড়া করলেন।

 বলছে : 'দেখো, ঠিক আমার মত কালো হবে।'

 এরপর একটা ঠাস করে শব্দ হওয়া উচিত।

 ওমা, বউমা বেশ ডগমগ হয়ে বলছে :

 'কী নাম দেব, জানো ?

 আফ্রিকা।

 কালো মানুষেরা কী কান্ডই না করছে সেখানে।'

 

১৪. পরিচয়ঃ

 রবিঠাকুরের পরিচয় নিয়ে অনেক কবিতাই আছে। তার মধ্যে এই কবিতাটিই সম্ভবত সবচে বেশি মানুষের প্রিয়'র তালিকায় আছে। আর এই কবিতার সাথে আমার আছে নাড়ি ছেঁড়া স্মৃতি। কতশত নির্ঘুম রাত আউড়ে কাটিয়েছি- 'আমি তোমাদেরই লোক'।

 

পরিচয়

 (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 

 একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে

 বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে,

 তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি

 'পরিচয় কোনো আছে নাকি,

 যাবে কোনখানে'?

 আমি শুধু বলেছি,'কে জানে'!

 

 নদীতে লাগিল দোলা,বাধঁনে পড়িল টান-

 একা,বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান।

 সেই গান শুনি

 কুসুমিত তরুতলে তরুণ-তরুণী

 তুলিল অশোক-

 মোর হাতে দিয়া কহিল,'এ আমাদেরই লোক'।

 আর কিছু নয়।

 সে মোর প্রথম পরিচয়।

 

 তার পরে জোয়ারের বেলা

 সাঙ্গ হল, সাঙ্গ হল জোয়ারের খেলা;

 কোকিলের ক্লান্ত গানে

 বিস্মৃত দিনের কথা অকস্মাৎ যেন মনে আনে;

 কনক চাপার দল পড়ে ঝুরে,

 ভেসে যায় দূরে,

 ফাল্গুণের উৎসবরাতির

 নিমন্ত্রণলিখনপাঁতির

 ছিন্ন অংশ তারা

 অর্থহারা।।

 

 ভাঁটার গভীর টানে

 তরীখানা ভেসে যায় সমুদ্রের পানে।

 নূতন কালের নবযাত্রী ছেলেমেয়ে

 শুধাইছে দূর হতে চেয়ে,

 'সন্ধ্যার তারার দিকে

 বহিয়া চলেছে তরণী কে?'

 সেতারেতে বাঁধিলাম তার,

 গাহিলাম আরবার,

 'মোর নাম এই'বলে খ্যাত হোক,

 আমি তোমাদেরই লোক,

 আর কিছু নয়-

 এই হোক শেষ পরিচয়।

 

১৫. চিঠি দিওঃ

 শেষ কবে চিঠি পেয়েছেন কিংবা লিখেছেন? মনে আছে কি? এমন কি হতে পারেনা যে কবিতার এই কথাগুলোর খুব কাছাকাছি সময়ে চলে এসেছি আমরা?

 

চিঠি দিও

 (মহাদেব সাহা)

 

 করুণা করে হলেও চিঠি দিও,

 খামে ভরে তুলে দিও আঙ্গুলের মিহিন সেলাই

 ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,

 এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও,

 তোমার শাড়ির মতো

 অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।

 

 চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও ...

 বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও!

 

 আজও তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি,

 আসবেন অচেনা রাজার লোক

 তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে ....

 এমন ব্যস্ততা যদি

 শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল! ...

 

 করুণা করে হলেও চিঠি দিও,

 ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি দিও খামে

 কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস

 একটি ফুলের ছোট নাম,

 টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে

 কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে

 সেইসব চুপচাপ কোন দুপুরবেলার গল্প

 খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড় একা লাগে, তাই লিখো

 

 করুণা করে হলেও চিঠি দিও, মিথ্যে করে হলেও বোলো, ভালবাসি !

 

১৬. যাতায়াতঃ

 হেলাল হাফিজের এই কবিতাটা কেমন যেন বিষন্ন করে দেয়! মানুষের মনের দীর্ঘ আকুতি যেন ফুটে আছে প্রতিটি পংক্তি ধরে। "শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক!"

 

যাতায়াত

 (হেলাল হাফিজ)

 

 কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো ।

 

 কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না

 রাত কাটে তো ভোর দেখি না

 কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না; কেউ জানেনা ।

 

 নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম

 পেছন থেকে কেউ বলেনি করুণ পথিক

 দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,

 কেউ বলেনি ভালো থেকো। সুখেই থেকো!

 যুগল চোখে জলের ভাষায়, আসার সময় কেউ বলেনি

 মাথার কসম আবার এসো ।

 

 জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো

 শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,

 চৈত্রাগুণে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি

 বললো না কেউ; তরুণ তাপস, এই নে চারু শীতল কলস ।

 

 লন্ডভন্ড হয়ে গেলাম তবু এলাম ।

 

 ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়

 আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই

 দুঃসময়ে এতোটা পথ একলা এলাম শুশ্রূষাহীন ।

 কেউ ডাকেনি তবু এলাম,

 বলতে এলাম-

 ভালোবাসি!