বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৬ মার্চ ১৯৭৪

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

রিয়ন চেম্বার - ৩

হাবিব রহমান

  • advertisement

    চার.

    কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বিভাগে আমরা দ্রুততার সাথে একটা রিপোর্ট করে পাঠালাম। আমাদের রিপোর্ট পাওয়ার সাথে সাথেই একটা টিম পুরো বিষয়টা যাচাই করে আমাদেরকে নিশ্চিত করল আমাদের বিশ্লেষণটা সঠিক। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে নিরাপত্তা বিভাগ দায়িত্ব গ্রহণ করল। আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। নিরাপত্তা বিভাগ নিরাপত্তা বাহিনীর একটা বিশাল দলকে বেশ কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে রিয়ন চেম্বার গুলোকে পুনরায় চালু করার কাজে লেগে গেল। ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিদ্যুৎ শক্তি পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করল। আমাদের এখানে এখনো রাত। টি.ভি স্টেশন গুলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ঘুরে ঘুরে প্রতিবেদন প্রচার করছে। আমাদের ছবি দেখিয়ে মূহুর্মুহ অভিনন্দনে ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই ভয়ংকর বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য মানব জাতির পক্ষ থেকে আমাদের সম্মান জানানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে জনমানুষের মাঝে আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। তারা তাদের আস্তানায় ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে।

     

    অসংখ্য সাংবাদিক, আলোকচিত্রকার আমাদের সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য, ছবি তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় গেটে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। তাদেরকে আগামীকাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার জন্য বলা হচ্ছে। আমরা সত্যিই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তাই এই ব্যবস্থা। সাংবাদিকরাও মেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গেটেই অপেক্ষা করে রইল। তথাপি আমরা পৃথিবীর সকল মানুষের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলার জন্য মিডিয়া সেন্টারে কিছু সময় পার করেছি। আমরা সংক্ষেপে আমাদের কর্মপন্থা সম্পর্কে বলেছি।

    বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় অতিথি শালায় আমাদের বিশ্রামে থাকার জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের কি বিশ্রাম হবে? নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে সদ্য বেঁচে ফিরে আসা মানুষ কি এত সহজেই বিশ্রামে যেতে পারে? কি ভয়ংকরই না ছিল পরিস্থিতি। সমস্ত পৃথিবীতে আমরা অসংখ্য পারমানবিক বোম চালু করে দিয়েছিলাম। যেকোনো মূহুর্তে ঘটতে পারতো নির্মম মৃত্যু।

    সবাই সবার রুমে চলে গেছে। আমি আমার রুমের বিছানাটাতে গা এলিয়ে শুয়ে আছি। ঘুম আসছে না। এদিক ওদিক করে ক্লান্তি যেন বেড়েই চলছে। এতক্ষণে হয়তো সব রিয়ন চেম্বার গুলোকে আবার চালু করে ফেলা হয়েছে। ঘুমের ঘোরের ছেদ কাটল প্রচণ্ড সাইরেনের শব্দে। আমি ধরমর করে উঠে বসলাম। ঘোর না কাটা চোখে আশে পাশে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম বিষয়টা কি? আমার রুমের লাল বাতিটা জ্বলছে নিবছে। ক্রমাগত বেজে চলছে সাইরেন। সাইরেনের শব্দটা কেমন ভয় জাগানিয়া। দ্রুততার সাথে পোশাক পড়ে প্রস্তুত হয়ে বাইরে বের হয়ে আসলাম। অসংখ্য সেনা সদস্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে রেখেছে। সকলকে একত্রিত করা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল মাঠে। আমি সোজা দৌড়ে চললাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের দিকে। একজন সেনা আমাকে বাধাঁ দিয়ে দাঁড়াল। বলল, “স্যর মাঠে চলে যান?”

    : কেন?

    : ইভ্যাকুয়েশন স্যার। এখান থেকে সকলকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ আছে, হাতে সময় তেমন নেই। জলদি করুন।

    : ইভ্যাকুয়েশন কেন?

    আমার কথার উত্তর দিতে লোকটাকে বেশী উৎসাহী মনে হল না। আরো দুই একজনের সাথে আমাকেও মাঠের দিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করল। আমি আমার আইডি টা দেখিয়ে লোকটাকে পাশ কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের দিকে চললাম। বেশ কিছু শিক্ষককেও আমার সাথে সভা কক্ষের দিকে দৌড়ে যেতে দেখলাম। সভাকক্ষে ঢুকে দেখলাম সবাই ইতোমধ্যে সেখানে চলে এসেছে। সবাইকে ভীত সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে। নিরাপত্তা বিভাগের একজন অফিসার ব্রিফিং করছে। সবাইকে পার্কিং লটে থাকা কার্গো ভেহিক্যাল গুলোতে গিয়ে উঠার জন্য নির্দেশনা দিয়ে লোকটা তার ব্রিফিং শেষ করে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। ঈশান হাত উঁচিয়ে প্রশ্ন করল, “কিন্তু তোমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়টাকে রক্ষা করার জন্য কি ব্যবস্থা নিয়েছ?”

    : মনে হচ্ছে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়টাকে আর রক্ষা করতে পারবো না। এখন লোকজনকে সরিয়ে ফেলা ছাড়া আর কোন পথ খোলা নাই।

    : তোমাদের হিসাব মত এখন হাতে কত সময় আছে?

    : ২ ঘণ্টা ৩২ মিনিট।

    : আমাদের মনে হয় আর একটু চেষ্টা করে দেখতে হবে।

    : দুঃখিত স্যর নির্দেশনা মাফিক আপনাদের এখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে।

    : তুমি তোমার ঊর্ধ্বতনের সাথে কথা বল এক্ষুনি। এখানে থাকার মত সেরা দশ-বার জন সেনা অফিসার এবং শেষ মূহুর্তে সরে যাওয়ার বন্দবস্ত করে ফেল। আমার টিম মেম্বারদের মধ্যে আনান, আসিফ, পৃথু এবং সায়ান থাকবে। অন্য সকলকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাও।

    অফিসারটাকে বিভ্রান্ত মনে হল। ঈশানকে না চেনার কোন কারণ নেই। অফিসারটি তার ঊর্ধ্বতনের সাথে যোগাযোগ করল। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। হচ্ছেটা কি? কি এমন ঘটল। ইভ্যাকুয়েশন করতে হচ্ছে কেন? আমি সায়ানকে বললম, কি হয়েছে?

    : নিরাপত্তা বিভাগ দুইটা রিয়ন চেম্বার কোন ভাবেই ট্র্যাক করতে পারছিল না। তার মধ্যে একটাকে কিছুক্ষণ আগে খুঁজে পেয়ে চালু করা হয়েছে। এখন যে একটা এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ২৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ছিল। ধরে নেয়া হচ্ছে ওটা এখনো এই এলাকাতেই কোথাও আছে। তাই এই এলাকার সকল লোকজনকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

    নিরাপত্তা বিভাগের অফিসারটা ঈশানকে বলল, “স্যর সকল ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেজর জহির আপনাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই রিপোর্ট করবে। তবে আপনারা পাচ্ছেন মোট ২ ঘণ্টা। এরপর আপনাদেরকে এখান থেকে সরে যেতেই হবে।”

    : সে হবে ক্ষণ। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

    : আপনাকেও ধন্যবাদ স্যর।

    আমরা চারজন সভাকক্ষে রয়ে গেলাম। অন্য সবাইকে এখান থেকে সরিয়ে নেয়া হল। আসিফ বলল, “২ ঘণ্টা ৩২ মিনিট কিভাবে কাউন্ট করেছে। সময়টা তো এর চেয়ে কমও হতে পারে। কতক্ষণ আগে চেম্বারটি বন্ধ করা হয়েছে তা কিভাবে নিশ্চিত হয়েছে? আমাদের হাতে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু সময় আছে তা জানা দরকার।

    আমি বললাম, “রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সেন্টার থেকে জানা যেতে পারে। প্রতিটা চেম্বার কখন চালু হচ্ছে, কত ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে এবং কখন বন্ধ হচ্ছে তা রিপোর্ট করার কথা”

    : পৃথু ঠিক বলেছে। ঈশান সায়ানের দিকে তাকিয়ে তথ্য যাচাই করে সঠিক সময়টা বের করতে বলল।

    মেজর জহির সভাকক্ষে আসল, নিজের পরিচয় দিয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইল। ঈশান বলল, “আপাতত কোন পরিকল্পনা নেই। এমন কিছু করতে হবে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যায়।”

    : স্যর আমাদের একটা টিম সেই চেষ্টা করে চলছে।

    : মনে কর আমরাও সেই দলে যোগ দিলাম। ঈশান বলল।

    : আচ্ছা হারানো রিয়ন চেম্বারের মালিকের খোঁজ করা হয়েছে? আসিফ জানতে চাইল।

    : আমরা সেই চেষ্টা করেছি স্যর কিন্তু লোকটিকে জীবিত পাওয়া যায়নি। উনি এই বিপর্যয়ে পালাতে গিয়ে নিহত হয়েছেন।

    : তার কোন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধব। ঈশান যোগ করল।

    : লোকটা নিঃসঙ্গ।

    : ওফ্ সিট। হাত দিয়ে বাতাস কাটল আসিফ। “এখন উপায়?”        

    সায়ান এসে ঘোষণা করল। আমাদের হাতে আছে ৩ ঘণ্টা ৪২ মিনিট। ওফ্ আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ১ ঘণ্টা সময় বেশী পাওয়া গেল। ঈশান বলল তিন ঘণ্টা বেশী সময় নয়। আমরা এখনো কোন ক্লু বের করতে পারিনি। তোমরা সবাই তোমাদের ডিভাইসে স্টপ ওয়াচ সেট করে নাও। প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য আছে। আমাদের আইটি ল্যবে বসতে হবে, চল। আমরা সবাই ঈশানের পিছু পিছু দৌড়ে চললাম আই.টি ল্যবের দিকে।

    পাঁচ.

    অবশিষ্ট সময়:  ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট

    “বিস্ফোরণের আগে ডিভাইসটা থেকে স্বল্পমাত্রার রেডিয়েশন বিকরিত হবার কথা, এই আপনারা কি রেডিয়েশন ট্র্যাকিং করার চেষ্টা করেছিলেন?” জহিরের কাছে জানতে চাইল আনান।  

    : আমরা সেই চেষ্টা করছি স্যর। এই এলাকার কাছাকাছি জায়গা গুলো সার্চ করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু পদ্ধতিটা সময় সাপেক্ষ আমাদের হাতে এত সময় নেই।  

    সায়ান বলল, “আমরা ধরেই নিচ্ছি লোকটা নিজেই রিয়ন চেম্বারটি সরিয়েছে।” এমনও তো হতে সে আসলে এটা সরায়নি। অন্য কেউ এটা সরিয়েছে।

    : অন্য কেউ কেন সরাবে? আসিফের প্রশ্ন।

    : এই বিষয়ে যেহেতু আমাদের হাতে কোন ক্লু নেই। কে সরিয়েছে সেটা বের করার চেষ্টা করা যাক। অন্য কেউ হলে এবং তাকে ট্র্যাক করতে পারলে আমরা হয়তো চেম্বারটার অবস্থান জেনে যেতে পারি। কি বল তোমরা? ঈশান জানতে চাইল, “এবং আমরা কিন্তু ইচ্ছা করলে তা করতে পারি।”

    : সেটা কিভাবে করব? আমি জানতে চাইলাম।

    : জি.পি.এস ট্র্যাকিং ম্যাপ।

    : হ্যাঁ। তুমি ঠিকই বলেছ। আমরা প্রত্যেকে যে কমিউনিকেশন ডিভাইসটা ব্যবহার করি সেটা একটা জি.পি.এস কিট। এটা নিয়ে আমরা যেখানেই যাই না কেন, তার একটা ট্র্যাক ম্যাপ তৈরি হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া ন্যানো ডিভাইস সচল রাখতে হয়। এটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। নিরাপত্তা বিভাগ অপরাধীকে ধরার জন্য এই ব্যবস্থা করে রেখেছে। কিন্তু আমাদের তো সেটাতে এক্সেস করার এক্তিয়ার নেই। আমরা এক্সেস কোড কোথায় পাব?

    : আমি এক্সেস করতে পারি। জহির এগিয়ে এল কম্পিউটার প্যানেলের সামনে এসে দাঁড়াল। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বিভাগ থেকে রিয়ন চেম্বারটার মালিকের ডিভাইস নম্বরটা জেনে নিল। “রিয়ন চেম্বারটি বন্ধ করা হয়েছে ক’টার সময়?” জানতে চাইল জহির।

    : ৬.১১ মিনিট। সায়ান বলল।

    জহির সময় এবং ডিভাইস নম্বরটা কম্পিউটারে প্রবেশ করিয়ে সার্চ দিতেই একটা ত্রিমাত্রিক ম্যাপ আমাদের সামনে স্ক্রিনে ভেসে উঠল। আমরা সবাই দেখতে পেলাম লোকটার অবস্থান কক্সবাজারে ছিল না। ঐ সময় সে কাঠমুন্ডুতে, শিষ দিয়ে উঠল ঈশান। আমরাও একটা আনন্দ ধ্বনি করে উঠলাম। তার মানে হচ্ছে রিয়ন চেম্বারটা সে সরায়নি। এখন আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে, কে সরিয়েছে। জহির এলাকা এবং সময় দিয়ে সার্চ দিয়ে কক্সবাজারের ম্যাপটা স্ক্রিনে নিয়ে আসল। অসংখ্য ট্র্যাক। এর মধ্যে কোনটা? হাতের ইশারায় ম্যাপটাকে জুম করে নিল জহির। আঙ্গুলে টেনে রিয়ন চেম্বারের মালিকের অবস্থানে এসে রাখল। ঐ অবস্থান থেকে সার্চ বাটন ওপেন করে সময় উল্লেখ করে সকল ডিভাইস সার্চ দেয়া হল। তিনটে ডিভাইস নম্বর ঐ সময় কাছাকাছি পাওয়া গেল। এবার তিনটি নম্বর এর মালিকদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানার জন্য সার্চ দেয়া হল। এদের একজনকে কক্সবাজারেই পাওয়া গেল, তার নাম নিতিন চাকমা। একজন কেতন প্রু, তার অবস্থান এখন সিমলা। সিমলাতে অস্থায়ী ক্যাম্প করে সেখানেই সবাইকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। আরেকজনের ডিভাইসটা বন্ধ পাওয়া গেল। আমরা একটু ঘাবড়ে গেলাম। সম্ভবত এও নিহত হয়েছে। আমাদের বুকের ভেতর ধ্বক ধ্বক করতে শুরু করল। আমরা মনে প্রাণে প্রত্যাশা করতে থাকলাম আমরা যাকে খুঁজছি এ যেন সে না হয়।

    ঈশান এখনই এই দুইজনের সাথে যোগাযোগ করে তথ্য নেয়ার জন্য জহিরকে নির্দেশ দিল। বন্ধ ডিভাইসের মালিকের বিষয়টাও নিশ্চিত হতে বলল। জহির কম্পিউটার থেকেই একটা গ্রুপকে দ্রুততার সাথে কাজটা সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা পাঠিয়ে দিল।

     

    অবশিষ্ট সময়:  ২ ঘণ্টা ১১ মিনিট

    সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সময় যেন ইলেকট্রিক ট্রেনে চেপেছে। এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে রিয়ন চেম্বারটিকে সচল করতে না পারলে, আমাদের কেও এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। এত সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয়টি মাটির সাথে মিশে যাবে ভাবতে ভীষণ খারাপ লাগছে। দুইজনের মধ্যে নিতিন চাকমা এই বিষয়ে কিছুই বলতে পারছেনা বলে জানিয়েছে। সে যে এ বিষয়ে সত্যিই কিছু জানেনা এ বিষয়টা নিশ্চিত করেছে নিরাপত্তা কাউন্সিল। যে ডিভাইসটি বন্ধ আছে তার মালিক নিহত এটাও নিশ্চিত করতে পেরেছে তারা। কেতন প্রুকেও সনাক্ত করা হয়েছে। তবে সে সঠিক ভাবে কিছু না বললেও অসংলগ্ন কথা বার্তা বলছে। হয়তো লোকটা ভয় পেয়েছে। কিছুক্ষণ আগে নিরাপত্তা বিভাগের একটা গ্রুপ লোকটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে এসেছে। কাউন্সিলিং করে লোকটার কাছ থেকে তথ্য আদায় করার একটা প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমরা প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি। এমনিতেই সময় কম তার উপরে অপদার্থটা সময় নষ্ট করে চলছে। জহির কাউন্সিলিং এর ধার দিয়ে না গিয়ে বাচ্চা সামলানোর মত করে বলল, শোন যদি তুমি সঠিক করে না বল, তবে তোমাকে এখানে বেধে রেখে আমরা সবাই এখান থেকে চলে যাব। যা জান স্পষ্ট করে বল। ডিভাইসটা কি তুমি সরিয়েছ?

     

    লোকটা মাথা নামিয়ে, নিচের দিকে তাকিয়ে সায় দেয়ার মত করে মাথা ঝাঁকাল।

    আমারা লোকটার দিকে ঝুঁকে আসলাম। ঈশান জানতে চাইল, কোথায় রেখেছ তুমি ওটা?

    : সাগরে ফেলে দিয়েছি, ঈশানের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট ভাবে বলল লোকটা।

    ওহ্ মাই গড, আমি হতাশার শব্দটা করে পাশেই চেয়ারটাতে বসে মুখ ঢেকে বসে পড়লাম। ঈশান নিজেকে সামলাতে পারল না। ধরাম করে লোকটার নাকে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল। চেয়ার থেকে ছিটকে পড়ে গেল লোকটা। জহির আর আনান ঈশানকে আটকাল। তারা ওর দুই হাত ঝাপটে ধরে রাখল। রাগে কাঁপছে ও, “অপদার্থ কোথাকার। তুমি জান কি সর্বনাশটা তুমি করেছ?”

     

    লোকটার সেটা বুঝতে পারার কথা নয়। যদি বুঝতে পারতো তবে সে চেম্বারটাকে কখনোই সমুদ্রে ফেলত না। এই অবস্থায় চেম্বারটি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ভিষণ ভাবে কমে গেছে। তবে গভীর সমূদ্রে বিস্ফোরিত হলে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমান অত বেশী হবে না। কারণ বিস্ফোরনের মাত্রা ১০ টনেরও কম। তথাপি সমুদ্র তীরবর্তি এলাকায় সুনামীর আসংঙ্কা থেকেই গেল। ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরও ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

     

    লোকটাকে উঠে দাড়াতে কাউন্সিলারদের একজন সহায়তা করল। হঠাৎ ঘটনায় লোকটা হতবিহবল হয়ে পড়েছে। নাক দিয়ে রক্তের একটা ধারা বেয়ে নামছে। ঈশান নিজেকে সামলে নিল। ওকে একটু লজ্জিতও মনে হল। দুই হাত ছাড়িয়ে নিয়ে লোকটাকে গিয়ে বলল, “কি সর্বনাশ করেছ তার বিস্তারিত বলার দরকার নেই। কিন্তু রিয়ন চেম্বারটা উদ্ধার করা দরকার, তুমি কোথায় সেটা ফেলেছ সেইটা ঠিক ঠিক বলতে পারবে?”

     

    লোকট হ্যাঁ সূচক মাথা ঝাঁকাল।

    অবশিষ্ট সময়:  ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট

    সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা গুলোকে সতর্ক বার্তা প্রদান করা হয়েছে। আসে পাশের  লোকজনকে সেই সব এলাকা থেকে সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মোটামুটি একঘন্টার মধ্যে রিয়ন চেম্বারটি আমাদেরকে অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে, সেই লক্ষ্যে কেতন প্রুর নির্দেশিত স্থানটির স্রোত প্রবাহ বিবেচনা করে মোটামুটি ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কয়েকশ রোবট চালিত ডুবো তরি চষে বেড়াচ্ছে। কিন্তু রিয়ন চেম্বার থেকে অতি অল্পমাত্রায় রেডিয়েশ বের হয়। পানির নিচে সেটাকে নির্দেশ করা সময় সাপেক্ষ ব্যপার তথাপি আমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যব থেকে কাজটা দ্রুত করার জন্য সর্বাত্তক চেষ্টা করে যাচ্ছি। কেন্দ্রিয় কাউন্সিলও আমাদের সাথে তাদের সদর দপ্তর থেকে বিষয়টা সার্বক্ষনিক নজরে রেখেছে। রোবট চালিত ডুবো তরি গুলোকে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোন  ভাবেই আমরা  চেম্বারটার  কোন সিগনাল  খুঁজে পাচ্ছি না।  কেতন প্রু সঠিক স্থানটি নির্দেশ করতে পেরেছে কিনা  সেটাও নিশ্চত করে বলা যাচ্ছেনা।  

     

    অবশিষ্ট সময়:  ১ ঘণ্টা ০৫ মিনিট

    আমাদের ল্যবের বিপদ সংকেত নির্দেশক লাল বাতিটি জ্বলে উঠেছে। কেন্দ্রিয় কাউন্সিল থেকে আমাদের সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে বলছে। আমরা নিরুপায় হয়ে এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টাকে রক্ষা করতে পারবোনা। জহিরকে আমাদের নিয়ে চলে আসার জন্য চুড়ান্ত নির্দেশনা দেয়া হল। জহির নিরুপায় হয়ে ঈষাণের দিকে তাকাল, “স্যার আমাদের এবার সরে যেতে হবে।” আমাদের চোখে মুখে রাজ্যের হতাশা। আর বিশেষ কিছু করার নেই। আমরা নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলাম।  

     

    অবশিষ্ট সময়:  ৫ মিনিট

    আমরা কেন্দ্রিয় নিরাপত্তা বিভাগের কন্ট্রোল রুমে। এখন পর্যন্ত হারানো রিয়ন চেম্বারটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। ডুবো তরী গুলো এখনো আসে পাশের এলাকায় খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে। কন্ট্রোল রুমে পিন পতন নিরবতা। সবাই ভয়ংকর এক বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। এক একটা সেকেন্ড, যেন হৃৎপিন্ডে আঘাত করছে। ধীরে ধীরে সময় শেষ হয়ে আসছে। আমরা মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছি, ৯, ৮, ৭, ৬, .....২, ১, ০।

    আমরা বিস্ময়ের সাথে মনিটরের দিকে তাকিয়ে। কোন বিস্ফোরণ ঘটেনি। আমাদের বিস্ময় কাটতে সময় লাগলো। আমরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছি। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, আনন্দ ধ্বনির করতে করতে নাচতে শুরু করলাম।


    চলবে.....

advertisement