বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৬ মার্চ ১৯৭৪

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

রিয়ন চেম্বার - ২

হাবিব রহমান

  • advertisement

     

    তিন.

    দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে অবনীর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে আমাদের শরীর পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হল। আমাদের শরীরের রক্তনালীতে রেডিয়েশন রিডাকশন ন্যানো-কিট প্রবেশ করিয়ে দেয়া হল। ন্যানো কিটটা আমাদের রক্তের মাঝে রক্তের কণিকার সাথে ঘুরে বেড়াবে। খুব সতর্কতার মাঝেও যদি রেডিয়েশন শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করে তার থেকে রক্ষা করাই হবে তার কাজ। ফিজি শিয়ান অবনী আমাদের বারবার করে মনে করিয়ে দিল। রেডিয়েশন রিডাকশন কিট থাকলেও তাদেরকে রেডিয়েশন থেকে দূরে থাকতে হবে এবং রেডিয়েশন এলাকায় গেলে রেডিয়েশন প্রোটেকশন ড্রেস পরে নিতে হবে। মেডিকেল ইউনিটে কাজ শেষে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের স্ব স্ব দায়িত্ব পালনের জন্য চলে এলাম।

     

    ৫.৩৩ মিনিটে আমরা যখন যে যার কাজে ভীষণ রকমের ব্যস্ত তখন দ্বিতীয় দুঃসংবাদটা পেলাম। এবার বিস্ফোরণটি হয়েছে তাজিকিস্তানে। সমগ্র পৃথিবীতে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছে। সকল রিরন চেম্বার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ফলে সন্ধ্যার মধ্যেই ঝলমলে আলোকিত পৃথিবীর অর্ধাংশ অন্ধকারে ছেয়ে গেল। জল বিদ্যুতের সাহায্যে চালিত এলাকাতেই শুধু মাত্র বিদ্যুৎ রয়েছে। ওয়ারলেস ডিভাইসের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, হাসপাতাল গুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। কোথায় বিদ্যুৎ আছে কোথায় নেই তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় মানুষের হাতে নেই। ভয়ার্ত মানুষেরা পিলপিল করে লোকালয় ছেড়ে বন-জঙ্গলের দিকে ছুটছে। তাদের পারাপারি ছুটাছুটির জন্যও মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। আমি আজকের সকাল আর আজকের সন্ধ্যার মধ্যে তুমুল পার্থক্যটা টের পাচ্ছি। মানুষের কাছে প্রায় ঈশ্বর রিয়ন এখন এক ভয়ংকর দানবের নাম। প্রায় স্বর্গের মত নির্মল পৃথিবী এখন ভয়াল মৃত্যুপুরী।

     

    আমি আর সায়ান কোন রকম কূলকিনারা করতে পারছি না। আসলেই রিয়ন চেম্বার ত্রুটিহীন একটা যন্ত্র। তারপরও বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে এর ছোটখাটো ত্রুটি গুলো ঠিকঠাক করে নেয়া হয়েছে। ফলে এর থেকে ত্রুটি খুঁজে বের করা খুবই কঠিন। হঠাৎ যন্ত্র গুলোর এমন আচরণের কারণ কি হতে পারে, কিছুতেই তা ধরতে পারছি না।     

     

    ৭.২১ মিনিটে এরিজোনায় তৃতীয় বিস্ফোরণটি ঘটার পর মানুষ ধরেই নিল, পৃথিবীকে আর রক্ষা করা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে এখন আর কোন রিয়ন চেম্বার সচল নেই। সকল রিয়ন চেম্বার বন্ধ করে দেয়ার জন্য নিদের্শনা দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বিভাগ হতে। তথাপি রিয়ন চেম্বার বিস্ফোরিত হল। যার মানে হচ্ছে, সচল থাকুক বা না থাকুক রিয়ন চেম্বার বিস্ফোরিত হবেই। তৃতীয় ঘটনাটা আমাদের চিন্তার মোড় ঘুড়িয়ে দিল। তার মানে কি শুধু বন্ধ থাকা অবস্থায় চেম্বার গুলো বিস্ফোরিত হচ্ছে? বিষয়টি খুতিয়ে দেখতে হবে। আমি সায়ানকে লেটেস্ট ভার্সনের চেম্বার গুলোর গঠন শৈলী, গঠনের উপকরণ এবং অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করতে বললাম। আমি ঈশানের সাথে যোগাযোগ করলাম। আমার সন্দেহের কথা ওকে বলতেই ও দলের সবাইকে পূর্বের কাজ স্থগিত রেখে এক সাথে কাজ করার জন্য আমাদের সাথে যোগ দিতে বলল।

    ২০ মিনিটের মধ্যে সবাই চলে আসলে আমারা গোল হয়ে দাড়িয়ে পড়লাম। ঈশান আমার দিকে তাকাতেই আমি এক নিশ্বাসে বললাম, “রিয়ন চেম্বার বন্ধ করে দেয়া মানে হচ্ছে পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া যাতে চেম্বারের ভিতর পারমানবিক বিস্ফোরণ না হতে পারে। কিন্তু অচল অবস্থায় যখন চেম্বারটি বিস্ফোরিত হচ্ছে তার মানে সেখানে অন্যকোন পরমাণু বিভাজিত হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে।”

    “এমন হতে পারে নতুন ভার্সন এ এমন কোন উপকরণ যোগ করা হয়েছে সেখান থেকেই এই পরমাণুটি পাচ্ছে রিয়ন চেম্বার”, আনান যোগ করল।

    সায়ান বলল, “গত মাসে নতুন ভার্সনের যে রিয়ন চেম্বারটি বাজারে ছাড়া হয়েছে তাতে নতুন উপাদান হিসাবে সূক্ষ্ম কপার প্লেট ব্যবহার করা হয়েছে যা আগে ব্যবহার করা হতো না”।

    “ঠিক আছে আনান, অর্থি এবং আভা তোমরা বিষয়টা পরীক্ষণে নেমে পড়। দেখ পৃথুর সন্দেহ কতটুকু সঠিক। তোমরা কপার প্লেট দিয়েই তোমাদের বিশ্লেষণ শুরু কর”। দায়িত্ব ভাগ করে দিল ঈশান। সায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, “সায়ান তুমি তথ্য নাও এই নতুন ভার্সন কতগুলো ইন্সটল করা হয়েছে এবং কোথায় কোথায় ইন্সটল করা হয়েছে, পারবে না?”

    : অবশ্যই পারব? পৃথিবীর সব রিয়ন চেম্বার একই কেন্দ্র থেকে তৈরি ও সরবরাহ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে সকল ধরনের তথ্য সহায়তা করছে প্রতিষ্ঠানটি। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি। যথা সম্ভব দ্রুত সবাই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য ছুটল।

     

    প্রায় দুই ঘণ্টা পর আমরা আবার একসাথে বসলাম। এর মধ্যে আর কোন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। আনান, অর্থি এবং আভা অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষণ করে যা জানতে পেরেছে সেটা শেয়ার করার জন্যই আমরা আবার বসেছি। আমাদের হাতে সময় নষ্ট কারার মত সময় নেই। ঈশান কোন ভণিতা না করে সরাসরি আনানের কাছ জানতে চাইল, “পৃথুর ধারনা কতটুকু সত্য?”

    : পৃথুর ধারনাই ঠিক। হাইড্রোজেন ছাড়া অন্য একটা পরমাণু বিকিরণে সহায়তা করছে এবং এর বিকিরণ এত তীব্র যে রিয়ন চেম্বার তার পুরোটা প্রতিরোধ করতে পারছে না এবং শুধু নতুন ভার্সনেই এটা হচ্ছে। তবে এই বিকিরণ রিয়ন চেম্বারের বাইরে হলে ভয়ংকর বিপর্যয় হত, কিন্তু এখন ক্ষয়ক্ষতি ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধেই সীমিত থাকছে।

    : তাই যদি হয় তবে, নতুন ভার্সনের সব গুলো রিয়ন চেম্বারই বিস্ফোরিত হওয়ার কথা। ঈশান আনমনে মাথা নাড়ছে।

    : হতে পারে, যখন রিয়ণ চেম্বারে পানির সরবরাহ না থাকছে তখনই অন্য পরমাণুটি সক্রিয় হয়ে উঠছে। নতুন ভার্সনের যে রিয়ন চেম্বার গুলো বন্ধ করা হচ্ছে সে গুলোই বিস্ফোরিত হচ্ছে। আমি ঝুঁকে, আনানের দিকে তাকিয়ে বললাম।

    : পৃথু ঠিকই বলেছে, তবে বন্ধ করার বেশ কিছু সময় পর পরমাণুটি সক্রিয় হয়। এই সময়ের মধ্যে বেশ কিছু বিক্রিয়া সংঘটিত হয়। আমাকে সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকাল আনান।   

    : ও মাই গড! এর মানে দাঁড়াল আমরা এখন ৫,৫৩৪ টি পারমানবিক বোমকে সুইচ অন করে দিয়েছি। শীষ দিয়ে উঠল, সায়ান। সন্ধ্যা ৫.৩০ এর মধ্যে সকল রিয়ন চেম্বার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। একটু থেমে আবার বলল, নতুন ভার্সনের মোট ৫,৫৩৭ টি রিয়ন চেম্বার ইন্সটল করা হয়েছিল। তার মধ্যে তিনটি ধ্বংস হয়েছে এবং বাকি গুলোকে এখন বন্ধ করা হয়েছে মানে সক্রিয় করা হয়েছে।

    ধপ করে উঠে দাঁড়াল ঈশান, “এক্ষুনি ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার সব রিয়ন চেম্বার গুলোকে চালু করে দিতে হবে। চল সবাই”। বলেই ছুটল। আমরাও তার পিছুপিছু দৌড়ে চললাম। ছুটতে ছুটতেই বলল, এক্ষুনি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বিভাগে যোগাযোগ করতে হবে। তারপর আনানের কাছে জানতে চাইল, আমাদের হাতে সময় কতটুকু আছে?

    : বিক্রিয়া সম্পন্ন হতে কম করেও ২১ ঘণ্টা লাগে, মানে হচ্ছে আমাদের হাতে সময় আছে ১৫ ঘণ্টার মত।

    চলবে......

advertisement