বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮

ভ্রম

  • advertisement

    বড় কর্তা।
    আমার ইংরেজী জ্ঞানের বহর জানতে চাইলেন। তখনও সামনের সীটে বসার অনুমতি পায়নি। আমার সংকোচ হচ্ছে। কি করে বসি। যাই হোক। আমার সততা, ভদ্রতা এবং নমনীয়তা সাহেবের পছন্দ হলেই হয়তো বসার অনুমতি মিলবে। দয়া কিংবা করুনা করে একটা চাকরীও দিতে পারে। অভদ্রতা যদি সেই করুনাটুকুও কেড়ে নেয় সেটা ভেবে শংকিত ছিলাম। পাছে মনে না ভাবে - ছেলেটাতো ভারী বেয়াদব। একে চাকরী দেওয়া যাবে না।
    টেবিলের উপর অবিন্যস্ত ক’টা ফাইল। কি যেন দেখছেন। সোনালী রং-এর ছোট ফুলদানীতে সাজিয়ে রাখা কিছু কাঁচা ফুল। গন্ধটা তেমন নেই। পাশেই বেনসন হেজেজ। হীরক খন্ডের মত স্বচ্ছ কাঁচের এসট্রেতে খানিকটা জল। ক’টা সিগারেটের দুই তৃতীয়াংশ পানিতে ভিজে চুপসে আছে। পানিগুলো গাঢ় তামাটে রং ধারন করেছে।
    যার সামনে বসলাম তিনি বড় কর্তা। একটা শিপিং কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কর্তাটি প্যাকেট থেকে একটা বেনসন নিয়ে মুখে দিলেন। সুদৃশ্য লাইটারটা দু’আঙ্গুলের ফাঁকে নিয়ে বাম হাতের একটা আঙ্গুল দিয়ে একবার ঘুরিয়ে নিলেন। তারপর লাইটার জ্বালিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন-নাম কি।
    - অমিয় চৌধুরী।
    - ইংরেজী কেমন পারো।
    বলা বাহুল্য আমি সদ্য গ্রাজুয়েশান নিয়েছি। তাও গ্রামের কলেজ থেকে। আমার একটা চাকরী খুব দরকার। পরিবারের পাঁচটা মুখ তাকিয়ে আছে আমার দিকে। গ্রামের কলেজে লেখাপড়ার যা পরিবেশ তাতে ইংরেজী দূরে থাক্ মাতৃভাষাটাও ঠিক মত রপ্ত করা মুশকিল। ক্লাস আর হতো কোথায়। সস্তা কিছু ইংরেজী ডায়ালগ। না মারলে কেমন বেমানান লাগে। ফার্ষ্ট ক্লাস সিটিজেনশীপ নেওয়াটা কেমন পন্ডশ্রম মনে হয়। তাছাড়া হ্রস্ব-ই কার কিংবা দীর্ঘ-ই কারের তেমন ঝামেলাও নেই। বাংলা ভাষার বিস্তৃতি আর ব্যাপকতাও বুঝি সীমিত হয়ে আসছে। একটা সীমাবদ্ধ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ হতে চলেছে। তাতে আর বিচিত্র কি। ”ওই একটা হলেই হলো” এই মনোভাব অনেকের।
    এই টানা পোড়েনে দু’দিকটাই হারালাম। না বাংলা (মাতৃভাষা) না ইংরেজী। কোনটায় মার্কেটে চলার মত রপ্ত করা হয়নি। তাই ঘুরছি। শুধু ঘুরছি। একটা চাকরীর জন্য। এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে একর পর এক অফিস পাড়ার দরজায় কড়া নাড়ছি।
    এম, ডি সাহেবের প্রশ্নের জবাবে সত্য কথাটায় বলে ফেললাম-স্যার একটু একটু পারি।
    - পড়তে পারো।
    - পারি।
    - Other Experience
    - No
    স্যার বিদ্রুপ করার মত সিগারেটের ধোয়াটা আমার দিকে ছুড়ে দিল। বুঝলাম স্যার খুশী হয়নি। চোখ পরল পাশের টেবিলে। একগাদা ইংরেজী ম্যাগাজিন। চোখ বুলিয়েও কিছু বোধগম্য হলো না। অধিকাংশ ম্যাগাজিনের কভারে অর্ধনগ্ন নারী চিত্র। আমাদের মত পোড় খাওয়া সামাজিক রীতিতে কেমন বেমানান। টিউশানির সামান্য আয়। তাতে ইংরেজী ম্যাগাজিন কিনে পড়ার দুঃসাহস কখনও হয়নি। ভয় হলো না জানি আবার ইংরেজীতে কি প্রশ্ন করে বসেন। মনে মনে একটা ইংরেজী ডায়ালগ মুখস্ত করে নিলাম। যদি কাটখোট্টা কোন ইংরেজী প্রশ্ন করে বসে তাহলে বলব-
    I am sorry sir, I can’t understand this question. Please ask the question in Bengali?
    কথাটা বলতে পারিনি বলে গার্মেন্টস-এ কিউ, সি-র চাকরীটা হলো না। আমার দুর্ভাগ্য ভাইবা বোর্ডে তৎক্ষণাৎ কথাটা আমার মনে পড়েনি। কথাগুলো সাজিয়েছি আরও অনেক পরে। পরদিন আরও কনফার্ম হলাম যখন দেখলাম রেজাল্টশীটে আমার নাম উঠেনি। অথচ ডায়ালগটা বলতে পারলে নির্ঘাত চাকরী। এই ভ্রম এর অবতারনা হতো না। একবার গিয়ে বলে আসতে চাইলাম, আমার ভ্রম হয়েছে। কিন্তু কে শুনবে আমার কথা।
    এম,ডি সাহেব সদুপদেশ দিলেন। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনলাম।
    বললেন-পারলে কম্পিউটারটা শিখে নাও। ইংরেজী ম্যাগাজিন পড়ো তাতে অনেক কিছু শিখতে পারবে। ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ কোর্সে ভর্তি হও, মাষ্টার্সটা কমপ্লিট করো। আরও অনেক পরামর্শ দিলেন আমার ভবিষ্যত উন্নতির জন্য। এসব করলে আমার যাতে কোন সমস্যা না হয় সে চেষ্টাও করবেন। আমার মাথাটা একবার কৃতজ্ঞতায় নতজানু হল। আসলে বড় কর্তা এই অল্প সময়ে আমার জন্য অনেক ভেবেছেন। আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিনে পারিশ্রমিকে আমাকে কতগুলো পরামর্শ দিলেন। আমার সারা জীবন মনে থাকবে। এই পরামর্শের সাথে সম্ভবত উনার ব্যবসায়িক কোন সম্পর্ক নেই।
    অথচ কোনটায় আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। ইচ্ছার অপমৃত্য ঘটুক এই আমি চাই। এর বেশী কিছু হয়তো সম্ভব নয়। সবই হতো যদি একটা চাকরী হতো। সামান্য  টিউশনির টাকা, তার উপর অনেকগুলো ক্ষুধার্ত মুখ। মুখগুলো বলছে - রাখো তোমার লেখাপড়া। আগে আমাদের মুখে খাবার দাও। আমরা ক্ষুধার্ত। পরনে কাপড় দাও। নয়তো পৃথিবী লজ্জা পাবে।
    তখন সমাজ ধিক্কার দেবে আমাকে। বলবে ছেলে তো লাট সাহেব। ডিগ্রি পাশ করে ঘুরছে আর মা বাবা উপোষ করে মরছে, এমন ছেলে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। ছি! ছি!! ছি!!!
    ঠিক আছে আমি দেখবো বলে এম, ডি সাহেব আশ্বাস দিলেন। তবুও খুশী হলাম। আদাব কিংবা নমস্কার বলিনি। বললাম থ্যাংক ইউ স্যার।
    মিনতি করে বলতে চাইলাম, স্যার আমার একটা চাকরীর খুব দরকার। বলা হলো না। বেরিয়ে আসতেই আর একগাল ধোঁয়া ছাড়লেন এম,ডি সাহেব। বিষাক্ত ধোঁয়াটা যেন আমাকে বার বার বলছে তুমি অপেক্ষা করো - তুমি অপেক্ষা করো।
    রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। বাসের অপেক্ষা। ভাবছি ইংরেজিটা কিভাবে রপ্ত করা যায়।
    একজন আমার হাত ধরলেন। বুড়ো লোক। বয়স কত হতে পারে। কি করে বলবো। ক্ষুধার্ত মানুষের বয়স অনুমান করা মুশকিল। পঞ্চাশ না পেরুতেই ওরা পৌছে যায় বার্ধ্যক্যের শেষ সীমানায়। ক্ষুধা, শুধু ক্ষুধার জন্য। তবে বয়সটা থাক। ভালো করে থাকালাম। আধা পাকা সাদা কালো চুল দাঁড়ি। গায়ে ছেড়া ময়লা ফতোয়া। পরনে ছেড়া লুঙ্গি। চোখদুটো সাদা ঘোলাটে। কর্দমাক্ত ঘোলাজলের মত। অনবরত জল আর কেতুর গড়িয়ে পরছে চোখ থেকে। বাম হাতে চোখটা মুছে নিল।
    প্রথমেই সম্বোধন করল - মাই ডিয়ার সান, আই এ্যাম এ পুওর ম্যান..তারপর অনর্গল বলে যেতে লাগলো ইংরেজী। সঠিক এবং স্পষ্ট উচ্চারন। বুঝতে একটুও বেগ পেতে হয়নি। বাক পটুতা দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়ে গেল। বুঝলাম চোখের অপারেশন করাতে হবে। অনেক্ষণ কথা বলল। মাঝে মাঝে চোখ মুছে নিচ্ছে।
    আমি অনেক কিছুই বুঝলাম। শিক্ষিত লোক। আমার জন্মের দুইবছর পর ডিগ্রি পাশ করেছে ফার্ষ্ট ডিভিশনে। আজ এই অবস্থা। বুঝলাম গরীব মানুষ। ভিক্ষা চাইছে। দু’টাকা দিয়ে দিলেই লেটা চুকে যেত। পারলাম না। ইতিমধ্যে আমার গাড়ী এসে গেছে। উঠতে পারলাম না। আমার গ্রাজুয়েশন ভিক্ষুক হয়ে রইলো। উনার কথা মত আমার ভাবতে হচ্ছে আই কান্ট আন্ডারষ্ট্যান্ড দিজ কোয়েশ্চান..।  মাথা নত হলো। লজ্জিত হলাম। এম, ডি সাহেবের কথা মনে হলো। ভাবলাম এই লোক তো ইংরেজী জানে। নিয়ে গেলে কেমন হয়।
    কিন্তু তা হবে কেন। দারোয়ান ঢুকতে দিলে তো। না জানি আবার আমাকেও গলা ধাক্কা খেতে হয়। আর সাহেব বসতেই বা দেবেন কেন। লোকটির পোষাক নেই। আয় থাকলে পোষাক থাকতো। কাজ করার ক্ষমতা থাকতো। চোখের দৃষ্টিও থাকতো। বিনা চিকিৎসায় দৃষ্টিশক্তি হারাতে হতো না।
    খুশী হলাম এই ভেবে যে আমার পরিপাটি পোষাক ছিল। ইংরেজী জানা ছিল না। তবুও সাহেবের সামনে বসার যোগ্যতা পেয়েছি। একি কম সুখের কথা। এই লোকটির কাছে আমার যোগ্যতা অথৈ সমুদ্রে বালি ছিটা দেবার মত। শুধু অবাক বিস্ময়ে তাকিয়েছিলাম।
    পুর্বেই বলেছি ইংরেজী জ্ঞান আমার সীমিত। ফলে একুশে আন্দোলনের রেশ টানতে চাই না। সর্বত্র বাংলা ভাষা নাই বা চালু হল, একুশ কিংবা ৮ই ফাল্গুন তো মিথ্যা নয়। এতক্ষণ ধরে জীবনের এক বিচিত্র কাহিনী ইংরেজীতে শুনেছি। এবার বাংলায় ফিরে এলাম। জিজ্ঞাসা কললাম-
    - আপনার বাড়ী।
    - এবার ষ্পষ্ট বাংলায় বললেন- রাউজান কোয়েপাড়া। মেজ চাচা চেয়ারম্যান ছিলেন। এখনও চেয়ারম্যান বাড়ী বললে সবাই চেনে। বি. এ পাশ করেছেন বৃটিশ আমলে। কথার ফাঁকে ফাঁকে ইংরেজী বললেন। হয়তো অভ্যাস হয়ে গেছে। সবশেষে বললেন - রিমেমভার মাই সান, পেন ইজ মাইটার দ্যান শোর্ড। আমার মতিভ্রম হলো। ডান হাতটা চলে গেলো বুক পকেটে। আবার শুন্য হাতটা ফিরে এলো। একজন অক্ষম ভিক্ষুককে করুনা করা যায়। সাহায্য করা যায়। কিন্তু একজন জ্ঞানীকে সাহায্য কিংবা করুনা কোনটায় করা যায় না। এতে নিজেকে ছোট করা হয়। অত্যন্ত হীন বলে নিজেকে ধিক্কার দেওয়া হয়।
    করুনা কিংবা সাহায্যের পথ বন্ধ হলে কর্তব্যের দুয়ার খুলে যায়। আমি ক্ষুধার্ত মুখগুলির অংশ থেকে লোকটির প্রতি সামান্য কর্তব্য পালন করলাম। বলতে পারেন দায়সাড়া গোছের। কারন লোকটির সাথে দেখা না হলে আমার কখনও ভ্রম হতো না যে, লোকটি আসলে কে। ভিক্ষুক না জ্ঞানী, আবার জ্ঞানী না ভিক্ষুক।
    আমার আজও ভ্রম হয়। একজন মানুষ হিসাবে আর একজন মানুষের করনীয় কি কিছুই থাকতে পারে না। থাকলে ভালো হতো। পৃথিবীটা আরও সুন্দর হতো। দয়া আর করুনা দিয়ে কোন মানুষকে খাটো করা হতো না। কেননা আমরা সবাই মানুষ।

advertisement