টেকনোবিডির নতুন অফিসে যেতে হলে কারওয়ান বাজার থেকে একটু হেঁটে ভেতরের দিকে যেতে হয়। টেঙ্কনোবিডি অফিস থেকে যে লোকটি ফোন করেছিলেন, উনি একটু রাগী ভঙ্গীতে বলেছিলেন দুপুর বারোটার মধ্যে আসতে হবে, এর বেশি দেরি হলে কিন্তু সমস্যা।

সমস্যা! ওরে বাপরে ... দেরি হয়ে গেলে যদি আবার পুরস্কার না দেয়। আমি বাস থেকে নেমে তড়িঘড়ি ছুটতে থাকি। লোকেশনটা ঠিক নিশ্চিত ছিলামনা, অফিস খুঁজে পেতে ঘাম ছুটে গেল।

অফিসটা দোতলায়। খুব চমৎকার ভাবে সাজানো হয়েছে, দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। প্রশস্ত ফ্রন্ট ডেস্কে দুইজন বসে ছিলেন। এর মধ্যে একজনের চেহারা আমার পূর্বপরিচিত, গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালাম। ভদ্রলোক এন্ড্রয়েডে কি একটা গেম খেলছিলেন, একটু খানি মাথা তুলে না তাকালে আমি কিভাবে শুরু করি! বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমি মিনমিন করে বললাম,

-      এক্সকিউজ মি, আমার একটা এপয়েন্টমেন্ট ছিল, বারোটায়।

ঢোকার সময় দেখেছি ঘড়িতে সোয়া বারোটা, ভেবেছিলাম ভদ্রলোক এরপর ঘড়ির থেকে তাকাবেন। কিন্তু তিনি সেটা না করেই বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুচকালেন-

-      গল্পকবিতা?

-      জি।

-      বসেন ওখানে ...

আমি সামনের সোফায় বসে থাকি, সামনের দুই ভদ্রলোক অনড়। এটা অবশ্য বড় কোন সমস্যা না। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এসেছি, এসির বাতাসে চুপচাপ বসে থাকতে ভালোই লাগছিল।

এন্ড্রয়েডে গেম লেভেল একসময় শেষ হয়, কিংবা হয়তো হয়নি, ভদ্রলোকের মুখে বিরক্তভাব এখন বেশ স্পষ্ট। ঝাটকা মেরে উঠে তিনি পাশের কলিগটিকে বলেন,

-      দেখি, ক্যামেরাটা বের করেন।

-      ক্যামেরা দেওয়া যাবেনা, সমস্যা আছে।  

-      কি সমস্যা?

-      আছে... আপনে আরেকটা ব্যবস্থা করেন।

-      আমি আরেকটা কই পামু?

-      সেটা আমি কি জানি!

-      আরে বসে আছে তো!

-      তো আমি কি করমু!

আমি এই প্রথম লজ্জা পাই। আজকাল অফিস কিংবা সামাজিক কোন অনুষ্ঠানে কেউ হঠাৎ কবি বলে সম্বোধন করলে আমি ভীষণ পীড়া বোধ করি। কবিদের কদরের দিন অনেক আগেই ফুরিয়েছে, ঢাকায় নাকি এদের তুলনায় কাকদের সংখ্যাও হাতেগোনা।

ভাবছিলাম ওই দুইজনের বাদানুবাদে ইন্টারফিয়ার করবো- থাক ভাই, ছবি তোলা লাগবেনা, আমি এমনিতেই ফটো কনশাস। আপনারা বরং আমাকে আমার সার্টিফিকেট (সাথে প্রাইজমানি ও) টা দিয়ে দেন, চলে যাই।

এমন সময় টেকনোবিডিতে ছোট খাট একটা মিরাকল ঘটে গেল। কোথা থেকে সাইদ সুমন ভাই এসে হঠাৎ আমাকে নিয়ে এমন হুলস্থূল শুরু করলেন, যে বাকি দুইজন বোধহয় ভেবে বসলেন, আমি হুমায়ুন স্যারের ছেলে নুহাস, যার উপর বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ খুব ব্যাপক আকারে নির্ভর করছে।

মনের উপর থেকে চাপটা সরে গেল। আমি জানি আমার দৌড় কতদূর। লেখালেখি করি মনের আনন্দে। সারাদিন কাজ শেষে রাতে গল্পের প্লট নিয়ে ভাবার মাঝে যে আনন্দ, তার সাথে কি কোন কিছুর তুলনা হয়!

গল্প কবিতা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, সবচেয়ে বড় পাওয়া- লেখার একটুকরো জায়গা আর আকাশের মত উদার একদল মানুষের সন্ধান। এর সাথে যদি যোগ হয় সাইদ ভাইয়ের মত ডেডিকেটেড একজন মানুষের আন্তরিকতা- তবে সেই এন্ড্রয়েডওয়ালা ভদ্রলোকের উপর কি বেশীক্ষণ রাগ পুষে রাখা যায়!