দুদিন ধরে বিরামহীনভাবে বৃষ্টি ঝরছে। সকাল- দুপুর – সাঁঝ, সবসময়ই আকাশে মেঘ জমে আছে। প্রাগউতিহাসিক কালের সিক্সটি ওয়াটের বাল্ব, অধুনা- নাকউঁচু এনার্জি সেভিং লাইটটা, এমনকি সল্পবুদ্ধির টিউব লাইটগুলো- কেউই ছুটি পাচ্ছেনা। ওভারটাইমের কারনে তাদের চোখের উপরে জমে যাওয়া কালির পরতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অনুভব করি- মন খারাপের বাতাস নিয়ে আবার এসে হাজির হয়েছে রোববার।

একমুহূর্তের জন্য বৃষ্টি থেমে যায়- তাতেই আকাশে জমে থাকা মেঘগুলো বদমেজাজি বুড়োর মত খিটমিট করতে থাকে। বিপুল আকৃতির সেই মেঘের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবি- আকাশে মেঘ জমলে তা অনায়াসে চোখে দেখা যায়, কিন্তু মনের মাঝে যে দিনে রাতে অবিরল মেঘেরা যাওয়া আসা করে- তার খোঁজ কি কেউ কখনো রেখেছে।

অনেক দিন আগে সমরেশের ‘কালপুরুষ’ পড়ে প্রচণ্ডভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম। অনিমেষের উপলব্ধি, মাধবীলতার সংগ্রাম, অর্ক’র সাহসী পথচলার সাথে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম। শ্মশানঘাটে অর্ককে যখন পঞ্চু গুন্ডা তাড়া করেছিল- কিলা, খুরকি, বিলুদের সাথে আমি ও রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আঠার মত লেগে ছিলাম অর্ক’র সাথে।

মার্জনাহীন, বিশালাকার সব প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে লড়ে লড়ে অর্ক যখন কোনাঠাসা- ঠিক সেই সময়টাতেই অনুভব করেছিলাম, আমার ক্ষতবিক্ষত দুটি পায়ে কাঁটা ফুটে আছে... কপাল থেকে দরদর করে ঝরে পরছে রক্ত।

অর্ক’র সেই প্রবল যুদ্ধ একসময় শেষ হয়, কিন্তু আমার ক্ষতবিক্ষত পা দুটো আজো সারেনি, কপালে হাত দিলেই অনুভব করি চুইয়ে চুইয়ে ঝরে যাচ্ছে উষ্ণ রক্ত।

মনের মাঝের মেঘের কথা হচ্ছিল- মনের মাঝের রক্তপাতের খবর ই বা রাখে কয়জনা!

 

------

 

টঙ্গী প্রেসক্লাবের বর্তমান যে সভাপতি- তিনি আমার খুব কাছের লোক (ইন ফ্যাক্ট- আমি ই তার খুব কাছের লোক)। অনেক সিনিয়র, আমার বয়সী তার একটা ছেলেও আছে। আমি তবুও তাকে ভাই বলে ডাকি।

সেই সভাপতি সাহেবের একটা অদ্ভুদ রকমের ব্যারাম আছে। দিনে- রাতে, সময়ে- অসময়ে তাঁর পেট, বুক আর মাথার মাঝে বুদবুদ ঘুরে বেড়ায়। নারে ভাই- এখানে গ্যাস্ট্রিকের কথা হচ্ছেনা, এ হল ভাব আর দর্শনের বুদবুদ। প্রজ্ঞা মৌসুমির ভাষায় – শব্দের ডিমের বুদবুদ।

বুদবুদানী রোগের প্রকোপ মাঝে মাঝে বেড়ে যায়- সভাপতি সাহেব তখন কিছু খেতে পারেননা, কোন কিছুতে মন বসাতে পারেননা। সংকট গভীর হয়ে গেলে অতপর তিনি কাগজ কলম নিয়ে বসে যান, বুদবুদ সব কলম চুইয়ে বের হয়ে আসে।

সভাপতি সাহেবের মত করে আমি ও মাঝে মাঝে কাগজ কলম নিয়ে বসি- বুকের মাঝের রুধির ধারাটা কাগজে এসে ঠাণ্ডা হয় (হায় মনি নামের জনৈক দার্শনিক অবশ্য ভাবছেন- আমার এই রক্তপাত যথেষ্ট নয়, লেখক হতে হলে আরো বেশি বেশি রক্তাক্ত হতে হবে )।

গল্প কবিতার বেশীরভাগ লেখকই এরকম মনের খেয়ালে লেখালেখি করেন। পাঠকের দুএকটা কমেন্ট, উৎসাহ পেলেই তারা খুশি হয়ে যান, আপ্লুত হন। দুএকজন অবশ্য খুব সন্তর্পণে এক কাঠি এগিয়ে হুমায়ুন স্যারের মার্কেট শেয়ারে ভাগ বসানোর স্বপ্ন দেখে ফেলেন (দেখতেই পারেন, ব্যাপারটা নেগেটিভ কিছু নয়)। কেউ কেউ আবার কিছুদূর গিয়ে ক্লান্ত হয়ে একসময় বিদায়ের চিন্তাভাবনা করেন।

বিদায়ের মুহূর্তগুলো সাধারণত করুণ হয়ে থাকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটি আবার বিপদজনক ও! শেষমুহুর্তে সবাইকে কটাক্ষ করে লেখা স্যাটায়ারের দৃষ্টান্ত তো আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়।

যে কারনে আজকাল আড্ডা পেইজে কারো ফেয়ার ওয়েলের ঘোষণা দেখলেই ভয়ে জড়সড় হয়ে যাই। অনেক ক্ষেত্রে আবার বিদায়ী বন্ধুটি আমাদের মনোভাব দেখে হেঁসে ওঠে বলেন-

-      ধুর মিয়াঁ আপনারা মানুষ চিনতে ভুল করসেন।

লজ্জায় তখন মাথা কাটা যায়- মনে মনে ভাবি, কেন যে মানুষ চিনতে ভুল হয়!

তবে শেষ রক্ষা আর হয়না। চলে যাবার আগে অনেক গভীরে থাকা আগুনটুকু দপ করে একবার জ্বলে ওঠে। দুই একজনের হুমায়ুন আহমেদের মার্কেট শেয়ারের প্রতি লোভের কারনে- বাকি সবাইকে গণহারে ইঁদুর দৌড়ে হুটোপুটি খেতে থাকা ইঁদুরের উপমা বরন করে নিতে হয়।

বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, মাথার দু তিনটি চুল ও এর মাঝে পেকে গেছে- তবু ও কিছু হলনা। মাঝে মাঝে খুব আক্ষেপ হয়। আমার মাথা এ ঘরের ছাঁদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে- তবে কি আমি ঠিকঠাক মানুষ চিনতে পারবো!