বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ৬ জানুয়ারী ১৯৭৩

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

একটি অমানবিক দৃশ্যের অবতারণা

মিজানুর রহমান রানা

  • advertisement


    মিজানুর রহমান রানা

    ঘটনাটি প্রায় আমার সামনেই ঘটলো। আমি বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেলাম। ইফতারের ঠিক পনের-বিশ মিনিট আগে আমি গিন্নির অনুরোধে সামান্য কিছু সাংসারিক কেনাকাটার প্রয়োজনে গিয়েছিলাম চাঁদপুর শহরের পালবাজার ১নং গেইট ধরে ভেতরে। টুপটাপ বৃষ্টি হচ্ছিলো তখন। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে নানা জিনিসপত্র নিয়ে আমি গেইট ধরে বাইরে আসতেই দেখি একটা জটলা। একজন বৃদ্ধ রিক্শাচালক কয়েক মিনিট আগে মাত্র একজন যাত্রী নিয়ে গেইটটির সামনে এসে রিকশাটা থামালেন। আমি দূরে ছিলাম বলে প্রকৃত ঘটনাটা আমার বোধগম্য হওয়ার আগেই রিকশাযাত্রী (বয়স আনুমানিক ৪২ হবে, সুঠাম দেহ, গায়ে প্রচণ্ড শক্তি) তার হাতের ছাতাটা দিয়ে বৃয়োবৃদ্ধ রিকশাচালকের মাথায় প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করলো। সাথে সাথেই ওই রিকশাচালকের মাথা ফেটে অঝোর ধারায় রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
    আকস্মিক ঘটনায় আমি বিহ্বল হয়ে গেলাম। কিছু বলার ভাষা যেনো মুহূর্তের জন্যেই হারিয়ে ফেললাম। রিকশাচালকের সম্পূর্ণ মাথায় রক্ত ভরে গেলো। সেই রক্ত গড়িয়ে তার পুরো দেহ রঞ্জিত হয়ে গেলো। আমরা কয়েকজন ত্বড়িৎ গতিতে গিয়ে রিকশাচালক বৃদ্ধ লোকটিকে ঘটনা ঘটার কারণ জানতে চাইলাম। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন, যাত্রীর কাছে মাত্র একটি টাকা তিনি অতিরিক্ত চেয়েছিলেন। সেই জন্যেই যাত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে তার এ সর্বনাশ করলো।
    আমরা অনেকেই জানি, চাঁদপুর শহরে রিকশাভাড়া তুলনামূলকভাবে রিকশাচালকরা একটু বেশিই নিয়ে থাকে। সেজন্যে অনেক সময় রিকশাচালক ও যাত্রীদের মধ্যে বচসা হতেও দেখি। সেটা তো ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু এই পবিত্র মাহে রমজানের ইফতারের মুহূর্তে একজন বয়োবৃদ্ধ রিকশাচালক মাত্র একটি টাকা বেশি চেয়েছিলেন বলে তার ওপর এমন অমানবিক দৃশ্যের অবতারণা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।
    অদূরেই দু’জন পুলিশ কনস্টেবল ছিলো। তারা এগিয়ে এলো, সাথে সাথে কিছু উৎসুক জনগণও এলো। আমরা পুলিশকে বললাম, অন্যায়কারী যাত্রীটিকে ধরে থানায় নিয়ে যাবার জন্যে। পুলিশ জানালো, ‘একে নিয়ে কোনো লাভ নেই। তার কিছুই হবে না।’ তারা যেনো নির্বাকভাবেই দেখার জন্যে সেখানে অবস্থান করছিলো। এমন সময় এগিয়ে এলেন মধুদা (ডিসের কাজ করেন, পালবাজার বাসা)। তিনি পুলিশ কনস্টেবল দু’জনের গা ঘেঁষে গিয়ে বললেন, তাহলে কি আমরা এভাবেই নির্বাক চেয়ে থাকবো। এই অন্যায়কারী লোকটির কি বিচার হবে না?
    মধুদার সাহসী আহ্বানে রাস্তার লোকজনও ক্ষেপে ওঠলো। আমার দু’হাতে নানা জিনিসপত্র থাকায় আমি কিছুই করতে পারছিলাম না। কারণ ওই ভিড়ের মধ্যে এগুলো আমার হাতের দ্রব্যগুলো মানুষের ধাক্কায় পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা আছে।
    মধুদা এগিয়ে গিয়ে রিকশাযাত্রী লোকটার সাথে তর্কে লিপ্ত হলো। সেই সাথে জনগণও এগিয়ে এলো। লোকটি দেখলো, এভাবে চলতে থাকলে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাবে, এক সময় হয়তো গণধোলাই খাবার উপক্রম হবে। হবে কি! আসলে গণধোলাইতো এখন সময়ের অপেক্ষামাত্র। মানুষ ক্ষেপে গেছে। বৃদ্ধলোকটি অসহায় রক্তমাখা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
    দু’একজন ওই রিকশাযাত্রী লোকটির ওপর চড়াও হবার উপক্রম হলো। সে প্রমাদ গুণলো। সাথে সাথে দিগি¦দিক হয়ে পকেট থেকে একটি ৫০০ টাকার নোট বের করে বৃদ্ধ লোকটির হাতে দিয়ে কোনোরকমে নিজের প্রাণটা বাঁচিয়ে গিয়ে ব্রিজের নিচ থেকে তড়িঘড়ি একটা সিএনজি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেলো। বৃদ্ধ লোকটাকে এরপর অনেকে মিলে ধরে হাসপাতালের দিকে নিয়ে গেলো।
    ইফতারের সময় একদম নিকটবর্তী হওয়ায় আমি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। আমার গিন্নির মিসকল দেয়া শুরু হয়ে গেছে। আমি দেরি না করে বাসার দিকে রওনা হলাম। ইফতারের পর তাকে সবিস্তারে ঘটনাটি খুলে বললাম। সে খুব দুঃখভরাট কণ্ঠে বললো, ‘মাত্র একটি টাকা বেশি দাবি করার জন্যে এমন একজন বৃদ্ধ অসহায় মানুষের ওপর ইফতারের আগমুহূর্তে যারা এমন অমানবিক কাজ করে, আল্লাহ্ তাদের কোনোদিনও ছেড়ে দেবেন না। ওই লোকটিকে একদিন না একদিন তার কর্মের প্রতিফল ভোগ করতে হবে।’
    কথাটা শুনে আমার বাবার কথা মনে হলো। বৃদ্ধ রিকশাচালক লোকটির চেহারাটায় কিছুটা আমার বাবার অবয়ব ছিলো। আমি আমার বাবার কথা চিন্তা করতেই দু’চোখ বেয়ে অশ্র“ধারা গড়িয়ে পড়লো। আমি ভাবতে লাগলাম, হায়রে মানুষ! মাত্র একটি টাকার জন্যে এমন একজন বয়োবৃদ্ধের গায়ে আঘাত করতে তোমার কি কোনো মায়া-দয়া সৃষ্টি হলো না। আর খুনী-ডাকাতরা যখন পিস্তল ঠেকিয়ে লাখ লাখ টাকা তোমাদের চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে যায়, তখন তো চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর করার কিছুই থাকে না। অথচ একজন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমী বৃয়োবৃদ্ধ রিকশাচালক মাত্র একটি টাকা বেশি দাবি করেছে বলে, তার ওপর এমন নির্মম নির্যাতন! ভাবতেই এ সমাজের এ ধরনের মানুষের প্রতি আমার একটা চরম নিন্দাবাদ ফুটে ওঠে। সেই সাথে মধুদার মতো সাহসী মানুষদের কথা ভাবলে আমি আশাম্বিত হই। কারণ ওই সাহসী মানুষটা সেদিন এগিয়ে এসেছিলো বলেই বৃদ্ধ লোকটা কিছুটা হলেও ক্ষতিপূরণ ও সান্ত্বনা পেয়েছিলো। আমাদের সমাজে এ ধরনের সাহসী মানুষের সংখ্যা খুবই বিরল। মধুদাকে আমার পক্ষ থেকে থাকলো অনেক মোবারকবাদ। আর বৃদ্ধলোকটির প্রতি থাকলো সান্ত্বনার বাণী। কারণ এ ছাড়া আমার আর তখন করার কিছুই ছিলো না। সম্ভব হলে আমিও অবশ্যই এগিয়ে যেতাম।
    লেখক ঃ কবি, গল্পকার ও সাংবাদিক, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ, চাঁদপুর।

advertisement