লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ অক্টোবর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৩৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftক্ষোভ (জানুয়ারী ২০১৪)

জামাই আদর!
ক্ষোভ

সংখ্যা

মোট ভোট ১০

মোঃ মোজাহারুল ইসলাম শাওন

comment ১১  favorite ০  import_contacts ৪,০৮১
ডাক্তারি পড়তে ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে পড়তে এসেছি। আমার ক্লাসের অতি অনিয়মিত ছাত্র খোকনের সাথে দেখা হল প্রায় ৫ মাস পর। আমার ব্যাচের ছাত্র। কোনদিন দেখিনাই। প্রথম কার্ড অ্যাবডোমেন প্রায় শেষের দিকে। ও ক্লাসে এসে বিমর্ষভাবে বসেছে। আমি ওকে ক্লাস শেষে ডাকলাম। দুইজনে ক্যান্টিনে বসলাম। ওর সমস্যার কথা শুনলাম। খোকনের সমস্যা হল ওর মেডিক্যাল পড়তে ইচ্ছে হয় না। পরের বৎসর (আমাদের সময় দুইবার পরীক্ষা দেয়া যেত) পরীক্ষা দিয়েছিল। অপেক্ষামান তালিকায় ছিল বলে সে আশায় ছিল। কিন্তু ওকে আর ডাকেনি। এখন বাবার ইচ্ছেয় নিজের অনিচ্ছায় আবার মেডিকেলের ক্লাসে ফিরে এসেছে। কিন্তু পোরা অনেকদূর এগিয়েছে, তাল মিলাত পারছে না। ক্লাসের কেউ এই অনিয়মিত বন্ধুকে নিয়ে ভাববার সময় পাচ্ছে না। মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বার্থপরতা একটি নিয়মিত বিষয় যে !

আমি ক্যান্টিনে ওর সকল বিষয় শুনে ওকে সাহস দিলাম। দুপুরে রুমে এনে খাওয়ালাম। আমার রুমে একটি বিছানা খালি থাকত। সেখানে ঘুমাতে দিলাম। সন্ধ্যায় নিয়মিত পড়বে বলে কথা দিয়ে ওদের ভাড়া বাসা আজিমপুর পল্টন লেনে চলে গেলো। যাওয়ার সময় বাসার ফোন নং এবং বাসায় যাওয়ার দাওয়াত দিতেও ভুলল না।

@@@

আমি টিউশনি করে পড়াশুনা করি। পূরোন ঢাকায় তেমন যুতসই টিউশনির বড়ই অভাব। আমাকে ৩ টি টিউশনি করে খরচ চালাতে হয়। ফলে আলাদা সময় বেড় করে আজিমপুরে যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠল না। খোকন আবার এলো ৩/৪ দিন পর। ওকে আমার রুমে ৩ দিন টানা থাকতে দিয়ে ওর লেখাপড়া করার সুযোগ করে দিলাম। লেখাপড়ার ফাকে ফাকে দুইজনের পরিবারের অনেক কথা জানা হল। আমি বাড়ি থেকে দূরে থাকি বলে একটা কষ্ট নিয়ে থাকতাম। ওর মধ্যে এই সমস্যা ছিল না। ও বাসায় আমার সম্বন্ধে অনেক গল্প করেছে আমাকে তা বলে নি। নিজের খরচে মেডিকেলে পড়ছি এই বিষয়টি ওদের পরিবারে একটি আলোচিত বিষয়ে দাঁর করিয়েছে। সকলেই আমাকে দেখার জন্য মুখিয়ে আছে।

আমার কাছে ৩ দিন থাকার সময় ও এর মধ্যে আমার সাথে পড়ে কয়েকটি আইটেম ক্লিয়ার করতে পারল। ৩ দিন পর বাসায় যাওয়ার সময় পড়ার জন্য আমার রুম থেকে একটি হিপবোন নিয়ে বাসায় গেল। একদিন পর শনিবারে নিয়ে আসবে। সোমবার আমাদের হিপবোনের উপর আইটেম আছে। যথারীতি শনিবার খোকন এলেও হিপবোন আনতে ভুলে গেলো। ওর ভিতরে এমন মন ভুলো অবস্থা প্রায়ই লক্ষ্য করতাম। বিকেলে ওর বাসায় গিয়ে আনা ছাড়া আর কোন উপায় দেখলাম না।

আমি একটি টিউশনি করে অন্যটি মিস দিয়ে ওর বাসায় গেলাম যখন তখন মাগরিব নামাজের আযান হয়েছে। দুইজনে নামাজ আদায় করলাম একসাথে। নাস্তা করে হিপবোন নিয়ে হোস্টেলে ফিরে এলাম। বাসায় তেমন কারো সাথে কথা হলনা। তবে ওর ছোট বোন গুলো দূর থেকে আমাকে খুব খেয়াল করল। আমি লম্বায় ৬ ফিট হার সর্বস্ব কালো শরীরের এক তরুণ। চুপচাপ নিজের আরদ্ধ্য নিয়ে ভাবি। মানুষ হতে আমার প্রাণান্ত চেষ্টা। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপিকা ডাঃ গুলশান আরা ম্যাডাম আমাকে বিভিন্নভাবে সাহস ও সহযোগিতা করেন। আমার লেখাপড়া ভালভাবেই চলছিল। একসময় খোকন আমার বন্ধু তালিকায় দৃঢ় ভাবেই স্থান করে নিল। এর মধ্যে খোকনের সিট নিয়ে সমস্যা হল। সিট নিয়ে সেই গ্যাঞ্জামে আমাদের ২ ব্যাচ সিনিওরদের সাথে ভালো গ্যাঞ্জাম হল। সুমন মোদক দাদা, সেলিম ভাই, স্বপন ভাই ও মিজান ভায়ের সাথে ওর জন্য একাই লড়তে হল। শেষমেশ মিজান ভায়ের প্রস্তাবে ওকে মেইন হোস্টেলে চলে যেতে হল। কিন্তু খাবার জন্য আমার ১৮ ডি সি রায় রোডের হোস্টেলে আসত। তখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হত। সময় গরিয়ে চলল বন্ধুত্বের আধারে।

নভেম্বর মাসের ১৯৮৪ কোন এক বিকেলে খোকনের বারংবার অনুরোধে ওদের বাসায় গিয়েছি। বাসায় গিয়ে দেখি ও আমাকে আসতে বলে নিজে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শামসুন নাহার বর্ধিত অংশের মাঠে খেলতে গেছে। ওর মা আমাকে বসতে বললেন এই বলে যে খোকন আর একটুর মধ্যেই চলে আসবে। খোকনের এক বোন সম্ভবত বড় বোন নাম বলেছিল কিন্তু আমার মনে নাই এসে আমার সামনে দাঁড়াল। সালাম নিয়ে খুব বিনয়ের সাথে জানতে চাইল, ‘ভাইয়া আপনি কিভাবে পড়াশুনা করতেন ! আপনি নাকি নিজে নিজে পড়েছেন, কোন স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েন নি !’
আমি ভালো করে মুখের দিকেও তাকাতে পারিনি। মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ !’
আবার প্রশ্ন, ‘কিভাবে পড়তেন ?’
আমি বললাম, ‘রুটিন করে। আমার রুটিন এমন ছিল যে প্রতিদিন সব বিষয় কমপক্ষে দুইবার রুটিনে থাকত। যেন কোন বিষয় সপ্তাহে না পড়া থাকে।’
সে খুব বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলে উঠল, কেমনে? কি বলেন, ভাইয়া ! আমারে একটু দেখিয়ে দিবেন !’
আমি প্রথমে ইতস্তত করলেও নিজের ছোটবোনের ক্লাসমেট হওয়ায় কি ভেবে তাকে রুটিন করে দিতে রাজী হলাম। প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টা করে তাকে একটি সামজস্যপূর্ণ রুটিন করে দিলাম।

এসময় খোকন বাসায় এলেও কেন আমাদের সামনে এলোনা বিষয়টি এখনো আমার কাছে রহস্যে ঘেরাই রয়ে গেছে। এরপর থেকে খোকনকে ফোনে খোঁজ করলে প্রায়ই ফোন ওর মা ধরে ওর বোনকে দিত। আমার সাথে লেখাপড়া নিয়ে কিছু আলাপ করতে চাইত। আমার এড়িয়ে যাওয়াকে স্বরের ভারী আওয়াজে অপছন্দ করত বুঝতাম।

এরপর একদিন ‘আমার লেখাপড়ার উন্নতিতে যদি আপনার আগমন কাজে লাগে তাহলে কি আমাকে সেই সুবিধা দিবেন না !’ বলে যে আহ্বান করল তা আর এড়িয়ে যেতে পারিনি । আমি রাজী হয়ে গেলাম তার লেখাপড়ায় সাহায্য করতে। সেই যে শুরু হলো আমাদের পথ চলা...

@@@


এরপর সে পাশ করে বদরুননেছা কলেজে ভর্তি হল। কলেজের সেই স্বাধীন জীবনে সে কিছুটা বেশী সাহসী হয়ে উঠল। প্রায়ই নাকি আমাদের কলেজে বান্ধবিদের নিয়ে যেত, কিন্তু হয় বড় ভাইকে দেখে অথবা দুর থেকে আমাকে দেখে কেটে পড়ত, যা ফোনে আমাকে বলত ! ততদিনে তার নাম জেনে নিয়েছি। কুসুম ! আমি প্রায়ই তাকে ডিমের কুসুম না ফুলের ওপর নাম কুসুম এই দ্বিধা নিয়ে তাকে বিমর্ষ করতাম। সে ফুল হতে চাইলে আমি ডিমে থাকতাম, আর ডিম মেনে নিলে ফুলে দৌড়াতাম। আমাদের দুরন্তপনায় সময় দ্রুতই কেটে যাচ্ছিল।

১৯৮৭ সাল।
এরশাদের সেই বিখ্যাত নির্বাচনের প্রচারের শেষদিন। সম্ভবত ৫ই মে। ঢাকার রাস্তায় মিছিলে মিছিলে ছয়লাভ। অলি গলিতে জ্যামে আটকে গেছে। কুসুম আমার সাথে দেখা করতে গেছিল। সরোয়ারদি উদ্যানে সময় কাটিয়ে আমরা বিকেলে রওয়ানা দিয়েছি মিরপুরে। কিন্তু বর্ষার সেই দিনে যখন ওকে বাসায় পৌঁছে দিলাম তখন রাত ৮ টা। একই ট্যাক্সিতে মিটফোর্ড ফিরে গেলাম।হোস্টেলে ফিরেই দেখি খোকন আমার রুমে বসে আছে, আমার অপেক্ষায় ! ও জানালো যে ওর আব্বা নাকি আমার সাথে কথা বলতে চায়। তাই আমি আসলে যেন কথা বলি। দুইজনে গেলাম আমাদের হাসপাতালে । তখন ৩৮... নাম্বারের এনালগ ফোনে মিরপুরে লাইন পাওয়া আর দৌড়ে শ্রীলঙ্কা যাওয়া প্রায় সমান কষ্টের ছিল। তবুও অনেক চেষ্টা করে জরুরী বিভাগ থেকে ফোন পেলাম। খালু আমাকে রাতেই তার সাথে দেখা করতে বললেন ! সাথে একটি শর্ত জুড়ে দিলেন যে উনি না বলা পর্যন্ত যেন কোন কিছুই খোকনকে না বলি। আমি সম্মতি দিয়ে বিপদে পড়লাম। কারন খোকনের কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। আমি রাতে খেয়ে আবার ট্যাক্সি নিয়ে মিরপুর রওয়ানা হলাম এবং রাত ১১ টায় পৌছালাম !

খালু আমাকে তার বাসায় না নিয়ে কুসুমসহ পাশের ঢাকা কলেজের মহিলা লাইব্রেরিয়ান এর বাসায় নিলেন। তাদের ড্রয়িং রুমে আমাদের দুইজনের মাঝে নিজে বসলেন। লাইব্রেরিয়ান খাল্মমাকে সামনে চেয়ারে বসালেন স্বাক্ষী হিসাবে ! আমরা কোথায় ছিলাম কুসুম সরাসরি বলে দিল। আর কতদিন আমরা সরোয়ারদি উদ্যানে দেখা করেছি তাও সে সাহসের সাথে বলে দিল। আমি বাবার সামনে এমন সাহসী উচ্চারণ দেখে তাদের বাবা মেয়ের মাঝের সম্পর্ক কেমন তা খুব বেশী আঁচ করতে ভুল করলাম না। খালু মেয়ের সহজ স্বীকারোক্তির পর আমাকে জিজ্ঞাসা করার কোন অর্থ পেলেন না। আমার দিকে বিমর্ষমুখে হাসি আনবার বৃথা চেষ্টা করে শুধু বললেন, ‘বাবা। তুমি মেডিকেলে পড়। আমার ছেলেকে মেডিকেলে পড়াতে অনেক সাহায্য কর। তুমি আমার ছেলের খুব ভালোবন্ধু । আমি চাইনা তোমাদের বন্ধুত্বে কোন সমস্যা হোক, লেখাপড়ায় কোন বিঘ্ন হোক। আমার কাছে তুমিও আমার আরেক ছেলে আজ থেকে।’
সামান্য দম নিয়ে সামনের লাইব্রেরিয়ান খালাম্মাকে দেখিয়ে আবারো বললেন, ‘আমার মেয়ে এখন কেবল কলেজে পড়ে। ওর এখনো সেই অবস্থা হয় নি। তোমার সামনে পরীক্ষা। এদিকে আমার মেয়ের খুব ইচ্ছা মেডিকেলে পড়ার। তাই আমি আপাকে হাজির নাজির করে কথা দিচ্ছি আগামী দুই বৎসর পর তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা আমি করে দিব। আমি আমার মেয়ের সিদ্ধান্তে নিজেকে মেনে নিয়েই বলছি, আজ থেকে তুমিও আমার আরেক ছেলে।’
আমাদের দুজনের হাত একত্রে মিলিয়ে দিয়ে আবার বলা শুরু করলেন, ‘এই যে আমি তোমাদের একত্র করে দিলাম; এর বিনিময়ে আমি দুইটি শর্ত তোমাদের মানতে বলছি। তোমরা যদি এই শর্ত মানো তবে কেউ তোমাদের কিচ্ছু বলতে পারবে না। আমিও সমাজে মাথা তুলে চলতে পারব !
১) আজ থেকে তোমরা আর বাইরে দেখা করবে না। যখন দেখা করতে ইচ্ছা হবে আমার বাসায় আসবে। সপ্তাহে একবারের বেশী আসা কিন্তু ঠিক হবে না। দুই জনের লেখাপড়া আছে !
২) আমার ছেলেকে তোমরা এই বিয়ের বিষয়ে কিছুই জানাবে না। এতে ওর পড়ার ক্ষতি হতে পারে। তোমাদের মাঝে শত্রুতা বাড়তে পারে। যা বলার আমিই সময় মত বলব। তোমরা যদি এই শর্ত মেনে নাও, আমি তোমাদের যেকোন সাহায্য করব।’

একনাগাড়ে এত্তগুলো কথা বলে উনি হাপাতে লাগলেন। খালাম্মা উনার জন্য পানি এনে দিলেন। উনি বেশ শব্দ করে পানি খেলেন। মনে হলো বুকের এক চাপা ভাঁড় নামিয়ে উনি স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করছেন। আমার মায়া হল এই পিতৃতুল্য মানুষটির উপর। যিনি তৎকালীন বিএডিসির উপপরিচালক ছিলেন।

আমরা দুইজন চোখে চোখে তাকিয়ে তার এই প্রস্তাব মেনে নিলাম। রাত তখন ১২ টা পার হয়ে গেছে। বাইরে খুব বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি কেন যেন প্রস্তাব থাকা সত্বেও আগামীকালের পরীক্ষার দোহাই দিয়ে রাতেই হোস্টেলে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিছুটা গোঁয়ার্তুমি করেই মিটফোর্ড ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাত ১ টা নাগাদ ট্যাক্সি নিয়ে হোস্টেলে ফিরলাম। হাসেম হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে দিলাম এক ঘুম ! কিছুটা আনন্দে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রাতে গভীর ঘুম হলো না। পরেরদিন কলেজে খোকনের অনেক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ায় খোকন আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করল, বুঝতে পারলাম !


১৩ দিন পর খোকনের মায়ের অসম্মতির দোহাই দিয়ে খালু তার প্রস্তাব থেকে নিজেই ফিরে গেলেন। এদিকে হোস্টেলে এসে খোকন আমার সাথে হাতাহাতি করতে উদ্দোত হল। যদিও সেইদিন আমি ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে ভুগছিলাম। আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরল। খোকন তার বোনকে আমার সাথে বিয়ে দিতেও অসম্মতি জানায় না, আবার আমাকে মেনেও নিতে পারেনা। আমি ওর সমস্যা ওকে সমাধানের দায়িত্ব দিয়ে আবার আস্তে আস্তে লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু সেই জ্বর আমাকে দেড় মাস পঙ্গু করে রাখল। আমার তৎকালীন সমস্ত রক্তের রিপোর্ট ব্লাড ক্যান্সারের দিক নির্দেশনা দিচ্ছিল। আমি প্রেমকে গুটিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। পুরো পরীক্ষা দিতে পারলাম না।

২ মাস পর পরীক্ষার চিন্তা মাথা থেকে দূর করে দিতে পারায় আমি আবার সুস্থ হতে শুরু করলাম। আমার রিপোর্ট স্বাভাবিক হতে শুরু করল। আমি লেখাপড়ায় নিয়মিত হলাম। কুসুমের কোন খবর আর পাইলাম না। একদিকে আমি আস্তে আস্তে কুসুম থেকে সরে আসতে পারি কিনা ভাবতে লাগলাম। আমার কিছু বন্ধু আমাকে সেই উপদেশ দিল। ৩১ ডিসেম্বর ৮৭ কুসুম আমার সাথে নিজে থেকেই দেখা করল। সে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না বলে কাঁদতে শুরু করল। আমি আবারো আমার মত পরিবর্তনের ইচ্ছা থেকে ফিরে আসলাম।
শুরু হল আমাদের ২য় পর্যায়ের গুরু গম্ভীর সাহসী প্রেমের আনন্দময় অধ্যায়।

@@@


আমাদের বেশিদিন লুকিয়ে থাকা সম্ভব হলনা। কিছুদিনপর আবার কুসুমের বাড়িতে জেনে যায় যে আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করি ! ১৯৮৯ সালের শেষ দিকে এইবার কুসুমের মায়ের ইচ্ছায় আমাদের বিবাহ দিতে ব্যবস্থা নিলেন ।বিয়ের জন্য ওদের বাসায় আব্বাসহ আমার ৫ বন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হল। মেয়েকে আব্বা আংটি পরে দিয়ে আগামী শক্রবার বিয়ের ডেট ঠিক করলেন। ওর মায়ের প্রতিনিধি সব ঠিক আছে বলে জানাল। হাল্কা নাস্তা খেয়ে আমরা খুশী মনে বেরুতে শুরু করলাম। সবশেষে কুসুমের বাবার সাথে আব্বার মোলাকাত চলছে।
কুসুমের বাবা বললেন, ‘ভাই আগামী সপ্তাহের তারিখ তা tentative থাকল।‘
আব্বা বললেন, ‘ঠিক আছে আপনি সিউর হয়ে জানিয়েন কিন্তু !’
কিন্তু আমাদের কিছুই জানালেন না। আব্বা শুক্রবার ১০ তার গাড়ি ধরে বাড়ি ফিরে গেলেন। আমরা জানলাম ওর বাবা রাজী নয়। ওর মায়ের পক্ষের লোক আমাকে যা বুঝালো তাতে মুলচক্র ওর বাবা। ওর বাবা আমাকে মেয়ে দিবেন না। যদিও তিনি মেয়েকে বুঝাতে সার্থক হলেন যে, আমি এই বিয়ে করব না। আমাদের মধ্যে আবারো ভাঙ্গন ধরানর চেষ্টা করলেন। কিন্তু প্রেম কি এইসব বাঁধা মানে? কুসুমের বাবার এই মনভাবের কথা শুনে মনে আরও জিদ ধরে গেলো। ক্ষোভে ফেটে পরলেও অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এর মধ্যে খবর এলো ওর বাবা ওকে মামার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেবে, পাত্র একজন মাদ্রাসা পাশ হুজুর। পাত্রের ছোটভাই আমাদের ব্যাচের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মেয়ের ভাই মানে খোকনের খোঁজ নিতে আমাদের মেডিকেলে এসেছে। উঠেছে আমার প্রিয় বন্ধু প্রয়াত ডলার এর রুমে। ডলার আমাদের প্রেমের কথা জানত এবং আমাকে সর্বান্তকরণে সমর্থন দিত। যখন ও জানল যে খোকনের বোনের বিয়ের কথা নিয়ে এসেছে ওর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, তখন ডলার ওকে নিয়ে আমার রুমে এলো। আমার রুমে আমাদের একটা দুইজনের যুগল ছবি বাধানো ছিল। পাত্রের ভাই অনেকক্ষণ সেই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকল।
ডলার ওর স্বাভাবিক মৃদু হাসি দিয়ে আমাকে বলল, ‘কি বিরিয়ানি খাওয়াবি না সিগারেট খাওয়াবি বল !’ আমি তখনো ঐ ছেলের পরিচয় এবং ওদের আসার কারন জানিনা।
আমি সিগারেট এর প্যাকেট এগিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘ধর ! কিন্তু কি জন্য বিরিয়ানি খাওয়াবো, বল !’
এইবার মুখ খুলল পাত্রের ভাই। সে জানালো তার আসার উদ্দেশ্য ! আমরা হাসতে হাসতে রুম থেকে বাইরে এলাম। এরপর বিয়ে কি হয় ! বেচারা কুসুমের বাবা এইবারও বিরাট ধাক্কা খেলো।

আমার আজিজুল হক কলেজে, বগুড়ার ক্লাসমেট বীণা এর বাবা শামছুল হুদা চাচা ছিল কুসুমদের আত্মীয়। এই অত্যাধিক মেধাস্বপ্ন মানুষের সাথে আমার বগুড়ায় পরিচয় ছিল। উনি দীর্ঘ ১৩ বৎসর বগুড়ায় বিনিয়োগ বোর্ডে চাকুরি করেছেন। ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে উনি আমার রুমে এলেন কুসুমের মামাকে নিয়ে। এক ফাঁকে আমাদের অতীত চারণ হল। নাস্তা খাওয়ালাম। একসময় উনি আমার মতামত চাইলেন কুসুমের বিয়ের ব্যাপারে।
আমি সরাসরি উত্তর দিলাম, ‘ওকে যেহেতু ভালোবাসি তাহলে বিয়ে করতে সমস্যা কেন, চাচা ! কিন্তু সমস্যা তো ওর আব্বা তৈরি করেন। বারবার দুইমুখো কাজ করছেন। উনি আমার সাথে এক কথা বলেন, মেয়ের কাছে এক কথা বলেন।’
হুদা চাচা আমার উত্তর শুনে খুব খুশী হয়ে নিজে দায়িত্ব নিয়ে সমাধান করবেন বলে কথা দিয়ে চলে গেলেন। এরপর আমাদের ভিতরের ক্ষোভকে প্রশমিত করলেন তার নিজস্ব মেধা দিয়ে। উনি তার নিজের কদমতলা, বাসাবোর বাসায় আমাদেরকে নিয়ে বসলেন। অনেক কথা হল এবং দ্রুত বিয়ের ব্যাপারে এগুতে বললেন। হুদা চাচার নিয়মিত তদারকিতে আমাদের বিয়ের দিন ঠিক হল ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯০। কিন্তু ১৯৯০ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার উপর আক্রমণ হওয়ায় ঢাকার দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় বিকেলে। আমরা আবারো শঙ্কায় পরি। কিন্তু হুদা চাচার বড় ডাঃ মেয়েকে নিয়ে পরেরদিন বিয়ের বাজার করে ২৩ তারিখেই বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করা হয়।

বিয়েতে হবু শশুর শর্ত দিলেন বেশী লোক নিয়ে যাওয়া যাবে না। সর্বমোট জনা ১৫ লোক নিয়ে যেতে হবে। তার প্রতি কাজে একটা বিরাট অনিহা প্রকাশ পেলো। তার প্রতি কাজে প্রতিশোধ বা ক্ষোভ প্রকাশের লক্ষন স্পষ্ট ছিল। কিন্তু হুদা চাচার সরাসরি তত্ত্বাবধানে কোন ঝামেলা ছাড়াই এইবার বিয়ে শেষ হল। আমার সাথে ১৩ জন লোক। সকলেই আমাদের আত্মীয়। দুই জ্যাঠাত দুলাভাই আমার সাথে। উনারা আমারে বুদ্ধি দিলেন যে কেমনে একটি ভদ্র প্রতিশোধ নেয়া সম্ভব। বলল এদেশে বিয়েতে মেয়ের আগে মত নেয়া হয়। উনারা বললেন যে আমি যেন কবুল পড়ার আগে একটু সময় নিয়ে কবুল বলি। আমার এই প্রতিশোধ নেয়ার পদ্ধতি খুব পছন্দ হল। মেয়ের অনুমতি নিয়ে উকিল বাবা ঢাকা কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক আনোয়ার চাচা আমার কাছে এসে হাত ধরলেন। অনুমতির জন্য যা বলা বলা হয় সব বলা হল। আমি চুপ করে এদিক ওদিক দেখছি। কিন্তু কবুল বলছি না। উকিল বাবা আবারো বললেন, বাবা কি মত আছে?
আমি কিছু বলি না । তাকিয়ে দেখছি শ্বশুর মশায় তার কোঁছা থেকে ভেনটোলিন ইনহেলার বেড় করলেন, ঝাঁকাতে শুরু করলেন... মুখে ধরলেন এমন সময় আমি জোরে বলে উঠলাম, ‘কবুল!’

শ্বশুর মশায় এবং উকিল বাবার মুখে হাসি ফুটে উঠল। গোটা বাড়িতেই হাসির আনন্দের জোয়ার বয়ে গেলো। আমার বিয়ে হয়ে গেলো। দীর্ঘ ৫ বৎসরের প্রেমের সফল সমাপ্তি সকল ক্ষোভের অবসান হল। কিন্তু আমার এই ঘটনায় বোঝা হল যে ক্ষোভকে সব সময় সহিংসভাবে প্রকাশ করতে হয়না। বুদ্ধি দিয়েও ক্ষোভ প্রশমিত করে প্রতিশোধ নেয়া যায়। আমার সেই পদ্ধতি বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আজও চলমান ! তেমন আরেক সুযোগ এলো ক্ষোভ দমনের বিয়ের ৩য় দিন। কারন এই ৩ দিনেই মনে হচ্ছিল আমরা অনেককে কষ্ট দিয়েই নিজেদের অধিকার আদায় করেছি। জামাইয়ের প্রতি এই দেশে চলমান যে সম্মান সাধারণত দেখানো হয়, তার কোন লক্ষন আমি পরের দিন থেকে ঐ বাড়িতে দেখি নাই। যা হচ্ছে সব লোক দেখানো। যদিও আমার গিন্নী কুসুমের এই নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নাই। প্রেমের দাবীকে বাস্তবায়ন হয়েছে এতেই সে মহা খুশী !

@@@@

১৯৯০ সাল ফেব্রুয়ারি মাস এর ২৫ তারিখ।

আমি বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেই আছি।
প্রেমের বিয়ে আদর যত্ন কম। তিন দিনের মাথায় সকালে বিছানা থেকে উঠে দেখি কেউ উঠে না। নাস্তাও দেয় না। বেলা৯ টা বেজেছে অনেকক্ষণ হল। ক্ষুধায় ছটপট করছি, কারন হোস্টেল লাইফে সাধারণত আমরা বেলা ৮ তার আগেই নাস্তা সেরে ক্লাসে যেতাম । একা একাই ডাইনিং টেবিলে গিয়ে দেখি রুটি আর গরুর মাংস বাটিতে ঢাকা।
রুটি গুনলাম ৪৪। বাসায় সর্বমোট মানুষ ১২ জন। বুঝলাম কেউ খায় নি।

জামাই বলে কথা । অনাদরের ক্ষোভের বদলা নেয়ের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না ! এত তাড়াতাড়ি জামাইকে আদর না করার মজা দেখাতে হবে যে !

বউকে ডাকলাম। বউ দাঁত মাজতে মাজতে বলল, ‘তুমি শুরু করে দাও। আমি আসছি।’ বলেই হাসতে হাসতে গোছলখানায় ঢুকে গেলো।

প্রতিশোধের নেশায় শুরু করলাম খাওয়া। এক সময় ৪৪ পিস রুটির সব শেষ হল। শুরু হলে শেষ হবে এইটা প্রাকৃতিক নিয়ম !
বউ গোছল খানায় ঐ যে ঢুকেছে আর বেড় হয় না। দরজায় দাঁড়িয়ে বললাম, ‘এই রুটি কই!’

এইবার বউ দৌড়ে বাথরুম থেকে ভেজা চুলে বেড় হল। ভেজা কাপড় সামলাতে সামলাতে তন্দ্রালু মাকে ডেকে বলল, 'মা রুটি কই? জামাই রুটি চায়।'
আধা ঘুমে তন্দ্রাচ্ছন্ন শাশুরি বলে চলেছেন, 'টেবিলে আছে। তুমি একটু তুলে দাও। আমার শরীর খারাপ লাগছে।'
বউ আমার গোটা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে রুটির দেখা পেল না। আমি মৃদু রাগত চেহারায় বাসা থেকে বেড় হয়ে পরলাম, যেন হোটেলে নাস্তা খেতে যাচ্ছি। পিছন ফিরে বউএর উদ্ভ্রান্ত চেহারা দেখে ভেংচি কেটে... একটু মজা করলাম !

লন্ডন ৫৫৫ এর জন্য কিলো খানিক হাঁটতে হল। অতঃপর এক দোকান থেকে লন্ডন ৫৫৫ সিগারেট ধরিয়ে টান দিচ্ছি আর ভাবছি...জামাইরে আদর করবে না ! কেমন মজা, দেখ সবাই ! প্রেম করেছি বলে দাম দিলে না ! জামাইরে আদর না করলে, না খেয়েই থাকতে হবে !

জামাই বলে কথা, তাও আবার বংশের বড় জামাই !

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement