লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ আগস্ট ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ১৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপূর্ণতা (আগস্ট ২০১৩)

দিদিমণি
পূর্ণতা

সংখ্যা

ইন্দ্রাণী সেনগুপ্ত

comment ২৩  favorite ০  import_contacts ১,২৯৭
গ্রামটির নাম বসাকপুকুর। শিয়ালদহ থেকে দক্ষিনের ট্রেন ধরে ছোট্ট রেলস্টেশনটিতে নামতে সময় লাগে সোয়া দু’ঘন্টা মত। মাঝে সিগন্যাল না পাওয়ার জন্য দাঁড়িয়েও যায় গাড়ি অনির্দিষ্ট কালের জন্য, তাই একটু বেশি সময় হাতে রেখেই বেরতে হয় অর্পিতাকে। বাড়ি কলকাতার পার্কসার্কাস অঞ্চলে। সেখান থেকে বাসে শিয়ালদহ, তারপর সোয়া দু’ঘন্টার ট্রেন জার্নি এবং তারও পরে মিনিট কুড়ির ভ্যান রিক্সার দুলুনি খেয়ে যখন স্কুলের পৌঁছায় অর্পিতা, তখন দেখে প্রেয়ার শেষের মুখে। হন্তদন্ত হয়ে টিচার্স রুমে এসে মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম করে জল খেয়ে attendance register হাতে দৌড়ায় ক্লাসের দিকে। উপস্থিতির হার ৩০-৪০% বা তারও কম, অর্পিতার বিষয় ভূগোল, পঞ্চম আর ষষ্ঠ শ্রেনিতে অঙ্কটাও করাতে হয়। পড়াতে অর্পিতার বেশ ভালই লাগে, সেই কারণেই সরকারি স্কুলে চাকরির পরীক্ষা দেওয়া। কিন্তু, বসাকপুকুর হাইস্কুলের শিক্ষিকা হিসাবে যোগ দেওয়ার পর পড়ানোর উৎসাহটাই যেন চলে যাচ্ছে। স্কুলবাড়ির একেবারেই দৈন্যদশা, সরকার থেকে যে কেন কোন উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হয়না সেটা একটা রহস্যই বটে। আরও বেশি দৈন্যদশা উপস্থিতির হারে। বিশালাকার ক্লাসরুমগুলিতে গোটাকয়েক ছাত্রী, তাদের ধরনও বিভিন্ন। কিছু ছাত্রী এমন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে যেন হাতেখড়ির আগেই তাদের হঠাৎ করে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে সপ্তম কি অষ্টম শ্রেনিতে। আর এক দল ছাত্রীর পড়াশুনাটুকু বাদ দিয়ে অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে অপার কৌতুহল। মাঝে মাঝে বিরক্তি এসে যায় ক্লাস নিতে, তবু নিতেই হয় বাধ্যতামূলক ভাবে। মাধ্যমিকে একটা কি দুটো ফার্স্ট ডিভিশান টেনেটুনে, বাকি সব সেকেন্ড বা পি, এটাই বসাকপুকুর হাইস্কুলের চিরাচরিত ফলাফল। বেশিরভাগ ছাত্রীর একটু উঁচু শ্রেনিতে ওঠার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে যায়, ফলে পড়াশুনারও ইতি। সপ্তম শ্রেনির ভূগোল ক্লাস নিচ্ছে অর্পিতা, নিয়ম মাফিক বোর্ডে এঁকে বোঝাচ্ছে আহ্নিক গতি-বার্ষিক গতি। দু’একবার বকাঝকা করেও কোন লাভ হয় নি, বোর্ডের দিকে ফিরতেই শুরু হয়ে যায় একটা চাপা গুঞ্জন। অর্পিতা হাল ছেড়ে দিয়ে নিয়মমাফিক ক্লাসটা শেষ করার জন্য পড়ানো চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই চোখ পড়ে যাচ্ছে ডানপাশের জানলাটায়।মেয়েটা তাকিয়ে আছে বোর্ডের দিকে, আর নিজের মনে কি সব যেন বলছে। আগেও দেখেছে মেয়েটাকে অর্পিতা, বেয়ারা রাধারমণের মেয়ে, স্কুলে ফাইফরমাস খাটে। বিভিন্ন শ্রেনিতে ক্লাস নেওয়ার মাঝে মাঝেই দরজার বাইরে অথবা জানলার ধারে দেখতে পায় মেয়েটাকে। কৌতুহলী হল অর্পিতা, ক্লাসটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর টিফিন টাইম, মুহূর্তে ক্লাসরুম ফাঁকা। হাতছানি দিয়ে ডাকল সে, মেয়েটা জড়সড় পায়ে এসে দাঁড়াল ক্লাসে। বোঝাই যাচ্ছে বেশ ভয় পেয়ে গেছে। পরিবেশটা হালকা করতে চাইল অর্পিতা –‘তুই রাধারমণের মেয়ে তো, নাম কি রে তোর?’
-‘শ্যামা দিদিমণি’
-‘বাহ, বেশ ভাল নাম তো, কি করিস তুই?’
-‘ইস্কুলের ঘর ঝাড় দিই, দিদিমণিদের বোতলে জল ভরে দিই,গাছে জল দিই’
-‘আচ্ছা বেশ, তা শ্যামা, বোর্ডের দিকে তাকিয়ে কি বলছিলি নিজের মনে?’
শ্যামা মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে।
-‘কি রে বল, আমি কিন্তু একটুও বকব না’
-‘হিসাব কষছিলাম’
-‘কিসের?’
-‘আহ্নিক গতি আর বার্ষিক গতির’
থমকাল অর্পিতা। এবার তার অবাক হওয়ার পালা – ‘তুই জানলি কি করে !!’
-‘বারে, আপনি যে বললেন’
-‘কি বললাম?
-‘সূর্যের দিকে পৃথিবীর যে দিকটা পড়ে সেটা হয় দিন, আর উল্টোপিঠে হয় রাত। পৃথিবীটা ঘুরতে থাকে সবসময়,তাই দিন-রাত-দিন-রাত এভাবে চলতেই থাকে। এটাই তো আহ্নিক গতি। বার্ষিক গতিটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল। ওটাই হিসাব কষছিলাম এক বছর কিভাবে হয়’ - বইয়ের ভাষার ধারেকাছে না গিয়েও কত সহজভাবে বলে দিল মেয়েটা আহ্নিক গতির মানে। উৎসাহিত বোধ করল অর্পিতা, এই স্কুলে ঢোকার পর প্রথমবার –‘তুই কি আমার অন্য ক্লাসেও পড়া শুনিস?’
-‘যখন সময় পাই তখনই দেখি। সেদিন সুদের অঙ্ক দেখছিলাম’
-‘তুই স্কুলে পড়িসনা কেন!’
-‘চতুর্থ শ্রেনি অবধি পড়েছি প্রাথমিক স্কুলে,তারপর বাবা ছাড়িয়ে দিল। ভাইদের তো পড়াতে হবে। অত বই কিনবে কি করে বাবা? আমরা যে খুব গরীব’
-‘তোকে যদি আমি বই কিনে দিই, তুই পড়বি?’
উজ্জ্বল দীপ্তিতে ঝলমল করে উঠল শ্যামার কালো মুখটা –‘পড়তে আমার খুব ভাল লাগে দিদিমণি’
পরের দিন অর্পিতা রাধারমণকে ডেকে বলে দিল, শ্যামাকে পড়ানোর সব দায়িত্ব সে নেবে। শুধু সন্ধ্যের পর বাড়িতে যেন অন্তত দু’টো ঘন্টা পড়ার সময় পায় শ্যামা। রাধারমণ রাজি তৎক্ষণাত। মেয়ের পড়াশোনায় আগ্রহের কথা তার অজানা নয়, কিন্তু অভাবের সংসারে মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার বিলাসিতা করার মত লোক রাধারমণ নয়। কিছুদিন নাড়াচাড়া করে অর্পিতা বুঝল, এ মেয়ের মধ্যে আগুন আছে, শুধু সঠিক প্রয়োগের অপেক্ষা। ষষ্ঠ শ্রেনিতে ভর্তি হয়ে গেল শ্যামা। স্কুলের ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর আরও ঘন্টা দুয়েক শ্যামাকে নিয়ে বসে অর্পিতা। নতুন বইপত্র-খাতা-পেন সব কিছু এনে দিয়েছে অর্পিতা তার নতুন শিষ্যার জন্য। কেমন যেন একটা জেদ চেপে গেছে তার, যে ভাবেই হোক শ্যামাকে সঠিক পথ দেখাতেই হবে। অর্পিতা অবাক হয়ে যায় শ্যামার জ্ঞানপিপাষা দেখে, জানার আগ্রহের শেষ নেই শ্যামার। এই অখ্যাত একটা গ্রামের আরও অখ্যাত এক পরিবারের অন্ধকারেই হয়ত থেকে যেত মেয়েটা, ভাগ্যিস খুঁজে পেয়েছিল অর্পিতা। স্কুল ছুটির পর আরো কিছুক্ষণ সমস্ত বিষয় নিয়েই আলোচনা করে শ্যামার সাথে, শ্যামাও খোলাখুলি ভাবে জেনে নেয় অসুবিধার জায়গাগুলো। শিক্ষাদানের আগ্রহটা প্রায় হারাতেই বসেছিল বসাকপুকুরে এসে, সেটা এখন বহুগুণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তৃপ্তির পূর্ণতা অনুভব করে অর্পিতা। শিক্ষিকা হিসাবে এই প্রথমবার নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে।

ধীরে ধীরে একের পর এক শ্রেনি পেরিয়ে যায় শ্যামা – ষষ্ঠ,সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম। প্রতি শ্রেনিতেই অন্যদের থেকে অনেকটাই বেশি নম্বরের ব্যাবধানে সফল হয় সে। বেড়ে চলে পড়ার আগ্রহ, আর তার সাথে বেড়ে চলে আত্মবিশ্বাস । অবশেষে মাধ্যমিক। বসাকপুকুর হাইস্কুলের ইতিহাসে এই প্রথমবার স্টার পাওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে শ্যামা ৮৪% নম্বর পেয়ে। স্থানীয় সংবাদ পত্র গুলিতেও অখ্যাত এই গ্রামটি বিখ্যাত হয়ে যায় রাতারাতি। শ্যামা ছুটে এসে প্রথমেই প্রনাম করে তার প্রিয় দিদিমণিকে। আজ অর্পিতা কানায় কানায় পূর্ণ। শিক্ষিকা জীবনের সব থেকে বড় সাফল্য আজ তার। তার নিজের হাতে গড়া শ্যামা, শ্যামার সাফল্যের একমাত্র অংশীদার সে-ই। এত আনন্দের মাঝে বিষন্নতায় ছেয়ে আছে মন। ট্রান্সফারের জন্য চেষ্টা করছিল বহুদিন ধরে, আজই উত্তর এসেছে। মিউচুয়াল ট্রান্সফার, এই গ্রামের কাছেই বাড়ি, এক ভদ্রলোকের, তার সাথে। কলকাতার একেবারে কাছে হাওড়া জেলার এক স্কুলে যেতে হবে তাকে। যাতায়াতের কত সুবিধা, স্কুল ভাল, রেজাল্টও হয় দারুন।চিঠিটা হাতে নিয়েই বসেছিল অর্পিতা। শ্যামা খেয়াল করল তার বিষন্নতা –‘কি হয়েছে দিদিমণি? চিঠিতে কি লেখা আছে?’
-‘আমাকে এবার চলে যেতে হবে রে শ্যামা’
মুহূর্তে চোখ ছলছল শ্যামার –‘কোথায় যাবেন দিদিমণি?’
-‘বদলির চিঠি এসেছে যে, হাওড়াতে’
-‘সে তো অনেক দূর’
-‘হ্যাঁ, এখান থেকে অনেকটাই, তবে আমার বাড়ি থেকে কাছে’
-‘আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন দিদিমণি?’
-‘যেতে তো হবেই। তবে তোর পড়াশোনার সব ব্যবস্থা আমি করে দিয়ে যাব। চিন্তা করিস না’
-‘ঐ ইস্কুলটা কেমন?’
-‘খুব ভাল স্কুল রে। খুব ভাল রেজাল্ট হয় বোর্ডের পরীক্ষায়’
-‘তাহলে যেতে হবে না দিদিমণি। ওরা তো ভালই। আমাদের বাজে ইস্কুলটাকে ভাল করে দিন বরং’
কি অবলীলায় শ্যামা বলে দিল সহজ কথাটা। ঠিকই তো। আরও কত শ্যামা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হয়তো এই গন্ডগ্রামেই অথবা আশেপাশের গ্রামগুলিতে। শ্যামাকে গড়ে তোলার মধ্যে যে পরিতৃপ্তি, যে স্বার্থকতা, যে পরিপূর্ণতা, তা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে কি! কখনোই নয়। সে না থাকলে শ্যামা নামের এই গ্রাম্য মেয়েটা হয়তো এতদিনে হারিয়েই যেত কোন সংসারের হেঁসেলে, গ্রাম্য জীবনের চিরাচরিত গড্ডালিকা প্রবাহে। শ্যামাকে নতুন জীবনের স্রোতে আনার একমাত্র কৃতিত্ব শুধু তার।এ পূর্ণতার যে কোন তুলনাই চলে না আর কোন কিছুর সাথে।মানসিক দোলাচলে কাটছিল সময়, বিষন্নতা ছেয়ে ছিল গোটা শরীরে। শ্যামা এক মুহূর্তে অবসান ঘটিয়ে দিল সব টানাপোড়েনের। এই মুহূর্তে অর্পিতার থেকে সুখি যেন আর কেউ নয়। আনন্দে কাছে টেনে নিল সে তার শিষ্যাকে- ‘তোদের ছেড়ে যাওয়া আমার হবে না। আমি চিঠি লিখব হেড অফিসে যেন আমার বদলির আবেদন খারিজ করে দেন।কত শ্যামা হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, প্রতিক্ষণ। তাদের খুঁজে আনতে হবে, দেখাতে হবে আলোর দিশা। এই তো আমার মুক্তি, আমার বন্ধন, আমার পূর্ণতা। তুই আমাকে সাহায্য করবি তো তাদের খুঁজে বের করতে?’ শ্যামা চেয়ে রইল অবাক বিস্ময়ে তার দিদিমণির দিকে, কিছুটা বুঝতে পারল, কিছুটা পারল না। এই পারা-না পারার মধ্যেই দিদিমণির চাওয়াটা সে অনুভব করতে পারল হ্রদয় দিয়ে, তাই দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল হঠাৎ চোখের জলে দিদিমণির ‘থেকে যাওয়ার’ প্রতিশ্রুতিটুকু পেয়ে ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement