মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী।পার্থিব জীবনের সকল মায়া মমতা বন্ধন ছিড়ে তাকে চলে যেতেই হয়। মৃত্যুই পার্থিব আর অপার্থিব জীবনের মাঝখানের ব্যবধান । সুতরাং আমার গল্পটি বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে হয়েছে।বাকীটা আপনারাই বিবেচনা করুন।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৮৩
গল্প/কবিতা: ২৬টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬২

বিচারক স্কোরঃ ১.৯৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - পার্থিব (আগস্ট ২০১৮)

ইব্রাহিম
পার্থিব

সংখ্যা

মোট ভোট ১৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬২

মাইনুল ইসলাম আলিফ

comment ১২  favorite ১  import_contacts ৩১৪
ছাল (স্যার) আমি বলো(বড়) হয়ে সৎ মানুষ হবো”
ইব্রাহিমকে তার স্যার একদিন প্রশ্ন করেছিল “তুমি বড় হয়ে কি হবে? সেই প্রশ্নের উত্তরেই কথাটা বলেছিল সে ।কথায় যথেষ্ট মায়া লুকিয়ে আছে যদিও ‘র’ উচ্চারণ করতেই যত গোল বাঁধে তার। বরাবরই ‘র’ হয়ে যায় ‘ল’ ।
ইব্রাহিম অসম্ভব দুষ্টু । তার দুষ্টুমিকে অপরাধ বলা যায় না কারন তার দুষ্টুমি কাউকে কষ্ট দেয় না, বরং অদ্ভুত এক চঞ্চলতার ছাপে ছাপিয়ে দেয় সবার মন ।কি অসম্ভব চঞ্চলতা আর দুরন্তপনা! অথচ কত সহজ সরল তার মন! কারন তার মনের প্রশস্থতা অপ্রকাশিত ।সে ছোট কিন্তু তাই বলে তার সহজ সরল আচরণ সেতো মিথ্যে নয় বরং সত্যের ছাঁচে গড়া একটি বাস্তবতা ।
কিন্তু ইব্রাহিমের এই চঞ্চলতা মাঝে মধ্যে তার মাকে খুব কষ্ট দিতো ।বারবার বারণ করতো “ইব্রাহিম দুষ্টামি কইরোনা বাবা”।কিন্তু সে নির্বিকার ।হঠাৎ শান্ত হয়ে আবার পরক্ষনেই এটা ওটা নিয়ে হৈ হুল্লোড় শুরু করে ।সংসারের সব দিক সামলে নিয়ে সত্যি অস্থির হয়ে উঠেন মা রাবেয়া। ছেলের এই দুরন্তপনা সইবার মতো সহ্য ক্ষমতা তখন আর থাকেনা ।বাধ্য হয়ে বকা ঝকা করেন ,মাঝে মধ্যে মেরেও বসেন ।কিন্তু পরে আর সইতে পারেন না, তুলে নেন কোলে, এইতো মায়ের মন ।
বয়স সবে মাত্র আট ।একেবারেই কথা শুনতে চায় না ।একদিন ছেলের অবাধ্যতায় খুব রেগে গেলেন ইব্রাহিমের মা রাবেয়া, রাগের মাথায় মা বলে ফেললেন ‘মর, তুই মর”
অভিমানি সুরে ইব্রাহিম বললো ‘দেইখো আমি মইলাই (মইরাই) যাব,আমি মইলা (মইরা) গেলে সেদিন না তুমি লাস্তায় লাস্তায়(রাস্তায় রাস্তায়) বে বে কইলা (কইরা) কাইন্দা বেলাইবা (বেড়াইবা)”।মা রাবেয়ার মনটা ছ্যাৎ করে উঠে ।একটু পরেই তিনি কোলে তুলে নেন ইব্রাহিমকে।
ইব্রাহিম খুব খেতে পারতো। কতক্ষন পরপর সে খাবে। মেনে না নিয়েও উপায় অন্তর থাকেনা, কান্নাকাটি করে। দোকান থেকে রোজ বাদাম, চানাচুর, চিপস কিনে খাবে। এসব তার চাইই। তাতেও বাঁধ সাধেন না মা রাবেয়া। মা তার খাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকেন। চাই চাই করলেই সবকিছু সহজে দিতে চাইতেন না, আবার না ও করতেন না। তবে ইব্রাহিমের খালা ছিলেন অন্যরকম। ইব্রাহিমের প্রতি তার ভালবাসা ছিল অবর্নণীয়। মায়ের কাছে একটু অবজ্ঞা পেলেই সে ছুটে যেতো খালার কাছে। মা যা দিতে আপত্তি জানাতো, সেটাতেই সম্মতি ছিল খালার। তিনি লুকিয়ে খেতে দিতেন, আর এ কারনেই খালার প্রতি খুবই দুর্বল ছিল ইব্রাহিম।
নিম্নবিত্ত এ পরিবারটি ঢাকার উত্তরার তের নাম্বার সেক্টরের একটি খালি প্লটে থাকতো। জমির মালিক প্লটের কেয়ারটেকার হিসেবে তাদেরকে থাকতে দিয়েছেন। ইব্রাহিমের বাবা কাঁচা মালের হকার। স্ত্রী,এক ছেলে আর এক মেয়ের সংসারে শ্যালিকা রাজিয়া থাকছেন বছর দেড়েক ধরে। সদালাপী, সৎ ও নামজী ফারুকের এ নিয়ে অবশ্য আপত্তি ছিলনা কখনোই। বরং সুখের সংসারই বলা যায়।
একদিন খেতে বসে সবাই। মা, বাবা, খালা, ইব্রাহিম ও তার আপু আখি। সবার প্লেটেই মাছ তুলে দেন মা রাবেয়া। ইব্রাহিম যেন আরো চাইছে এমন ভঙ্গিতে মায়ের কাছে চামচ চাইলো। মা বললেন ‘তুই আরো নিতি চাস?’ ইব্রাহিম বললো ‘মা তুমি চামুচটা দ্যাওনা আমাল (আমার) হাতে। অনেকবার বারণ করলেও সে চামচ নেবেই। চামচটা হাতে নিয়ে সে একটা মাছ তুলে দিলো খালার প্লেটে। অবাক হয়ে সবাই কেবল চেয়ে রইলো।
পাশের বাড়ির রাকিব আর আকলিমাকে পড়াতো স্যার। সেখানেই পড়তে যেতো ইব্রাহিম আর আখি। পরতে যেতে তার আপত্তি নেই,তবে মাঝে মধ্যে টিভি দেখতে বসে পড়লে আর উঠতে চাইতো না। বিশেষ করে টিভি সিরিয়াল রবিনহুড। পড়তে যেতে বললে সে বলতো ‘আমি এখন যাব না আমি লবিনহুড দেখব’। পড়তে গিয়ে মাঝে মধ্যে আপত্তি তুলতো ‘ছাল আমাল ঘুম পাইছে, আমি ঘুমিয়ে যাব’।আবার কখনো বলতো ‘ছাল বালিতে মামা আইছে, আমি মামাকে দেখতে যাব’।সত্যিই সে মামাকে দেখতে গিয়ে আদর করে চুমু খেতো মামার গালে।
স্যার সবচাইতে বেশি ভালবাসতেন যে ছাত্রটিকে, সে এই ইব্রাহিম। প্রায়ই তিনি ইব্রাহিমের জন্যে চকলেট ,চিপস নয়তো চানাচুরের প্যাকেট নিয়ে যেতেন। বাসা থেকে স্যারের জন্য খাবার পাঠালে ইব্রাহিমের বেশ খেতে ইচ্ছে হতো, স্যার সেটা বুঝতেন, তাই তিনি ইব্রাহিমকে খেতে বলতেন এবং সে তৃপ্তি সহকারে খেতো। তার মা এসে যদি জিজ্ঞেস করতো ‘কি ব্যাপার স্যারের খাবার কি খাইতে হয় নাকি?’ তখন সে বলতো ‘আমি কি খাইছি নাকি?ছালই তো আমালে খাইতে বলে’। মা রাবেয়া আর কিছুই বলেন না, মুচকি হেসে ফিরে যান।

ইব্রাহিমের ধৈর্য্ খুব কম। বাড়তি পড়ার চাপ সে সহ্য করতে পারতো না, একদম হাপিয়ে উঠতো। দুই হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলে উঠে ‘না ছাল, না ছাল’। কোনোদিন পড়া শিখে না আসলে স্যার একটু মেজাজ দেখিয়ে কিংবা দু একটা মেরে যদি জিজ্ঞেস করেন ‘পড়া শিখে আসনি কেন? ইব্রাহিম চেচিয়ে বলে উঠতো ‘সডি ছাল (সরি স্যার) সডি ছাল’।স্যার বলতো ‘সডি ছাল কি? কান ধরে উঠবস করো’। আর তখনি সে স্ট্যান্ডআপ বলে উঠে দাঁড়াতো, সিট ডাউন বলে বসতো এবং লে ডাউন বলে শুয়ে পড়তো। এভাবে চলতে থাকতো, স্যার বারণ করলেই বরং সে থামতো। ইব্রাহিমের কীর্তি দেখে মাঝে মধ্যে বেশ হাসি পেতো স্যারের কিন্তু বড় মায়াও হতো।
মার খেয়ে সইতে পারে না ইব্রাহিম। অন্যদের কেউ একটু দুষ্টুমি করলেই নালিশ করে স্যারের কাছে। আকলিমা একটু দুষ্টুমি করলেই সে নালিশ করতো ‘ছাল আলকিমা (আকলিমা)দুষ্টামি কলে। এই নালিশটুকুই তার আত্নতৃপ্তির জন্য যথেষ্ট হয়না। রাকিব আকলিমা কিংবা আখি স্যারের হাতে মার খেলে তবেই সে তৃপ্তি পেতো।
শত আদর আর শাসনের মাঝেও ইব্রাহিমের দুরন্ত মন কখনো কখনো কোথায় যেন হারিয়ে যায়। হঠাৎ সে হাসে আবার হঠাৎ সে চিৎকার করে কেঁদে উঠে। তার চঞ্চল মন যেন স্থির হতে চায় না, এটা নাড়, ওটা নাড়, এটা খাও, ওটা খাও, এই কর, সেই কর করে করে মাতিয়ে রাখে সারাটা প্রহর। রাগে দুঃখে হাপিয়ে ওঠে মা রাবেয়া। একদিন তিনি রেগে গিয়ে জেদ করে ইব্রাহিমের পায়ে শিকল এঁটে দেন। তার দুষ্টুমি কমাতে এ ব্যবস্থা, কিন্তু খানিকের জন্য সে আসহায় হয়ে পড়ে। খুব খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু খাবে কেমন করে সে যে শিকলে বাঁধা। তাই সে খালাকে বললো ‘খালা মাকে বলো, কাল থেকে আমালে খাবালেল(খাবারের)কাছে বাঁনতে ,যেন আমি খাইতে পালি(পারি)।আমাল খুব খিদা পাইছে’।পরে খালা ইব্রাহিমকে খেতে দিলেন। পরদিন আবার একই অবস্থা। মানুষ হয়েও সে এখন খাঁচার পাখি। কারো কাছে সে করুণা ভিক্ষাও করে না, কাউকে একবারও তবু বলে না ‘ছেড়ে দাও আমাকে’। সহজ মনের এই নির্লিপ্ততা কতটা করুণা জাগায়, একটু ভাবলেই টের পাওয়া যায়।
খুব ঘুম পায় ইব্রাহিমের।সে খালাকে বললো “খালা মায়লে বলো আমালে খাটেল (খাটের) পায়াল (পায়ার) লগে বাঁনতে যেন আমি খিদা পাইলে খাইতেও পালি,ঘুম পাইলে ঘুমাইতেও পালি, আমাল খুব ঘুম পাইছে”।পরে খালা তার ঘুমের ব্যবস্থা করে দেন।
মুক্তির প্রয়াসে মানুষ কত হাহাকার করে অথচ ইব্রাহিম কত নিরব নিরুচ্ছল। অসহায় চোখে কেবল চেয়ে চেয়ে সে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা দেখছে।
পরদিন খালার কাছ থেকে টাকা নিয়ে শিকল পরিহিত ইব্রাহিম বন্ধুদের অনুরোধ করে দোকান থেকে মজা(বিস্কুট,চকোলেট, চিপ্স ইত্যাদি) এনে দিতে, কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না ।এবার খালাকে অনুরোধ করলে খালা খুলে দেয়, কিন্তু পা থেকে শিকল খুলতে পারেনি সে, খুলেছে খাটের পায়া থেকে। নিরুপায় ইব্রাহিম পায়ে শিকল নিয়েই শিকলটা হেচড়াতে হেচড়াতে দোকানে যায়।খাবার কিনে নিয়ে সে অনেক দিনের ভুখার মত হা করে একের পর এক সব গিলতে থাকে ।খাওয়া শেষ হলে তবেই সে শান্ত হয়।
কয়েকদিন পর পড়তে গিয়ে ইব্রাহিম বললো “ছাল আমি মামাল (মামার) বালি যাব”।স্যার না করেননি ‘ঠিক আছে যেয়ো’।
দুদিন পড়াতে যাননি স্যার । যেদিন গেলেন, দেখলেন আকলিমাদের বাড়িতে কেউ নেই। পাশের বাড়িতে কান্নার আওয়াজ। গিয়ে দেখলেন ইব্রাহিমদের বাড়িতে লোকজনের ভীড়। সবার মধ্যমনি হয়ে শুয়ে আছে ইব্রাহিম।ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলেন ইব্রাহিমের নিসাঃড় দেহটা পড়ে আছে। পাশেই মা রাবেয়া, খালা রাজিয়া, বোন আখি। তাদের আর্ত চিৎকারে চারদিক প্রকম্পিত হয়ে উঠছে।বাবা একটু দূরে বাকহারা হয়ে বসে আছেন, আর দুই চোখ গড়িয়ে পড়ছে পানি। স্যার জানতে পারলেন মামার বাড়ি থেকে ফেরার পথে বন্ধুদের সাথে খেলতে খেলতে ঝিলে নেমেছিল, আর তখনি ঘটে বিপত্তি। অবশ্য লোকজন তাকে পানি থেকে উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মাঝপথেই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে। অথচ তখনো কেউ জানতো না ইব্রাহিম থাকবেনা, সবাইকে কাঁদিয়ে সে হঠাৎ হারিয়ে যাবে।
আখি আর খালার বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কাঁদতে থাকা, বাবার নির্বাক চেয়ে থাকা আর মায়ের হতচকিত আর্ত চিৎকারে বারবার মূর্ছা যাবার দৃশ্য সত্যি হৃদয় বিদারক!
মা কি ঘূর্ণাক্ষরেও একবার ভেবেছিল এভাবে ছেলেটা মাকে ছেড়ে, পার্থিব মায়া ছেড়ে চলে যাবে?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement