লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ১১টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৭৬

বিচারক স্কোরঃ ২.৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৃষ্টি (আগস্ট ২০১২)

সেদিন আকাশ কেঁদেছিল
বৃষ্টি

সংখ্যা

মোট ভোট ৪০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৭৬

ইসমাইল বিন আবেদীন

comment ১৯  favorite ১  import_contacts ৯৭১
তখন আশ্বিন মাস। সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা মুখ ভার করে ছিল। দূরে কাকের ছুটোছুটি আর ডাকাডাকি। হন্তদন্ত হয়ে একজন আগন্তুক গেল নানাবাড়ির দিকে। আমাদের বাড়ির একটু পরেই নানাবাড়ি। ঠিক চেনার মত বয়স হয়নি বলে মাকে জিজ্ঞেস করলাম- মা, নানাবাড়ির দিকে দৌড়ে গেল কে ? মা বলল -জানি না। কেউ হয়তো হবে। মুখে একটু বিরক্তি নিয়ে মা নারিকেল গাছের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো- সাত সকালে কাক ডেকে মরছে কেন ! আমি কৌতুহলী। কাক ডাকলে কী হয় মা ? জানতে চাইলাম মায়ের কাছে। মা বলল- ছোট মানুষের এত সব জানতে নেই, শিমুল। মায়ের ঐ একই কথা ছোট মানুষ। আচ্ছা ছোট বলে কি আমার কোন কিছু জানার থাকবে না।
একটু পরেই জেনেছিলাম কাক কেন ডেকেছিল আর আগন্তুক কেন এসেছিল। আমার নানীর বৃদ্ধ বাবার মৃত্যু সংবাদ নিয়ে এসেছিল ঐ আগন্তুক। সবাই ডুকরে কেঁদে উঠলো। যাকে আমরা দু’ভাই বুড়োবাবা বলে ডাকতাম আজ তিনি গত। আমারও কান্না পেল। বুড়োবাবা নানা বাড়িতে বেড়াতে এলেই আমাদের শোবার ঘরের বারান্দাতে থাকতেন। আমাদেরকে রূপকথার গল্প শোনাতেন। আমার মা তাঁর প্রথম নাতনী তাই মাকে তিনি ভীষণ স্নেহ করতেন।
নানীর সাথে সবাই কাঁদতে কাঁদতে রওনা হয়েছিল বুড়োবাবাকে শেষ বারের মত দেখতে। মায়ের সাথে আমিও ছিলাম। এক ক্রোশ পথ হেঁটে জয়দিয়া বাওড় পার হয়ে যেতে হবে বুড়োবাবাকে দেখতে। আমার ছোট ভাই আববার সাথেই ছিল। বাওড় পার হওয়া ছাড়া তাড়াতাড়ি যাওয়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না তখনকার দিনে। আক্কাসের ঘাটে নৌকা পাওয়া সহজ বলে সবাই সে ঘাটেই গেল। খেয়া ঘাটে আসার সাথে সাথেই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। তাড়াতাড়ি সবাই আক্কাস গায়েনের বাড়িতে আশ্রয় নিল। বৃষ্টি সেই যে শুরু হল আর থামতে চাইল না। আশ্বিন মাসের বৃষ্টি। এমনিতেই সকালে সবাই না খেয়ে রওনা দিয়েছে তার ওপর এক ক্রোশ পথ পায়ে হেঁটে আসা। সবাই খুব ক্ষুধার্ত। আক্কাস গায়েন আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় হয়। এই দুঃসংবাদে তারাও ব্যথিত কারণ বুড়োবাবাকে তারা খুব সম্মান করত। এপথ দিয়েই তিনি মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। এত গুলো মানুষকে বৃষ্টি ভেজা সাত সকালে তারা আপ্যায়ন করেছিল অতি যত্নে ; পান্তা ভাতের সাথে কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়ে। এত তৃপ্তি নিয়ে সেদিন এই পান্তা ভাত খেয়েছিলাম যা আর কখনো খাইনি। মা, নানী ও খালাদের চোখের পানির সাখে পাল্লা দিয়ে সেদিন বৃষ্টি নেমেছিল যা থামতে চাইছিল না। বুড়োবাবাকে বৃষ্টি এভাবে যে গোসল করাবে তা কারো জানা ছিল না।
ঘাটে কোন খেয়া ছিল না। ক্রমেই বৃষ্টি ঝাপটা দিয়ে বেড়েই চলেছে। হাতের ছাতা উড়ে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় খেয়া পার হওয়া বিপদজনক। অনেকক্ষণ পরে সিদ্ধান্ত হল বৃষ্টি মুড়ে আর বাওড় পার হওয়া যাবে না। তাই আবার বাড়ি ফিরে এসে রায়পুর বাজার ঘুরে দতিয়ারকুঠি হয়ে যেতে হবে লক্ষীকুন্ডু গ্রামে। যেখানেই নানীর বাবার বাড়ি। কিন্তু বাবা যে আর পৃথিবীতে নেই একথা ভাবতেই যেন নানীর বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানির সাথে চোখের পানি আর পারছে না। কেবল কান্নার আওয়াজ ছিল নানীর মুখে।

বৃষ্টি মুড়ে আমার আর যাওয়া হল না। বড়রা সবাই ভিজতে ভিজতে পায়ে হেঁটেই গিয়েছিল প্রায় চার ক্রোশ পথ। পলাশ তখনো মায়ের দুধ খায়, ওকে আববা বড় পলিথিন দিয়ে ঢেকে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন বৃষ্টি আমার বুড়োবাবাকে শেষ দেখাটা দেখতে দেয়নি। বুড়োবাবা মাকে বৃষ্টি রাণী বলে ডাকতেন। সেজন্য কি মা আমাকে নিয়ে গেল না। এইসব ভেবে ভেবে আমার মন খারাপ ছিল। আববা ফিরে এসেছিলেন সন্ধ্যায়। সেদিন বুড়োবাবার মৃত্যু শোকে আকাশ কেঁদেছিল মুষলধারে। ঝাপটা বাতাস দিয়ে কেঁদেছিল। টিনের ছাউনি দিয়ে বুড়োবাবাকে সবাই শেষ বিদায় দিয়েছিল। পরের দিন সকালে থেমেছিল বৃষ্টির কান্না।

বুড়োবাবাকে শেষ দেখা হয়নি বলে মনটা অজান্তে কেঁদে ফিরছিল। দু’দিন পরেই কুলখানি। আববার সাথে বাইসাইকেলে চড়ে কুলখানিতে গিয়েছিলাম। সকাল থেকেই মসজিদে মুসল্লিদের আগমন ঘটেছিল। কেউ কুরআন পড়ছেন আবার কেউ বা কলেমা পড়ছেন। কলেমা পড়ার জন্য ছোলা ভেজানো ছিল তাও কলিয়ে গেছে। বুড়োবাবার কবর দেখতে গিয়ে মায়ের কান্না দেখে আমারও কান্না পেয়েছিল। মায়ের বড় মামা একটা ঘোড়া পালতেন। তাই তাকে আমি ঘোড়া নানা বলে ডাকি। ঘোড়া নানা আমাকে খুব আদর করেন। আমার প্রথম জন্মদিনে ঘোড়া নানা আমাকে একটা কাঁসার বাসন দিয়েছিলেন। তিনি আমার কান্না দেখে ভেজানো ছোলা নিয়ে আমাকে মসজিদের দিকে নিয়ে গেলেন। কুলখানি হল, রাতে মিলাদ পড়ানো হল। রাতে চারিদিকের পরিবেশ কেমন যেন ভার ভার লাগছিল। দুরে সাদা কাপড় পরা একজনকে দেখে মা ভয় পেল। মা যে তার নানা ভাইকে খুব ভালবাসতো। বুড়োবাবাও তো আমার মাকে ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। বেড়াতে আসলেই বলতেন আমার বৃষ্টি রাণী কই, তারে তো দেখছি না। আমি তার হাতে ছাড়া একটু পানিও খাবো না। মাকে তিনি আদর করেই বৃষ্টি রাণী নামে ডাকতেন। ছোটবেলায় আমার মাকে নাকি কেউ অল্প বকা দিলেই অঝরে চোখের পানি ফেলতো। তাই বুড়োবাবা মাকে এ নামেই ডাকতেন। আমাদেরকে আদর করে বলতেন আমার শিমুল-পলাশ কই। ওদের ছাড়া তো ভাল লাগে না। আজ ক’দিন হল কেউ আর এভাবে ডাকে না। নানাবাড়ি বেড়াতে এসে যে, আমাদের শোবার ঘরের বারান্দাতে আর কেউ থাকবে না। এসব ভাবতেই মনটা মায়ের মত আমারও ব্যথিত হচ্ছে।


মা আববার সাথে বাড়িতে চলে এসেছিল কিন্তু আমাকে নানী রেখে দিলেন ক’দিন পরে নানীর সাথেই বাড়ি ফিরবো বলে। আমার নানা -নানীও আমাকে অনেক ভাল বাসেন। আমিও যে তাদের প্রথম নাতি। বিকাল থেকে আবার ছড়ায় ছড়ায় বৃষ্টি হতে লাগলো। তিনদিন ধরে চলল বৃষ্টির কান্না। ঘোড়া নানারা পাঁচ ভাই ও তিন বোন। আমার নানী সবার বড় তাই আমার কদরটাও বড় আদুরে। নোয়ানানা মানে রুস্তম নানা তো সিনেমার নায়ক হবার আশায় ঢাকায় আসা যাওয়া করেন। বাড়ি ফিরে আমাদের সাথে অনেক গল্প করেন। বলেন সামনে আমার সিনেমা বেরুবে, অমুক নায়িকার সাথে তমুক ভিলেনের সাথে, আরও কত কী। সেই নানাকে আমি নায়ক নানা বলি। নায়ক নানা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলেই আমাকে বলেন শিমুল আমার মাথার চুল টেনে দাও তোমাকে অনেক গল্প শোনাবো। মজার মজার গল্প। এবার নায়ক নানা আমাকে অনেক কাছে পেয়েই শুরু করে দিলেন শিমুল আমার পাঁকা চুল তুলে দাও তোমাকে অনেক মজার মজার গল্প শোনাবো। আমিও নানাকে পছন্দ করি। নানা যে সিনেমা জগতের মজার সব গল্প বলেন। ঝিপঝিপ বৃষ্টিতে পাঁকা চুল তুলে কেটে গেল দু’দিন। বাড়ি থেকে খবর এল বড় মামার সাথে আমাকে চলে যেতে হবে। মা আমার জন্য মুরগীর গোস্ত রেখে দিয়েছেন। কিন্তু আমার মন পড়ে রয়েছে বুড়োবাবার কাছে। আকাশের অবস্থা ভাল না তাই নানা ও নানী বললেন আমাদের সাথে কালকে যাবে। পরেরদিন আমরা বাড়ি ফিরলাম সেই বাওড় পার হয়ে। কিন্তু কোন বৃষ্টি নেই, নীল আকাশে তিল পরিমাণ সাদা মেঘও নেই। পার হয়ে আক্কাসের ঘাটে নামলাম। আক্কাস গায়েনের বাড়ির ভেতর আসতেই সবাই হা-হুতাশ করল। কেউ কেউ জানতে চাইল কীভাবে সেদিন সবাই গিয়েছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। বেশিক্ষণ দাড়ানো হল না রোদের তাপ বেড়ে যাচ্ছে বলে। আমরা যখন ঘাট পার হলাম তখন তাদের দুপুরের রান্নার প্রস্ত্ততি চলছে তাই সেই অমৃত পান্তা খাওয়া আর হল না। মা আমার জন্য মুরগীর যে গোস্ত রেখেছিল তা ভাজতে ভাজতে একেবারে শুকনো হয়ে গেছে। অসম্ভব মজা লেগেছিল ভাজা গোস্ত।

তারপর কেটে গেল অনেক বছর। ভরা শ্রাবণে এসে স্মৃতিতে ধরা দিল সেই বৃষ্টিদিনের কথা। তখন বৃষ্টির জন্য দু’দিন দুটি মজার খাবার খেয়েছিলাম আর একজন প্রিয় মানুষকে শেষ দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম। বুড়িমা তারপর অনেক দিন বেঁচে ছিলেন। আমাদেরকে একইভাবে আদর করতেন। তিনিও যখন গত হলেন তখন আমি অনেক দূরে। এমন সময় সংবাদ পেয়েছিলাম বাড়ি পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমেছিল। অসময়ে হালকা বৃষ্টি হয়েছিল। আজ দুই যুগ পরে এসেও যখন বড় বৃষ্টি হতে দেখি তখন সেই সব স্মৃতি মনে পড়ে যায়। বুড়োবাবার কথা মনে পড়ে। সেই পান্তা ও মুরগীর ভাজা গোস্তের কথা মনে পড়ে। মাকে বলেও আর সেরকম ভাজা গোস্ত খাওয়া হয়নি। পান্তা ভাতও অনেকবার খেয়েছি কিন্তু সেই পান্তার স্বাদ পাইনি। (সংক্ষেপিত)

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement