একটি বিয়ের স্মৃতিচারণ
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ২০১৯
গল্প/কবিতা: ৩৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - একটি বিয়ে (আগস্ট ২০১৯)

একশতম ফাগুন
একটি বিয়ে

সংখ্যা

প্রজ্ঞা মৌসুমী

comment ১১  favorite ০  import_contacts ১৬০
ছবিটায় অভিনয় নেই কোন। আমরা যেমন ক্যামেরার জন্য তৈরি হই সেরকম নয় বরং ক্যামেরাই যেন অপেক্ষায় থাকে এরকম আশ্চর্য মূহুর্তের। বড়ো সরল ঐ ছবির কালো-সাদা নীলাচল, উড়ে যাওয়া অচেনা পাখি, পায়রারঙা খোঁপায় পড়িয়ে দেয়া কাঠ মালতি ফুল, লাস্যময়ীর বয়সী হাসি, একটু খসে যাওয়া চাদর, চশমার ফ্রেম, শার্টের পকেট থেকে উঁকি দেয়া এক চিলতে কলম- সবকিছু মিলিয়ে যেন এক যাদু বাস্তবতা। ছবির দুটো মানুষ কখনো ভাবেনি ছোট ছেলের হঠাৎ ক্লিকের বদৌলতে এই গোপন প্রেমটুকু এভাবে ফ্রেমবন্দী হবে। তারপর মিশে যাবে কতকালের রোদে, ছায়ায়, আমাদের সাংসারিক গল্পের উজানে, ভাটিতে।

ছবিটা যেন এক নৌকো। আমাদের বয়ে নিয়ে যায় পুরনো এক গল্পের কাছে। সে গল্পে মেয়ের বাড়ির সামনে দিয়ে হাইস্কুলে যেত ছেলেটা, দেখে মায়া হতো। ব্যাস এইটুকুই। হয়তো এর বেশি অনুভূতি ধারণের বয়স তখনও হয়নি মেয়ের। তারপর এক পহেলা ফাগুনের রাতে হলদিয়া বরণ মেয়ের হাতে মেহেদি, মুখে স্নো আর দেয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে যখন চন্দন পরানো হচ্ছিল, দশম ক্লাস শেষ করা ছেলেটা তখন দেয়াগঞ্জে বোনের বাড়িতে ঘুমোচ্ছে। হয়তো সেই সকালে চোখের কোণ দিয়ে দেখা এক লাস্যময়ীকে মুখোমুখিতে রেখে স্বপ্ন দেখছে। হয়তোবা না।


মেয়ের উঠোনে বরপক্ষ চলে এসেছে ততক্ষণে। সুদর্শন তোরাজ আলীর সাথে আর কিছুক্ষণ পরেই মেয়ের বিয়ে। হঠাৎ শোরগোল শুরু করে দিল মেয়ের বাপজি যিনি নিজেকে কখনো কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা মনে করেননি। এমন কি তিনি তাঁর বড়ো মেয়েকে পর্যন্ত শ্বশুরবাড়ি থেকে চুরি করে নিয়ে এসেছিলেন। সেবার মেয়ে বরের পকেট থেকে খুয়া যাওয়া পোটলা পেয়ে বাপজিকে দেখেয়েছিল, "বাপজি এইটা কিসের পোটলা? সকালে না পাইয়া সে চিল্লাচিল্লি করছে।" বাপজি চিনতে পেরে রেগে যান, "এ তো গাঁজা। আজকে ধমকায়, কালকে মারবে, এমন গাঁজা খাওয়া লোকের ঘর তোমার করা লাগতো না।" এমনি বললে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দেবে না কখনো, বউকে আটকে রাখবে। সেদিন বাপজি চলে গেলেন ঠিকই তবে মেয়েকে শিখিয়ে দিলেন পরের দিন গোসল করার নাম করে বের হয়ে আসতে। বাপজি লুকিয়ে ছিলেন পুকুরের পাশের ঝোঁপে। কিশোরী মেয়ে আসতেই সোজা মেয়েকে দু’হাতে তুলে, কাঁধে করে বাড়ি ফিরলেন।

এরকম সাহসিকতা, জেদ কিংবা অফুরন্ত ভালোবাসা যে পিতার, সে পিতা আবারও শোরগোল তুলেন পরের মেয়ের বিয়ের লগ্নে। ছেলেপক্ষ কথামতো মেয়েকে সাজিয়ে দিতে গয়না দিয়েছে ঠিকই তবে কানের ঝুমকো জোড়া নতুন নয়। তাই পিতাজি শোরগোল তুলেন, "আগেই বল্‌তা যে নতুন দিতে পারবা না, তোমাদের জবান ঠিক নাই, তোমাদের সাথে আত্নীয়তাই খাটে না।" তারপর কেবল এক পিতা ছাড়া ফাগুনের রাতের আকাশ ভেঙে পড়ে এই বাড়িতে সবার ওপর।

পাত্রপক্ষ পাশের বাড়িতে গিয়ে ওঠে, মধ্যস্থতা করার জন্য লোক পাঠায়, মেয়ের মা কাঁদেন, বুঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু বাপজির একই কথা- জবান ঠিক নাই। অনড় বাপজি হঠাৎ অন্ধকাৱে হেঁটে চলেন উত্তর পাড়ার মনসুর গেরস্তের বাড়ি, "মনসুর, তোমার পোলা আমার মেয়ের লাগি দিবা?" মনসুর মিঞাও এক মাথা আকাশের বোঝা নিয়ে তাকায়, ভাবেন মাথা-মোতা ঠিক আছেনি! এই ছোট্ট ঘর আর একটুখানি জমি ছাড়া কিবা আর আছে ওঁদের। এমন বাড়ির মেয়েকে বউ করার কল্পনাইতো কোনদিন করেননি। যে পিতা কন্যাদায়গ্রস্ত কাকে বলে জানেন না তিনি দয়া চাইতে আসেননি, মেয়েকে জলেও ফেলে দিতে আসেননি। কোন এক অদ্ভুত কারণে তিনি মনসুর মিয়ার ছেলেকেই চাইছেন, "কিচ্ছু দেয়া লাগতো না, শুধু পোলা আমারে দাও।" আর তখনই মনসুর মিয়ার বউ বড়ো ঘোমটার ভেতর থেকে বলে ওঠেন, " ছেলে তো বাড়িতে নাই। বইনের বাড়ি গেছে।"


সেদিন রাতেই দেয়াগঞ্জে লোক পাঠানো হয়। ঘুম কিংবা স্বপ্ন থেকে ডেকে তুলে আরেক স্বপ্নে পাঠানো হয় ছেলেকে, "উঠো, তোমার আজকে বিয়া।" সবটা ঘোর, সবটা স্বপ্ন নিয়ে গাঁয়ে ফেরা ছেলেটির সাথে ফাগুনের রাতে বিয়ে হয় সেই মেয়ের যারা দূর থেকে শুধু দুজন দুজনকে দেখতো, মায়া বুনতো। নিয়তিতে ভর করেই ওঁরা খুঁজে পায় ফেরারী স্বপ্নকে। তবে সে স্বপ্নও ঘোলাটে হয়ে আসে যখন বাপজি প্রস্তাব দেয়, "দেখো বাবা, এই বাড়িতে তুমি থাকবা, এখনতো তুমি আমার পোলাই।" আত্নসম্মানে লাগা ছেলে ‘সম্ভব না’ বলতেই পিতাজি হঠাৎ জেদ ধরেন, "ঘরজামাই না থাকলে বউ পাবা না।" ছেলেও রাগ করে বাড়ি ফিরে আসে। এই হঠাৎ ঘটে যাওয়া কাণ্ডের ফল- বউয়ের সাথে দেখাশোনা বন্ধ।

অবশ্য কখনো সখনো দুপুর গড়ালে পাড়া পৃথক করা বিদীর্ণ খালকে সামনে রেখে দু'জন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভালোবাসা বুনে। মেয়ের আঁচল ভিজে নোনতা হয়। তবু লজ্জা, ভয় আর সংকোচকে মাঝখানে ভাসায় বলে, ভীষণ কাছের মানুষটা স্পর্শের বাইরেই থেকে যায়। এভাবে দিন গড়াতে গিয়েও হঠাৎ গড়ায় না। একদিন দুপুরের অনেকটা আগে অথবা পরে যখন পাড়া অনেকখানি নীরব হয়ে যায়, থেকে থেকে শোনা যায় নিঃসঙ্গ ঘুঘুর ডাক, মেয়ে তখন পুকুর থেকে চাল ধুয়ে বাড়ি ফিরছে। হঠাৎ পাশের ঝোঁপ থেকে বের হয়ে আসে ছেলে। বউকে ঝাপটে ধরে, কপালে চুমু খায়, তারপর দু’হাতে বউকে বুকের সাথে জড়িয়ে পাথালি কোলে করে কোন একটা দূরের পথের দিকে এগোয়। মেয়ের হাত থেকে পড়ে যায় বাঁশের চালুনি, পড়ে যায় চাল, ভয় কেটে গেলে যা থাকে তা হলো তুমুল তোলপাড় আর চুরি হওয়ার এক অপূৰ্ব সুখ... কে জানতো চুরি হওয়াতেও সুখ থাকে এমন!

এই যা! এত গল্প করছি, পরিচয়টাই দেয়া হলো না। সবটা ভালোবাসায় আটকে থাকা এই যে ছবি অথবা গল্পের দুটো মানুষ- আমাদের বড়মা, বড় আব্বা। আজ তাঁদের
একশতম বিবাহবার্ষিকী।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • রুহুল  আমীন রাজু
    রুহুল আমীন রাজু গল্পের সুন্দর প্রেক্ষাপট। বেশ লেগেছে। শুভকামনা।
  • আশা
    আশা এক টানে শেষ করলাম। অপূর্ব!
  • মোঃ মোখলেছুর  রহমান
    মোঃ মোখলেছুর রহমান বিগত কয়েকটি থেকে বেশ সাবলিল,বেশি গবেষণা করতে হয়নি, ফিনিশিংটায় নতুনত্ব এনেছেন। শুভ কামনা।
    প্রত্যুত্তর . ২ আগস্ট
  • মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী
    মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী কি বলবো আর, সহজেই বলতে পারি- আপনার হাতে গল্পের যাদু আছে দিদি... হা হা হা। এতো অল্পের ভিতরে এতো সুন্দর করে সাজাতে পারেন, সত্যি অভিভূত হওয়ার মতো। এ গল্পও তার বাহিরে নয়। একশতম বিবাহবার্ষিকীর সেই পুরনো ঘটনাকে নতুন করে সাজিয়ে আমাদেরকে নতুন কিছু দিলেন, এই জন্যই...  আরও দেখুন
  • বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত
    বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত বেশ কয়েকদিন বিরতির পর আপনার লেখা পড়লাম । যথারীতি ভাল লাগল । অনেক শুভকামনা রইল ।
  •  মাইনুল ইসলাম  আলিফ
    মাইনুল ইসলাম আলিফ সত্যি অভিভূত হওয়ার মতো গল্প।যেমন শশুড় তেমন জামাই।আপনার বড় আব্বা কে স্যালুট।ভোট রইল।দিদি আমার পাতায় আসবেন ।গল্পের পৃথিবীতে আমি নতুন।আমার গল্পটা পড়ে আমাকে কিছু বলে যাবেন, এই আশায়............
  • সুপ্রিয় ঘোষাল
    সুপ্রিয় ঘোষাল বা, বেশ মেদহীন ঋজু গদ্যে লেখা গল্প। বেশ টানটান একটু abrupt যদিও।
  • নাজমুল হুসাইন
    নাজমুল হুসাইন এই যে ছবি অথবা গল্পের দুটো মানুষ- আমাদের বড়মা, বড় আব্বা। আজ তাঁদের
    একশতম বিবাহবার্ষিকী।ভালো লাগা রইলো।সেই সাথে আমার কবিতা পড়ার আমন্ত্রন জানালাম।ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ৫ আগস্ট
  • Shahadat Hossen
    Shahadat Hossen বেশ গল্প,শুভ কামনা
    প্রত্যুত্তর . ৭ আগস্ট
  • আদেল পারভেজ
    আদেল পারভেজ সত্যি অভিভূত হলাম লেখাটা শুরু থেকে শেষ অনেক ভালো লেগেছে।
    প্রত্যুত্তর . ১৫ আগস্ট

advertisement