এই গল্প লোকের কাছে কাঠখোট্টা বলে পরিচিত এক হিন্দু মিস্ত্রীর যে কেবল লাশের খাটিয়া বানায়। খাটিয়াকে কেন্দ্রে নিয়ে (একাত্তরে) মৃত্যু যে কতোটা কাঠখোট্টা হয়ে উঠে সেটাই প্রকাশের চেষ্টা করেছি।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ২০১৮
গল্প/কবিতা: ৩২টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৬৩

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - কাঠখোট্টা (মে ২০১৮)

লোবানমুখী তালব্য-শ
কাঠখোট্টা

সংখ্যা

মোট ভোট ২৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৬৩

প্রজ্ঞা মৌসুমী

comment ১৬  favorite ১  import_contacts ৬১৫
তীর ছোঁয়া পানির মতো এ গাঁয়ে যাদের বয়স কবর ছুঁইছুঁই করছে, ওরা বলে গহরের দাদা লোকটা বেরসিক, কাঠখোট্টা। এক আধটু বিলাসিতা, সামান্য আহ্লাদও প্রশ্রয় পায়নি ওর কাছে। আড়ংয়ে এক ঘন্টা ঘ্যানঘেনের পরেও দু'গাছি কাঁচের চুড়ি কিনে দেয়নি নয়া বউকে। একবার তো ছালুনে লবণ বেশি হল বলে এক মাস লবণই কিনে আনেনি। ও ব্যাটা পাষণ্ড। বলতো একশ এক পাপে একটা মেয়ের জন্ম হয়। বংশে তখনো কোন মেয়ে না হওয়ায় এটা ওর দম্ভ নাকি বিদ্রূপ ছিল এ ব্যাপারে লোকগুলো নিশ্চিত না। তবে এভাবেই একজন আরেকজনের মুখের গল্প টেনে নিয়ে ওরা বয়ান দেয়। চায়ের দোকানে বেলা কাবার করে।

কাঠখোট্টা বলেই হয়তো জহর মিস্ত্রী না হতে পারলো ঘরের, না হলো পরের। যে অতীতে লিলুয়া হাওয়ার মতো ছুঁয়ে গেছে ক্রশবিদ্ধ যীশু, পায়ের তলার তুচ্ছতাচ্ছিল্য থেকে ওরা হতে চেয়েছিল মানুষ। উঁচুদরের না হোক। তুচ্ছ করা যায় না অমন জ্যান্ত মানুষ। অথচ জহর মিস্ত্রীর সেই এক কথা- 'রাধামাধব কিবা ছাড়ি। ধর্ম না শিখায় প্রেম, প্রেম ধর্ম শিখায়।' লেজকাটা শেয়ালের ভিড়ে লেজুড় শেয়ালও টিকে থাকে বেখাপ্পা হয়ে। জহরও হয়তো মানিয়ে যেত ওভাবে। অথচ লোকে টের পায় সে কতোটা বেমানান। তখনও মিস্ত্রী পাড়ায় পালকির বায়না আসে। খাট পালংয়ের জোরে চলে টিকে থাকা। শুধু জহর এক ভোররাতে স্বপ্ন দেখে উঠে বসে সেই যে কাঠে হাত দিলো। সেই থেকে ও কেবল খাটিয়া বানায়। ভীষণ বাহারি তার কাজ। বাঁশের খাটিয়া দেখেও চোখ জুড়িয়ে যায়। মৃত্যু যেন ওর রাধামাধব, অপূর্ব সব নকশায় খাটিয়া সাজিয়ে জহর তার আরতি করে।

জহরের এসব খেয়ালপনায় ঝঞ্ঝাট বাড়ে। হিন্দুর বানানো খাটিয়ায় মুসলমানের জানাজা জায়েজ কিনা, এই খাটিয়া মসজিদে রাখা উচিত কিনা- এসব নিয়ে মজলিস হয়। ওসব মালাউন, কাফেরের ধোকাবাজি। শয়তানের প্ররোচনা। এক শব্দে নাকচ হয়ে যায় জহরের খাটিয়া। অথচ কাকা লহর মাইকেল লুকিয়ে থাকা সত্য জানিয়ে দিলে, আবার ঝুলে থাকে দ্বন্দ্ব- ওর তো বগা কাটা জন্ম থিকাই। পয়গম্বর হয়ে জন্ম নেয়া জহর আর তার খাটিয়া নিয়ে কোন স্থির সিদ্ধান্তে আসতে না পেরে ওরা সুমতি দেয়, ‘মুসলমান হই যাও জহর। এ আল্লাহপাকেরই ইচ্ছা।’

ওসব কথায় জহরের বুক হুহু করে, রাধামাধব রাধামাধব তোলপাড় করে। হয়তো তাই জহরের হাতের যশ বাড়লো, বাড়লো না পসার। লক্ষ্মী তার উঠোন মাড়ালো না কোনদিন। একটা খাটিয়াও বিক্রি হয় না বলে নতুন করে ভালো কাঠের যোগান হলো না মানুষটার। স্বামীর জ্বালায় ত্যক্ত, দিশেহারা তুলসী রাণী এ-ওর বাড়িতে ধান ভেনে, মুড়ি ভেজে, চালের গুড়ি করে, ঘর লেপে ফুটা সংসারের নোঙর আঁকড়ে থাকে। লিলুয়া হাওয়ার মতো ক্রুশবিদ্ধ যীশু বয়ে গেলে তুলসী রাণীর আশা ছিল জহর মিস্ত্রী অন্তত কফিন বানাতে সায় দেবে। আবার ভাবে খ্রীষ্টান মিস্ত্রী থাকতে ও বেয়াড়া বায়না পাবে এ তার অন্যায্য চাওয়া।


এভাবেই জহরের খাটিয়া ঝড় আনে। ভাঙন তুলে। মাঝরাতে কলঘরে যেতে গিয়ে উঠানে খাটিয়া দেখে চিৎকার তোলে ছেলের নয়া বৌ, দাঁতে কপাট লাগে। আরও অনেকের মতো ডর পাওয়া বউ বাপের বাড়ি গেল। ছেলেও গেল পাছে পাছে। জহর চেঁচায়- আরেকটু বুঝ হলে ডর ভাঙবি, ডর কি সীসা যে ভাঙবি! খোদাই হই গেলে ঐ ডর কে পারে সরাতি!’ শম্বুকও বুঝে। তবে লোকে যে ওরে ভোলানাথ বলে। সে যেমন বাপের অবুঝপনাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। তেমনি বৌয়ের অবুঝপনাও দরদ দিয়ে আগলায়। ওর ভাবকে দূর্বলতা ভেবেই হয়তো তাল দেয় বৌ, শ্বশুরবাড়ির লোক। পালকির চল নেই বলে যারা অন্য কিছুতে হাত দেয়, ওদের দলে ভিড়ে শম্বুক।

'বান্দর নাচের ডুগডুগি হইছে। কুলাঙ্গার। ত্যাজ্য করলুম। ত্যাজ্য।' ও কেবল ফনাই তুলে, বিষ থাকে না। জহরের মন অশান্ত ঢেউ হয়ে টলমল করে। সেই কবে ছেলেকে নিয়ে খাটিয়া বানানোর শুরু। অভ্যস্ত মন তখনও ভোররাতে ডেকে উঠে ছেলের নাম। ঘুম জড়ানো গলায় ‘জ্বে বাপ‘ শুনতে না পেয়ে বুকে উথালি নদীর মতো হাহাকার হয়। রাগে, যন্ত্রণায় খটখট করে করাত চালায়। খ্যাপা মানুষটার দিন রাতের তফাৎ লোপ পায়। চোখে ভালো দেখতে পায় না জহর। তবু খটখট করে। কী যে নকশা তার! চাঁদের আলোতে গাঁথুনিতে যেন আরও জৌলুস আসে। লোকে বলে জহর মিস্ত্রীর সেরা কাজ এটা।

একদিন আচমকাই কাঠ পেটানোর শব্দ থেমে যায়। খরগোশের সতর্ক কানের মতো লোকেরা এদিক ওদিক করে। অপেক্ষা করে। ’খটখট’ খোঁজে। মনে হয় কোথাও একরোখা ভয়াল শূন্যতা গলা চেপে আছে। খবর চড়াও হয় জহর মিস্ত্রীরে পাওয়া যাইতেছে না। ভোর থিক্যা বাড়ি ফেরে নাই। অদৃশ্য জহরকে নিয়ে লোকেরা হৈচৈ করে। চায়ের দোকানে বেলা কাবার করে। শম্বুক অবেলায় না খেয়েই পথে নামে। অবুঝ বাপ হয়তো রাগ করে বসে আছে কোন বন বাদাড়ে।
ও পাড়ার পাগলা গোমেজ চালতা গাছের ডালে এক ঠাঁয়ে বসে দেখে শম্বুক আর অস্থিরতা। দেখে আচমকা কতগুলো শকুন শম্বুকের মাথার উপর ঘুরপাক খায়। তালব্য-শয়ের মতো দেখতে উড়ান শকুনদের যেন কী এক প্রতিযোগিতা। রুদ্ধশ্বাসে গোমেজ তাকিয়ে থাকে আর ভাবে শকুন না শম্বুক কে আগে খুঁজে পাবে জহর মিস্ত্রীরে?

অবশ্য একটা সময় পরে পাগলা গোমেজের মনে হতে থাকে শম্বুক শকুন ওরা কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। ওদের সবটাই একটা গাঢ় মিছিল। শকুন কিংবা তালব্য-শয়ের যে গাঢ় মিছিল শম্বুকের উপর এসে হয়ে যায় একটা খুবলানো মরা একাত্তর। থরথর করে লোবান। ঝাঁঝরা হয়ে কাঁপিয়ে দেয় ঐ নক্ষত্রেরও আকাশ। আর জহরের উঠোনে অন্তত নক্ষত্রবীথির দিকে তাকিয়ে থাকে সমাজের বিতাড়িত, অবহেলিত অথচ জহর মিস্ত্রীর বড়ো আদরের একেকটা খাটিয়া। যেন জিকির করে রাজিউন, রাজিউন।

লক্ষ লাশের লোবান নিয়ে ছুটে চলে নিদারুণ বাতাস। জহরের উঠোনের দিকে। আহা, মৃত্যুর মতো কাঠখোট্টা অমন কে আর আছে...

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement