প্রতিবার তোফায়রাই আর্কিমিডিসের ইউরেকার মতো জানান দিত বিড়ালের খোঁজ- জুতোর বাক্স, লোহার গাইল, আধভাঙা তবলা, পুরনো দোলনা, টব, বালতি, পেঁয়াজের টুকরি, মুড়ি ভাঁজার হাঁড়ি। বড়দা বলতো ‘জানবেই তো। ওর গায়েও যে জাত বিড়ালের গন্ধ। আর দেখ্ কেমন আচড়ে দেয়।’ প্রথম দিকে তোফায়রার খুব কাছে গিয়ে, খুব দম নিয়েও খুঁজে পেতাম না গন্ধটা। বড়োজোর হাঁসমার্কা নারকেল তেল, রসুন-হলুদ, কিংবা ভোরের বকুলের গন্ধ। তখনও বুঝিনি বড়দার মতো অতটা কাছে অতটা গভীরে কখনও যাইনি আমরা। তবে যুক্তি যেখানে হারে, সেখানেই জিতে যায় বিশ্বাস। আর আকাশের মতো বিস্তার সে তো কল্পনার। তাই বিড়ালে ভয় পাওয়া আমিও একদিন পেয়ে যাই তোফায়রার গা জুড়ে থকথকে বেড়াল-গন্ধ। দূরে সরে যায় তোফায়রা, সরে যায় তার স্টোররুমের গোপন চকলেট জীবন।

অবশ্য বিড়ালের খোঁজ পেলে আবার আমাদের গাদাগাদি হতো, ঠাসাঠাসি হতো। ছোটন থুতনিতে আঙুল ঠুকে ঘোষণা দিত- হুম অঘটন ঘটিয়েই বিবিসাব ঢুকছেন। তারপর গানের রেশে (ছ মাসের এক কন্যা ছিল, ন মাসে তার গর্ভ হল, এগার মাসে তিনটি সন্তান) ধাঁধার উত্তর পেছনে ফেলে পড়ার ঘরে টাঙানো যামিনী রায়ের চিংড়ি চুরি করা বিড়ালের দিকে তাকিয়ে থাকত। যেন চন্দ্রাহত কেউ।

দেবী দুর্গার পায়ের দিকেও ওরকম তাকিয়ে থাকত ছোটন। রাধাকে লিখেওছিল- দুর্গার এতকিছু আছে শুধু এক জোড়া জুতো নেই। যুদ্ধপ্রি় জুতো। সেই কবে শুনেছিল যুদ্ধ-জুতোর ইতিহাস, জুতো ছাড়া কেমন কষ্ট হতো, কিভাবে লুট হতো মৃত সৈনিকের জুতো। সেসবই মনে ছিল বোধহয়। ওর আঁকার খাতায়ও দেখেছি জুতো পড়া দুর্গার ছবি, যেন বা গর্ভবতী আর মুখখানা যেন অবিকল বিড়াল। আমাদের ছোটন শুধু বিড়ালের ছবি আঁকত - কোমল গর্ভবতী বিড়াল।

মান অপমানের বিলাসিতা মানায় উঁচু তলায়। একশ দোররা, ব্যভিচারের দশ খণ্ড রামায়ণ ওসব আশরাফুল মাখলুকাতের কারবার। পোয়াতি বিড়ালে নাক সিটকানো ছিল না আমাদের। বরং বিড়াল, দাঁতাল ইঁদুর, ঘরের ফসল আর গেরস্তের মুহুর্মুহু পসারের পুরনো সংযোগকে সংস্কার বানিয়ে দাদী বলতো- বিলাই থাকন সংসারে উন্নতির লক্ষণ। আমাদের শখ আর মুহুর্মুহু উন্নতির ধৈর্য্যে অবশ্য ভাটা পড়ে যেত মা বিড়ালটা ছেড়ে যাওয়ার কিছু পরেই। ত্যক্ততা উছলে যেত তিক্ততায়- হাগু মুতের গন্ধ, দিল গোস্তের পাতিলে মুখ, গেল তো উল্টে সব, উদারতারও লিমিট থাকে।

তারপর এক রাতে ছানাগুলারে বস্তায় ভরে ফেলে আসতাম আমরা। ততটা দূরে যতটা দূরে গেলে পথ চিনে কখনো ফেরে না কেউ। কোনো রাতে ভরা পূর্ণিমা হতো। আলো উপচে পড়তো আমাদের চক্রান্তে। কখনো শুধুই কয়লা জমানো অথৈ অন্ধকার। নিজের নিয়তি অন্যের হাতে দিয়েই পৃথিবীতে আসি আমরা। জন্মাবার শর্ত তো এটাই। ভালো থাকা নিশ্চিত করতে পারেনি তবে বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে ছোটন আধখোলা বস্তার পাশে রেখে আসতো খাবার, দুধ, উলের সুতোর বল।

পরদিন ছোটনের খুব জ্বর হতো। প্রতিবার। মনে আছে ভীষণ বিশ্বস্ত মিনহাজ চাচা মাল কেনার টাকা নিয়ে পালিয়েছিল বস্তায় ভরে বিড়ালগুলো ফেলে আসার পরের দিন। আমাদের দোকানটা বিক্রি হয়ে গেল বিড়াল ফেলে আসার পরদিনই। কেনা দর উসুলের জন্য স্কুল থেকে ফেরার পর ফুটপাতে ওড়ায় করে জুতো বিক্রি করতাম। ক্ষতিপূরণ হয়নি তেমন। কেবল স্টোররুম ভরে গেল অজস্র জুতার বাক্সে। প্রতিটা বাক্সে শুয়ে আছে তিনটা বিড়ালের বাচ্চা, অসংখ্য করুণ 'মিঞাঁও' সমুদ্রের গর্জন হয়ে তেড়ে আসছে- কতো রাত স্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠেছি।

থকথকে বেড়াল-গন্ধের তোফায়রাকে বের করে দেয়ার পর বাড়িতে আর বিড়াল দেখি নি। নাকি দেখেছি! ছোটন যেমন ছবি এঁকেছিল আয়নার ধারে বসে থাকা এক গর্ভবতীর পেটে বিড়াল। আমরা তো জানি ছবির মেয়েটা আমাদের আম্মা। কনডমের ব্যবহার তখনও জমে নি বাসায়। দু একটা থাকলে সেও হয়ে যেত ছোটদের খেলনা বেলুন। আড়াই কামরার ঠাসবুনানের সংসারে আরও এক বাচ্চা সত্যিই ছিল বাড়াবাড়ি। তাই নষ্ট করাই ঠিক হয় অথচ হাত থেকে মেশিন পড়ে গেলে ভড়কে যায় স্বাস্থ্যকর্মী- ‘আপনার পেটে কী আছে জানি না। আমি পারবো না।’ পরে অবশ্য নানু এনে দেয় সহজ সমাধান- 'রেহনুমা বাচ্চার জন্য কত কাঁদে, আরেকটু কষ্ট কর, ও আসলে দিয়া দিস।’ রেহনুমা মানে ক্যাঙ্গারুর দেশ, রেহনুমা মানে ততটা দূরে যাওয়া যতটা দূরে গেলে পথ চিনে কখনো ফেরে না কেউ।

আমাদের ছোট বোন, তাকেও একদিন অথৈ অন্ধকারে রেখে আসি আমরা। ছোটন যার কান্নার জল জমিয়ে রাখত। পরদিন জ্বর গায়ে ও কৃষ্ণচূড়ার গাছ লাগিয়েছিল সেই জমানো জলে। হঠাৎ হঠাৎ কী যে হাওয়া হয় কৃষ্ণচূড়ার গাছটায়। যেন কারা ফিসফিস করে-মিঞাঁও, মিঞাঁও। মনে হয় অজস্র বিড়াল ভেসে বেড়ায় গাছটাকে ঘিরে। কাকতালীয় নয় পরিণতির মতো একটা ইচ্ছে তখন একসাথে তাড়িত করে আমাদের গভীর। যে বোনটার কোন নাম দেয়া হয়নি তাকে খুব নাম ধরে ডাকতে ইচ্ছে হয়। ছোটন অস্ফুটে উচ্চারণ করে- নাম রেখেছি কোমল গান্ধার... আহা কোমল গান্ধার- আমাদের বোন, আমাদের শেষ বিড়াল ছানা।