লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ৪৯টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

২০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftস্বাধীনতা (মার্চ ২০১১)

"অপেক্ষা"
স্বাধীনতা

সংখ্যা

হাছান ছাদেক

comment ৮৫  favorite ৯  import_contacts ২,৯৫৭
পুব আকাশে লাল থালার মত সূর্য উঠছে। তার লালিমা ছড়িয়ে পরছে প্রকৃতির প্রতিটা পরতে পরতে। অন্ধকারের কালো পর্দাটা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে ফর্সা হয়ে উঠছে চারিদিক।

চোখে-মুখে আলোর ছটা পরতেই চোখ মেলল হাসান। একটা পাটক্ষেতের ধারে নিজেকে আবিষ্কার করলো। হাত-পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পরে আছে। নিজেকে টেনে উঠাতে গিয়ে কাঁধে আগুন ধরে গেল। যন্ত্রণায় গুলিয়ে উঠলো গা। বাম কাঁধটা এখনো আড়ষ্ট হয়ে আছে, হাত নাড়াতে গিয়ে টের পেল। সারা শরীরে একটা শীত শীত ভাব জানিয়ে দিল জ্বর এসেছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে কপালের দু'পাশে। রাস্তার একদম কাছেই পাটক্ষেতটা। তারমানে বেশিদূর সরে যেতে পারেনি ও। নেহায়েৎ ভাগ্য গুণে ধরা পরেনি। ওরা হয়তো ভেবেছে পালিয়ে অনেক দূর সরে গেছে ও। আসলে ও বেঁচে আছে, এটা হয়ত ওদের মাথায়ই আসেনি। তাই আর খোঁজা-খুঁজির ঝামেলায় যায়নি। গুলিটা ওর কাঁধের মাংস চিড়ে বেড়িয়ে গেছে। স্রেফ রক্তক্ষরণেই দুর্বল হয়ে গেছে ও। তাই নিজেকে সজ্ঞান রাখতে পারেনি। তাছাড়া ওদেরও তাড়া ছিল। ভেতো বাঙ্গালীদের প্রাথমিক ধাক্কাটা ভালভাবেই দেয়া গেছে ভেবেই ওরা খুশী। তাই হাসানের পিছে আর সময় নষ্ট করেনি। এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। হাসানও সেই সুযোগে যথাসম্ভব নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। খুব পানি-পিপাসা হচ্ছে ওর। ইতিমধ্যে রোদ উঠে গেছে। টনটন করছে কাঁধের ক্ষতটা। না এভাবে ঝিম মেরে থাকলে হবে না। আমাকে কারো সাহায্য পেতেই হবে, ভাবছে হাসান। অনেক কষ্টে নিজেকে টেনে দাঁড় করালো। বোঁ করে ঘুরে উঠলো মাথাটা। হাতের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা এক গোছা পাটগাছ ধরে তাল সামলাল। মাতালের মত পা টেনে টেনে রাস্তায় উঠে এলো। গত রাতের হানাদারদের আর্মাড কারের সুস্পষ্ট চাকার দাগ দেখতে পেল মাটিতে। বুকটা কেঁপে উঠলো ওর। মৃত্যুর কত কাছ থেকে ফিরে এসেছে ভেবে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিল। রাস্তার দু'মাথায় দৃষ্টি বুলালো। কোন জন-মনিষ্যির সাড়া পেলনা। আশে-পাশের লোকজন কেউ বেঁচে আছে কিনা সন্দেহ। থাকলেও ওরা নিশ্চয়ই জীবন বাঁচাতে পালিয়ে গেছে। পাকবাহীনি নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর এমন করে হামলে পড়বে, এটা নিশ্চয়ই কেউ ভাবেনি। হাসান নিজেও কি তাই ভেবেছিল। গতরাতের কথা মনে পড়লো ওর। বুম-বুম, ট্যাঁ- ট্যাঁ শব্দে যখন ঘুম ভেঙ্গেছিল, সে ভেবেছিল দুষ্ট ছেলের দল পটকা ফোটাচ্ছে। অবশ্য আশ-পাশের লোকজনের সাথে তার তেমন পরিচয় নেই। মাত্র মাসক্ষাণেক হলো, এখানকার স্কুলের টিচার হয়ে এসেছে ও। তবে কদিন থেকেই শুনছিল ঢাকার অবস্থা থমথমে। ইয়াহিয়া সরকারের এক গুঁয়েমির কথাও টুক-টাক কানে আসছিল। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী থেকে ধরে টিচাররা পর্যন্ত সবাই ফিঁসফাস করে কি নিয়ে যেন কথা বলে। সে নির্বিবাদি মানুষ। তাই নিজেকে এসব থেকে দূরে রাখে। আসলে হাসান ভয় পায়। নিজের জ্ঞান-বুদ্ধিবলে এটুকু অন্তঃত বুঝতে পারে, ইয়হিয়া সরকারের এ দেশ থেকে বিতারণ স্রেফ সময়ের ব্যপার মাত্র। আসলে বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ই মার্চের ভাষনেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, পাক সরকারের বিরুদ্ধে রাংগালীরা এখন জোড়ালো ভাবে সোচ্চার। বঙ্গবন্ধু তো স্পষ্টতঃই বলে দিয়েছেন,"তোমাদেও যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। ..... মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। তবু এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্।"
রক্ত দিতে হাসান ভয় পায়। অথচ সেই রক্তই আজ তার শরীর থেকে ঝরে গেল। যে বাড়িতে সে ভাড়া থাকতো, সেই বাড়ীর লোকজনের আর্তচিৎকারে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে এসেছিল ও। অন্ধকারে কে কোনদিকে দৌড়াচ্ছে কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছিল না। বাড়ীটা বড় রাস্তার কাছে হওয়ায় আর্মাড কারের চাকার ঘড়ঘড় শব্দ স্পষ্টতই শোনা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে থেমে থেমে গুলির অবিরত ট্যা ট্যা শব্দ, আর সন্ত্রস্ত মানুষের আর্তচিৎকার মিলে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। এর ভেতর হাসান দিগ্বিদিক জ্ঞাণশূণ্য হয়ে কোনদিকে দেঁৗড়িয়েছে নিজেও বুঝতে পারেনি। শুধু তার মাথায় ছিল বড় রাস্তার ধারে যেতে পারলে সে অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে পারবে। ফলে সে ভুল করে পরে যায় হানাদারদের একটা ট্রুপের সম্মুখে। যখন ভুলটা বুঝতে পারে ততক্ষণে দেরী যা হবার হয়ে গেছে। তারই খেসারত হিসেবে এখন সে আহত। এখন কোথায় যাবে, কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। আসলে তার মাথাই কাজ করছে না। তৃষ্ণায় বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে। একটু পানি না পেলে সে হয়তো মরেই যাবে। না আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। কিছুতেই মরে যাওয়া চলবে না। মরতে হাসান খুব ভয় পায়। তার বেঁচে থাকার অদম্য তৃষ্ণাই তাকে নতুন করে শক্তি যোগালো। উদভ্রান্তের মত শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলল সামনে। রোদ এরই মধ্যে তেতে উঠেছে। পূবমূখী হয়ে হাঁটছে বলে সূর্যরশি্নর সরু তীর চোখেমুখে ফুঁটছে। ভাল করে সামনে তাকানো যাচ্ছে না। চোখ সরু করে মাতালের মত টলতে টলতে সামনে এগোতে থাকলো হাসান। পখের দু'ধারে হানাদারদের বর্বরতার ছাপ সুস্পষ্ট। নির্জিব কংকালের মত দাড়িঁয়ে থাকা পোড়া বাড়ী-ঘর গুলো যেন ওর বেঁচে থাকাকেই উপহাস করছে। কতক্ষণ সে হেঁটেছে, নিজেও বলতে পারবে না। শুধু এটুকু বুঝেছে, সে ঐ মৃতু্যপুরী ছেড়ে অনেক দূরে সরে আসতে পেরেছে। দু'পাশের বাড়ী-ঘর গুলোর জানালায় উৎসুক মানুষের দৃষ্টিই তাকে জানিয়ে দিল, অবশেষে সে নিরাপদ জায়গায় সরে আসতে পেরেছে। বোধহয় পরিস্থিতি অনূকূলে এসে গেছে বুঝতে পেরেই, তার চেতনা দ্বিতীয় বারের মত লোপ পেল। সহসা আবারো জ্ঞান হারালো ও। এক জোড়া উৎসুক চোখকে আঁতকে দিয়ে ধুঁপ করে মাটিতে পরে গেল হাসান। সবচেয়ে কাছের বাড়ীটার চৌকাঠ তখন তার থেকে মাত্র দু'হাত দূরে।

"বাবা, বাবা লোকটা পইরা গেছে।" মাজেদার আর্তচিৎকারে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন রহিম মিয়া। গত রাতে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেন নাই। পাশের গ্রামে পাকসেনারা হানা দিয়ে নির্বিচারে মানূষ মেরেছে। জ্বালিয়ে দিয়েছে বাড়ী-ঘর। তাদেও নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে পুরুষ তো বটেই, নারী-শিশু এমনকি ঘরের হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগলও রেহাই পায়নি। তাই জীবন বাঁচাতে তারাও সবাই জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল। সারাটা রাত ওখানেই কাটিয়েছে। চারিদিক ফর্সা হবার পর সবাই বুঝতে পারলো, সারারাত যেহেতু পাকসেনারা আসেনি কাজেই এখন আর আসবে না। তখনি দল বেঁধে তারা বাড়ী-ঘরে ফিরে এসেছে। সবে চোখটা বুজে এসেছিল, এমন সময় চিৎকার দিয়ে উঠলো মাজেদা। প্রথমেই তার মনে এলো পাকসেনারা আবার এসেছে। তাই বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমেই পেছনের দরজা খুলতে গেলেন।
"কই যাও বাবা, লোকটা তো সামনের উঠানে পইরা আছে।" মাজেদার কথা কানে যেতেই আবার থমকে দাঁড়ালেন।
"কার কথা কস্ ? কেডা পইরা আছে ?" জানতে চাইলেন রহিম মিয়া। মেয়ের কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারছেন না। ততক্ষণে মাজেদা সামনের দরজা খোলে বেড়িয়ে গেছেন। পিছু পিছু তিনিও ছুটলেন। উঠোনে একটা ছেলে পড়ে আছে। উদোম গা, স্রেফ একটা লুঙ্গি পরা। তার লোমশ বুকে কান ঠেকিয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে পাশেই বসে আছে মাজেদা। দৃশ্যটা দেখে তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।
"বাবা, বাবা, লোকটা বাইচ্যা আছে। তাড়াতাড়ি আস বাবা। হের জ্ঞান ফিরাইতে হইবো।" বলে নিজেই কলতলায় ছুটে গেল মাজেদা। কল চেপে বালতি ভরে পানি নিয়ে এলো। ততক্ষণে রহিম মিয়া নিজেও হাসানের কাছে চলে গেছেন। বিমুঢ় চোখে তাকিয়ে আছেন ডান কাঁধের ক্ষতটার দিকে। হাসানের চোখে-মুখে পানির ছিটা দিতে থাকলো মাজেদা। কি মনে করে দু'হাতের অাঁজলা ভরে পানি নিয়ে হাসানের ঠোঁটে আঙ্গুল ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে ঢেলে দিতে লাগলো। সহসা চোখ মেলল হাসান। সুন্দর একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল ওর সবটা মুখ জুড়ে। আনন্দে চিৎকার করতে যেয়েও থেমে গেল মাজেদা। অনেক কষ্টে কন্ঠ স্বাভাবিক রেখে বলল, "আর ডর নাই। আপনে বাইচ্যা গেছেন।"

বাহ্্ আমি দেখি বেহেশতে আছি। শুধু শুধু আমি এদ্দিন মরতে ভয় পেয়েছি। কই আমি তো ভালই আছি। এই যে কত আদর করে সুন্দরী হুর আমায় পানি খাওয়াচ্ছে, এটা বেঁচে থাকলে আশাই করতে পারতাম না। নাহ্ আমার আরো আগেই মরা উচিৎ ছিল। চোখ মেলেই মাজেদাকে হাসি মুখে কথা বলতে দেখে হাসানের ঠিক তাই মনে হলো। কিন্তু একি বলছে ও, বেঁচে আছি মানে। আমি তো মরে গেছি। দু'হাতের চেটোয় ভর দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসতে গিয়ে কাঁধের ব্যথাটা চাগিয়ে উঠতেই বাস্তবে ফিরে এলো হাসান। বুক ভরা পানির তৃষ্ণাটা আবারো মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।
"পানি পানি" বলে দুর্বল কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো।
দু'হাতের চেটোয় পানি নিয়ে আবারো হাসানের মুখে ধরলো মাজেদা। ঠোটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে দেখে তড়িৎ শিয়রের কাছে বসে মাথাটা উঁচু করে ধরলেন রহিম মিয়া। বারবার আজলা ভরে হাসানকে পানি খাওয়ালো মাজেদা, যতক্ষণ না মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো ও।
ধরাধরি করে হাসানকে ঘরে নিয়ে এলো ওরা। ঘর বলতে লাগোয়া এক চিলতে বারান্দা সমেত একটা টিনের লম্বা বাড়ী। মাঝখানে বাঁশের পার্টিশান দিয়ে দুইটি আলাদা কক্ষ। একটাতে মাজেদা, আর একটাতে রহিম মিয়া থাকে। ওদের অবস্থা তেমন ভাল নয়। অন্যের জমি জিরাত চাষাবাদ করে সংসার চালায় রহিম মিয়া। নিজের বলতে এই বাড়ীটা, আর কিছু সব্জীক্ষেত। মাজেদার মা গত হয়েছে অনেক আগেই। তাই দু'জনের সংসার মোটামুটি বেশ ভালভাবেই চলে যায়। মেয়েকে পড়াশোনা তেমন না করালেও তাকে স্বাধীনচেতা হিসেবে বড় করেছেন। তার চিন্তা-চেতনার উপর আস্থা আছে রহিম মিয়ার। তাই ছেলেটাকে যখন মাজেদা ঘরে নিয়ে আসতে চাইলো, তিনি আপত্তি করতে পারলেন না।


কাঠের চৌকির উপর নেতানো কাঁথার বিছানায় শুয়ে আছে হাসান। তাকে ঘরে আনার সময়ই টের পেয়েছে মাজেদা ছেলেটার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। একটা মোটা কাঁথা দিয়ে ওর শরীরটা ঢেকে দিল। বাবাকে হাসানের পাশে বসতে বলে দৌড়ে বাড়ীর ভেতরের দিকের উঠোনে চলে গেল। গোটা কয়েক জবা ফুল ছিড়ে নিলো। পাশের তুলসী গাছ থেকে বেশ কটি পাতা তুলে নিল। চুলোয় পানি গরম হতে দিয়ে পাটায় তুলসী পাতাগুলো ছেচতে লাগলো। ছেচা পাতাগুলো চিপে চিপে রস বের করে একটা গ্লাসে রেখে দিল। তারপর জবা ফুলগুলো বাটতে লাগলো। বেটে পেস্টের মত হলে সেটা তুলে একটা বাটিতে নিল।

কি করে মৃতু্যর হাত থেকে বেঁচে এলো রহিম মিয়াকে তাই বলছিল হাসান। "এত কথা কওয়া ঠিক হইতাছে না আপনার।" বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো মাজেদা। কাঁধ থেকে একটা পরিস্কার গামছা ঝুলছে। দু'হাতে বড় একটা গামলা ধরে রাখা। মেঝেতে নামিয়ে রাখলো ওটা। গলা পর্যন্ত ফুঁটন্ত পানি ভরা। ক্রমাগত ভাপ বেরুচ্ছে। এগিয়ে গেল হাসানের মাথার কাছে। উবুঁ হয়ে ক্ষতটা দেখলো ভাল করে। বাম কাঁধের চামড়ায় সরু নালার মত একটা বিশ্রী ক্ষত। রক্ত জমাট বেঁধে আছে। "মাথাটা শক্ত করে চাইপ্যা ধরেন।" বাবাকে বলল। দু'হাতে হাসানের মাথাটা শক্ত করে বালিশে চেপে ধরলেন রহিম মিয়া। অবাক হয়ে মেয়ের কান্ড দেখতে থাকলেন। গামছাটা গরম পানিতে ভাল করে চুবিয়ে নিল মাজেদা। "দাঁতে দাঁত চাইপ্যা যন্ত্রণাটা সহ্য করেন।" বলেই ভেজা গামছাটা হাসানের ক্ষতে ঠেসে ধরলো। যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়ে উঠলো হাসান। মনে হলো কেউ যেন আস্ত একটা রড তার ক্ষতে ঠেলে দিয়েছে। তৃতীয়বারের মত জ্ঞান হারালো সে। যত্নের সাথে জমাট বাঁধা রক্তটা মুছে ফেলল মাজেদা। গরম পানি দিয়ে ক্ষতটা ভাল করে পরিস্কার করলো। ইঞ্চিখানেক লম্বা ক্ষতটা। জবা ফুলের পেস্ট দিয়ে ওটার পুরোটাই ঢেকে দিল। তারপর একটা পরিস্কার কাপড় দিয়ে ক্ষতটা ব্যান্ডেজ করে দিল।

কিছুক্ষণের ভেতরই জ্ঞান ফিরে এলো হাসানের। চোখ খুলেই দু'দুটো উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পেল। বাম কাঁধটা এখনো আড়ষ্ট হয়ে আছে, হাতটা নাড়াতে গিয়ে টের পেল। তবে জখমটা ড্রেসিং করায়, ব্যাথাটা আগের মত টের পেলনা। সহসা পেটের ভেতর ক্ষিধের রাক্ষসটা চাগিয়ে উঠলো। ওর মনের অবস্থা টের পেয়েই বোধকরি একটা গ্লাস এগিয়ে দিল মাজেদা "এটা খায়া ফালান।"
খেতে গিয়ে, হাসানের মনে হলো এর চেয়ে মরে যাওয়া আরো ভালো ছিল। এমন তেতো কিছু যে মানূষ খেতে পারে, এটা তার কল্পনাতেই আসলো না। "এটা খাইলে আপনের জ্বর সাইরা যাইবো।" তার মুখের অবস্থা দেখে হাসি মুখে ওকে আশ্বস্ত করতে চাইলো মাজেদা।
"খাও বাবা, কোন চিন্তা নাই। আমার মাইয়া টোটকা-ফাটকা অনেক চিকিৎসা জানে। আমগো এহানে তো ডাক্তার নাই। তাই অসুখ-বিসুখে এইগুলান দিয়াই কাম চালাতে হয়।" মেয়ের হয়ে সাফাই গাইলেন রহিম মিয়া। অগত্যা চোখ-মুখ কুঁচকে রসটা গিলে ফেলল হাসান। তার দু\'চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো।

যখন ঘুম ভাঙ্গলো, তখন অনেক রাত। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। তবে এক কোণে নিভু নিভু অবস্থায় হ্যারিকেন জ্বলছে একটা। তার অস্পষ্ট আলোয় দেখত পেল কে যেন শিয়রের পাশে বসে আছে। হাসান ভাল করে লক্ষ্য করে বুঝলো ওটা মাজেদা। মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে।

ওর নড়াচড়ার শব্দে মুখ তুললো মাজেদা। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো হাসানের দিকে। "যাক ঘুম ভাঙ্গলো তাইলে আপনের। নেন, এক বাটি হৌরা(সু্যপ) খায়া লন। এইডা আপনেরে শক্তি দিব।" বলতে বলতে বাতিটার কাছে এগিয়ে গেল মাজেদা। সলতে বাড়িয়ে দিল। আলোকিত হয়ে উঠলো সারা ঘর। পাশের একটা টেবিল থেকে প্লেট ঢাকা এক বাটি সু্যপ নিয়ে ফিরে এলো বিছানার কাছে। বাটির উপর থেকে প্লেটটা সরিয়ে নিলো। ততক্ষণে আধশোয়া হয়ে উঠে বসেছে হাসান। ওর হাতে ধরিয়ে দিল বাটিটা।

এক চুমুকে সু্যপটা খেয়ে নিল হাসান। আগের মত স্বাদটা তেতো লাগছে না দেখে মেয়েটার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করলো। "ধন্যবাদ", বলেই বাটিটা ফিরিয়ে দিল সে। শুয়ে পড়লো আবার। খালি বাটিটা নিয়ে টেবিলের কাছে চলে গেল মাজেদা। হ্যারিকেনের সলতেটা টেনে আবারো নামিয়ে দিল। ঘুম ভাঙ্গার পর ভীষন দুর্বল বোধ করছিল হাসান। সু্যপটা খেয়ে অনেক ভালো বোধ করছে এখন। জ্বর বোধহয় প্রায় নেই হয়ে গেছে। বরং সারা শরীরে ভীষন একটা প্রশান্তি অনুভব করছে। জড়িয়ে আসছে চোখের পাতা। একটু পরেই আবারো ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল ও।

হাসানের যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। মাজেদা কিংবা রহিম মিয়া কাউকেই ঘরে দেখতে পেল না। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো সে। বেশ দুর্বল লাগছে। ধীরে ধীরে হেঁটে এগিয়ে গেল ভেতরদিকের দরজার কাছে। মাজেদাকে দেখতে পেল কলতলায়। থালা-বাসন মাজছে। উঠোনে কুড়োল দিয়ে লাকড়ি চিড়ছে তার বাবা।

ওর পদশব্দে চোখ তুললো মাজেদা। "একি্ব ! আপনে দেহি উইঠ্যা পড়ছেন।" এগিয়ে এল হাসানের কাছে। কপালে হাত দিয়ে দেখলো। "হুমম্, জ্বর একদম নাই।"

তাওয়ায় রুটি সেঁকতে বসে গেল মাজেদা। তার পোড়া পোড়া গন্ধ নাকে আঘাত করলো হাসানের। পেটে ছুঁচোর নাচন শুরু হলো। বারান্দা লাগোয়া বাঁশের বেঞ্চটাতে বসে পড়লো। ওর হাতে প্লেট ভর্তি গরম রুটি আর ঝোলা গুড় ধরিয়ে দিল মাজেদা। "ব্যাথা কমে গেছে, তাই না?" জানতে চাইলো।

বাম হাতটা বৃত্তাকাওে ঘুরিয়ে দেখলো হাসান, তেমন কোন ব্যাথা লাগছে না। মেয়েটার টোটকা চিাকৎসার উপর ওর ভক্তি এসে গেল। "ব্যান্ডেজটা বদলায়া দিমু আবার।" ওর কাঁধের দিকে ঈঙ্গিত করলো মাজেদা। সুবোধ ছেলের মত মাথা নাড়িয়ে মাজেদার কথাটায় সম্মতি জনালো হাসান।

কিছুক্ষণ বাদেই এক গামলা হালকা গরম পানি নিয়ে এল মাজেদা। আগের ব্যান্ডেজটা খুলে ফেললো। জখমটা সাবধানে পরিস্কার করে আবারো জবা ফুলের পেস্ট লাগিয়ে দিল। পরিস্কার কাপড়ের নতুন আর একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল।

মাজেদার শুশ্রশায় কদিনেই পূর্ন শক্তি ফিরে পেল হাসান। বামহাতটা আগের মতই স্বাভাবিকভাবে নাড়াচড়া করতে পারে এখন। তবে মনের দুর্বলতাটা রয়ে গেছে ঠিকই। সেদিনের সেই ভয়ংকর স্মৃতিটা মনটাকে এখনো আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মাজেদার সহজ উপস্থিতিই কেবল তাকে কিছুটা থমকে দেয়। একজন মেয়ে হয়েও মাজেদা কত দৃঢ়চেতা। অথচ একজন পুরুষ হয়েও সে কিনা ভীরু কাপুরুষের মত আচরন করে। নিজের প্রতি হাসানের কেমন যেন রাগ হলো। সহসা নিজের মধ্যে বদলে যাবার একটা তাগিদ অনুভব করলো।

কদিন বাদে হাসানের জখমের কিছুটা উন্নতি হলে ঘর ছেড়ে বেরুলো সে। বারান্দার বেঞ্চটাতে বসে দৃষ্টি মেলে দিল সামনে। অনেক দূরে জঙ্গল দেখতে পেল। জঙ্গলের শেষ প্রান্তটা সবুজ ছোপের মত নীল আকাশের গায়ে মিলিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে দৃষ্টি সামনে টেনে নিয়ে এলো। উঠোনের পরেই ফুলকপির বাগানটা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল ওর। সব কিছুই ছবির মত সাজানো গোছানো মনে হলো। একটা দীর্ঘশ্বাষ বেড়িয়ে এলো হাসানের। কত সুন্দর আমদের এই দেশটা।

দেখতে দেখতে আরো ক'টা দিন পেড়িয়ে গেল। হাসান এখন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। প্রায় প্রতিদিনই বাগানের ভেতর হাঁটাহাঁটি করে সে। মাঝে মাঝে মাজেদাও থাকে ওর সাথে। ওর পাশাপাশি হাঁটতে বেশ ভাল লাগে তার। তবে জীবনে কোন মেয়ের এতটা কাছাকাছি আসেনি বলেই বোধহয় অনুভুতিটা ভাললাগার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। তার কাছে সব খবরই নিয়োমিত পাচ্ছে ও। দেশের দামাল ছেলেরা মুক্তিফৌজে যোগ দিচ্ছে। পাকসেনারা মাঝে মাঝেই তাদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে। হাসান নিজের মাঝেও কিসের যেন একটা তাড়না অনূভব করছে। তার কেবলি মনে হচ্ছে কিছু একটা করা দরকার।

একদিন বিকেলে কপি ক্ষেতের আগাছা সাফ করছিল মাজেদা। হাসান সাহায্য করছিল তাকে। সহসা কোথেকে একটা গরু এসে ক্ষেতটাকে মাড়িয়ে দিতে লাগলো। প্রচন্ড রাগ হলো হাসানের। বেড়া থেকে একটা বাঁশের কঞ্চি টেনে নিয়ে প্রায় দৌড়ে গরুটার গেল গরুটার কাছে। দু'চার ঘা লাগাতেই দ্বিগ্বিদিক ছুট লাগালো গরুটা। পলায়নপর গরুটার দিকে তাাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষতে লাগলো হাসান। নিজের লুব্ধ শক্তিটা ধীরে ধীরে ওর ভেতর পূর্ন অবয়ব পাচ্ছে টের পেল। ওর দৃঢ়বদ্ধ চোয়াল দেখে বুকের ভেতর প্রচন্ড একটা স্বস্থির পরশ খেলে গের মাজেদার।

ঠুক করে শেকল টানার শব্দ হতেই বিছানা থেকে পিছলে নেমে গেল মাজেদা। এগিয়ে গেল দরোজার দিকে। আস্তে করে পিঠে হাত রাখলো হাসানের।
"তুমি জানো?" প্রায় নিঃশব্দে প্রশ্নটা করলো হাসান।
"হঁ্যা, যেদিন আপনেরে প্রথম দেকছি, হেদিন থাইক্যাই জানি।" ওর হাতে একটা পোঁটলা ধরিয়ে দিয়ে বলল মাজেদা। "এটাই আপনের নিয়তি। তাই আমি আপনেরে আটকামো না।"
"ধন্যবাদ।" কথাটা বলেই বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল হাসান।
অন্ধকার রাতের কালো চাদরটার দিকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকলো মাজেদা। সে এখন জানে, এই আঁধার কেটে গিয়ে নতুন এক ভোর হবে। নতুন এক সূর্য়ের আলোয় হেসে উঠবে তার আগামী দিন।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement