লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৫১টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.৪১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫৭ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftশাড়ী (সেপ্টেম্বর ২০১২)

ছেঁড়াপাতা
শাড়ী

সংখ্যা

মোট ভোট ১১০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯৮

লুতফুল বারি পান্না

comment ৪৪  favorite ৪  import_contacts ১,৩৮৯
এক.
আধ ঘণ্টার বেশী হয়ে গেছে- রাজীব অপেক্ষা করছে। ওর ছাত্রী প্রিয়ন্তী আজ দেরী করছে, বেশ দেরী। সময় নিয়ে রাজীবের যথেষ্টই গোঁড়ামী আছে। না থেকে উপায়ও নেই, নিখুঁতভাবে সময় মেন্টেন করতে পারছে বলেই প্রতিদিন তিনটা করে টিউশনি করেও নিজের পড়াশোনাটা ঠিকঠাক চালিয়ে নিতে পারছে। এখান থেকে বেরিয়ে আর একটা টিউশনি ধরতে হবে ওকে। তারপর হলে ফিরে নিজের পড়া। কাজ বা পড়াশোনার সাথে ফাঁকিবাজি ওর পছন্দ না। কিন্তু এই ছাত্রীকে কিছু বলা যাবে না। মাস গেলে ঠিক সময়মত অনেকগুলো টাকা দেয় ওরা- কখনো মাসের দুই তারিখ হয় না।

কাজের মেয়েটা এসে কফি দিয়ে গেছে এক ফাঁকে। কিছু না বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বলে বসল, 'আপায় বসতে বলছে। একটু পরেই আসতেছে।' ধীরেসুস্থে কফি শেষ করেছে রাজীব। তারপরও অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেছে। তবু সেই একটু পরটা কিছুতেই আসছে না।

মনে যাই বয়ে যাক, বাইরে খুব শান্ত হয়ে অপেক্ষা করছে ও। সময় কাটানোর জন্য স্টাডি রুমটা পর্যবেক্ষণ করছে। পরিপাটি- ছবির মত সাজানো রুম। একদিকের দেয়ালে অদ্ভুত সুন্দর বড় একটা ল্যান্ডস্কেপ। একটা তুষার ঢাকা পাহাড়ি ঝর্ণা। ফটোগ্রাফ নয়- হাতে আঁকা। অথচ এত্ত জীবন্ত যেন পানির গতিটাও দেখা যাচ্ছে! শিল্পের সাথে টাকার একটা যোগ থাকে বোধ হয়। অন্তত একজন শিল্পপতির বাড়ির ডেকোরেশন তাই ভাবাচ্ছে। টেবিলের পাশের বইয়ের র্যাজকটা ওকে সবচাইতে বেশী আকর্ষণ করে। অতি দুর্লভ কিছু বই আছে। ওর বাবার টাকা না থাকলেও বইয়ের শখ ছিল ষোল আনা। তাঁর সংগ্রহেও অনেক দুর্লভ বই ছিল। কিন্তু এটার সাথে তুলনা চলে না। মাঝে মাঝে ছাত্রীর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে পড়ে ও। দেয়ালের অন্য দিকে বিচিত্র ডিজাইনের একটা ফটো অ্যালবাম ঝোলানো। প্রিয়ন্তীর বিভিন্ন পোজের কিছু ছবি। ঝর্নার ছবিটার মতই উচ্ছল, প্রাণচঞ্চল। খুব উগ্র কিছু না, তবে পোশাকে বরাবর অতি আধুনিকা। একটা ছবিতে ডেনিম জিন্সের সাথে টি-শার্ট। যদিও বেমানান বা খুব অশালীন লাগছে না। মেয়েটা একেবারে ন্যাচারাল বিউটি। যেমন মিষ্টি মুখ, তেমন গ্লামার আর গায়ের রং। যাই পরে, মানিয়ে যায়। বেশ অস্বস্তি নিয়েই অপেক্ষা করছে ও।

'খুব দেরী করিয়ে দিলাম তাই না?'

চোখ ফেরাতে পারছে না রাজীব। হালকা নীল রঙের ওপর কারুকাজ করা দামী একটা জামদানী পরেছে মেয়েটা। এই প্রথম শাড়ি পরা অবস্থায় দেখল ওকে। ওর চোখে ঝিলিক মেরে যাওয়া মুগ্ধতা ঠিক ধরা পড়ে গেল মেয়েটার কাছে। ব্যাপারটা বুঝতে পারল রাজীব। দ্রুত নিজেকে সামলে নিচ্ছে। ছাত্রীদের কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে অভ্যস্ত নয় ও। যদিও এই মেয়েটা মাঝেমাঝেই ওকে বিব্রত করে ফেলে। এক একদিন এত সুন্দর করে সাজে। এমনিতেই মুখটা দেখলে ভেতরে অদ্ভুত সব বুদবুদ ফেনিয়ে উঠতে শুরু করে। জীবনানন্দ নিশ্চয়ই এইরকম কোন মুখ দেখে শ্রাবস্তির কারুকার্য উপমাটি দিয়েছিলেন। মৃদু স্বরে বলল ও, 'তোমার কি পড়ার ইচ্ছা আছে আজ?'

দেখার সঙ্গে সঙ্গে সব রাগ জল হয়ে গেছে। তবু কণ্ঠ থেকে অভিমানের ঝাঁঝটা লুকোনো থাকল না। ওর দিকে তাকাল মেয়েটা। চোখে চোখ রেখে বলল, 'সত্যি কথা বলছি ভাইয়া, নেই।'

'মানে?'

'আগে কখনো শাড়ি পড়তে দেখেছেন আমাকে? আজ আমাকে দেখতে আসবে ছেলে পক্ষ।'

একটু কি হতাশার ছায়া পড়ল ওর চোখে। পড়তেই পারে। মানুষের মনের সব অংশ লজিক মেনে চলে না। মেয়েটা তাকিয়েই আছে ওর দিকে, পলক ফেলছে না। নিজেকে সামলে নিলো ও। এরকম রঙিন স্বপ্ন মনের ভুলে দেখে ফেলা যায় কিন্তু তাকে প্রশ্রয় দেয়া চলে না।

'আগে বললেই পারতে। তা তোমার মত মেয়েকেও আনুষ্ঠানিকভাবে দেখতে হয়? তাছাড়া তোমাদের মত পরিবারে এ যুগেও এমন রীতি আছে নাকি?'

'আমাদের পরিবার সম্পর্কে আপনার ধারণা আছে নাকি? বাবা যেমন উদার, কিছু কিছু ব্যাপারে সেইরকম কনজারভেটিভ। আপনাকে বলতে পারতাম। ইচ্ছে করেই বলিনি। কারণ এমনিতেই এখানে দু'ঘণ্টা কাটানোর কথা আপনার। আজ না হয় একটু গল্প করে কাটাই। বিয়ের পর এ সুযোগ আর নাও পেতে পারি, তাই না?'

'দেখ, আমি শুধু কাঠখোট্টা একজন প্রাইভেট টিচার মাত্র। গল্প করার বিদ্যা নাই।'

'ভুল বললেন কিন্তু। শিল্পকলায় আপনার আবৃত্তি শুনেছি সেদিন। অত বড় একটা গল্পের মত কবিতা কি চমৎকার করেই না পড়লেন। তাছাড়া...'

'তুমি ওখানে ছিলে?'

'ছিলাম। আমার এক বান্ধবীর আগ্রহে গেছিলাম। তাছাড়া আমি মাঝে মাঝে পত্রিকার সাহিত্য পাতাও পড়ি।'

কি বলতে চাইছে, হঠাৎ করেই বুঝে ফেলল রাজীব। আশংকা নিয়ে চুপ করে থাকল।

ওর চোখে চোখ রেখে বলল, 'প্রথম আলো সাহিত্য পাতায় আপনার গত সংখ্যায় ছাপা হওয়া কবিতায় যে মেয়েটির বর্ণনা দিয়েছেন তা এত নিখুঁতভাবে মিলে গেল! আর কেউ না বুঝুক...'

'মেয়েটাকে থামাল রাজীব। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সহজ করে বলল, 'শিল্পীদের যেমন ছবি আঁকতে মডেল লাগে, কবিরও তেমন প্রয়োজন হয় মাঝে মাঝে।'

হাসল মেয়েটা, 'জানি। তা শিল্পীর কি মডেলকে কাছে পেতে আগ্রহ জাগে না?'

'কি শুরু করলে বল তো? আমাদের রিলেশনটা সেরকম নয় কিন্তু প্রিয়ন্তী।'

'শুনুন ওসব মিডল ক্লাস মেন্টালিটি ছাড়ুন। আমি যা চাই সরাসরি চাই। আদিখ্যেতা পছন্দ করি না।' ওর চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট করে বলল, 'আপনার চোখে আমি মুগ্ধতা দেখেছি, ভালবাসা দেখেছি। নোংরামি দেখিনি। যদি সত্যি চান, সত্যি সত্যি চান- ইউ হ্যাভ এ চান্স ফর লাইফ টাইম।'

প্রিয়ন্তীর নীল শাড়ি রাজীবের চোখে যেন আচমকা নীল আকাশ হয়ে গেল। যে আকাশ ওপর থেকে নেমে, সরাসরি ওর হাতের মুঠোয় ধরা দিয়েছে। রাজীব কি না বলবে? কেন বলবে? ও কি অস্বীকার করতে পারে, কতদিন পড়াতে পড়াতে মনের অজান্তে ওই চোখের গভীরে হারিয়ে গেছে। ও কি অস্বীকার করতে পারছে- নিজের অরিজিন ওকে এরকম একটা স্বপ্ন দেখা থেকে জোর করে সরিয়ে না রাখলে- এই দিনটা অনেক আগেই আসতে পারত। প্রস্তাবটা ওর কাছ থেকেই তো যেতে পারত। কি করবে রাজীব? নিজের দুর্বলতা বিবেচনা করে, না বলবে মেয়েটাকে?

'বাবার কাছে আমি সময় চেয়ে নিয়েছি। শর্ত একটাই বাবাকে আপনার ইমপ্রেস করতে হবে। যদি পারেন- ইউ উইল উইন।' ওর সামনে ঋজু হয়ে দাঁড়াল মেয়েটা। নীল শাড়িতে নীল একটা পরী। পাপড়ির মত ঠোঁট জোড়া মেলল। বেরিয়ে এলো ঝকঝকে একরাশ মুক্তা। ঝুলে রইল অদ্ভুত এক টুকরো মিষ্টি হাসি। আপাদমস্তক জ্বলজ্বলে একটা লাবণ্য। তারপর বলল, 'অ্যান্ড দিস ইজ ইওর ট্রফি। গো অন ম্যান, বেস্ট অব লাক।'

পাগল মেয়েটার কথা শুনে মাথা বন করে ঘুরে উঠল ওর। ভীষণ আত্মবিশ্বাসী মেয়ে, ওর অনুমতি ছাড়াই অনেকদূর এগিয়ে গেছে। যেরকম গ্লামারাস, তাতে এমন আত্মবিশ্বাস থাকতেই পারে- কিন্তু এতটা নিশ্চিত হল কীভাবে? কার কাছে যেন শুনেছিল মেয়েরা ছেলেদের আকর্ষণ খুব ভাল বুঝতে পারে। কিন্তু ওর কি হবে? এতক্ষণের হাওয়ায় উড়ে চলা রোমান্স শেষ ডায়লগগুলো শুনে- হঠাৎ যেন বাস্তবের মাটিতে ঠক করে আছড়ে পড়ল। ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মত দ্রুত এদিক ওদিক চাইল একবার।

দুই.
'ছোটন, দোকান থেকে একটু সরিষার তেল নিয়ে আয় তো বাবা।'

'যাচ্ছি মা।' বলে দ্রুত রান্নাঘর থেকে তেলের শিশি নিয়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করল। মা ব্যস্ততার ফাঁকেই বলল, 'কিরে টাকা নিবি না।'

'আমার কাছে আছে মা। হাত খরচের টাকা থেকে বেঁচে গেছে।' বলেই মাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত বেরিয়ে আসে ছোটন। সামনে ঈদ। মায়ের মলিন শাড়িগুলো ওকে খুব কষ্ট দেয়। বাবা সামান্য স্কুল মাস্টার। চার চারটা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ আর সংসার চালিয়ে হয়ত এবারো মার জন্য শাড়ি কেনার টাকা হবে না। বাবার তিনটে পাঞ্জাবীই বিভিন্ন জায়গায় রিপু করা। এগুলো পরেই তাকে স্কুলে যেতে হয়। দেখলেই ছোটনের বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। ঈদের দিন ওদের নতুন কাপড় দেবার সময়ে নিতে হাত উঠতে চায় না। না নিলে ওঁরা আরো কষ্ট পাবে ভেবে নেয়।

ছোটনের বড় এক ভাই আর একটা বোন আছে। ওর পরে আরো দুটো বোন। বড় ভাই শহরে একটা চাকরী করে। বিয়ে করে সেখানেই থাকে। বাবা মার খোঁজ খুব একটা রাখে না। শ্বশুর বাড়ির পাশে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে। বোনটা ওর পিঠাপিঠি, ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী।

ছোটন এবার ক্লাস টেনে পড়ে। ছাত্র খুবই ভাল ও। ক্লাসে অনেক নম্বর পেয়ে ফার্স্ট হয়। নিজের ক্লাসমেটদের খুব সুন্দর করে পড়া বুঝিয়ে দেয় বলে ধীরে ধীরে ওর পড়ানোর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছর থেকে বিভিন্ন বাসায় বেশ কিছু টিউশনি পেয়েছে ও। এর মধ্যে কয়েকজন ক্লাসমেটও আছে। মূলত তারাই ওকে পড়ানোর কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ক্লাসমেটদের পড়াতে গিয়ে ওকে পরিশ্রম একটু বেশীই করতে হয়। কিন্তু তাতে লাভও কম হয়নি। নিজের পড়াশোনা মুফতেই এগিয়ে যাচ্ছে।

ঈদ মানুষের জন্য খুশীর খবর হয়ে আসার কথা। কিন্তু ঈদ আসার সময় এলেই ছোটনের বাবা মার মুখ শুকিয়ে কেমন আমসি হয়ে যেতে থাকে। ব্যাপারটা অনেকবার খেয়াল করেছে ছোটন। এখন বড় হয়েছে, সবই বোঝে। কিন্তু কিছু করতে পারে না।


ঈদের দিন সকালে ওর বাবা যথারীতি সব ভাইবোনদের ডাকলেন। ওরা বাবা মাকে সালাম করার পর সবার হাতে এক এক করে প্যাকেটগুলো তুলে দিতে থাকেন। ছোট বোন দুটো খুবই খুশী হয়ে তক্ষুনি পরে ফেলার জন্য উঠল। শুধু বড় বোনটাকে একটু গোমড়া মুখো মনে হল। কলেজে পড়ে সে। বাবা মার দেয়া সস্তা পোশাক পরে কলেজে যেতে লজ্জা লাগে। ভেবেছিল ঈদে একটা ভাল পোশাক পাবে- তাও হল না। ছোটন জানে এসব কিনতেই বাবা মা প্রায় ফতুর হয়ে গেছে। এখন বাকি মাস সংসার চালাতে ধার দেনা করতে হবে।

সবশেষে বাবা মাকে সালাম করল ও। বাবা মার উপহার হাসিমুখে নিলো। তারপর ওর লুকিয়ে রাখা প্যাকেটটা বের করল। ওর সেই আধুনিক প্যান্ডোরার বাক্স খুলতেই বেরিয়ে এলো একরাশ ঝলমলে আনন্দ। মায়ের জন্য দুটো শাড়ি কিনেছে ও। ঘরে পড়ার জন্য মোটামুটি ভাল একটা, আর বেড়াতে যাওয়ার জন্য সাধ্যের মধ্যে বেশ দামী শাড়ি। বাবাকেও দুসেট পাজামা পাঞ্জাবী দিল। বড় বোনের জন্যও পছন্দ করে শহরের দোকান থেকে দামী একটা থ্রি পিস নিয়ে এসেছে ও। ছোট বোনদের জন্য ফ্রক। সবশেষে মায়ের হাতে অবশিষ্ট থাকা বার হাজার সাতশ টাকা তুলে দিল।

মা চোখ কপালে তুলে সব দেখছেন আর জিনিসগুলো নিচ্ছেন। ছোটনের বাবাও হকচকিয়ে গেছেন। ফ্যাল ফ্যাল করে ছোটনের দিকে তাকিয়ে আছেন। ছোটন ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করল- কিভাবে গত এক বছর ও টিউশনি করেছে আর মাসে মাসে সেই টাকা জমিয়ে গেছে- আজকের দিনে সবাইকে অবাক করে দেবার জন্য।

পাগলের মত ছোটনকে জড়িয়ে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলেন মা- আর কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, 'অনেক বড় হবিরে বাপজান তুই, ঐ আসমানের লাহান বড়।' বাবা মুখ লুকাতে ঘরের বাইরে চলে গেলেন। তার এই ছেলেটা ক্লাস ফাইভ আর এইটে দু'বার ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পেয়েও তাকে এত আনন্দ দিতে পারেনি যা আজ পেলেন তিনি।

তিন.
রায়হান সাহেব ঈদের শপিং করতে বেরিয়েছেন। ড্রাইভার ছুটিতে গেছে তাই নিজেই ড্রাইভ করছেন তার ব্যক্তিগত পাজেরো। পাশে স্ত্রী বসে আছে। ছেলে মেয়ে দুটো পেছনের সিটে শান্তশিষ্ট হয়ে বসে আছে। যদিও এত শান্ত তারা না।

রায়হান সাহেবের শপিং খুবই সহজ। নির্দিষ্ট কিছু ফ্যাশন হাউজ বাছাই করা আছে। পছন্দমত ডিজাইন না পেলে অর্ডার অনুযায়ী তারা সাপ্লাই দেন। তার মেয়ে এবার শাড়ি কেনার বায়না ধরেছে। মেয়েটি তার খুবই আদরের। কিন্তু এ জন্য তাকে কোন ঝামেলাই পোহাতে হচ্ছে না। ডিজাইন, অর্ডার সব মেয়ে আর তার মা দিয়েছে। তিনি টাকা দিয়েই মুক্ত। পোশাক, ফ্যাশন এসব তিনি ভাল বোঝেন না। পুরোটাই তার স্ত্রীর ডিপার্টমেন্ট। এমনকি তার নিজের বেলায়ও।

কিন্তু ঈদের আসল শপিং অন্য কারণে। প্রতি বছরই মায়ের জন্য, ভাই বোনদের জন্য, ভাগনে ভাগনি, ভাতিজা ভাতিজিদের জন্য তিনি নিজেই কেনাকাটা করতে বেরোন। আগে মা নিজেই আসতেন ভাগনে ভাগ্নিরাও থাকলে সংগে আসে। এবারে অসুস্থ থাকার কারণে আসতে পারেননি। ছেলেমেয়েরা এসেছে দাদীর জন্য কেনাকাটা করতে। নাতি নাতনিদের কাছে তিনি খুবই জনপ্রিয়।

তিনি নামলেন। শোরুমে ঢুকে অসহায়ের মত স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি একটু দেখ তো।' স্ত্রী হেসে ফেলে বলল, 'শেষ পর্যন্ত আমাকেই তো সব করতে হয়। তবু তুমি কেন যে আসো?'

তিনি উদাস হন, 'কেন যে আসি, সে তো তুমি জানো?' তার স্ত্রী মায়া, নেশা আর মোহমাখা চোখে তাকাল তার দিকে। তিনি নস্টালজিক হয়ে ওঠেন। আবেশ মাখানো দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন। তার স্ত্রী তাকে খোলা বইয়ের মত পড়তে পারে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় ভঙ্গীতে হাসে। প্রথম পরিচয়, প্রথম ভাললাগার অনুভূতি, প্রণয়-পরিণয়ের ভাঙচুর সেইসব স্মৃতিগুলো জোয়ারের পানির মত ভরে তোলে মনের ঘরদোর।

চার.
ড্রয়িং রুমে এসে কাঁচুমাচু হয়ে বসল রাজীব। প্রিয়ন্তীর বাবা ওকে চশমার ওপর দিয়ে মাপলেন কিছু সময়। পোশাক আশাক দেখে খুব ইমপ্রেসড হয়েছেন বলে মনে হল না। দেখেশুনে আরো একটু কুঁকড়ে গেল ও। তিনি গম্ভীর মুখটা আরো একটু গম্ভীর করে বললেন, 'তোমার বাবা কি করেন?'

'জি, উনি একটা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক।' উত্তর শুনেই ভ্রু কুচকে মেয়ের দিকে তাকালেন একবার। তবে কোন মন্তব্য করলেন না। প্রিয়ন্তী উঠে ভেতরে চলে গেল।

'তোমাদের দেশের বাড়ি কোথায়?'

'বরিশালের গৌরনদীতে।'

'দেশের বাড়িতে তোমাদের অবস্থান কেমন?' তার কথার মধ্যে ওর প্রতি সূক্ষ্ম অবহেলার ভাবটা গোপন থাকছে না।

'না। খুব ভাল না।' কথা বলতে বলতেই কেমন অলৌকিকভাবেই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করল রাজীব। 'সত্যি বলতে কি, নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি। আপনি যদি আমার আর্থিক অবস্থা যাচাই করতে চান তবে এত রাখঢাক করার কিছু নেই। আমার বাবা খুবই অল্প আয়ের মানুষ। আমাদের মোটামুটি বড় পরিবারের সংসার খরচ, ভাইবোনদের লেখাপড়ার খরচ সংস্থান করতে করতে তিনি ক্লান্ত। আমার লেখাপড়া, হলের খরচ, ঢাকায় থাকার ব্যয় তাঁর পক্ষে মেটানো সম্ভব না। আমার খরচ আমি নিজেই টিউশনি করে যোগাড় করে নেই। কিছু আউটসোর্সিং এর কাজ করেও টাকা পয়সা হয়। সত্যি কথা হল, অনেকদিন হল আমিই বরং তার ভার অনেকখানি কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার পরিবার যদি আমাকে সত্যিকারের কিছু দিয়ে থাকে, সে অন্য কিছু।'

তিনি খুবই করুণার দৃষ্টিতে তাকালেন। 'তুমি তো বুয়েটে পড়ছ তাই না?'

'জি, সিএসই।'

'কোন স্টেজে?'

'থার্ড ইয়ার, ফার্স্ট সেমিস্টার।'

'পাশ করে কি করবে ভাবছ? সিএসই থেকে প্রতি বছর প্রচুর ছেলেমেয়ে বেরোয় আজকাল। সবাই কিন্তু খুব ভাল কিছু করতে পারে না। তোমার তো বিজনেসে ইনভেস্ট করার সামর্থ্যও নেই।' তার ভাব দেখে মনে হল মেয়েকে সান্ত্বনা দেবার জন্যই কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। যা বোঝার তা আগেই বুঝে নিয়েছেন।

'জি, মাইক্রোসফট একটা অফার দিয়ে রেখেছে। চাইলে ফাইনাল সেমিস্টার থেকেই জয়েন করতে পারি। পরীক্ষা পর্যন্ত তারা একটা মান্থলি অ্যামাউন্ট দিয়ে যাবে। আমার জন্য সেটা অনেক।'

তিনি একটু চমকালেন, 'কোন কোম্পানি বললে?'

'মাইক্রোসফট।' তিনি চশমা খুলে কাঁচ পরিষ্কার করে আবার চোখে ওঠালেন। ভাল করে দেখলেন ওকে। তারপর বললেন, 'তোমার অ্যাভারেজ রেজাল্ট কিরকম?'

'বাকি সেমিস্টারগুলোতে আমাকে কারো টপকাতে হলে দুটোর একটা ঘটতে হবে। হয় তাদেরকে খুব ভাল করতে হবে নয়ত আমাকে খারাপ করতে হবে।'

'তাহলে অফারটা নিচ্ছ?'

এখনো ঠিক করিনি। আরো কিছু অফার আছে। দেশেও আছে- বেশ কয়েকটা। তবে বাইরে গেলে মাইক্রোসফটের অফারটাই নেব। বছর দুতিন থেকে ফিরে আসব। আমার পরিবার ফেলে রেখে বেশীদিন থাকতে পারব না।

'বাবার পেছনে মেয়ের মুখ দেখা গেল। যথারীতি সেই স্পেশাল প্রীতি জিনতা হাসিটি ফুটিয়ে ডান হাতের দুই আঙ্গুলে একটা বিশেষ ভঙ্গী করল- যার অর্থ করা যায় কি দারুণই না দেখালে।'

পাঁচ.
ঈদের ছুটিতে সবাই মিলে তারা গ্রামের বাড়িতে যান। তার খুব ভাল লাগে। পুরনো বাড়িটা আগের মতই আছে। তার পাশেই বিরাট বাড়ি করে নিয়েছেন তিনি। ভাইবোন, তাদের পরিবারসহ সবাইকে নিয়ে থাকার মত বিশাল স্পেস, সব রকমের আধুনিক সুযোগ সুবিধাসহ গ্রামের মধ্যে রীতিমত রাজপ্রাসাদ বানিয়ে রেখেছেন। তবু এখানে আসলেই তিনি একবার ভাঙাচোরা টিনের পুরনো ঘরে ঢুকবেনই। এ পাশ থেকে ও পাশে যান আর স্মৃতিগুলো নিউরনের আনাচে কানাচে ধাক্কা খেতে থাকে। যথারীতি মাও আসেন। বাবার কথা মনে করে মাতাপুত্র চোখের জল ফেলে। মাকে এখন তিনি কত দামী দামী শাড়ি কিনে দেন। তবু মা বাড়ির তোরঙ্গে তুলে রাখা ছেলের দেয়া প্রথম শাড়িটা পড়েন সেদিন।

ধীরে ধীরে সব বোনেরাই আসে। কত ভাল ভাল ঘরে সবার বিয়ে দিয়েছেন তিনি। স্বামী সন্তান নিয়ে পরিপূর্ণ সংসার প্রত্যেকের। তবু এখানে এসে মাকেসহ ভাইবোনেরা ঘুরতে থাকে। পুরনো সময়ের গন্ধ শোঁকে। তার স্ত্রী সন্তান কিংবা বোনদের পরিবারের কেউ তাদেরকে বিরক্ত করে না। একসঙ্গে নির্বিঘ্নে কাটানোর সুযোগ করে দেয়। একসময় ধীরপায়ে বড়ভাইও এসে যোগ দেয়।

শুধু শেষ সময়ে প্রিয়ন্তী এসে মাকে ডেকে নিয়ে যায়। মায়ের পিছু পিছু চুপচাপ সব ভাইবোনেরা বেরোতে থাকে। রাজীব রায়হান তখন আর কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার রাজীব রায়হান নন, মায়ের আদরের ছোটবেলার ছোটন হয়ে যান।

বেরোতে বেরোতে তার মনে পড়ে অনেকদিন কবিতা লেখা হয় না। সময়, মানসিকতা কোনটাই আর আগের মত নেই। তিনি আবার লিখতে চান, কবিতা আসতে চায় না। অনেকদিন আগের পুরনো একটা কবিতার কথা মনে পড়ে। প্রিয়ন্তীকে যখন পড়াতেন তখনকার লেখা।

ঝরে যায় যত ছেঁড়াপাতা দিনগুলো
নিরুদ্ধ এই বুনো শহরের
বাতাসে জমেছে ধুলো
উড়ে চলে যাওয়া ক্লান্ত মেঘের
ছায়া এঁকে রাখা দিনে
নিজেকে জড়াই নিজেরই জমানো ঋণে
জোনাক ফোটানো অদ্ভুত কিছু
ছেঁড়াখোঁড়া রাত্তিরে
কত অনন্ত কালের পিপাসা
সখেদে রেখেছে ঘিরে
জীবনের সব চাওয়ার আড়ালে
দীর্ঘশ্বাসের ঝড়
বুকের পাতায় লিখে রাখে তার
আরক্ত অক্ষর

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement