লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ আগস্ট ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৪.২

বিচারক স্কোরঃ ২.৫৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকৈশোর (মার্চ ২০১৪)

কৈশোরের আত্নজীবনী
কৈশোর

সংখ্যা

মোট ভোট ১৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.২

মুশফিক রুবেল

comment ১১  favorite ০  import_contacts ১,২৬৮
নিশাচর কুহুক পাখির কণ্ঠে যখন অন্ধকারের গান,তখন সুদূর অতীত থেকে শরৎ এর মেঘের মতো ভেসে আসছে সাদা সাদা সুখে ভরা অম্লান শৈশব । কিভাবে আমি চার পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে দুপায়ে ভর করে উঠে দাঁড়ালাম আজ আর আমার মনে নাই । তবে সেদিন থেকেই শুরু পৃথিবীর পথ পরিক্রমায় আমার পদ চিহ্ন আঁকার । যেদিকে তাকাই সেদিকেই যেন কোয়াশায় ঘেরা রহস্য আর মুগ্ধতায় ভরা আমার দুচোখ । কোমল , স্নেহ মমতার পরশে থাকা আলিস্যি ভরা দিনগুলো ছেড়ে যখন উঁকি মারলাম পার্থিব জানালায় , দেখি চনমনে হলুদ রোদ্দুরে ছড়িয়ে আছে অসীম দুরন্তপানা, ঘর হতে বের হওয়ার প্রচ্ছন্ন হাতছানি, এসো হে নবীন, এসো পৃথিবীর প্রান্তরে , এসো দাগ রেখে যাও তোমার আগমনের । হাইস্কুলের বটবৃক্ষের মতো প্রবীণ শিক্ষক পন্দিতজি বলতেন,তুই এসেছিস ভবে ছাপ রেখে যারে বাছা, ছাপ রেখে যা । ক্লাসে চার সারি বেঞ্চের দুসারিতে মেয়েরা , দুসারিতে ছেলেরা , পণ্ডিতজি খেয়াল করেছেন পেছনের ফ্যা ফ্যা জগন্নাথ (শিক্ষকদের হাতে মার খেয়ে ফ্যা ফ্যা করে কেঁদে উঠত, তাই আমরা ওকে ফ্যা ফ্যা জগন্নাথ বলতাম) পাশের বেঞ্চের একটি মেয়ের সাথে কথা বলছে, কটমট তাকালেন পণ্ডিতজি , মেঘ হয়ে চলে গেলেন যথাস্থানে, হাতে জোড়াবেত,একটু পরেই নোনা বৃষ্টি নামবে । পণ্ডিতজি বললেন , “সীতারা দুই বোন “ ইংরাজী কর । জগন্নাথ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে আর মাথা চুলকাচ্ছে, পণ্ডিতজি সপাং সপাং করে বেত চালালেন আর জগন্নাথ ফ্যা ফ্যা শব্দে কুঁকড়ে উঠল। পণ্ডিতজি জিজ্ঞাসা করলেন, টেন্স বুঝিছ ? জগন্নাথ মাথা নিচু করে ফেললো, তা বুঝবা কেন ? তোমার তো বুঝার ফুটো বন্ধ হয়ে গেছে, তারপর চোখ ঘুরিয়ে মেয়েদের সারির সেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোরা আসিছ ওদের জন্য আর ওরা আসে তোদের জন্য, এই কথায় সমস্ত ক্লাস হো হো করে হেসে উঠলো আর পণ্ডিতজি নির্বিচারে বেত চালালেন। ওরা ওই বয়সেও প্রেম করতো আর আমি বিপরীত লিঙ্গের সাথে কথা বলতে গেলে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতো, মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতো, শরীর অবশ হয়ে যেতো। আমার এই অবস্থা দেখে পিনটুদা বলতেন, প্রতিদিন গ্লুকোজ খাবি আর পারিস তো দিনে দুইবার সালসা খাবি। তোর শরীরটা তো ভীষণ দুর্বল, মেয়েদের শরীরে যে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড আছে , তোর দুর্বল শরীরটা তা রিসিভ করতে পারে না, তোর এই সমস্যা আমি ঠিক করে দেবো। জানিস তো একটা কথা, “ভয় করলে ভয় ,ভরে দিলে কিসের ভয়? “ বলে, পিনটুদা হো হো করে হেসে উঠলেন। লজ্জায় আমার চোখ মুখ লাল হয়ে গেল, পিনটুদা বুঝে ফেলেছেন, আরে বোকা এতো লজ্জা পেলি কেন, ওই গল্পটা শুনেসিছ না?, “এক গ্রামে ছিল এক পাগল । প্রায়ই সে বাজারে এসে ঘোরাঘুরি করতো আর পাগলামি করতো আর বলতো ভয় করলে ভয় ভরে দিলে কিসের ভয়। একদিন এক মিষ্টির দোকানের সামনে কড়াইতে রসগোল্লা রাখা আছে, তো দোকানে গিয়ে পাগলটি কড়াইয়ের দিকে হাত বাড়াতেই দোকানি ভয় দেখিয়ে বলল হাত দিও না,গরম কিন্তু, হাত পুড়ে যাবে। পাগলটি হেসে উঠে বলল জানিস না ভয় করলে ভয় ভরে দিলে কিসের ভয় বলেই কড়াইয়ের ভিতর হাত ভরে দিলো। ” কেউঁ কথা রাখেনি, পিনটুদা ও কথা রাখেনি, তাই আমি ভয়কে জয় করতে পারি নাই।
ইউনিভার্সিটির প্রথম দিনে একটি বিব্রতর ঘটনার মুখোমুখি হলাম, আমার ক্লাস দুই তলায় , ঘোরানো সিঁড়ি একতলা থেকে দুইতলায় উঠে গেছে,আমি উঠছি একতলা থেকে দুইতলায় ,সিঁড়ির অন্যপ্রান্তে দুইতলা থেকে নেমে আসছে একটি সুন্দরী মেয়ে, মেঘের মতো চুল, সাগর দুটি চোখ, কমলা লেবুর কোয়ার মতো ঠোঁট, রাজহংসীর মতো সে খুব দ্রুত নীচে নেমে আসছে । হঠাৎ , পায়ের স্যান্ডেল ছিড়ে যেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো আমার উপর, আকস্মিক আসা ধাক্কা সামলাতে না পেরে আমি গড়াতে গড়াতে গিয়ে পড়লাম সিঁড়ির নীচে, আমার বা পায়ের হাড় ভেঙ্গে গেল , ঈশ্বরের কৃপায় তার কিছুই হলো না। কয়েকজন মিলে ধরা ধরি করে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলো, সেই দলে উনি ও ছিলেন, আমাদের দুই ইয়ারের সিনিয়র নিতু আপা। একমাস হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে হলো। ইউনিভার্সিটি মেডিকেলের কেবিনের বিছানায় শুয়ে শুয়ে বলতে গেলে ত্রিশ দিনের এক একাকী জীবন কাটিয়ে দিলাম কেননা ঢাকা শহরে আমি নতুন এসেছি, আমার কোন বন্ধু নাই, আত্নীয় নাই। কলেজের এক বড় ভাই রাত্রে থাকেন, সকালে আমার প্রাতরাশ সারিয়ে বের হতেন তার কাজে। আর আমি সারাদিন নিজের সাথে কাটিয়ে দিতাম। প্রতিদিন এক পশলা বৃষ্টির মতো নিতু আসতো অপরাধ বোধ নিয়ে। তারপর, এখন তোমার কি অবস্থা? ওষুধপত্র ঠিক মতো খাচ্ছ? ইত্যাদি টাইপ ফরম্যাল কথা বলে দুঃখবোধ, অপরাধবোধ জানিয়ে চলে যেতো, প্রতিদিনই হাতে করে কিছু ফলমূল আর উপন্যাস, প্রবন্ধের বই নিয়ে আসতো আমার জন্য। একটি হলো দেহের স্বাস্থ্যের জন্য অন্যটি মনের, তারপর সিলভার কালারের প্রাডো গাড়ীতে চড়ে সাই করে হারিয়ে যেতো সারা দিনের মতো। অলস দুপুরে শুয়ে শুয়ে হারিয়ে যেতাম দুরন্ত কৈশোরের সেই দুপুর গুলোতে। বাসায় নিয়ম ছিল দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমাতে হবে, তারপর বিকালে ঘুম থেকে উঠে নীচে খেলতে যেতাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। সেই অলস দুপুরে আম্মা যখন ঘুমাচ্ছেন, বোন যখন ঘুমাচ্ছে ,নীচে ক্লান্ত পায়ে ফেরীওআলারা তখনও ডাক ছাড়ছে কেওবা “লেইসফিতা লেইস ”, কেওবা “হাওয়ায় মিঠে”, আরো কত কি, বাহিরে যাওয়ার জন্য মনটা ছটফট করতে থাকতো, চুপি চুপি চেয়ার এনে দরজার উপরের সিটকানি খুলে নীচে চলে যেতাম। কোয়ার্টারের সারি সারি বিল্ডিং এর সামনে পিছে , ডানে বায়ে মাঠ আর মাঠ, যেন তেপান্তরের মাঠ, ঝা ঝা হলুদ রোদ্দুরে গ্যাস বেলুনের মতো উড়ে বেড়াতাম, কখনও ফড়িং ধরায় ব্যাস্ত কখনও প্রজাপতি, দুপুরের ক্লান্ত পথ ঘাটে যখন শূন্যতা নেমে আসতো তখন আমার মতো কিছু ঘর পালানো কিশোর রঙিন ঘুড়ি উড়িয়ে দিতাম নীল আকাশে, কখনও দৌড়াচ্ছি , কখনও খেলছি, তারপর সন্ধ্যায় কোয়ার্টারের বন্দী খাঁচায় প্রত্যাবর্তন। মায়ের শাসন মানে ছিল পায়ের স্যান্ডেল দিয়ে অভ্যর্থনা। কেঁদে কেটে অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে থাকতাম ব্যালকনিতে আর নীচে বয়ে যেতে দেখতাম জীবনের স্রোত, বাইরেটা কি ভীষণ বড় আর রহস্যে ঘেরা, বাইরেটা বড্ড মায়াবী কোয়াশায় ঘেরা ভালো লাগা।

নিতু যেমন সুশ্রী তেমনি ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন । ওর সামনে আমি কুঁকড়ে যেতাম। ওর বই এর রুচিটা আমার বড় ভালো লেগেছিল। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে মনে হতো হুমায়ন আহমেদের শুভ্র উপন্যাসের শুভ্রের মতো যেন পড়ার জন্যই জন্ম হয়েছে । আলবেয়ার কামুর “দ্যা আউটসাইডার ” পড়ে মনে হয়েছিল এই উপন্যাসের নায়কের মতো আমার ও বোধ হয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ অনেক কম। প্রায় পনেরদিন হয়ে গেল আমি হাসপাতালের বিছানায়, হঠাৎ করেই জ্বরে পড়লাম, প্রবল জ্বর। জ্বরের ঘোরে শূন্যতা মিশে যেয়ে আমাকে যেন নেশায় আচ্ছন্ন ঘোরের মধ্যে নিয়ে গেল।স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগারডের “নেশা” উপন্যাসের নায়কের মতো আমি ও কাল মাত্রার ছাড়পত্র নিয়ে হারিয়ে গেলাম সুদূর অতীতে। নেশা উপন্যাসের নায়ক অ্যালান কোয়ার্টারমেইন মধ্য আফ্রিকায় পাওয়া এক প্রকার শেকড়-তাদুকির নেশায় হারিয়ে গিয়েছিলো হাজার হাজার বছর আগের আদিম পাথুরে যুগে, বাসা বেঁধেছিল ওয়াই নামে এক আদিম মানুষের দেহে। আমি জ্বরের ঘোরে হারিয়ে ছিলাম মরুভুমির এক রুপালী রাত্রে। বাঁধভাঙা চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে মরুভুমির সমস্ত চরাচর , কোথাও কেউ নাই, শুধু আমরা দুজন শুভ্র সাদা পোশাকে, মাথায় নানা রঙএর পাথর খচিত মুকুট পরিহিত রাজকন্যার হাত আমার হাতের মধ্যে খেলা করছে , নগ্ন পায়ে দুজন হাঁটছি মরুভূমির বালিতে রাতের অভিসারে, মৃদু সমীরণে ছুয়ে যাচ্ছে ভালো লাগা শিহরণ। হঠাৎ একদল বর্গী ঘোড়ায় চড়ে টগবগিয়ে এলো, ওরা রাজকন্যাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, আমি প্রাণপণ ছুটছি ওদের পেছনে, সহসায় ম্যানগ্রোভে জংগলের মতো খাড়া খাড়া গুল্ম জাতীয় শেকড় কাঁটার মতো ফুঁড়ে উঠছে মরুভুমির প্রান্তরে , আমি তার উপর দিয়ে ছুটছি আর আমার পা খত বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে, আমি চিৎকার করছি নিতু নিতু বলে। আমার ঘোর ভেঙে গেছে, আমি ঘামে ভিজে নেয়ে উঠেছি, আমার পাশে বসে আছে নিতু, সামনে দাড়িয়ে আছে ডাক্তার আর দুজন নার্স। ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন , নিতু বলে চিৎকার করছিলে , নিতু কে? পাশে বসা নিতু যেন লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সেই রাতে নিতু থেকে গেল হাসপাতালে, নিতু হঠাৎ করে খোলস ছেড়ে বের হলো, আমাদের যেন অনেক দিনের পরিচয়, মনের গহীনে যেন লুকিয়ে ছিল এই পরিচয়।
আমরা ছিলাম নদীর বাঁকে ঘূর্ণিপাকে সন্ধ্যাবেলা
নিষিদ্ধ দেশ, ভাঙা মন্দির, দুচোখে ধোঁয়া
দেবী মানবীর প্রথম দ্বিধা, প্রথম ছোঁয়া, আমৃত্যু পণ
গোপন গ্রন্থে এক শিহরন, কৈশোরময় তুমুল খেলা . . .
লুকোচুরির খেলা শেষে কেউ কারুকে খুঁজে পাইনি
দ্যাখো সে মুখ, চোরা চাহনি
একই আয়না
চিনতে পারো না?
(সুনীল গঙ্গাপাধ্যায়) নিতু আমার কপালে জলপট্টি দিচ্ছে, শরৎ এর নায়িকার মতো সারা রাত আমার শিহরে বসে থাকলো নির্ঘুম। বাইরে নিতুর প্রাডো গাড়ী দাড়িয়ে, ড্রাইভার বোধ হয় ঘুমাতে পেরেছিল গাড়ীর ভিতর। মাঝরাতের দিকে আমার জ্বর ছেড়ে দিলে আমি উঠে বসলাম, আমার তখন বেশ ভালো লাগছিলো, নিতুর সাথে গল্প করতে ইচ্ছা করছিলো, নিতুকে বললাম চা খেতে ইচ্ছা করছে, নিতু ওর ব্যাগ থেকে একটি ছোট ফ্লাস্ক আর দুটি কাপ বের করলো, তারপর চা ঢেলে আমার হাতে ধরিয়ে দিলো। তুমি কি রাতে থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলে? ও সহজভাবে বলল হ্যাঁ, তুমি জ্বরে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে হাসপাতাল থেকে আমাকে ফোন করেছিলো। বাসা থেকে কোনো সমস্যা হবে না? নিতু বললো আমার দাদু ও তো এসেছিলেন, তোমার তখন জ্ঞান ছিল না, উনি চলে গেছেন গাড়ী আর ড্রাইভার রেখে, আসলে আমাদের ড্রাইভার বজলু চাচু অনেক পুরানো লোক, উনি ভীষণ কাজের মানুষ, অনেকটা আলাউদ্দিনের দৈত্যের মতো উনাকে দিয়ে অনেক কিছুই করানো যায়, আর দাদু সেই দায়িত্ব দিয়েই তাকে রেখে গেছেন। এখন তোমার কিছু খেতে ইচ্ছা করছে বলো, উনাকে দিয়ে আনিয়ে দেবো। হ্যাঁ, আমার কাচ্চি বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছা করছে আর লন্ডন ফাইভ সিগারেট এবং কফি। নিতু ফোন করে দিলো ড্রাইভার বজলু মিয়াঁকে, আধাঘণ্টার মধ্যে ব্যাবস্থ্যা হয়ে গেলো। খাওয়া শেষে নিতু আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, তখন তুমি ঘুমের মধ্যে নিতু নিতু বলে চিৎকার করছিলে কেন? আমি চুপ করে রইলাম, খানিক পর ও আবার এই প্রশ্ন করলো, আমি তখন ওকে সবই বললাম, ও আমার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো, নিতু নিজে ও গত রাতে এই স্বপ্নটি দেখেছিলো, নিতুর শরীর শিউরে উঠলো, স্বপ্নের এতটা মিল কিভাবে হতে পারে। পরদিন সকালে নিতু চলে গেলো আর পর পর দুই তিন দিন এলো না, তারপর একদিন এসে অনেকক্ষণ থাকলো, তারপর আমার দুই হাত ধরে ক্ষমা চাইলো। এদিকে বাড়ী থেকে আমার ছোট চাচু এসেছেন, উনি চিরকুমার, জীবনের অর্ধেকটা উনি দেশ ভ্রমণ করে কাটিয়েছেন, অদ্ভুত ভবঘুরে স্বভাবের মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষে স্কলারশিপে পাড়ি জমান মার্কিন মুল্লুকে,সেখানেই থেকে যান এক যুগেরও কিছু বেশি সময়,সেখানে আমেরিকান হিপ্পিদের সাথে কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়। হিপ্পি পোয়েট আলেন গিন্সবারগের সাথে তার সখ্যতা ছিলো, এই হিপ্পি পোয়েট ৭০ এর দশকে ভারতে এসেছিলেন,তারপর ১৯৭১ বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের ডামাডোল তখন তিনি রচনা করেন ,“সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড ” । ছোট চাচু ভারতীয় সাধু কালচারের সাথেও কিছুটা সময় কাটিয়েছেন, তাই উনার স্বভাবের মধ্যেও খানিকটা সেইন্ট সেইন্ট ভাব চলে এসেছে। উনার একটি গবেষণাপত্র পাশ্চাত্যে খুব সমাদৃত হয়েছিলো। গবেষণার বিষয় ছিল , “মানুষের কি ইচ্ছার স্বাধীনতা আছে? নাকি মানুষ নিয়তি তাড়িত”। গবেষণাপত্রে উনি দেখিয়েছেন যে, “মানুষের আকাঙ্খাই এক প্রকার কার্যকারণের বৃত্ত তৈরি করে। আর এই বৃত্ত থেকে মানুষ সহজে বের হতে পারে না, যা তাকে অদৃশ্য শেকলের মতো আবদ্ধ করে রাখে, তার ফলে মানুষ নিয়তি তাড়িত হয়ে ওঠে। মানুষ ইচ্ছার স্বাধীনতা অর্জন করে তখনই যখন সে আকাঙ্খা শূন্য হতে পারে, আর এই আকাঙ্খা শূন্য অবস্থা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলাফল।”

খুব জড়সড় হয়ে ছোট চাচু কে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম চাচু আপনি তো দর্শন এর উপর গবেষণা করেছেন, আপনি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে কিভাবে দেখেন? চাচু তখন মৌন ছিলেন , মাঝে মাঝে উনি ভীষণ রকম মৌন হয়ে যান , তখন আর সাহস হয় না আবার প্রশ্ন করার। বিকালে আমি ঘুম থেকে উঠার পর ছোট চাচু আমাকে একটি অদ্ভুত ধাঁধাঁর গল্প বললেন, একজন ধনবান লোক মারা যাওয়ার আগে তার সম্পদের বিভিন্ন অংশ উইল করে গেছেন তার তিন ছেলের নামে। উইলে তিনি তার সম্পদ বিভিন্ন অনুপাতে তার ছেলেদের মধ্যে ভাগ করেছেন, কাউকে ক্যাশ টাকা বেশি দিলেন, কাউকে জমিজমা বেশি দিলেন, কাউকে সোনাদানা বেশি দিলেন। তো তার ছিল সতেরোটি উট, তিনি তার বড় ছেলেকে মোট উটের ১/৩ অংশ, মেজো ছেলেকে ১/২ অংশ, ছোট ছেলেকে ১/৯ অংশ উইল করে গেছেন। কিন্তু একটা শর্ত দিয়ে গেছেন , শর্তটি হলো প্রত্যেকেই পাবে জীবিত উট, মেরে কেটে ভাগ করা যাবে না। ভদ্র লোক মারা যাওয়ার পর ছেলেরা তাদের সম্পদ বাবার উইল অনুযায়ী ভাগ পেলো, কিন্তু সমস্যা হলো উট ভাগ করতে যেয়ে। উট আছে ১৭ টি, বড় ছেলে যেহেতু ১/৩ অংশ পাবে অর্থাৎ সে পাবে ৫।২/৩ টি উট , মেজো ছেলে ৮।১/২ টি উট এবং ছোট ছেলে ১।৮/৯ টি। কিন্তু ভদ্র লোক শর্ত দিয়েছিলেন কেটে ভাগ করা যাবে না, জীবিত ভাগ করতে হবে, অর্থাৎ প্রত্যেকে পাবে পূর্ণ সংখ্যা। তাদের বাবা বলে গেছেন যে, সম্পদ ভাগ করতে যেয়ে কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে জনৈক জ্ঞানী ব্যাক্তির শরনাপন্ন হতে। জ্ঞানী ব্যাক্তি ছেলেদের সমস্যার কোথা মন দিয়ে শুনলেন। উনারও অনেকগুলো উট ছিল, তার থকে একটি উট তাদের ১৭ টি উটের সাথে দিলেন, এখন হলো মোট ১৮ টি উট। তারপর উনি উইল অনুযায়ী ছেলেদের মধ্যে উট ভাগ করে দিলেন। বড় ছেলে মোট উটের ১/৩ অংশ অর্থাৎ ৬ টি পেলো, মেজো ছেলে ১/২ অংশ অর্থাৎ ৯ টি উট এবং ছোট ছেলে ১/৯ অংশ অর্থাৎ ২টি উট পেলো, এখন দেখা গেলো ছেলেরা তার বাবার রেখে যাওয়া ১৭ টি উটই পেলো, ৬+৯+২=১৭, এবং জ্ঞানী ব্যাক্তি তার উটটি নিয়ে নিলেন। ছোট চাচু বললেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব হচ্ছে জ্ঞানী ব্যাক্তির ওই উটের মতো, ঈশ্বরের অস্তিত্ব ছাড়া মানুষ হচ্ছে ওই ১৭ টি উটের মতো। মানুষ হলো অপূর্ণ সংখ্যা, ঈশ্বরের অস্তিত্ব তাকে পূর্ণ করে।
রাতে আবার সেই দুঃস্বপ্নটি দেখলাম, স্বপ্নের ভিতর থেকে আমি নিতু নিতু বলে চিৎকার করে উঠলাম। ছোট চাচু চেয়ারে আমার সামনে বসা, ক্ষণকাল স্বপ্নভঙ্গ অবস্থায় তার চোখে তাকিয়ে দেখলাম তার দৃষ্টি যেন আমার ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। কিছুক্ষন চুপ থেকে বললেন, নিতু কে? আমি খানিক্ষন নীরব থাকলাম, তারপর নিতু সম্পর্কিত সব কিছুই বললাম। পরদিন সকালে নিতু এলো। আকাশী রঙের শাড়ীতে ওকে দারুন মানিয়েছে, খোঁপায় বেলী ফুলের মালা। ছোট চাচুর সাথে নিতুর পরিচয় হলো । নিতু চলে যাওয়ার একটু পরে ছোট চাচু ও বের হলেন।তারপর সারা দুপুর আমি একলাই রইলাম। বিকালের সোনা রোদে পৃ থিবী যখন হাসছে, তখন আমার মুখে ও বোধ হয় সুখের আবেশ। নিতুর ভাবনায় আমি সুখ অনুভব করছিলাম, আমার বার বারই মনে হচ্ছিলো ও আমার জন্য শাড়ী পরে সুন্দর করে সেজে এসেছিল, ওকে অনিন্দ্য সুন্দর লাগছিলো, হঠাৎ ছোট চাচুর কথায় আমার ঘোর ভাঙল, কখন যে উনি এসে বিছানার পাশে রাখা চেয়ারে বসেছেন, আমি বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ অন্তর্যামীর মতো বললেন, তুমি বোধ হয় মেয়েটির শাড়ী পরে আসার ব্যাপারটা এখনও ভাবছ। আমি খুব চমকালাম ! আমতা আমতা করে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কিভাবে বুঝলেন, আপনি কি থটরিডিং জানেন? ছোট চাচু আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তোমার কি মনে হয়? আপনার ভিতর কোন অলৌকিক ক্ষমতা আছে। তারপর উনি নিজেই বললেন, থটরিডিং কোন অলৌকিক ব্যাপার নয়, এটা হচ্ছে অনেকটা দুয়ে দুয়ে চার মেলাবার মতো ব্যাপার, সম্পূর্ণটাই অবজারভেসনের ব্যাপার। মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় হচ্ছে চোখ, কান,নাক,মুখ আর ত্বক। এগুলোর ব্যাবহারের ফলে মস্তিস্কে আমরা তথ্য প্রেরণ করি আর তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে আমাদের এক প্রকার অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়, যা তথ্য উপাত্তকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুয়ে দুয়ে চার মেলাবার যে ক্ষমতা যোগায়, তাই হচ্ছে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। এই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মানুষের কোন অলৌকিক ক্ষমতা নয়, বরং তা মানুষের স্বাভাবিক লৌকিক ক্ষমতা। তারপর উনি ক্ষণকাল চুপ করে থাকলেন, আমার মনে হতে লাগলো সারা পৃথিবীই বোধ হয় শব্দহীন হয়ে গেছে।
পরের দিন হাসপাতাল থেকে আমাকে রিলিজ দিয়ে দিলো। দীর্ঘ একমাস পরে হাসপাতাল থেকে বাইরে এসে আমার মনটা রঙ্গিন প্রজাপতির মতো উড়তে লাগলো। ফাগুণের মাতাল হাওয়ায় চারিদিকে মাতোয়ারা। বিকালে টি, এস, সি অডিটোরিয়ামে চলচিত্র উৎসবে নিতুর সাথে অ্যানিমেটেড সিনেমা দেখলাম, মুভির নাম “ওয়ালি এন্ড ইভা” দুটি রোবটের প্রেম কাহিনী। আমার এটা ভেবে ভালো লাগছিলো যে পা টি ভেঙ্গেছিল বলে নিতুর সংস্পর্শে আসতে পেরেছি। পরদিন নিতু আমাকে একুশের বই মেলায় নিয়ে গেলো, এই মেলায় আমি প্রথম এসেছি শুনে নিতু আমাকে এতো বই উপহার দিলো দিলো যে আগামী পাঁচ বছর লাগবে শেষ করতে , এরকম উপহার কেউ দিতে পারে আমি ভাবতেও পারিনি, সত্যি আমি খুব খুশি হয়েছিলাম, জীবনে আমি এত খুশি কখন ও হইনি। পরের দিন বিকালে ফুচকা খেলাম, রিক্সায় ঘুরলাম, রিক্সায় ঘুরতে নাকি ওর ভালো লাগে, জ্যামে পড়লে ও ভালো লাগে? ও বলেছিল জ্যামে পড়লে মানুষ দেখবা, কার মনের অবস্থা কেমন বোঝার চেষ্টা করবা, মানুষের মন বোঝা খুব কষ্টের কাজ, কিন্তু শারলক হোমস কিভাবে যেন বুঝে ফেলত, অনেক সাধক টাইপ লোক ও নাকি মানুষের ভাবনা ধরে ফেলতে পারেন, আসলে অ্যানালিটিকাল প্র্যাকটিস মানুষের সেন্স আর উপলব্ধি কে বাড়িয়ে দেয়, তাই হয়ত কেউ কেউ মাঝে মাঝে অনেক কিছু বুঝে ফেলেন, যেটা প্রত্যক্ষ জ্ঞান নয়, কিন্তু পরোক্ষের চেয়ে বেশি। বেশ ভালো বললে তো, তোমার ইচ্ছাটাকে তুমি যুক্তিসিদ্ধ করেছ দর্শনের মতো।
এভাবেই চলতে লাগলো আমার দিবা রাত্রির কাব্য, কিছুদিন পর আমার মনে হলো আমাদের সম্পর্কটায় ভালো লাগা আছে কিন্তু কোন দাবি দাওয়া নেই। নিতু সারাদিন আমার সাথে থাকবে কিন্তু ও সবসময় চেয়েছে ওই গানটার মতোঃ-
আকাশটা আজ বড়ই নীল,
আজ আমায় পিছু ডেকো না,
যে রঙ তোমার চোখে সামিল,
সে চোখ ভিজিয়ে দিও না,
বন্ধু তোমার আমি তাই
অন্য দাবি রেখো না।
ডেকো না ।।
বন্ধুত্বের হয় না পদবি,
বন্ধু তুমি কেঁদো না,
বন্ধু সবুজ চিরদিন,
বন্ধুত্বের বয়স বাড়ে না,
বন্ধু তোমার আমি তাই
আত্নীয়তাই বেঁধো না।
কেঁদো না।।
হয়তো তোমার আনলায়,
থাকবে না আমার জামা,
ঝুলবে না তোমার বারান্দায়,
আমার পাঞ্জাবী, পাজামা,
তবুও মনের জানালায়,
অবাধ আনাগোনা
দুজনায়।।
হঠাৎ চায়ের সুগন্ধে,
হঠাৎ কোন বই এর পাতায়,
হঠাৎ মনের আনন্দে,
আপন মনে কবিতায় ,
হঠাৎ খুঁজে পাওয়া সুখ,
চার দেয়ালে বেঁধো না।
ধরে রেখো না।।
আকাশ হয়ে যাবে ফ্যাকাশে,
তবু আমাদের ঘুড়ি
উড়বে মনের আকাশে,
অনন্ত ছেলে মানুষী ,
সেই ছেলেমানুষীটাকে
অন্য নামে ডেকো না,
পিছু ডেকো না।।
(অঞ্জন দত্ত)
নিতুর ভাবনাকে মাঝে মাঝে মেনে নেই, কিন্তু মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে মন, মনের ভিতর আমার তখন তোলপাড় শুরু হয়, নিতুর উপর আমার কোন অধিকার থাকবে না তা কি করে হয়? তাই একদিন নিতুকে আমি চিঠি লিখতে বসলাম আমার ভালো লাগা, ভালোবাসার কথা জানাতে,
তোমায় ভালবাসি যে স্বাতি ,
তোমার বুকের মধ্যেও কি হাওয়া ঘুরে উঠেনি,
হৃদয়ে ভালবাসার বৃষ্টি ঝরেনি?
চাদনী পসর রাতে বুঝিবা কথা শেষ হয়নি,
অলসদুপুরেও তাই গল্পমুখর তুমি,
আর বিকাল ফুরানো চোখাচোখি,
তোমায় ভালবাসি যে স্বাতি।।
তোমার শরীরেও কি বিদ্যুৎ খেলা করিনি,
যেদিন আমরা কটিদেশ ছোঁয়া ছোয়ি করে,
প্রথম রিক্সা চড়েছিলাম।
তোমার হাতে হাত রেখে ,
তেত্রিশ হাজার ভোল্টের ট্রান্সফরমার হয়েছিলাম,
চোখে চোখ রেখে লোডশেডিং থামিয়ে ছিলাম।
সেদিনই প্রথম অশরীরি প্রেমকে
শরীর ছুয়েছিল,
তবুও শরীরের শুচিবায়ুতে লাগেনি,
তোমায় ভালবাসি যে স্বাতী।।
ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড দিয়ে ,
হৃদয়কে শরীর বলেছিল
এ দাবি তার পৃথিবীর শুরু থেকে,
এ যে প্রনয়ের দাবি,
অশরীর থেকে জার জন্ম,
তোমায় ভালবাসি যে স্বাতী।।
যার বসতি হৃদয়ের পললভুমিতে,
আর শরীরে কেবল পথ চলা
হানাদার প্রেমিকের,
তোমায় ভালবাসি যে স্বাতী।।
চিঠি লিখতে যেয়ে লেখা গুলো কেমন ছন্দহীন গদ্য কবিতার মতো হলো , মস্তিস্ক আমার কথগুলো কে এইভাবে ওলট পালট করে সাজিয়ে দিলো , তবে তাই হোক, আমি নিতুকে চিঠিটি দেয়ার জন্য ছট ফট করতে লাগলাম, অবশেষে জীবনানন্দের একটি কবিতার বই এর ভিতর যেদিন চিঠিটি দিলাম(নিতু চিঠিটি তখন পড়েনি, কারণ ও জানে না বই এর ভিতর একটা চিঠি আছে, চিঠি সমেত বইটি ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে রাখলো) আমি ভাবতে পারিনি সেদিনই ও আমাকে ওর বিয়ের নিমন্ত্রন জানাতে সাত সকালে আমার হলে এসেছে। তারপর ও চলে যাওয়ার পর আমি ও বের হয়ে পড়লাম পৃথিবীর পথে . . . মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে সুনীলের কবিতা,
আমি কিরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ
এই কি মানুষজন্ম নাকি শেষ
পুরহিত কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধ্যেবেলা
আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা
করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে
থাকি- তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। আমি আক্রোশে
হেসে উঠি না, আমি ছারপোকার পাশে ছারপোকা হয়ে হাটি,
মশা হয়ে উড়ি একদল মশার সঙ্গে ; খাঁটি
অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব মধ্যে ডুব দিয়ে দেখেছি দেশলাই জ্বেলে-
(ও-গাঁয়ে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই !)

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement