মিঠাপুরের হাড়িভাঙা

রহস্য (এপ্রিল ২০২৬)

মাহাবুব হাসান
  • 0
  • 0
এক.

নাহ্‌! লোকটা আজও আসে নি। বাজারের এ-কোণা ও-কোণা তন্য তন্য করে খুঁজলাম, কোথাও নেই! আজ নিয়ে তিনদিন ধরে তাকে খুঁজছি।

লোকটার নাম জানা হয় নি। আম বিক্রেতা। কাঁচা বাজারের সাথের গলিতে তাকে পেয়েছিলাম ৪/৫ দিন আগে।

বাজারে ফলের দোকানগুলোতে এখন আম-কাঁঠালের ছড়াছড়ি। রাস্তার ধারে ভ্যানে করেও বেচে অনেকে। তবে লোকটি রাস্তায় বসেছিল ঝুড়ি নিয়ে। গোলগাল চেহারার মাঝবয়সী লোক, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সারাক্ষণ পান চিবোয়। দোক্তা-খয়েরে ঠোঁট-দাঁত লাল হয়ে গেছে। লোকটার ব্যাপারে অনেককেই জিজ্ঞেস করলাম। কেউই হদিস দিতে পারল না।

আশ্চর্য ব্যাপার! চেহারার বর্ণনা শুনে কেউ স্পষ্ট বলতে পারছে না এমন কাউকে তারা গত কয়েকদিনে এখানে আম বেচতে দেখেছে!

আমার মতোই বাসার অন্য সবার আমটা খুব প্রিয়। বাসার গলিতেই প্রচুর আম বিক্রি হচ্ছে। দামটাও একটু কম। ফলে বাসায় আম বেশ চলছে। কেউ কেউ বলে আমি হঠাৎ করেই যে একটু ফুলে গেছি তার কারণ নাকি আম! তা কারণ যা-ই হোক, আম ছাড়া আমার চলেই না, হা হা হা!

বাসার নিচ থেকেই আম কেনা হয়। সেদিন অফিস থেকে একটু বড় বাজারে গেছিলাম। আতিয়া বাজার। ওখানে মাছ বেশ সস্তা। কিনেটিনে ওয়াটার বাসে করে বাসায় ফিরব, সামনে পড়ল সেই আমওয়ালা। ঝুড়িভর্তি কালচে সবুজের ওপর ছাই রঙের লম্বাটে আম। হাড়িভাঙ্গা- আমের নাম শুনে ক্ষেপে গেলাম। আমি হলাম ম্যাঙ্গো-এক্সপার্ট; আমাকে চেনাচ্ছে হাড়িভাঙ্গা আম! লোকটা অমায়িক হেসে বলল, “এইটা মিঠাপুরের হাড়িভাঙ্গা!”

বোকা বানাচ্ছে ভেবে বাড়ির পথ ধরছি, লোকটার পিছুডাকে ফিরলাম

“মামা! একবার নিয়া দ্যাখেন, এরপর থিকা আমারে বিছরাইবেন!”

‘বিছরানো’ শব্দটার সাথে পরিচয় আছে। আঞ্চলিক শব্দ, অর্থ হলো খোঁজা। এই আম খেলে নাকি লোকটাকে খুঁজব আবারো কেনার জন্যে! মার্কেটিং ডায়ালগ জেনেও কেজি দুই কিনলাম। দাম তো আহামরি বেশি না! হলো না হয় একটা নতুন স্বাদ আস্বাদন।

লোকটা এক বর্ণও ভুল বলে নি! আমার জীবনে এখন পর্যন্ত খাওয়া বেস্ট আম! এরপর থেকেই লোকটাকে প্রতিদিন খুঁজে ফিরছি। ঘুরপথে বাসায় যেতে সময় এবং পয়সা নষ্ট হওয়া সত্ত্বেও।


দুই.

অফিসে কাজ করতে করতে নিজেদের মধ্যে কিছু আলাপসালাপ গালগল্প তো হয়ই! তো আজ একথা ওকথায় উঠল আম প্রসঙ্গ। কার কোন জাতের আম ভালো লাগে- কেউ বলছে হিমসাগর, কেউ ল্যাংড়া, কেউ আম্রপালি। আবার কেউ হাড়িভাঙ্গা।

“আমারো হাড়িভাঙ্গা প্রিয়; তবে চাঁপাই কিংবা রাজশাহী হলে হবে না, মিঠাপুরের হতে হবে!”

চোখ নাচিয়ে রসিয়ে রসিয়ে বললাম কথাগুলো। বলার ধরণে সবাই ফিক করে হেঁসে দিল। কিন্তু রফিক ভাই কেন জানি চমকে উঠলেন।

রফিক ভাই বয়সে আমার চেয়ে দুই বছরের বড়, তবে পদবিতে আমার জুনিয়র। আমার আগে জয়েন করেছিলেন, কিন্তু প্রমোশন না পেয়ে পেয়ে একটু পিছিয়ে গেছেন। মাস ছয় হলো হেড অফিসে এসেছেন। কেমন চুপচাপ স্বভাবের। এতদিনেও ডিভিশনের কারো সাথে ভাব হয় নি। হবে কীভাবে, কারো সাথেই তো মনখুলে কথা বলে না! শুরুতে দুয়েক দিন যেচে গিয়ে কথা বলেছি। রসকষহীন মানুষ, আলাপ বেশিদূর গড়ায় নি। ভীষণ ভুলোমনা। এখনো বিয়ে করেন নি, থাকেন ব্যাচেলর মেসে।

ভদ্রলোক আজ এতদিন বাদে যেচে আমার সাথে কথা বলতে এলেন দেখে অবাক হলাম। ক্যান্টিনে খাচ্ছিলাম, আমার পাশে এসে বসলেন। খেতে খেতে কথা হচ্ছিল। বেশিরভাগ কথা আম নিয়ে! আমের ব্যাপারে ওনার এত ইন্টারেস্ট কেন ভেবে পাচ্ছিলাম না।

অফিস শেষ পাঁচটায়। হাতের কাজ সারতে সারতে সাতটা বেজে গেল। আমাকে উঠতে দেখে রফিক ভাই এগিয়ে এলেন।

“মাহাবুব ভাই! চলেন আপনাকে এগিয়ে দেই”

আবারো অবাক হলাম। উনি মোটর বাইকে যাতায়াত করেন। আজ অব্দি কাউকে লিফট দিতে দেখি নাই। আজ যেচে লিফট দিতে চাইছেন। ওনার কাজ শেষ হয়েছে আরো আগে। এতক্ষণ তাহলে আমার জন্যেই অপেক্ষা করেছেন। লোকটার মতলব কী?

“কিন্তু আমি তো এখন বাসায় যাব না, আতিয়া বাজারে যাব”
“জানি! আমার বাসা বাজারের পাশের গলিতেই তো!”

আগ বাড়িয়ে লিফট দিতে চাইছে; মন্দ কী! একটু ফ্রি রাইড হলো, পয়সা সময় দুটোই বাঁচল। উঠে বসলাম রফিক ভাইয়ের বাইকের পেছনে। মন্দ চালান না! অল্প সময়েই বাজারে পৌঁছে গেলাম।

নাহ্‌! লোকটা আজও আসে নি… আজ নিয়ে তিনদিন ধরে তাকে খুঁজছি…

মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

“জানেন রফিক ভাই, বাজারে এত আম, কিন্তু কোনটাতেই স্বাদ পাই না! এজন্যেই এই আমওয়ালারে খুঁজতেছি... আজ তিন দিন ধরে…”
“আর আমি খুঁজছি তিন বছর ধরে!”

চমকে উঠলাম কথাটা শুনে। মানে কী!

রফিক ভাই দীর্ঘ আলাপে যা জানালেন তার সারসংক্ষেপ হলো- বছর তিনেক আগে তিনি প্রথম এই আম খান। মিঠাপুরের হাড়িভাঙ্গা।

বিক্রেতার চেহারার যা বর্ণনা দিলেন তাতে খাঁপ খাঁপ মিলে গেছে! এ সেই লোক, যার থেকে আমি আম কিনেছি তিন দিন আগে।

“মিঠাপুরের হাড়িভাঙ্গা আম, একবার খাইলে বিছরাইবেন…”

আমি উনাকে বিছরাচ্ছি, আর ওদিকে রফিক ভাই আধ-পাগলা হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তিন বছর আগে আমওয়ালা ওনাকে এটাই বলেছিল, “মিঠাপুরের হাড়িভাঙ্গা, একবার খাইলে পাগল হইয়া যাইবেন…!”

রফিক ভাই কথা কম বলেন, ভুলোমনা; কিন্তু তাকে আমার কখনোই পাগল মনে হয় নি। তবে এনার স্ত্রীর মনে হয়েছিল! তাই তো তাকে বিয়ের মাস ছয় পরেই ছেড়ে গেছে। যাবেই বা না কেন! আচার-আচরণে কেমন পাগলা পাগলা ভাব।

বিয়ের পর নতুন বাসায় শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছে মিষ্টি-মণ্ডা এটা সেটা অনেক কিছু নিয়ে। নতুন জামাই ফট করে বলে বসেছে, “আব্বা, আম আনেন নাই?”

বৌয়ের সামনেই ছাদ থেকে ঝাঁপ দেয়ার দুই দিন পর রফিক ভাইয়ের জ্ঞান ফিরলেও ওনার বউ আর ফেরে নি।


তিন.

রফিক ভাই বিয়ে করেছিল; অথচ ডিভিশনের কেউই তা জানি না! খঁচখঁচানি ভাবটা দূর করতে ফোন দিলাম রিয়াদকে। রিয়াদ আমার কলেজের ক্লাসমেট, অফিসে ব্যাচমেট। পোস্টিং শিববাড়ি শাখায়। দু’বছর আগে ছিল চাঁদগাঁও শাখায়, রফিক ভাই হেড অফিসে বদলি হয়ে আসার আগে যে শাখায় কাজ করতেন।

কথায় কথায় রফিক ভাইয়ের প্রসঙ্গ টানলাম। উনি বিবাহিত, অথচ ছয় মাস কাছাকাছি থেকেও আমরা তা জানতে পারি নি!

রিয়াদ তাচ্ছিল্যের সাথে বলল,
“এগুলারে একদম পাত্তা দিবি না! সব গপ্প, লোকটা বানায়ে বানায়ে বলে। ‘বিয়ে কেন করে না’ এই নিয়ে আমরা ওনারে খুব ত্যাক্ত করতাম। একদিন শুনি এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে, বউয়ের তিন মাস পর পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে তুলে আনবে। এরপর শুনি এনগেজমেন্ট ভেঙে গেছে। ওনার এক বাল্যবন্ধুর সাথে পরিচয় আছে, উনি বলল এমন কিছুই হয় নাই। আমার ধারণা রফিক ভাই ছ্যাঁকা খাইছে! হাসিখুশি মানুষটা কেমন চুপচাপ হয়ে গেল এরপর থেকে"

অনেকদিন বাদে রিয়াদের সাথে কথা হচ্ছে। লম্বা সময় কথা বললাম। আমার মতো সেও রাতে ভাত খায় না। ফল-ফলাদি খায়। আমের সিজনে আম খুব চলতেছে।

“তা কী কী আম খাইলি এবার?”
“এবার বেশি খাইছি.. ওই যে গোলগাল…”
“হিমসাগর?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, হিমসাগর! আরেকটা আমও ম্যালা খাইছি… ছোটখাট লম্বাটে…”
“ল্যাংড়া?”
“না না, ল্যাংড়া না। নিচের দিকে একটু চিকন.. কী যেন নামটা…”
“আম্রপালি?”
“হ্যাঁ, আম্রপালি! তবে দোস্ত এবার লাইফের বেস্ট একটা আম খাইলাম সেইদিন…”

এটুকু শুনেই চমকে উঠলাম

“আমওয়ালা এলাকায় নতুন? গোলগাল চেহারা? মাঝবয়সী, মুখের কাটা দাগ আছে?”
“হ্যাঁ! কিন্তু তুই ক্যামনে জানলি?”

রিয়াদের প্রশ্নের ধারেকাছ দিয়েও গেলাম না। ভেতরে ভেতরে তীব্র উত্তেজনা বোধ করছি

“তুই কি ওনার থেকে কেনা আম খাইছিস?”
“হ্যাঁ! তিন চার দিন ধরে তো ওনার থেকে কেনা আমই খাইতেছি। দেখতে ভালো না। কিন্তু লোকটা বলছিল, এই আম খাইলে নাকি বাকি সব আম ভুইলা যাব!
“কী নাম লোকটার, বল তো?”
“আরে লোকের নাম দিয়ে কী হবে? ওনার আমের নাম শোন! অদ্ভুত নাম- মিঠাপুরের হাড়িভাঙ্গা!”

রিয়াদের সাথে কথা শেষ করে ফ্রিজে থাকা সর্বশেষ ‘মিঠাপুরের হাড়িভাঙ্গা’ আমটা জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। ঠিক করলাম লোকটাকে আর খুঁজব না। কিন্তু অফিস শেষ হতেই অস্থিরতা বোধ শুরু হলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা বাড়ালাম আতিয়া বাজারের দিকে। লোকটাকে খুঁজে বের করতেই হবে!


চার.

রোজ অফিস শেষে আতিয়া বাজারে যাই; বাজার লাগলে যাই, না লাগলেও যাই। অনেক প্রশ্ন মনে জমে আছে

রফিক ভাই আমাকে লিফট দেয়ার পরদিন থেকে অফিসে আসছেন না। কেউ তার সন্ধান দিতে পারছে না। ওনার শেষ পরিণতি কী হবে?

রিয়াদের মতো তুখোড় মেমরিওয়ালা একজন মানুষ আমের জাতের নাম ভুলে যাচ্ছে! ক্ষতি কি শুধু এটুকুই, না আরো আছে?

আমওয়ালা লোকটা কেন কোনো এলাকায় একবার বেচাকেনা করে লাপাত্তা হয়ে যায়?

ওনার আম খেয়ে সবার এই অবস্থা কেন হচ্ছে?

কী এই মিঠাপুরের হাড়িভাঙা, গুগলে হাজার খুঁজেও যার নাম পেলাম না?

আমার খোঁজা শেষ হয় না, অপেক্ষার প্রহরও ফুরোয় না। যেমনটা আমওয়ালা বলেছিল,

“এই আম একবার খাইলে বিছড়াইবেন, কিন্তু আর পাইবেন না…”
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

অনেকগুলো উত্তরহীন প্রশ্ন নিয়ে রহস্যধর্মী ছোটগল্প। রহস্য আম, না আম বিক্রেতা নিয়ে গল্প শেষে তা পাঠকই ডিসাইড করুক!

৩০ সেপ্টেম্বর - ২০২৩ গল্প/কবিতা: ৫৫ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

বিজ্ঞপ্তি

“ ” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ , থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।

প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী