সারারাত বাচ্চাটা কেঁদে একটু ঘুমিয়েছে। ঘরে দুটো চালের খুদ ছিল। পিষে সুজি করে দিয়েছে রাহেলা। দশ মাসের ছেলেটা মুখে নিতে চায় না আর। বেশি কান্না করলে স্তনে মুখটা লাগিয়ে দেয়। একফোঁটা দুধ নেই শিশুটির অমৃতাধারে। নিজেরই খাবার নেই তিনদিন ধরে। একাত্তরের আগুন জ্বলছে চারদিকে। ছেলের বাবা মাছ ধরার নৌকা নিয়ে গিয়েছিল গৌরনদীতে। চার রাত চলে গেছে। এখনও ফেরেনি। একেতো ঘরে খাবার নেই, তার উপর গলা দিয়ে নামে না একফোঁটা জল। ছেলেটা কি বুঝবে এতকিছু? বৃদ্ধ শাশুড়িটা সেই যে ছেলের শোকে বিছানায় পড়েছে, আর নড়ছে না। টিকে কি টিকে না, ঘোর সন্দেহ!
দুই বাড়ি পরে পালদের বাড়ি। হঠাৎ একটা চিৎকার ভেসে আসে। অন্যসময় হলে রাহেলা ছুটে যেত খোঁজ নিতে। কিন্তু এই একাত্তরে বাড়ির বাইরে পা দিলেই বিপদ। একসময় দেখে ধোঁয়া উড়ছে ওখান থেকে। বাড়ির বড় ছেলেটা বিয়ে করেছে মাস ছয়েক হয়েছে। বাতাসে কী ওই নতুন বউটার কান্না ভেসে আসছে? কয়েকটা গুলির শব্দ গর্জন করে উঠে। পুরুষ কণ্ঠের আর রা নেই। বউটা তখনো চিৎকার করে কাঁদছে। রাহেলা আঁতকে উঠে। পাকিস্তানি মিলিটারি মানুষ না, জানোয়ার, শুনেছে এতদিন। সাথে আছে গ্রামের শান্তি কমিটির দেলোয়ার, রহমত এরা। রাহেলা যেন চোখের সামনে দেখছে, বউটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পশুদের দল। মাটি লেগে সিঁদুর মুছে গেছে প্রায়। শাঁখাগুলো ভেঙে পড়ে আছে উঠোনের তুলসী গাছের গোড়ায়। কুকুরগুলোর ধারালো দাঁতের ফাঁক দিয়ে লালা ঝরছে।
আরও কিছু ভাবার আগে মনে হল কয়েকটা পশু ওদের বাড়ির দিকে আসছে। রহমতের গলার আওয়াজ চেনা। খুব কাছাকাছি আসছে। বাচ্চাটার ঘুম ভেঙে গেছে। শাশুড়ির কান্না করার শক্তিও নেই। কী করা উচিত, রাহেলা ভেবে পায় না। গলার আওয়াজ আরও প্রবলতর হচ্ছে। ছেলেটাকে বুকে চেপে ধরে রাহেলা দৌড়ে যায় ঝোপের পায়খানার পিছনে। নালার মত যেখানে মল, মূত্র জমা হচ্ছে, মাছিও যেখানে উড়তে পারে না, সেই একহাঁটু মলে ভরা নোংরায় রাহেলা দাঁড়িয়ে থাকে। ডান হাত দিয়ে বাচ্চার মুখ চেপে রেখেছে মা। ওর একটা চিৎকারে পশুদের দল শিকার খুঁজে নেবে।
সেই নালায় দাঁড়িয়ে রাহেলা দেখে রাজাকাররা প্রথমে, পিছু পিছু মিলিটারি বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েছে। ‘আব্বাসের বউ কই গেলা? পানি খাওয়াইবা না ভাবি? ওই মুক্তির বউ কই লুকাইলি? কীরে বুড়ি, বউরে কার ঘরে পাঠাইছিস’? নিজের স্বদেশী লোকদের রাহেলা চিনতে পারছে না। এরা মানুষ, নাকি পশু? আলমারি ভাঙার শব্দ, গয়না লুটের কোলাহোল, জিনিসপত্র ভাঙার উৎসব, মরার আগে বুড়ির গোঁগোঁ উত্তেজনা, পশুদের বিকৃত উল্লাস চারদিক জাহান্নাম করে ফেলে। আর যেই শব্দের সবচেয়ে ভয় ছিল, রাহেলা হঠাৎ চেয়ে দেখে সেই শব্দ, ছেলের কান্নার ধ্বনি চিরদিনের জন্য থেমে গেছে। মায়ের হাত কখন যে তার নাক আটকে দিয়েছে, আর দশ মাসের শিশুটা মায়ের কোলে নীরব অথচ প্রাণপণ ছটফট করতে করতে চলে গেছে না ফেরার দেশে, কেও দেখেনি। রাহেলা পাথর হয়ে যায়। হাত অবশ হয়ে যায় তার। মৃত শিশুটা পড়ে যায় মলের নালায়, ঝপ করে শব্দ হয় একটা। সেই শব্দ শোনার আগেই চলে গেছে হানাদার।
রাহেলা তখনো দাঁড়িয়ে। চোখ শুকিয়ে গেছে। হৃৎপিণ্ড থেমে যাচ্ছে। আত্মা গলায় আটকে গেছে। একাত্তরের আগুনে পরমপ্রিয় বাংলা মায়ের কোলে রাহেলার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।