গল্পটি ভৌতিক এবং এখানে ভয় দেখানো হয়েছে, যা বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ ডিসেম্বর ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ১০টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভৌতিক (ডিসেম্বর ২০১৮)

গড়াই বাড়ীর রহস্য
ভৌতিক

সংখ্যা

শৈলেন রায়

comment ৪  favorite ০  import_contacts ৩৯
আজ সকালে একটু দেরী করেই উঠেছে মাসুদ। কিছুদিন যা চাপ গেলো, সামলাতে সামলাতেই জিভ বাইরে বেরোনোর অভিপ্রায়। এরকম হওয়ায়টাই স্বাভাবিক। একটা পুরো সেমিস্টারের সিলেবাস মাত্র পনেরো দিনে শেষ করলে আর যা হয়। যাক, পরীক্ষা কোনোরকমে পেরিয়েছে। এখন শুধু প্র‍্যাকটিকাল বাকী। তাই বেশী চাপ নেই।

মাসুদরা ছয় জন একসাথে রাজবাঁধের একটি মেসবাড়ীতে থাকে। রাজবাঁধ জায়গাটি চিলমারী উপজেলার অন্তর্গত হলেও সেরকম সমৃদ্ধ নয়। পাকাবাড়ী, রেলস্টেশন থাকলেও রাজবাঁধকে গ্রাম বলাই চলে। জি.টি রোড, অয়েল কর্পোরেশন এবং চিলমারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কিছুটা হলেও জায়গাটিকে সমৃদ্ধ করেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থাকায় এখানকার মানুষদের উপার্জিনেও বৃদ্ধি হয়েছে। এখানে কম করেও বিশ খানা মেসবাড়ী আছে।
এলাকায় গড়াই দের প্রভাব বেশী। এককালে তারাই নাকি এখানকার জমিদার ছিল। তার প্রমান এখনো পাওয়া যায়। তাদের বড় বড় পুরোনো বনেদী বাড়ী এখনো তাদের জমিদারীর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এরকমই এক গড়াইদের মেষবাড়ীতে ভাড়া থাকে মাসুদ, জুলু( জুলফিকার), সুদীপ, সন্দীপ, রাজীব আর ছোটেলাল। প্রত্যেকে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
দোতালা মেসবাড়িটির নিচে চারটি ঘর ও উপর তালায় দুটি বড় বড় ঘর রয়েছে। জানলাগুলো আগেকার যুগের মত, রড দেওয়া। দেওয়ালে কোথাও কোথাও ফাটল ধরেছে। কাঠের সুইচবোর্ডে গোল কালো পুরোনো যুগের ইলেক্ট্রিক সুইচগুলো দেখেই বাড়িটির বয়স অনুমান করা যায়। দেওয়ালে শ্যাওলা আর কচি কচি ঘাসও গজিয়েছে। বর্ষাকালে মাঝে মাঝেই বিনা নিমন্ত্রনে সাপ বিছের আগমন ঘটে। নিচের তালায় মাসুদরা থাকে। আর ওপর তালায় ২-৩ টে বাইওটেকনলেজির ছাত্র থাকে।

সুদীপের কাছে একটা বিড়ি চেয়ে বাথরুমে ঢুকলো মাসুদ। সকাল সকাল বিড়ি না ধরালে পেটে চাপ আসে না তার। কিছুদিন আগে সিগাড়েট চলতো, পকেট মানি পাতলা হওয়ায় ব্যাটা বিড়িতে নেমেছে। মাঝে মাঝে হাতে ঝাড়া খৈনি নিয়েও বাথরুমে যায় সে। বাথরুমে একটি জিরো পাওয়ারের বালব লাগানো। প্রায় অন্ধকার থাকে বাথরুমটা। এমনকি জলও দেখা যায় না। শুধু আন্দাজ করে নিতে হয়। বাথরুমের দিকে যেতেই কেমন একটা গা ছম ছমে ব্যাপার থাকে। এমনকি দিনের বেলাও কেমন একটা অনুভুতি হয়। বাথরুমে বসলেই অন্য আরেক জনের উপস্থিতি ফিল হয়। মাঝে মাঝেই সুদীপরা ওপরের বাথরুম ব্যাবহার করে প্রাতঃকৃত্য সারার জন্য।

সকালের চা এ চুমুক দিয়েই মাসুদ বললো
-- কাল তো পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এবার না হয় ওই শালা রাজুকে ডাকি আজ রাতে। কি বলিস তোরা? ব্যাটা অনেক দিন থেকেই প্ল্যানচেটের ভয় দেখাচ্ছে। আজ ব্যাটার প্লানচেট ওরই পেছনে গুজে দেবো।
-- খেপেছিস নাকি? ওর মাসী কামাক্ষা থেকে দীক্ষা নিয়ে এসেছে। ওর কাছ থেকেই শেখা ওসব। আমি বাপ বিশ্বাস করি এসব। ভয়ে ভয়ে সুদীপ বললো।
-- ধুর। শালা হলিউডের এতো মুভি দেখিস কি করতে। দ্যা গ্রাজ, শাটার, পেট সিমেট্রি এসব দেখেও ভয় কাটে না তোর? তুই বরং একটা কাজ করবি। প্ল্যানচেটে শামিল হওয়ার আগে একটা গরম গরম পানু দেখে নিস ল্যাপটপে। তাহলে তোর মনটা ওদিকেই থাকবে।
হো হো করে হেসে উঠলো সন্দীপ আর ছোটেলাল।
একটু অপমানিত বোধ করলো সুদীপ। পরক্ষনেই গর্জে উঠে বললো
-- আমি বামুনের ছেলে। গায়ে পৈতে আছে। গায়ত্রী মন্ত্র জপি বুঝলি।
-- তাহলে তোর ফাটছে কেন? প্রেতাত্মা এলে সবাই মিলে তোর পৈতে ধরবো। খিল্লি করলো জুলু।
-- ডাক তা হলে ওই রাজুকে আজ রাত আট টায়।
শালা অনেকদিন থেকেই ক্লাসে ভয় দেখাচ্ছে মালটা।

রাজু তাদের সাথেই পড়ে। ক্লাসে মাঝে মাঝেই তন্ত্র মন্ত্রের ভয় দেখিয়ে বেড়ায় সে। পাশেই অন্য একটি মেসে থাকে সে।
যথারীতি রাজুকে ফোন করে ডাকা হলো রাত আট টায়। এদিকে মাসুদরা গঞ্জিকা সেবন করে আগে থেকেই রেডি। ভুত দেখার অদ্ভুত শখ তাদের।
-- কি রে ভয়ে আগে থেকেই প্যান্ট টা ভিজে গেছে নাকি তোদের? তাই তামুক মেরে বসে আছিস।
ঘরে ঢুকেই রাজু একটু খিল্লি করেই বললো।
সন্দীপ দাঁড়িয়ে পড়ে চিলিম হাতে।
--শালা, ভোলেবাবার প্রসাদ খেয়েছি রে। আজ ভুত দেখতে না পেলে এই চিলিমটাই তোর পেছনে গুঁজে দেবো।
--দেখা যাক। কে কার পেছনে গোঁজে। প্রথমেই কিছু নিয়ম বলে দিই। সবাই টেবিলের চার ধারে একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকবি হাত ধরে। যতই কিছু হোক না কেন, একে অপরের হাত ছাড়বি না। হাত ছাড়লে প্রান যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আর প্ল্যানচেট চলাকালীন একটাও টুঁ শব্দ চাই না আমার।
রাজুর বরাবরের অভ্যাস ভয় দেখিয়ে কথা বলার।
মাসুদ সন্দীপের দিকে তাকিয়ে একটা খিল্লির হাসি হাসলো।

ঘরের মেইন সুইচটা অফ করা হলো। বনেদী বাড়িটাতে দিনের বেলায় এমনিতেই গা ছম ছমে ব্যাপার থাকে। এখন এতটাই অন্ধকার একে অপরের মুখ অবধি দেখা যাচ্ছে না। মেসবাড়িটা রাজবাঁধের একদম শেষপ্রান্তে অবস্থিত। রাত সাড়ে আটটা বাজে তবুও বাইরে থেকে কোনো লোকজনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। বর্ষাকালের রাত। বিকালেই মুসলধারে বৃষ্টি হয়েছে। মাঝে মাঝে কোলা ব্যাঙের সত্যি বলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আর ঝিঝিপোকার ঝগড়া করার শব্দ কানে বাজছে। সব কিছু মিলিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার বাড়িটা যেন হানা বাড়িতে পরিনত হয়েছে।

টেবিলের চারটি কোনে চারটি মোমবাতি জ্বালানো হলো। অন্ধকার চিরে মোমবাতির আলোয় একে অপরের মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ছয় জন মিলে একে অপরের হাত ধরলো শক্ত করে। কাঠের টেবিলে চক দিয়ে অদ্ভুত একটা চক আঁকলো রাজু। ছকের একদম কোনের ঘরটাতে একটা পাঁচ টাকার কয়েন রাখা হলো। এবার শুরু হলো প্ল্যানচেটের প্রক্রিয়া।
কয়েনটিকে একটি ঘর থেকে অন্য ঘরে ঘোরাতে শুরু করলো রাজু। সবার চোখ রাজুর কয়েন ঘোরানোর দিকে। এক মাত্র ছোটেলাল রাজুর মুখের দিকে চেয়ে থাকে একদৃষ্টিতে। সবাই আগ্রহ সহকারে দেখছে কয়েনটিকে কিভাবে ঘোরানো হচ্ছে। এসব শুধু তারা সিনেমাতে এক দুবার দেখেছে, আজ চোখের সামনে এরকম একটা জিনিষ করার অভিজ্ঞতাটা তারা আজ ভোগ করতে চায়। ঘরের মধ্যে পিন ড্রপ সাইলেন্স। নিস্তব্ধতা যেন ঘরটাকে আলিঙ্গন করেছে। ঘরের পাখা বন্ধ রাখা হয়েছে। গরমও লাগছে, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছে না। হাফ প্যান্ট পরা ছেলেগুলোর হাঁটুর নিচে মশাদের মহাভোজের আসর বসেছে। তবুও তারা কিছু করতে পারছে না। মাঝে মাঝে শুধু পা গুলো ঝেড়ে নিচ্ছে। প্রায় কুড়ি মিনিট হয়ে গেছে। মোটাসোটা চেহারার ছোটেলালকে একটু বেশীই গরম লাগছে। মাত্র কুড়ি মিনিটেই ঘেমে স্নান হয়ে গেছে সে। ছোটেলাল রাজুর ঠিক বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে কেমন একটা অস্বস্তিবোধ কাজ করছে তার ওপর। বিরক্ত হয়ে মাসুদ সন্দীপকে চোখের ইশারায় একটা বিড়ি ধরাবার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু হাত ছাড়ার যে উপাই নেই। জুলু আর রাজীব খুব মনোযোগ সহকারে কয়েনটাকে দেখেই চলেছে। সবাই বুঝতে পারছে ছোটের অস্বস্তি হচ্ছে। সন্দীপ আর থাকতে না পেরে ফিসফিস করে কিছু বলার চেস্টা করলো রাজুকে। রাজু কেমন একটা নিষ্ঠুর দৃষ্টিতে তাকালো সন্দীপের দিকে। এবার যেটা হলো সেটার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না মাসুদরা। প্রানটা আঁতকে উঠলো। এটা কি করে সম্ভব? পাঁচ টাকার কয়েনটা নিজে নিজেই ঘুরতে শুরু করেছে ছকের ঘর গুলোতে। এটা কি দেখছে তারা।
রাজু মুখ খুললো এবার।
--" হাত ছাড়বি না তোরা। হাত ছাড়লেই কিন্তু মুসকিল।"
ভয়ে প্রান শুকিয়ে গেছে সন্দীপদের। সবার পায়ে যেন একটা অদ্ভুত জড়তা কাজ করছে।

এতক্ষন ধরে শুধু ছোটের ঘাম ঝড়ছিল। কিন্তু এটা দেখার পর সবার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝড়তে শুরু করেছে। পাঁচ টাকার কয়েনটা যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরো বেশী গতিতে ছকের ঘর গুলোতে ঘুরছে।
শক্ত করে চেপে ধরে সন্দীপের হাতটা মাসুদ। হঠাত করে একটা অদ্ভুত অনুভুতি হয় সবার। বন্ধ ভ্যাপসা গরম ঘরটাতে হঠাত যেন হালকা হিমেল বাতাস বইছে। এমন প্রতীত হচ্ছে যেন ঘরের ভেতরে দু-টনের এ.সি লাগানো রয়েছে।

প্রায় চল্লিশ মিনিট কেটে গেছে। হঠাত করে কয়েনটা ঘুরতে ঘুরতে নিজে থেকেই ছকের একটা ঘরে গিয়ে থেমে যায়। এবার সবার দৃষ্টি শুধু কয়েনটার দিকে।
এদিকে সুদীপ ফিসফিস করে গায়ত্রী মন্ত্র জপ করেই চলেছে। এক সময় সবাই লক্ষ করে ছোটেলাল মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তার চেহারাটা দেখতে পারছে না। রাজু এক দৃষ্টিতে সমানে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। ছোটেলাল এবার মাথাটা ওপর দিকে তুললো। ঠিক ওর বিপরীত দিকে সুদীপ দাঁড়িয়ে। মোমবাতির আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার মুখটা। ছোটেলালের দিকে একবার তাকিয়ে সুদীপ খুব জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকে। মুখটা হাঁ করে খুলে কিছু যেন বলতে চাইছে সুদীপ। কিন্তু গলা থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনো এক অশুভ শক্তি ওকে বলতে দিচ্ছে না। এরপর সবাই যখন ছোটের দিকে তাকালো দেখলো ছোটের অদ্ভুত এক চেহারা। চোখগুলো যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলছে। নাক থেকে জোরে জোরে ফস ফস করে নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মোমবাতির মৃদু আলোতে ছোটের জ্বলন্ত রক্ত চক্ষু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
এবার রোবোটের মতো মুখটা ঘোরায় রাজুর দিকে। ভয়ের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। গায়ের লোম গুলো প্রায় খাড়া হয়ে গেছে মাসুদের। গাঁজার নেশা কবে কেটে গেছে। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা যেন একশো কিলোমিটার বেগে ঘুরছে। স্পন্দনের শব্দ স্পষ্ট কান অবধি শোনা যাচ্ছে। রাজু এবার বুঝতে পারে নিশ্চয় কোনো আত্মা অথবা অশুভ শক্তি ছোটের ওপর ভর করেছে।

হঠাত ছোটের মুখ থেকে বজ্রকণ্ঠস্বর---
--" কে তুই? আমাকে এভাবে ডেকেছিস কেনো?"
শোনামাত্রই সুদীপ অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ে রাজীবের গায়ে।
অদ্ভুত ব্যাপার। পুরুষ-মহিলা মিশ্রিত ভারী কণ্ঠের আওয়াজ কি করে সম্ভব? হিন্দিভাষী ছোটেলাল কিভাবে এত স্পষ্ট বাংলা বলতে পারছে?
সবার চোখ এবার মাথার ওপরে। সাহসী রাজু ছোটের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো..
--" আমি রাজু বটব্যাল। এরা সবাই আমার বন্ধু। তোমার ব্যাপারে আমরা সবাই জানতে চাই। কে তুমি? কোথা থেকে এসেছো?"
এবার গলার আওয়াজ টা যেন আরো ভারী হয়ে যায় ছোটের।
--" আমি নেহা। আমি এ বাড়িতেই থাকি। ওই যে ওই বাথরুমের গলিতেই আমার নিবাস। "
কথাটা শোনামাত্রই ভয়ে সবাই যে যার দিকে দৌড়। ছোটেলাল পড়ে রইলো মেঝের ওপর। সুদীপকে কোনোরকমে টেনে রুম থেকে বের করে সোজা বাইরের দিকে দৌড় জুলুর।
রাজু চেঁচাতে থাকে..
--"তোরা হাত ছাড়লি কেন? বিরাট বড় মুসকিল হবে।"
হুড়োহুড়ি, দৌড়াদোড়িতে মোমবাতিগুলো নিভে যায়। রাজু নিজেও ভয়ে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে দৌড়ে। ওই ঘরে শুধু পড়ে রইলো ছোটেলাল একাই।

তখন প্রায় রাত দশটা। বাইরে এবার হালকা বৃস্টি শুরু হয়েছে। আকাশটা মাঝে মাঝে ফ্ল্যাশ লাইটের আলোর ঝলকানি দিচ্ছে। এর মধ্যেই পাড়ায় লোডশেডিং ও হয়েছে। মেসের ছেলেগুলোর চেঁচামেচিতে পাড়ার লোকজন জমা হয়েছে। বাড়ি মালিক সরোজ গড়াই উপস্থিত হয়েছেন ছাতা হাতে। এসেই চারটা গালি দিলেন মাসুদদের। পাড়ার লোকজনেররা মিলে ছোটেলালের মুখে চোখে জল দিয়ে জ্ঞ্যান ফেরালো। সরোজবাবু কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইছেন না ঘটনার ব্যাপারে। উলটে সন্দীপদের নেশাখোর ছেলে বলে গালমন্দ করলেন। এমনকি পাড়ার লোকজনও কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইলো না তাদের কথায়।
ওই বাড়ি লাগোয়া একটি ঝুপড়ি ভাতের হোটেলের মালিক সুকুদার চেহারায় একটু অন্যরকম ভয়ের ছাপ দেখা গেলো। সরোজবাবু অভয় দিয়ে চলে গেলেন। ওনার কথায় এ বাড়িতে আগেও ভাড়াটিয়ারা থেকেছে কিন্তু কখনো কিছু হয়নি এসব। পরিস্থিতি একটু হালকা হওয়ায় মাসুদরা একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। সুকুদা সহিত আবার সবাই বাড়ির ভেতরে গেলো। সুকুদার হাব ভাব দেখে বুঝেছিল তারা যে ও কিছু বলতে চায়।

সবাই একটা ঘরের ভেতরে বসলো। সাময়িক ভাবে পরিবেশটা হালকা হলেও ভয় কিন্তু এখনো যায়নি। একটা বিছানাতেই রাজু সহিত সাত জন গুটি সুটি ভাবে বসলো। পাশে রাখা একটা প্লাস্টিকের টুলের ওপর সুকুদার স্থান হলো। ছোটের ঘোর কিন্তু এখনো কাটেনি। চোখগুলো বড়বড় করে এখনও যেন কিছু ভেবে চলেছে ছোটে। সুদীপের শরীরটাও ভালো করছে না। মাথা চুলকাতে চুলকাতে রাজু বললো
--" তোরা সব থেকে বড় ভুল করেছিস। একে অপরের হাত ছাড়া উচিত হয়নি তোদের। আমি লাইফে সাত-আট বার প্ল্যানচেট করেছি, কিন্তু এরকম কস্ট হয়নি কোনো বার। নিশ্চয় এটা কোনো অশুভ শক্তি। আবার ওই আত্মা ফিরে আসবে। আমাদেরকে ভোর চারটে অবধি সাবধানে থাকতে হবে।"।
অনেক্ষন ধরেই সুকুদা কিছু বলতে চাইছিলো। এবার ও মুখ খোলার সুযোগ পেলো।
--" আমি প্রায় দশ বছর ধরে হোটেল করছি। প্রথম প্রথম বাড়িঘরের ব্যাবস্থা না থাকায় আমারা কয়েকজন ওই ঝুপড়ি হোটেলেই ঘুমাতাম। রাতের বেলায় কিছু খট খট শব্দ পেতাম। দু-চারদিন আনাকানি দিয়ে ভাবি হয়তো কোনো ছুঁচো অথবা বেড়াল রয়েছে। একদিন বাসন কোসনের ঝনঝন শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় মাঝরাতে। শুয়ে শুয়েই দেখি তোমাদের এই বাড়ির বাথরুমের জানলা দিয়ে একটা লম্বা সাত আট ফুট মোটা কালো পাইপের মতো কিছু একটা নিজে থেকে বেড়ে চলেছে।
প্রথমে ভাবলাম চোর-টোর আছে। কিন্তু হঠাত টর্চ মেরে দেখি সেটা পাইপ নয়, একটা লম্বা হাত তোমাদের ওই জানলা থেকে বেরিয়ে আমার হোটেলের দিকে বাড়ছে নিজে থেকেই। মুহুর্তের মধ্যেই হাত টা অদৃশ্য হয়ে যায়। পরের দিন পুরোহিত ডেকে হোটেলে পুজো করাই। তারপর থেকে এরকম কোনও কিছুর দর্শন পাইনি। "

সুকুদার গল্পটা শোনার পর সবার মুখ হাঁ হয়ে যায়। সুদীপ আর জুলুর খুব জোরে টয়লেট পাওয়া সত্ত্বেও চেপে ধরে বসে থাকে।
--" এটা সত্যি একটা অশুভ শক্তি। আমার প্ল্যানচেট করা ঠিক হয়নি এ বাড়ীতে। খুব জলদি তোরা এ বাড়ি ছেড়ে দিস।" রাজু এবার একটু নরম হয়েই বললো।
--" আমরা কালই এ বাড়ি ছাড়ছি। শুনেছি সুজিতদার মেসে একটা ফ্লোর ফাকা আছে। ওখানেই শিফট করবো কাল। আজ রাতটা কোনো রকমে কাটাই।"
বলার পরেই বিড়িটা মুখে নিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরটাতে লাইটার টা জ্বালায় সন্দীপ।
লাইটারের হালকা আলোতে ঘরের দরজার বাইরে যা দেখতে পেলো তার বর্ননা করা সম্ভব নয়। স্ট্রেট চুলের একটা কুচকুচ কালো মেয়ে দরজাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুটের মতো। কিন্তু সবথেকে ভয়ংকর জিনিষ যেটা সেটা হলো তার চোখ গুলো। একদম কোনো পশুর মতো চোখ। গরুর যেমন চোখ হয় ঠিক তেমনি চোখ তার। মনিটা পুরো কালো। কোনো সাদা অংশ নেই চোখে।
ভয়ে দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা সবার। সুকুদা তো চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে এক লাফে বিছানাতে। সবাই একসাথে চেচালো। চোখের সামনে এরকম অদ্ভুত ভয়ংকর জিনিষ দেখতে পেয়ে চেঁচানো সত্ত্বেও কণ্ঠ থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছে না কারোর।
মুহুর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায় সেটি। এটা কি দেখলো তারা। ভয়ে দু-তিন জন প্রায় কেঁদেই ফেললো।

বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে। ঝোড়ো হাওয়া কাঠের বন্ধ জানলাতে একবার করে দস্তক দিয়ে যাচ্ছে। সাহসী রাজু একবার ঘরের চারদিকে তাকিয়ে নিলো। বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে এসে দাঁড়ালো সে।
--" তুই আবার কিছু করিস না ভাই। জানিনা প্রানে বাঁচবো কি না আজ।
রেগে গিয়ে মাসুদ বললো রাজুকে।
কোনো উত্তর নেই রাজুর। শুধু একদৃষ্টিতে স্থির হয়ে থাকা শিলিং ফানের দিকে তাকিয়ে রইলো।

এবার যে খেলা শুরু হলো তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলোনা। রুমের মধ্যে দু খানা কম্পুউটার ছিলো। হঠাত কি বোর্ডে টাইপ করার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কেউ যেন কি বোর্ডে কিছু টাইপ করছে। মুহুর্তের মধ্যেই সবাই একলাফে বিছানা থেকে নেমে ঘরের এক কোনে গুটি শুটি মেরে বসলো কোনো রকমে। থর থর করে কাঁপুনি এসেছে তাদের। কেউ কাউকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। সুদীপের মুখ থেকে সমানে থুতু লালা ঝড়ে পড়ছে। বার বার অজ্ঞ্যান হয়ে যাচ্ছে সে। জুলুর প্যান্টটা একটু ভিজে গেছে পেচ্ছাবে।
বাইরের বৃষ্টি যেন থামতেই চাইছে না। বন্ধ কাঠের জানলার ফাঁক দিয়েও জল ঢুকে দেওয়াল বেয়ে মেঝেতে জল গড়াচ্ছে ঘরের মধ্যে। এই ঝোড়ো বৃষ্টির জন্য প্রায় চার ঘন্টা লোডশেডিং। মাঝে মাঝে আকাশের ঝলকানিতে ঘরটা মুহুরতের জন্য দেখার সুযোহ হচ্ছে তাদের। কাছাকাছি কোনো জায়গায় বাজ পড়ার শব্দে কেঁপে উঠছে দু-তিন জন। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঝোড়ো বৃষ্টি, সহসা বাজ পড়ার শব্দ, আর তার সাথে অবিশ্বাস্য সব ভুতুড়ে কান্ড.. এই সব কিছু নিয়েই গড়াই ভবনে আট জন ফেঁসে রইলো।

জিভ দিয়ে একবার কাঠ-শুস্ক ঠোঁট চেটে নিলো রাজু। হাফ প্যান্টের পকেট থেকে নোকিয়া 1600 মোবাইলটা বের করে সময়টা দেখে নিলো। এখন রাত দুটো বাজে। আরো দু ঘন্টা সাবধানে থাকতে হবে তাদের। গায়ের পৈতেটা বের করে খুব জোরে জোরে গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতে থাকে রাজীব। অন্ধকার ঘরে চশমাটা কোথায় যেন পড়ে গেছে তার।

এবার ঘরের মধ্যে হঠাত কট কট শব্দ হচ্ছে। পকেট থেকে সাহস করে লাইটারটা বের করে জ্বালিয়ে দেখলো সন্দীপ।
দেখলো ঘরের খাটটা মাত্র দুটো পায়াতে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আবার যেন ঘরের মধ্যে কোথা থেকে হাড় হিম করা শীতল হাওয়া বইতে শুরু করলো।
মাসুদরা এবার বুঝতে পারে এবার আর বাঁচার কোনো উপাই নেই।
সবাইকে চমকে দিয়ে রাজু এবার দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে দেওয়ালের শিলিং এর দিকে তাকিয়ে মন্ত্র পড়তে শুরু করলো সে। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা খাটটা খটাস করে পড়ে গেলো।
এবার মুখ খুললো রাজু।
--" এটা খুবই শক্তিশালী অশুভ শক্তি অথবা অতৃপ্ত আত্মা। আমাদেরকে এই মাত্র বাড়ির বাইরে যেতে হবে। ভোর চারটা অবধি অপেক্ষা করলে নিশ্চয় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ বাড়িতে আমার প্ল্যানচেট করা মোটেও ঠিক হয়নি। "
সবাই মুহুর্তের মধ্যে সাহস করে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে সব জিনিষপত্র ছেড়ে দিয়ে।
প্রবল বর্ষনের মধ্যেও ভিজে ভিজে রাজবাঁধ স্টেশনে পৌঁছায় তারা। স্টেশনে রাতের বাকী সময়টুকু কাটিয়ে সকাল বেলায় কিছু লোকজন নিয়ে ওই গড়াই মেসে থেকে জিনিষপত্র শিফট করা হয় অন্য মেসে।

পাড়ার এক মুরব্বী চা ওয়ালার কাছ থেকে তার জানতে পারে যে প্রায় ওই গড়াই বাড়িতে একটি যুবতী মেয়েকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। তার পর কয়েকবার মেয়েটিকে দেখা গেছে। পরে পুজো দেওয়া হয় ওখানে।

ওই গড়াই বাড়ির ঘটনার পর রাজু বটব্যাল আর প্ল্যানচেট করার সাহস পায়নি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement