আকবর আলি ছাই দিয়ে দাঁত মাজে, পান খায় গাবের বিচি দিয়ে। পানটা তার আম গাছেই হয়—‘গুয়ার বাড়ি ধুয়া’ হয় মনে করে সুপোরি লাগায়নি। টাকা খরচের ভয়ে অসুখের চিকিৎসা না করালেও বাঁচার আকুতি অতিশয়। জ্বর-জারি হলে দোয়া-দরূদ পড়তে থাকে; এবং কাজ দেয়। অবশ্য স্ত্রীর বক্তব্য ‘অসুখ-বিসুখ ভাবে এই খাটাসের ট্যাঁক থেইকা কোনও টাকা বাইর করা যাবে না—তাই হাল ছাইড়া পালায়।’

সে বলে ‘ডাক্তার হল জোঁক! মানুষ না মরা পর্যন্ত নানা বাহানায় রক্ত চুষতেই থাকে।’
‘তোমার শরীরের রক্ত জোঁকেও খাইতে পারব না; চুষ দিলে উল্টা জোঁকের রক্ত তোমার শরীরে আইসা পড়ব।’
‘দেখলা না সেবার কতগুলা টাকা ডাক্তারে নিয়া গেল? সাধে কি আমি...’
হ্যাঁ স্ত্রী এ-পর্যন্ত একবার ডাক্তারের কাছে যেতে দেখেছে তাকে। সেটাও একটা ঘটনা বটে! শহরে গিয়েছিল আকবর আলি। তার কোন পরিচিত দূরের আত্মীয়ের বাড়িতে দুপুরে হাজির হল তার নতুন বাড়িটা দেখার ছুতোয়। দু-জন কামলা ঘর-বাড়ি সাফ করায় ব্যস্ত। একটা ভ্যানে ভাঙ্গা,কাটা টাইলসের স্তূপ দেখে জিজ্ঞেস করে এসব কোথায় নিয়ে যায়। জানাল ফেলে দিতে। তার চোখ চকচক করে উঠল। ‘সানা ভাই তোমার ভাঙ্গা-চোরা টালিগুলার কয়টা নিয়া যাই—উঠানে ফুলের গাছের গোড়ায় লাগামু।’ পরে খানা-পিনা শেষে ভ্যান ভর্তি করে সব টাইলস নিয়ে বাড়ি ফেরে। মনে মনে বলে ‘আইলাম দুপুরে খাওয়ার খরচ বাঁচাইতে, পায়া গেলাম অমূল্য ধন!’

কিন্তু মিস্ত্রি খরচের টাকার জন্য বুকের মধ্যে পোড়াতে লাগল। বাথরুমে ঢুকে হাত বোলায় টাইলসে, মনটা ফুরফুর করে। স্ত্রী যতই ঘ্যান ঘ্যান করুক কিছুতেই টাইলস ক্লিনার আনে না। বলে ‘গায়ে সাবান দেওয়ার পরে অল্প পানি ঢালবা, সেই সাবান-পানি নারকেলের ছোবড়ায় চুবায়া-চুবায়া সবখানে ঘইসবা, দেখবা কত চকচক করে। এইটাই নিয়ম—বড়লোকেরা তাই করে—সানা ভাই সব শিখায়া দিছে। খালি ঈদের সময় মেডিসিন মারণ লাগে। সেইটা আমিই দিমু—তোমরা না বুইঝা বেশি ঢাইলা দিবা।’
রোজার ঈদের দুই দিন আগে টাইলস ক্লিনার কিনে এনে নিজেই নারকেলের ছোবরা নিয়ে ঢুকে পরে। দোকানির কাছে সব জেনে এসেছে আকবর আলি, মেডিসিন খুব তীর্ব। লুঙ্গিটা যদি নষ্ট হয় তাই লুঙ্গি খুলে পুচকে জানালার এক কোণায় গুঁজে রাখে ‘আরে ধুর এইখানে কেউ আছে নাকি?’ জন্মদিনের পোশাক পরে বাথরুম ঘষাঘষি করতে থাকে। মেঝে ঘষার সময় তার মেটে আলুর মত পাকা অণ্ডকোষ মেঝের সঙ্গে তালেতালে ছেঁচড়াতে থাকল। টেরটা পেল গোসল করার সময়... হোলের চামড়া উঠে গিয়েছে। চুনগোলা দিয়ে পট্টি দেয়া হয় কিন্তু তাতে ওটা আরও রসালো হয়ে উঠল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে বিস্ময়াভূত হয়ে জানতে চাইলেন ‘আপনি ফ্লোর ক্লিনার দিয়ে গোপনাঙ্গ পরিষ্কার করতে গেলেন কেন!?’ আকবর আলি কোনও জবাব না দিয়ে গোল গোল করে তাকিয়ে থাকে। এই তার ডাক্তারের কাছে যাবার ঘটনা।

আকবর আলি সব সময় কপাল কুঁচকে থাকে—এতে বেশ ফল দেয়—বন্ধু-বান্ধব চা খেতে চায় না। উল্টো তারা বলে ‘মনটা খারাপ নাকি? আসো এক কাপ চা খাও ফ্রেশ লাগবে।’ সে খুশি হয় পাশে গিয়ে বসে। ছেলে-মেয়েরা বায়না ধরে না—আকবর আলির জমি বাড়ে—স্ত্রী বাজারের কথা ভুলে যায়। সব কাজেই স্ত্রীর খুঁত ধরে আকবর আলি—নয়ত সে পেয়ে বসবে, পেঁয়াজের খরচ বাড়িয়ে দেবে।

সকালে ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যায়। রুটি তৈরির সময় দেখে আটা শেষ।
‘বাবা যা তো দুই কেজি আটা নিয়ে আয়। তোর বাপের রুটি হবে না।’
‘আমি যাইতে পারব না। ওরা বাকি দিতে চায় না।’
আকবর আলির বকেয়া আদায় করতে পাওনাদারের জীবন ফাতাফাতা হয়ে ওঠে। অনেক জোরাজুরিতে ছেলে বিরস বদনে দোকানে যায়।

খেতে বসে আকবর আলি। আজ শহরে যাবে। রুটিতে কামড় বসিয়ে খিঁচিয়ে ওঠে ‘রুটিটা যদি ঠিক মত বানাতে শিখেছ!’
স্ত্রী জানে স্বামীর প্রতিদিনকার বদ-অভ্যেস, ভ্রুক্ষেপ করে না।
‘আমাকে কি বিড়াল, কুকুর মনে করো...’
‘কাকাতুয়া...’
‘মুখ সামলাইয়া কথা কও! আমার বয়স কি এত বেশি যে কাকা কও?’
‘তাইলে দুধের বোতল ভইরা দেই?’
‘তোমার বাপ-মায়ে কিচ্ছু শিখায় নাই। কোনও কিছুই ঠিক মত পারো না। আমার বিয়া করাই ঠিক হয় নাই।’
‘হ, জানো তো ঐ একখান কথা! সব থুয়া বাপের বাড়ি যামু গা...!’
‘তা যাও, কয়দিন ঘুইরা আসো গিয়া। কবে যাইবার চাও?’
‘তোমার মত বেহায়া মানুষ আমি জীবনে দেখি নাই! কয় দিন একটু বেড়াইতে যামু, সেই জো নাই—গিয়া হাজির হইব... তোমার জ্বালায় বাপের বাড়িও বন্ধ...’
‘ভাল-মন্দ খালি তুমিই খাইবা? তোমার পিছে পিছে না গেলে কোনও দিন দাওয়াত দেয় নাকি? সবাই বছরে কতবার শ্বশুর বাড়ি বেড়ায়, আর আমি... কঞ্জুস বুইড়া...’
‘বাজানরে গালি দিবা না কইলাম! তোমারে দিব দাওয়াত! কোনও দিন কিছু নেও নাকি? তোমারে দেইখা বাজান শরম পায়! সব যখন জানবার চায় ধনি জামাই কী আনল? কিছু জবাব আছে?’
‘মিছা কথা কইবা না কইলাম! গতবারের আগেরবারের আগেরবার বিশ টাকার কটকটি নিয়া গেলাম না?’
‘হ বিশ টাকার কটকটি দিয়া আর কত বছর দাওয়াত খাইবা? ছেঁচ্ছর একটা... ওইডাও তো নিছিলা শয়তানি কইরা—বাজানের যে দাঁত নাই, মস্করা করতে!’

এক টুকরো রুটি মুখে পুরে আবার খিঁচিয়ে ওঠে।
‘আচ্ছা এগুলা তুমি কী বানাইছ! নিষ্কর্মা একটা...!’
‘চুপচাপ খায়া নেও, বেশি কথা কইলে তাড়াতাড়ি হজম হয়া পেট খালি হইব।’
‘খাওয়া গেলে না খামু—সব উলটায়া আসছে!’
‘আচ্ছা প্রত্যেক দিন একই কথা কইতে তোমার হয়রান লাগে না?’

সদর দরজা দিয়ে কেউ ঢুকল মনে হয়। চাচি বলে ডাক দিল। বারান্দায় এসে মশা বলল ‘চাচি একটা ভুল হয়া গেছে... সবুর ভাইয়ের হাতে বানাইনা সাবানের গুঁড়ার বস্তা থেইকা দাদি ভুলে আটা মনে কইরা দিয়া দিছে...’
‘হায় হায় কস কী!’
‘আরে না মশা! অন্য কাউরে দিছে। মোমেনা তুমি ঐগুলা দিয়াই রুটি বানাইছো না?’
‘হ্যাঁ, আগের খানিক আটা ছিল মিশায়া...’
‘অন্য কেউ নিছে খুঁইজা দেখ। এই তো খাইতেছি, সাবানের গুঁড়া কি খাওয়া যায়!’ গপাগপ রুটি গিলতে থাকে আকবর আলি। মশা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে।
‘পাঞ্জাবির পকেট থেকে দুই কেজি আটার দাম দিয়ে দাও মোমেনা।’
মশা কাঁচুমাচু হয়ে আটার দাম নিয়ে বিদায় হয়।
আকবর আলি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বোয়াল মাছের মত একটা হাসি দেয়। হাতের পাঞ্জাবিটা স্বামীর মুখে ছুঁড়ে দিয়ে রান্না ঘরে যায় মোমেনা।
আকবর আলির বুকটা সুখে ভরে ওঠে।