স্বামী'র উষ্ণ ভালোবাসায় অভ্যস্ত জীবনে ছন্দপতন ঘটে, এক প্রিয়জনের অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ অবশ্যম্ভাবী বিয়োগে। শীতকাতর জবুথবু সেই ভীষণ দুর্যোগে পরাস্ত হৃদয় আকুল হয়ে এতটুকু উষ্ণতা খুঁজে ফেরে ভালোবাসার মানুষদের কাছে। দীর্ঘদিনের পরম আশ্রয় স্বামীর কাছ থেকে ব্যর্থ মন নিয়ে ফিরতে হয় তাকে। নিজের হাতে বোনা চারাগাছের মতো ছোট্ট মায়াময় সন্তানের কাছে অবশেষে সে পায়... উষ্ণতা জড়ানো পরম স্নেহের ঠাঁই। সেই ছোট্ট বুকেই সে খুঁজে পায়, হারিয়ে যাওয়া এক বুকভরা উষ্ণতা।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৬৪টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৩২

বিচারক স্কোরঃ ২.৯২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উষ্ণতা (জানুয়ারী ২০১৯)

ওমের খোঁজে
উষ্ণতা

সংখ্যা

মোট ভোট ১৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৩২

ফাহমিদা বারী

comment ১৪  favorite ০  import_contacts ৭৫৬
এক
জয়তুনের সাত বছরের মেয়ে আলো, চটাশ করে এক চড় বসিয়ে দিলো তার পাঁচ বছরের ভাই সবুজের গালে।
ভাইয়ের অপরাধ তেমন বড় কিছু নয়। আলোর সাজিয়ে রাখা পুতুলের ঘরে অসাবধানে তার পায়ের পাড়া পড়ে গেছে। আলোর কাছে এই অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। চড় দিয়ে তার ছোট হাতটাও বেশ গরম হয়ে উঠেছে। কিন্তু তবু তার মনে হচ্ছে, উচিত শাস্তি দেওয়া হয়নি। সে আশেপাশে ব্যাকুল চোখে তাকাতে লাগলো লাঠি জাতীয় কিছু খুঁজে পাওয়া যায় কী না।

বোনের চড় খেয়ে আকাশ পাতাল ফাটিয়ে চিৎকার দিতে শুরু করেছিল সবুজ। এখন বোনের মতলব বুঝতে পেরে আর কেঁদে সময় নষ্ট করতে গেল না সে। গালে এক হাত বসিয়ে রেখে ফোঁপাতে ফোঁপাতে পুকুর পাড়ের দিকে একটু তড়িঘড়িই রওয়ানা দিলো। পুকুরে এখন তার মায়ের থাকার কথা। সেখানে গিয়ে একটা নালিশ ঠুকে আসতে পারলেই হলো। বাকীটুকু মা’ই সামলাবে।

আলো আর সবুজের মা জয়তুন তখন সবে রান্নাবাড়ি শেষ করে পুকুরে একটা কাকডুব দিতে এসেছিল। সেই কাকডুব তার দীর্ঘ ডুবে পরিণত হয়েছে। পুকুরপাড়ে এলে আর চটজলদি ফেরা যায় না। দশবাড়ির বৌ ঝিরা সবাই এসে তখন পুকুরপাড়ে জড়ো হয়। এ এককথা ও আরেককথা...এভাবে কথায় কথায় কথা বাড়তে থাকে। জয়তুন তাদের সাথে কথার রাজ্যে ডুবে যেতে যেতেও ভাবছিল, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আজ সবুজের বাবা গঞ্জে গিয়েছে। এতক্ষণে ফিরে এসে বৌকে না পেয়ে আর খিদের মুখে ভাত না পেয়ে মহা হট্টগোল শুরু করে দিবে সে।
সেকথা ভাবতে ভাবতেই জয়তুন দেখতে পেল, সবুজ একহাতে গাল চেপে আরেকহাতে চোখ মুছতে মুছতে এদিকেই আসছে। মাকে সেও দেখতে পেয়েছে। দেখামাত্রই ফোঁপানির বেগ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। জয়তুন তাড়াতাড়ি পরনের শাড়ি ঠিকঠাক করে পুকুর পাড়ে উঠে আসে। ভেজা শাড়ি বুকের ওপরে দু’পরতে টেনে আনে। সবুজের বয়স সবে পাঁচ। তবু পাড়াগাঁয়ের ছেলেপেলেদের চোখের চাহনি একটু অল্প বয়সেই ফুটে যায়। ছেলের সামনে একটু ঢেকে ঢুকেই চলে জয়তুন। নারীদেহের ভাঁজ খাঁজ আরেকটু ধীরে সুস্থেই জানুক! অন্য বৌঝিরা সবুজকে দেখে মশকরা করে,
‘ও আল্লাহ্‌! এটিত ব্যাটা ছাওয়াল অ্যালো ক্যা? হামরা বেটি ছাওয়ালেরা গা ধুবার আইছি! হামাগের এডা ইজ্জত আছে না!’

সবুজ অবশ্য এসব গুরু রসিকতা বুঝতে পারে না। সে মা’র কাছে গিয়েই গালের লাল হয়ে বসে যাওয়া পাঁচ আঙ্গুলের দাগ দেখিয়ে বললো,
‘আলোপা, খালি খালি হামাক ইংকা কইরা মারলো! হামি কি ওর পুতুলের ঘর দ্যাখবার পাছি?’
ভাই-বোনের ঝগড়া বিবাদ মীমাংসা করতেই দিনের বড় একটা সময় কেটে যায় জয়তুনের। সবুজের গালের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে দিয়ে একঝলক সেদিকে ভালোভাবে চোখ বুলায় সে। চুক চুক করে সহানুভূতির একটা ভঙ্গিও করতে হয়। এখানেই শেষ নয়। এখন বিস্তারিত আদ্যোপান্ত শুনতে হবে। তারপরে আলোকে ডেকে এনে কড়া ভাষায় দু’চার কথা বলতে হবে। তাহলে ছেলে সঠিক বিচার পাবে।

জয়তুন মনে মনে প্রমাদ গুনলো। এখন বিচার করতে বসলে স্বামীকে আজ আর ভাত বেড়ে দেওয়া হবে না। অনুপস্থিত আলোকে উদ্দেশ্য করে বেশ রাগ জড়ানো গলায় জয়তুন বলে,
‘হামার ছোলডাক এক্কেরে জখম কর্যাা দিছে! আইজ আলোক হামি আস্ত থুমু না! তুই দ্যাইখা নিস! চল বাপ, হামরা আগে বাড়িত যাই। তর বাপে এতক্ষণে হাট থেইকা চইলা অ্যাসিছে!
সবুজের মন এতে আশ্বস্ত হয় না। সে উপর্যুপরি মায়ের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি চায়,
‘তুমি আলোপা’ক বৈকা দিবা...ওক তুমি মাইরবা...কও?’
‘হ, বাপ! কনু তো! ওক আইজ ছাড়াছাড়ি নাই! তুই দ্যাখিস খালি... মুই ওর কী করি আইজগা!’

ছেলেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে বাড়ির পথে পা বাড়ায় দু’জন। সবুজ সতর্ক চোখে আশেপাশে দেখতে দেখতে যায়। এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন যদি আলোপা এসে উল্টাপাল্টা কিছু বুঝিয়ে মায়ের মন ঘুরিয়ে ফেলে, তাহলেই ওর সব পরিশ্রম কেঁচে যাবে।
আশেপাশে আলোর দেখা পাওয়া যায় না। সবুজ নির্ভার হয়। যাক, এবার আলোপাকে সে মার খাইয়েই ছাড়বে। মায়ের কাছে সময়মত লাল হয়ে যাওয়া গাল নিয়ে আসতে পারাটা খুব কাজের কাজ হয়েছে। প্রমাণ নষ্ট হয়ে গেলে আর অভিযোগ ধোপে টিকতো না।
ভাবতে ভাবতেই গালের চিনচিনে ব্যথাটা আবার চাগিয়ে ওঠে সবুজের।


দুই
রাতে ছেলেমেয়েকে খাইয়ে দাইয়ে স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে দাওয়ায় গিয়ে বসে।
চাঁদনী রাত। আকাশে ফুটফুটে জ্যোৎস্না। উঠোন জুড়ে জোনাকিদের মেলা বসেছে। উঠোনের এক কোনায় জয়তুনের নিজের হাতে যত্ন করে বোনা হাস্নাহেনা থেকে ভুরভুর করে সুবাস ভেসে আসছে। সেই সুবাস বুক ভরে টেনে নিতে নিতে জয়তুন ভাবে,
এবারে একটা শিউলী গাছ বুনতে হবে। সকাল বেলা শিশির সিক্ত মাটিতে শিউলী পড়ে থাকবে। সবুজ আলো দুই ভাই-বোন আনন্দ করে ফুল কুড়াবে। ওদের সাথে সাথে সে নিজেও একটু ছুটাছুটি করবে। কীই বা এমন বয়স তার! এই বয়সে শহরের মেয়েরা তো বাবা-মা’র আদরের ছোট মেয়েটি হয়েই থাকে। বাবা-মা হারা হয়ে তাকে না হয় এই বয়সেই গিন্নি বান্নি হয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু মনটাকে তো আর জোর করে শক্ত বানাতে পারে না!

জয়তুনের স্বামী আব্দুর রাজ্জাক বিড়িতে ফুক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে,
‘বুইঝলা জতু...হামি চিন্তা কইরা দ্যাখলাম, এই বছর আলুর বিছন কিনি। যদ্যি লাভ শিংকা বেশি না হয়, পরেরবার ভুট্টা লাগামু। বুদ্ধিডা কেমুন মনে হছে তুমার?’
ফুলের সুবাস আর চাঁদনী রাতের জ্যোৎস্নায় জয়তুনের মন একটু উদাস হয়েছে। চাষাবাদের মতো এমন বৈষয়িক বিষয়ে সে তখন জড়াতে চাচ্ছিলো না। একটু আনমনা গলায় বললো,
‘দ্যাহেন চিন্তা কইরা য্যাডাত আপনে ভালা মনে করেন!’
আব্দুর রাজ্জাক একটু গাল ফুলিয়ে বলে,
‘এইডা কী কও জতু! হামি তুমার একখান মতামত চাছি আর তুমি হামাক চিন্তাভাবনা কইরবার কও? তুমার হছেডা কী?’

জয়তুন নড়েচড়ে বসে। স্বামী তার মতামত নিয়েই ছাড়বে। ফুলের সুবাস আর জ্যোৎস্নার মাদকতায় তার ভেসে গেলে চলবে না। মনকে জোর করে ঘুরিয়ে নিয়ে এসে সে আলু ভুট্টার হিসাব কষতে বসে। নিজের বিচক্ষণ মতামত স্বামীকে দিতেই নিমেষে তার ফোলা গালে হাসি ফুটে উঠে। গদগদ গলায় বলে,
‘এর লাইগাই তোমাক এনা বেশি ভালোবাসি। ইঙ্কা কইরা হামি ক্যান ভাববার পারি না কও দেহি?’
জয়তুন নাকের ফুল নাড়তে নাড়তে গরবিনী হাসি দেয়। গাঁয়ে তার বয়সী কত মেয়েকে অপমান, লাথি ঝ্যাঁটা সহ্য করে দিন পার করতে হয়! আর তার স্বামী তার সাথে পরামর্শ না করে দু’পাও চলে না। স্বামী সুখে সোহাগিনী জয়তুন বুক ভরে সুখের আস্বাদ টেনে নেয়।

এই সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি তাকেই সামাল দিয়ে চলতে হয়। সে নাই তো কিছুই নাই।
স্বামীর নির্ভরতার আশ্রয় জয়তুন। ছেলেমেয়েরাও সব কাজে মায়েরই পিছ ধরে সবার আগে। ভাইবোনে ঝগড়া বিবাদ খুনসুটি... যা কিছুই হোক না কেন, মাকে না বলা পর্যন্ত তাদের কারো মনে শান্তি নেই।
মনে মনে গর্ববোধটুকু এড়াতে পারে না জয়তুন। সম্পর্কগুলোকে পাঁচ আঙ্গুলের মুঠোয় বেঁধে রাখা সহজ কাজ নয় মোটেও। সবাই তাকে, তার মতামতকে এই যে এত গুরুত্ব দেয়...এটা তো আর এমনি এমনি হয়নি! সংসারের পেছনে দিবারাত্র পরিশ্রম করারই ফল পেয়েছে সে। এই সংসারের রাজরাণীর আসনটি তার যোগ্যতা দিয়েই অর্জন করেছে জয়তুন। কারো কাছে ভিখিরির মতো চাইতে হয়নি তাকে।
নিঃস্ব ভিখারীকে দেখে তার মনেও দয়া জাগে...কিন্তু ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা মনে জাগে না। সে জানে, তার আছে অসীম আকাশ...অবারিত প্রশস্ত আঙিনা। এর অধিকারিনী হতে অনেক কাঠখড় পুড়াতে হয়েছে তাকে। তাই এই ঠাঁইটুকুও তার কখনোই হারাবে না।

অথচ শুরুটা এত সহজ ছিল না। বাবা-মা’কে একেবারেই শিশু বয়সে হারিয়েছিল জয়তুন। সামান্য পেটের ব্যথায় ছটফট করতে করতে জয়তুনের তরতাজা জোয়ান বাপটা মরে গেল। সেই শোক নিতে পারলো না তার মা। সেও পরের বছরই অজানা অসুখে দুনিয়া ছাড়লো।
আট বছরের জয়তুনের কেউ রইলো না সারা দুনিয়ায়। কে ই বা তার মাথায় হাত রেখে দুটো সান্তনার কথা শোনায়...কে ই বা তাকে খাওয়ায় পরায়! দূর সম্পর্কের এক চাচা ছিল। সে তো ভাইয়ের মৃত্যুর পর ধারে কাছেই ভিড়েনি। হয়ত এই ভয়েই...যদি তার ঘাড়ে কোন দায়িত্ব এসে চাপে!

কিন্তু কথায় বলে, ‘যার কেউ নাই, তার আল্লাহ্‌ আছে!’ শুধুমাত্র আল্লাহ চেয়েছিলেন বলেই জয়তুন এই ঘোর বিপদেও পরম নির্ভরতার এক ঠাঁই খুঁজে পায়। রক্তের সম্পর্কহীনা এক নিঃসন্তান নারী বুকে তুলে নেয় তাকে। সেও অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েছে। সন্তানের সুখ কাকে বলে জানা হয়নি কখনো। নিঃসঙ্কোচে জয়তুনকে আশ্রয় দেয় সেই নারী। তার পরম মমতায় জয়তুন ভুলতে বাধ্য হয়, ত্রিভূবনে সে একেবারেই একা...আপন বলতে কেউই নেই তার। সন্তানহীনা সেই নারীকেও মা ডাক শোনার অতৃপ্তি ঘুঁচিয়ে দেয় জয়তুন। দুজনেই দুজনার ভালোবাসার বন্ধনে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যায়।

জয়তুনের ভালো ঘরে বিয়ে আসে। তার মা দেখেশুনে ভালো গৃহস্থের ঘর দেখেই পাত্রস্থ করে তাকে। এত অল্প বয়সে জয়তুন ছেড়ে আসতে চায় না তার মাকে। কেঁদে কেটে ভীষণ একটা হুজ্জোত বাঁধায় সে।
আব্দুর রাজ্জাকের বৌ প্রীতিতে অবশ্য এই ছেড়ে আসার শোক বেশিদিন স্থায়ী হয় না। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কোল আলো করে আসে রাজ্জাক-জয়তুনের সন্তান...আলো। জীবনটা আলোকিত হয়ে ওঠে পিতৃমাতৃহারা জয়তুনের।
মমতা দিয়ে বাঁধে সে সবকিছু। হৃদয়ের উষ্ণতায় ভরে ওঠে সাজানো গৃহকোণ। শীতার্ত জবুথবু শৈশবকে সে কবেই ভুলে গেছে! ঘোর দুঃস্বপ্নেও সেইদিন এখন আর তার মনেই পড়ে না!



তিন
আলোর একমাথা চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে বকবক করে জয়তুন।
‘বেটি ছাওয়ালের চুল ক্যান ইঙ্কা হোবে? চুলেতে এনা তেল নাই, চিরুনি দ্যাওয়ার নাম নাই...তক দ্যাখে ত ফকিরনীর ছোল মুনে হয়। উকুনের চাষ করিচ্ছু চুলেত?’
আলো কথা না বলে চুপ করে মায়ের বকা ঝকা শুনতে থাকে। কুসুম গরম তেল ঘষে ঘষে মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছে মা। আরামে চোখ বুজে আসছে আলোর। মনে মনে সে ভাবে... আহ্‌! মায়ের হাতটা কি আল্লাহ অন্যরকম করে বানাইছে? এত আরাম লাগে ক্যান?

আব্দুর রাজ্জাক আজ মাছ ধরতে নদীতে যাবে। মাঝে মাঝে তার এই শখ চাগাড় দেয়। জেলে বন্ধুদের নৌকায় চড়ে নিজেও দু’চার খেপ মেরে আসে। জয়তুনের বুক ধুকপুক করতে থাকে। জেলে নৌকাগুলো যে ছোট ছোট! নদীতে বড় একটা ঢেউ উঠলেই নৌকা উল্টে যায় যদি! জয়তুনের কথায় তার স্বামী হাসে।
‘জতু, তুমি এগলান কী কও? হামি কি সমুদ্দুরেত যাছি?’

আব্দুর রাজ্জাককে মাছ ধরতে যাওয়ার আয়োজন করতে দেখে এবারেও আশঙ্কার কথা বলে জয়তুন। আব্দুর রাজ্জাক সেদিকে মন না দিয়ে একটু অন্যমনষ্ক গলায় বলে,
‘তুমার মায়ের খোঁজ পাছো?’
জয়তুন আচমকা মায়ের প্রসঙ্গে অবাক হয়। ভ্রু কুঁচকে বলে,
‘ক্যা, মায়ের কি হছে? মায়ের খোঁজ নিবার কছো ক্যা?’
‘না...শুনবার পানু...এট্টু শরীরডা নাকি খারাপ করিছে তুমার মা’র!’

মেয়ের মাথাতে বিলি কেটে দেওয়া হাত থেমে যায় জয়তুনের।
তার মা থাকে পাশের গ্রামে। মাঝে মাঝে সেই গ্রামের মেম্বারের মোবাইলে ফোন দিয়ে মায়ের খোঁজ নেয় জয়তুন। আগে থেকে বলে রাখলে মা এসে সেই বাড়িতে বসে থাকে। জয়তুন দুদিন পরে পরেই খোঁজ নেয়। বুকটা কেমন যেন ধবক করে উঠলো তার। আজ কী কারণে যেন প্রায় সাতদিন ধরে মায়ের সাথে কথা বলা হচ্ছে না।
ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে জয়তুন,
‘কী শুনিছো খুলা কও তো! মা’র কী হছে?’
আব্দুর রাজ্জাক আমতা আমতা করে বলে,
‘তুমি এনা ঐ গাঁয়েত যাও। তুমার মায়ের শরীরডা মুনে হয় বেশিই খারাপ!’

জয়তুন আর ভাষা খুঁজে পায় না।
গোটা দুনিয়াতে এই সংসারের পরে ঐ মানুষটাই তার নিজের। সংসারের জন্য এই যে তার প্রাণপাত করা, তাও সম্ভব হয়েছে সেই মানুষটার জন্যই। দূরে বসেই সে জয়তুনকে এটা সেটা উপদেশ দেয়। ভালোমন্দ বাছ বিচার করা শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়। শীতের পিঠা, কুমড়ো ডালের বড়ি, নারিকেলের নাড়ু...যা যা খেতে ভালোবাসে জয়তুন, সব কিছুই মা তৈরি করে পাঠিয়ে দেয়।
জয়তুন তার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে অনুভব করে, এই পৃথিবীতে কেউ একজন এক বুক উষ্ণতা নিয়ে বসে আছে তার জন্য। শীতের আগমনী সুর কাবু করে না তাকে। আসুক শীত...উষ্ণতা মাখানো একটা স্বর ভেসে আসবে দুরালাপনীর ওপার থেকে,
‘ভালো আছু মা? শইরলের যত্ন করিচ্ছু তো! বাড়িত কবে আসবু?’

আলো ঘাড় ঘুরিয়ে নিশ্চল হয়ে বসে থাকা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে যায়। শিশুমনের বুঝটুকু দিয়ে কী বোঝে সে, কে জানে! বারকয়েক মায়ের আঁচলের কোনা ধরে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। মৃদুস্বরে ডাকে,
‘মা...মা...ও মা! কী হছে মা? তুমি ইংকা করিচ্ছ ক্যা? ও মা... আও করিচ্ছ না ক্যা?...মা..।’
দূর ওপারের কোন জগত থেকে যেন সেই ডাক তার নিজের শিশুকালের মমতামাখানো ডাক হয়ে ফিরে আসে জয়তুনের কাছে। মা...মা...আহা! কত প্রিয় একটা নাম! কত প্রিয় সেই নামের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা মানুষটা! কত স্নিগ্ধ সেই মুখের আঁকিবুকিগুলো! কী উষ্ণ মায়াময় মায়ের আঁচল!

হঠাৎ বুকের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় জয়তুনের। নিশ্চল দেহটা অকস্মাৎ যেন দুলে ওঠে কীসের এক জোর ধ্বসের সম্ভাবনায়।
‘মা... মা... কী হছে মার?’ অজানা আশঙ্কায় থরথর করে কেঁপে ওঠে জয়তুনের ঘর মন দুয়ার।


চার
মা’র দাফন কাফনের কাজ শেষ করে একদিনও আর দেরি করে না জয়তুন।
খালি ঘরদোর, উঠান, লাগোয়া পুকুরঘাট...সব কেমন খাঁ খাঁ করছে। এক বুক শূণ্যতা নিয়ে যেন ধেয়ে আসছে জয়তুনের দিকে।
এই ঘরের মেঝেতে শীতলপাটি পেতে শুয়ে থেকেছে তারা মা-মেয়ে। নিজেদের জমিয়ে রাখা হাজার কথা শব্দ দিয়ে গেঁথে গেঁথে মালা বুনেছে। হাসি আনন্দে রঙিন হয়েছে বিবর্ণ প্রহর। দিনযাপনের নিত্য কষ্ট টাকে খুব যত্নে আড়াল করে রাখতে জানতো তার মা।
মায়ের লাশের পাশে নিশ্চল বসে থাকা জয়তুনের মাথায় কোন কিছুই আসে না। একটা কোন কথা, কোন শব্দ...অথবা কোন আনন্দ বেদনার স্মৃতি...কিছুই না! জয়তুন শুধু অনুভব করে, এখান থেকে এখনি পালাতে হবে তাকে। এই শূণ্য ঘরদোর যেন হাঁ করে গিলতে আসছে তার সমস্ত সত্তাকে।
এক্ষুনি চলে যেতে হবে তাকে...ফিরতে হবে সেখানে, যেখানে তার সংসার আছে। তার স্বামী... সন্তান...সাজানো সংসার! এখান থেকে পালাতে পারলেই সে বেঁচে যাবে। জীবনের স্পন্দনে ফিরে গিয়ে ঠিক সে ভুলে যাবে মৃত্যুর নৈঃশব্দ। কে যেন অবিরাম বলতে থাকে তাকে...ফিরে যাও জয়তুন...পালাও এখান থেকে...
নিজের মধ্যে অজানা এক তাড়না অনুভব করে জয়তুন।

নিজের বাড়িতে ফিরে এসে সত্যি সত্যি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে জয়তুন।
স্বামীর নিত্য ফরমায়েশ, শলা পরামর্শ আর সন্তানদের ব্যস্ত কোলাহলে ফিরে তার মনে হয়, এই তো তার উষ্ণ ভালোবাসার ঠাঁই! সবকিছুই তো তেমনই আছে! মৃত্যুর শীতলতা কেন শুধু শুধু গ্রাস করতে যাবে তাকে?
নিজেকে বুঝ দেয় জয়তুন। যে যায়, সে তো তার দেনাপাওনা চুকিয়ে নিয়েই ওপাড়ে পাড়ি দেয়। যা কিছু দেওয়ার ছিল সবটুকুই তো উজাড় করে দিয়ে চলে গেছে সে। আর তো কিছুই পাওয়ার নেই তার কাছ থেকে!

কিছুদিন কেটে যায় নৈঃশব্দ আর কোলাহলের মাঝামাঝি এক অনুভবে।
প্রতিদিন সূর্য ওঠে...ভোর হয়... রাত্রি আসে...আবার ভোর হয়। কী অদ্ভূত ছন্দময় এই নিত্য দিনযাপন! কোথাও এতটুকু বৈকল্য নেই। সব ছিমছাম নিখুঁত। যেন কোনকালেই সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটি এই পৃথিবীর কোন অংশই ছিল না। তার থাকা না থাকার সাথে এই পৃথিবীর যেন কোনরকম যোগসূত্রই তৈরি হয়নি কোনদিন।

কিন্তু যার সাথে সেই মানুষটা গড়ে নিয়েছিল জন্ম জন্মান্তরের যোগসূত্র...সেই জয়তুনের দিনযাপনে ধীরে ধীরে বৈকল্য দেখা দেয়। একটু একটু করে মনের ভেতরে স্থায়ী আসন গাঁড়ে কষ্টেরা। দু’দিন পরে পরেই হুট করে মনে হয়, কতদিন মায়ের সাথে কথা হয় না! আজ একবার মাকে মেম্বার বাড়িতে আসতে বলি!
তখনই মনে পড়ে যায়, আর কাউকে আসতে বলার নেই। যে আসতো...সে আর আসবে না কখনো।

শীতের পার্বন শেষ হতে চললো। জয়তুনের বাড়িতে পিঠা পুলি তৈরি হয় না। জয়তুন অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে একসময় ভুলে যায়... বাঁশের ঝুড়ি ভর্তি পিঠা নিয়ে ও গ্রাম থেকে আর কেউ আসবে এই বাড়িতে। দুরালাপনীর ওপাশ থেকে কেউ ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠবে না,
‘ও মা... ভালা আছু?’

এবারে সত্যি সত্যি স্থবির হয়ে পড়ে জয়তুনের দিনরাত্রিগুলো। সে পুকুরঘাটে গিয়ে চুপ করে বসে থাকে। এক সময়ে মনেই পড়ে না, বাড়িতে স্বামী থালা নিয়ে বসে পড়েছে। ঘাট থেকে ফিরেই তাকে খেতে দিতে হবে।
ছেলে মেয়ে দুটো চোখের সামনে মারামারি করে নিজেদের ক্ষতবিক্ষত করে। মায়ের কাছে বিচারের আর্জি জানিয়ে চেয়ে থাকে দু’জন। সেই দৃষ্টিকে দেখতে পায় না, জয়তুনের অনুভূতিহীন শূণ্য দৃষ্টি। ওদের আকুল কণ্ঠের ‘মা’ ডাক কানে পৌঁছে না তার।
রাতের শয্যায় জড়ানো কণ্ঠে স্বামী নাম ধরে ডাক দেয়। নেশাজড়ানো হাতে ভাঙতে চায় কুণ্ঠিত অনিচ্ছুক অবগুণ্ঠন। এতদিনের আগ্রহী আত্মসমর্পণে অভ্যস্ত গর্বিত স্বামী মানতে পারে না স্ত্রী’র এই অনাগ্রহী দায়সারা সম্মতি।

দিনে দিনে শান্ত নিটোল জলে ঢেউ ওঠে।
অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে স্বামী। ঘর সংসারে মনোযোগ না দেওয়া বৌয়ের ঘাড়ে অলক্ষ্মী এসে ভর করেছে বলে বকাঝকা করে। প্রশস্ত আঙ্গিনাটুকুতে কখন যেন অনাদরে আগাছা জমে। খুব ধীর লয়ে সঙ্কুচিত হয়ে আসে অবারিত আকাশ। মুক্ত পাখির মতো এতদিন সেখানে বিচরণ ছিল জয়তুনের। হঠাৎ এই অকস্মাৎ সংকোচনে খাঁচায় পোরা পাখির মতোই ছটফটিয়ে ওঠে সে।
রাত্রির অন্ধকারের আড়ালে চোখের পানিতে ভেসে গুটিগুটি ঘেঁষে আসে স্বামীর পাশের শয্যায়। সেই অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে বিরক্ত স্বামী পাশ ফিরে শোয়। দ্বিতীয়বার আর ফিরেও তাকায় না। হয়ত ঘুমিয়েও পড়ে একসময়।

জয়তুনের ঘুম আসে না।
নিঃশব্দে ঘরের আগল খুলে পাশের ঘরে যায়। ছেলেমেয়ে দুটো ঘুমে একেবারে কাদা হয়ে পড়ে আছে। জয়তুন গিয়ে ওদের একপাশে শুয়ে পড়ে।
সবুজ ঘুমের ঘোরে বোনের গায়ে পা তুলে দিতেই এক ঝটকায় সেই পা সরিয়ে দেয় আলো। তখনই তার চোখ পড়ে যায়, পাশে নিঃশব্দে শুয়ে থাকা মায়ের দিকে। মায়ের দুগালে অশ্রুধারা...জানালার গরাদ কেটে ঢুকে পড়া চাঁদের আলোয় সেই অশ্রুকণা চিক চিক করে জ্বলছে।

আলো তার ছোট্ট দু’হাতে পরম মমতায় মুছে দেয় সেই চোখের পানি। মাকে জড়িয়ে ধরে গুটিসুটি মেরে ঢুকে পড়ে তার প্রশস্ত বুকের মাঝখানটাতে।
দু’হাতে সেই ছোট্ট শরীরটাকে ব্যাকুলের মতো জড়িয়ে ধরে জয়তুন। ছোট্ট শরীরের পরতে পরতে উষ্ণতার ছোঁয়া পেয়ে আনন্দে অধীর হয়ে ওঠে তার মন।
মায়ের বুকে ঘুমে লেপ্টে থাকা আলো জানতেও পারে না...আজ সে পক্ষীমায়ের মতোই আশ্রয় দিয়েছে তার নিজের মাকে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement