লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ১০টি

সমন্বিত স্কোর

৬.৪৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.৪৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপ্রত্যয় (অক্টোবর ২০১৪)

নতুন প্রত্যয়ে
প্রত্যয়

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.৪৫

আব্দুল্লাহ্ আল মোন্তাজীর

comment ১৩  favorite ১  import_contacts ১,৭৯০


অভাবের তাড়না মানুষের প্রত্যয় গুলোকে কিভাবে ম্লান করে দেয়, তা নিশাতের দিকে তাকালে সহজেই বুঝা যায়। অত্যন্ত দরিদ্র ঘরের সন্তান নিশাত। চির রোগা বাবা কাশেম আলীর পক্ষে মানুষের টুকিটাকি কাজ করে সংসার চালানো বড়ই দায় হয়ে পড়েছে। এক খণ্ড জমিতে ভাঙ্গা ঘরে- খেয়ে না খেয়ে, পড়ে না পড়ে দিন কাটে। স্রষ্টা প্রদত্ত আত্মাটাকে যে কোন ভাবেই হোক রক্ষা করতে হবে- এটাই যেন জীবনের মূখ্য ব্রত। তারপরও চেয়ে থাকে আগামীর প্রত্যাশায়।

মানুষের সাধ্যের সীমাবদ্ধতা যতই থাকুক- সাধ-আহ্লাদতো কিছু না কিছু থাকেই। কাশেম আলীর এক মাত্র সাধ মেয়েটাকে লেখা-পড়া করানো।

মিষ্টি চেহারার মেয়ে নিশাত। গায়ের রঙ তত উজ্জ্বল না হলেও রমনীয়তা, কমনীয়তা, মুখের সুন্দর গঠন, আচার-‌আচরণ, মন-মানসিকতা মুগ্ধকরার মত। মেধা শক্তিও ভাল। গ্রামের স্কুল থেকে এস.এস.সি. পাস করেছে আত্মীয়দের আথির্ক সহযোগীতায়। কিন্তু ‘নিত মরা গারে কে আর নিতুপবাসী খাওয়ায় কে?’ এইচ.এস.সি. পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের জন্য যে টাকা দরকার, তা কোন ভাবেই যোগার হচ্ছে না।
‘আব্বা, পরীক্ষা কি দেওয়া অইবো না তা অইলে?’ কাতর স্বরে জানতে চায় নিশাত।
‘অইবো-অইবো। রাখ দেখি কি করা যায়।’ উত্তর দেয় কাশেম আলী।
‘আর তো মাত্রা নয় দিন বাকি। কোন পথই তো দেখা যায় না।’
‘তুই কোন চিন্তা করিস না মা। আরও তো কয়দিন আছেই।’ কাশেম আলীর উত্তর শেষ হতে না হতেই নিশাতের মা হাজেরা খাতুন অগ্নিঝরা কন্ঠে বলে-
‘আগেই কইছি, মাইয়্যাডারে বিয়া দিয়া দেন। না, মেয়ে শিক্ষিত অইব। জজ-ব্যারেস্টার অইবো। গরিবের ঘোড়ার রোগ আর কি! এখন টেকা দিতে পারেন না কেন? দেন টেকা।’
‘আহ্ হা রে। এই পযর্ন্ত তো এক ভাবে না এক ভাবে চললই। দেখি একটা ব্যবস্থা তো অইবোই।’
‘হ। উপরের দিকে হা কইরা থাকেন। আসমান থাইকা ব্যবস্থা খইসা ধপাস কইরা পইরা আপনার সামনে হাজির অইব।’ গায়ে যেন শ্লেষ আটছে না হাজেরার।
‘আচ্ছা তুমি চুপ কইরা থাক। দেখি কি করা যায়। চেয়ারম্যান সাইবে কইছে পরশু দিন ভি.জি.এফ. এর কার্ড লইয়া গিয়া চাউল আনতে। ঐ গুলি বেইচ্চা দিমু। তা অইলে বাকি টাকা জোগার অইয়া যাইবো।’
‘খাইবেন কি? হাওয়া, না কলের পানি? খোড়াকি তো শেষ অইয়া গেল গেল।’
‘নিশাতের মা, তুমি শান্ত হও। খাওনের অভাবে তো আর মরুম না। আগে মাইয়া পরীক্ষাডা দেউক। ভাইবা দেখ তো- মাইয়াডা যদি আই.এ. পাস দেয়- তা অইলে আহ্! কি শান্তি।’
চোখ বুঁজে, আশায় বুক বেঁধে, কথাগুলো এমন ভাবে বলল যে, আবেগ যেন তার চোখে মুখে ঠিকরে পড়ছে। হাজেরা চুপ করে। কাশেম আলী গভীর ভাবনায় ডুবে যায়। নিশাত ছোট্ট ঘরের এক কোণে বাঁশের খুঁটিতে তক্তা বিছানো টেবিলের মত মাঁচায় পড়তে থাকে। বেড়া কাটা খিড়কি দিয়ে যে কিঞ্চিত আলোটা তার বইয়ে পড়ছে- তা যেন তার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছার একটা প্রতীকী রূপ!

কাশেম আলী নির্ধারিত দিনে ভি.জি.এফ. কার্ডের চাল তুলে আনে। বাড়িতে এনে মাপ দিয়ে দেখে- নির্ধারিত ত্রিশ কেজি চালের মধ্যে সাত কেজিই ঘাটতি ! বাকি চাল যে রাঘব-বোয়ালদের পেটে চলে গেছে তা বুঝার বাকি রইল না। জ্বি হুজুর করেই যাদের জীবন যায়, সব কিছু জানলেও এই সব চুনো-পুঁটিরা কি-ই বা করতে পারে!

উত্তর পাড়ায় চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ি। নিজ গাঁয়ের মানুষ। দয়া করে তিনি যা দিয়েছেন, তা-ই যেন সাত এদের সাত পুরুষের পূণ্যের ফল! চেয়ারম্যান সাহেবের ভাবখানাও এমন যে- তিনি যেন সাত পুরুষের কামাইয়ের ধন দু’হাতে উদার ভাবে বিলি করছেন!

চাল ঘাটতি পড়ায় তা বিক্রি করে নিশাতের পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের বাকি টাকা কোন মতে পূরণ করা গেলেও খাবারের জন্য কিছু পরিমানও অবশিষ্ট থাকল না। আগে থেকেই ধার দেনা করে চলতে চলতে এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থা। কারো কাছে কোন ধার পাওয়ার পথ আর অবশিষ্ট নেই। চোখের সামনে সর্ষে ফুল ভাসলে এর রঙ্গের তীব্রতা মনের উপর কতটুকু প্রভাব ফেলে- তা কাশেম আলী হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছে!






আজাদ লাবিব- চেয়ারম্যান সাহেবের বড় ছেলে। মার্জিত আচরণের ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন শিক্ষিত যুবক । তার বাবা যে ভাবে বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে লেগেছেন, তা তার কাছে ভাল তো লাগেই না- বরং সে সব সময় এটা ঘৃণার দৃষ্টিতেই দেখে। তার বাবার কুকীর্তির অনেক কথাই জানা থাকলেও তেমন কিছুই সে করতে পারে। অন্যদিকে পড়ার কার কি সমস্যা, কার ঘরে খাবার নাই, কার চিকিৎসা দরকার এ সবের খোঁজ-খবর নেওয়া তার নিত্য দিনের কর্মকাণ্ড। নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর ব্যাপারটা যে তার বাবা তিযর্ক দৃষ্টিতে দেখেন- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে আচরণটুকু এ জন্য তাকে সহ্য করতে হয় তাও অন্দরের বাইরে বর্ণনার যোগ্য নয়। যদিও ভোটের খাতিরে চেয়ারম্যান সাহেবের মুখ দিয়ে জন সম্মুখে মধু পড়ে!

লাবীব অন্য দশ জনের মত কাশেম আলীর খবরও রাখত- তবে এতে অন্যদের সাথে ঢের পার্থক্য ছিল। আর সেটা হল- সে নিশাতকে মনে মনে ভালবাসত, যদিও কোন দিন তা সরাসরি প্রকাশ করেনি। তবে আকারে ইঙ্গিতে তা বুঝানোর চেষ্টা করেছে। কাশেম আলী নিজের অবস্থানের দিকে লক্ষ্য করে নানা অজুহাতে বিষয়টা সব সময় এড়িয়ে যেতে চেয়েছে।




নিশাতের পরীক্ষার আর মাত্র তিন মাস বাকি। ঘরে খাবার নেই। ধার কর্জ পাওয়া যায় না। রোগা শরীরে কাজও করতে পারে না কাশেম আলী। অভাবের চরম মূহুর্তে কাটছে তার সংসার। কারো কাছে সাহায্য চাইবে- সে সুযোগও নেই। একটা জায়গা অবশ্য আছে সাহায্য চাওয়ার মত- আর সেটা হচ্ছে লাবীব। কিন্তু সেখানে সে সাহায্য চাইবে না- পাছে কোন ফেরকা বাঁধে!

অভাবে যে মানুষের বুদ্ধির বড়ই বিভ্রাট ঘটে! কাশেম আলীও এ থেকে মুক্তি পায়নি। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখে একটা খাসি ঘাস খাচ্ছে। এটা দেখে এক ধরণের বিকৃত সুখ তার মনে টগবগিয়ে উঠল! আর টগবগিয়ে উঠবেই না কেন? স্বয়ং ইবলিস যে দল-বল নিয়ে তার ঘাড়ে চেপেছে!

‘এই সুযোগ হাত ছাড়া করা যায় না। এইডাই আমার সম্বল! যা অয় পরে অইবো। আগে তো খেয়ে বাঁচি।’ আনমনেই মুখে কথাগুলো আওরাতে থাকে সে। ব্যাস, যেই চিন্তা সেই কাজ। খাসিটি চুরি করে বিক্রি করে দিল হাটে।

যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়! খাসিটি ছিল চেয়ারম্যানের সহযোগী জালালের। সন্ধ্যায় এটি বাড়ি ফিরেনি, তাই খুঁজ লাগায় চতুর্পার্শ্বে। অবশেষে সে জানতে পারে- কাশেম আলীই খাসিটি চুরি করেছে। মালিকের নাম জানতে পেরে, নিজের ভাগ্যে যে কলির সন্ধ্যা শুরু হয়ে গেছে- তা বুঝার আর বিন্দু মাত্রও বাকি রইল না কাশেম আলীর।

পরদিন সকালে সালিস বসল। চেয়ারম্যান সহ এলাকার গণ্য-মান্য ব্যক্তিবর্গ প্রায় সকলেই উপস্থিত। তাঁরা চেয়ারে বসা। কাশেম আলী মাটিতে বসে আছে, পেছন থেকে হাত বাঁধা। জালাল পাশেই একটি ব্রেঞ্চে বসা। তার পাশে লাবীব। জালালের আরজি সাপেক্ষে চেয়ারম্যান সাহেব বিচারের কাজ শুরু করেন।

‘কাশেম আলী, খাসিটা তো মিয়া তুমিই চোরি করেছ। তো..... এইডা নিয়া কত টেকা বেচলা?’ চেয়ারম্যান সাহেব জানতে চান। কাশেম আলী চুপ করে থাকলে উত্তরের জন্য আবার তাগাদা দেন তিনি। ‘কি মিয়া কথা কও না কেন? কানে কি বাতাস যায় না- না কি? কত টেকা বেচ্চ?’

‘তিন হাজার টেকা।’ অপরাধী হিসাবে মাথা নিচু করে স্বীকার করে নেয় সে।
‘কেন চুরি করছ?’
‘ঘরে খাওন নাই। কাম কাজও পাই না। ক্ষিধার জ্বালায় যে মরতে বসছিলাম ভাই।’
‘ক্ষিধার জ্বালায় যে মরতে বসছিলাম ভাই-ই-ই।’ মুখ ভেংচায় চেয়ারম্যান। ‘বেটা চোর। ভাই ডাকস আবার। এই বেটা, ঘরে খাওন নাই বইলা তুই চোরি করবি?’
‘ভুল অয়া গেছে। মাফ কইরা দেন। এমনটা আর অইব না।’ কাতর ভাবে মাফ চায় সে।
‘না না। তা হবে না। এই অন্যায় মাফ করা যায় না। তুরে মাফ করলে সমাজে এই অন্যায় আরও বাড়ব। তুর দৃষ্টান্ত মূলক শান্তি হওয়া দরকার।’ বলে চেয়ারম্যান অন্যদের মতামত জানতে চান- ‘মাতবর সাব আছেন, গেরামের দশ জন আছেন- আপনারা কি কন?’
‘হ হ। আপনি ঠিক কইছেন চেয়ারম্যান সাব, ঠিক কইছেন। আপনে এর বিচার করেন।’ সবাই সমস্বরে বলে উঠে।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনারা শান্ত হন। আমি দেখতাছি।’
‘মতি মিয়া, কি করা যায় কও তো শুনি।’ তাদেরই ওয়ার্ডের মেম্বার মতি মিয়ার কাছে জানতে চান চেয়ারম্যান সাহেব। মতি মেম্বার স্বাধীন চেতা মানুষ। সে অন্যায়কে তেমন প্রশ্রয় না দিলেও চেয়ারম্যানের দাপটে তেমন কিছুই করতে পারে না। এ দিয়ে মাঝে মধ্যে কিছু দ্বন্দ্বও তাঁদের মধ্যে হয়। বাধ্য হয়েই তিনি সব সময় কৌশলী পথ অবলম্বন করেন। উত্তরে মেম্বার বললেন, ‘চাচা, আপনি থাকতে আমার কি কওয়ার আছে? আপনে যা কন- তাই তো অইব।’
মুরুব্বি গোছের একজন বললেন, ‘চেয়ারম্যান সাব বিচারের কাজ শুরু করলে ভাল হয়।’ বলে সেও অন্যদের মতামত জানতে চায়, ‘আপনারা কি কন?’
আবারো গ্রামের দশ জন সমস্বরে বলে উঠে, ‘ঠিক কইছেন চাচা, ঠিক কইছেন।’
চেয়ারম্যান সাহেব দুই হাত উঁচু করে সবাইকে শান্ত করে বলেন, ‘আচ্ছা আচ্ছা। আপনারা থামেন। সবাই শুনেন আমি কি বলি।’
‘হ হ। চেয়ারম্যান সাব, আপনি কন।’ মাতবর গোছের আরেক জন মুরুব্বি লোক ডান হাত উঁচু করে সম্মতি জানান।
‘শুনেন সবাই। কাশেম ‍আলী মস্ত বড় অপরাধ করেছে। এর দৃষ্টান্ত মূলক শান্তি দিমু। যেহেতু সে রোগা-সোগা মানুষ, তাই তারে সরাসরি শরীরে আঘাত করা যাইব না।’ বলেই মেম্বারের সমর্থন চান-‘কি কও মেম্বার।’
‘ঠিক কথা। মার-ধর করলে আবার কি থাইক্যা কি অয় কে জানে! কাজডা যে ভাবে সহজে সমাধান করা যায় সে পথে হাঁটাই ভাল।’ উত্তর দেয় মেম্বার।

‘কাশেম আলীর শাস্তি অইলো- সে এইখানে সবার সামনে মাফ চাইবো, নাকে খত দিবো, একশ ‍বার কান ধইরা উঠা-বসা করবো, আগামী তিন দিনের মধ্যে সে ছাগলের দাম জালালরে ফিরাইয়্যা দিব। আর, সাত দিনের মধ্যে গেরাম ছাইড়্যা চইল্যা যাইব।’ একটু থেমে আবার বলল, না অইলে ভবিষ্যতে এই রকম কাজ আরো হইবো।’ বলে উপস্থিত সকলের সমর্থন চায়। ‘আপনারা কি কন?’
‘ঠিক কইছেন চেয়ারম্যান সাব। তাই করতে অইব।’ এক সাথে আওয়াজ উঠে। মতি মেম্বার এমন রায়ে ভীষণ মর্মাহত হলেও কোন প্রতিবাদ না করে চুপ করে থাকল। কারণ সে জানে, এখানে প্রতিবাদ করে কোন লাভ হবে না। লাবীবও এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল, আর মনে মনে ক্ষোভে ফুসছিল। এদিকে অপরাধের তুলনায় গুরু দণ্ডে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে কাশেম আলী।
‘হুজুর। আমারে শাস্তি যা দেওয়ার এইখানে দেন। কাটেন-বাটেন যা ইচ্ছা তা-ই করেন। তবু আমারে ভিটা ছাড়া করবেন না। আল্লাহর দোহাই লাগে হুজুর। একটু রহম করেন।’ হাত বাঁধা কাশেম আলী চেয়ারম্যানের মুখের দিকে তাকিয়ে শিশুর মত হাউ-মাউ করে কেঁদে করুণা ভিক্ষার আবেদন করে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।
‘চুপ কর মিয়া। যা কইছি তা-ই অইব। হাকিম নড়ে, হুকুম নড়ে না; বুঝলা?’ ধমক দেয় চেয়ারম্যান। এইবার লাবীব মুখ খুলে। এটা যে একটা পূর্ব পরিকল্পিত এবং বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত রায় তা বুঝার একবিন্দু বাকি রইল না তার।
‘আব্বা। লোকটার সব কথা শুনলেন। অভাবের তাড়নায় পেটের দায়ে অসহায় অবস্থায় সে না হয় একটা ভুল করে ফেলেছে। সে ভুল স্বীকারও করছে। ক্ষতি পূরণও দিবে। তারপরও এত শাস্তি! এমন কি তাকে গ্রাম ছাড়া পযর্ন্ত করতে হবে! এটা কেমন বিচার!’
‘বেটা তুমি চুপ কর। মুরুব্বিরা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে- তা-ই অইব।’
‘এই একটা সামান্য অন্যায়ের জন্য এত বড় শাস্তি কেন?’ প্রশ্ন লাবীবের।
‘এইটারে তুমি সামান্য অন্যায় বলছ? একটা খাসি চোরি করেছে। যেই সেই কথাতো নয়! একটা পেয়ারা দু’টা সুপারি হলেও কথা ছিল।’
‘এটা যদি অনেক বড় চোরি হয়- তাহলে যারা জনগণের টাকা লুট করে, রাস্তা-ব্রিজের কথা বলে সরকারি টাকা চোরি করে তাদেরটাকে কি বলবেন? এই রকম হাজারো কাজ প্রতিদিন হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে রায় কি হবে? কাশেম চাচা অসহায় বলে তার বিরুদ্ধে এত তোড়জোড়! মশা মাড়তে কামানের ব্যবহার। চোরির শাস্তি যদি হতেই হয় তাহলে সব চোরদেরই শাস্তি হওয়া উচিত।’
ছেলের কথায় চেয়ারম্যান সাহেবের রাগ মাথায় উঠে যায়। কিন্তু এত লোকের সামনে এই অকাট্য সত্য কথার প্রতিবাদও চলে না। গলা কেশে, একটু থেমে, নিচু স্বরে শুধু বলল, ‘ঠিক আছে বাবা তুমি থাম। এখন সামনে যেটা পড়েছে সেটাই শেষ করি।’
তারপরেও অনেক চেষ্টা করে সে; কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়। সেখানেই শারীরিক শাস্তি কযর্কর হয়। আর বাকিগুলো নির্ধারিত সময়ে আদায়ের জন্য তাগাদা দেওয়া হয়।

ঐ দিন রাতে কাশেম আলীর সাথে সাক্ষাত করে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে লাবীব। দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। অবশ্য কাশেম আলী ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। তাই বলল- ‘বাবা গো তুমি কি করবা! আমার কপাল মন্দ। তোমার যা চেষ্টা করার তা তো করছই। জীবনে অনেক কষ্ট কইর্যা চলছি। কিন্তু কারো কাঁচা আইলে পারা দেই নাই।’ বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে কাশেম আলী। কথাগুলো শুনে ঘর থেকে বাইরে আসে নিশাত। লাবীব কাশের আলীর সামনেই দাঁড়ানো ছিল। লাবীবকে দেখে তার রাগে ফেটে পড়ার অবস্থা।
‘কেন আসছেন এখানে? কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিতে- না? আপনারাই শাস্তি দেন আবার আপনারাই সান্তনার বাণী শুনান। বাহ্! কি আজব এই দুনিয়া।’
‘মা। তুই ভুল করতাছস। লাবীবের তো কোন দোষ নাই। তার যৎটুকু সাধ্য আছে তৎটুকুতো করছেই।’ বলে কাশেম আলী নিশাতের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বুঝিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দেয়।
‘চাচা, জানি আপনার কাছে তো ‍টাকা নাই। তাই এই টাকাটা রাখেন। জালাল চাচাকে এই টাকাটা দিবেন। আর দেখি আপনার যাতে গ্রাম ছাড়তে না হয়, তার কোন ব্যবস্থা করতে পারি কি না।’ বলে সে টাকাটা দেয়। টাকা নিয়ে কাশেম আলীর চোখ ভিজে উঠে।
‘বাবা, তোমার মত এমন ফেরেস্তার মত মানুষ যদি গেরামে গেরামে থাকত, তা অইলে মানুষের এত দুঃখ কষ্ট থাকত না।’
‘সে কথা থাক চাচা। এখন দেখি কি ভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়। আমি আজ আসি।’ বলে লবীব বিদায় নেয়। কাশেম আলী ঘরে ডুকে।




‘মারে তোর পরীক্ষা বোধ অয় আর দেওয়া অইবো না। কত আশাই না করেছিলাম। আহা-হা-রে। আমার একটা ভুলের ‍কারণে.......।’ নানান অনিশ্চয়তায় আক্ষেপ করতে করতে বলে কাশেম আলী।
‘আব্বা, আমার পরীক্ষা দিতে অইবো না। তুমি এই নিয়া চিন্তা কইরো না। আগে তো বাইচ্যা থাকা- তারপর অন্য কিছু।’ বাপকে সান্তনা দেয় নিশাত।

এ দিকে লাবীব অনেক চেষ্টা করেও কিছু করতে পারল না। এই নিয়ে বাপ-ছেলের মধ্যে দ্বন্দ্বও কম হয়নি। হুজুকের মিছিলে বাস্তবতার ধ্বজাধারী লাবীবরা যে চির কালই মার খায়! উপায়ান্তর না দেখে আরও কিছু টাকা কাশেম আলীকে দিয়ে বলে- ‘চাচা, আপনাদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। বড়ই অক্ষম আমি। যাই হোক- আপনারা শহরে চলে যান। দক্ষিণ পাড়ার খলিল চাচা ঢাকায় থাকেন। এই যে ঠিকানা। উনার সাথে ফোনে আমার কথা হয়েছে। আপনার ‍কাজের ব্যবস্থা তিনি করে দিবেন। তবে কথাটা গোপন রাখবেন।’ বলতে বলতে পকেট থেকে আরও কিছু টাকা বেড় করে কাশেম আলীর হাতে তোলে দেয় পথ খরচের জন্য।
‘বাবা তোমার এই ঋণ কেমনে শোধ করমু?’ কৃজ্ঞতায় আবেগে কেঁদে ফেলে কাশেম আলী।
‘চাচা, মানুষের বিপদে মানুষ পাশে দাঁড়ায়; আর দু’পায়ী পশুরা তা থেকে বিকৃত আনন্দ লাভ করে। তবে আমি আপনাকে যতটা না সাহায্য করছি- তার চেয়ে বেশি আমার বাপের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছি! প্রায়শ্চিত্ত করছি!!’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে গভীর আবেগের সাথে বলে লাবীব। একটু থেমে আবার বলে, ‘থাক সে কথা। এখন যা বললাম সেই মত কাজ করেন।’ বলে লাবীব চলে গেল। কাশেম আলী সপরিবারে ঐ রাতের ট্রেনেই ঢাকায় চলে গেল।





এই দিকে সমাজের বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লাবীব একাই লড়তে থাকে। কিন্তু কোন কূল-কিনারা পায় না। কারণ এই অন্যায়ের মূল চাবি-কাঠি যে তারাই জন্ম দাতা পিতা! আর ন্যায়-অন্যায়কে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের তিক্ততা তুঙ্গে। কিন্তু পিতার ক্ষমতার দাপটে পুত্রের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তারপরও কয়েক মাস ব্যর্থ সংগ্রাম চালিয়ে যায় সে। অবশেষে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সেও গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে যায়।

ঢাকায় গিয়ে এক বন্ধুর বাসায় উঠে লাবীব। একটা প্রাইভেট ফর্মে চলন সই বেতনের একটা চাকরি জোগার করে নিজেই একটা বাসা ভাড়া করে। প্রাথমিক গোছ-গাছ শেষ করে- কয়েক দিন পর কাশেম আলীর বাসায় সাক্ষাত করতে যায় সে।
‘কেমন আছেন চাচা?’
‘বাবাজি তুমি!’ অবাক হয়ে যায় কাশেম আলী। ‘ভাল বাবা; খুব ভাল আছি। তুমি কেমন আছ বাবা?’
‘আপনাদের দো’আয় ভাল ‍আছি চাচা।’
‘বস বাবা, এখানে বস।’ একটা কাঠের চেয়ার টেনে দিয়ে বলল কাশেম আলী।
‘থাক থাক। এত ব্যস্থ হতে হবে না চাচা।’
‘তো তুমি এখানে!’ অবাক হয়ে কাশেম আলী জিজ্ঞাস করে।
‘আপনাদের খবর দিতে আসলাম। কেমন আছেন কি করছেন- এই আর কি।’
‘বাবা, আয়-রোজগার ভালই হচ্ছে। হকারি করছি, এই আর কি বাবা। সকালে জিনিস-পত্র কিনে সারা দিন বিক্রি করি। আমরা তো আর চাকরি-বাকরি করতে পারব না।’ কিছুটা সংকোচের সহিত বলে সে।
‘কি যে বলেন চাচা! সৎ পথে থেকে যে কোন কাজই সম্মানের।’ কাশেম আলীর সংকোচ নিরসনের জন্য লাবীব উত্তর দেয়।

এখানে এসে তাদের কথা-বার্তা, পোশাক-আশাকসহ সব কিছুতেই এত পরিবর্তন দেখে লাবীবও কম বিস্মিত হয়নি। এত কম সময়ের মধ্যে এত পরিবর্তন!

চা-নাস্তা খেয়ে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে নিশাতকে নতুন উদ্দ্যোগে লেখা-পড়া শুরু করতে বলে লবীব। সব শেষে সে নিশাতের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেয় কাশেম আলীর কাছে।
‘চাচা, বাবার ভ্রান্ত বিলাসের পাপী জীবনকে প্রত্যাখান করে, চলন সই একটা বেতনের চাকরি নিয়ে সত্যকে আঁকড়ে থাকতেই ঢাকায় চলে এসেছি। আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনে নিশাতকে সঙ্গিনী করে নতুন প্রত্যয়ে বাকী জীবনটা কাটাতে চাই।’ নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড কাশেম আলীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে কাল বিলম্ব না করেই কিঞ্চিত সংকোচের সহিত সে বেড়িয়ে যায়।

কিন্তু লাবীবের শেষের দিকের কথা কয়টা শুনে যেন কাশেম আলী মাথায় বাজ পড়ার উপক্রম হল। গাঁয়ের চেয়ারম্যানের বিভৎস রূপটা তার মনের মাঝে ভেসে উঠল। যে মুহূর্তে জীবনের নিকষ ‌আঁধার কিছুটা প্রশমিত হয়ে পূবার্শায় সোনালী আলোর রেখা ফুঁটবে ফুঁটবে অবস্থা; ঠিক সেই মুহূর্তে লাবীবের কথা কয়টা যেন গভীর কালো মেঘ হয়ে তার জীবনটা ঢেকে দিয়ে আবার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ছেলে হিসাবে লাবীব উত্তম হলেও তার বাবা এই বিষয়টা নিয়ে যে একটা হুল-স্থুল কাণ্ড না ঘটিয়ে ছাড়বে না, এটা প্রায় ‍নিশ্চিন্তেই বলা যায়। এদের কালো হাতের থাবা যে কত দূর পর্যন্ত পৌঁছে, তার ধারণা পুরাপুরি না থাকলেও, সে এটা বুঝে যে- সে হাত খুব লম্বা। আবার লাবীবের কথাটাই অগ্রাহ্য করবে কি ভাবে! যে আলোতে লাবীব নতুন প্রত্যয়ে পথ চলতে চায়, সেটা যে আরও তাৎপর্যপূর্ণ- আরও গুরুত্বপূর্ণ!

সন্ধা হয়ে এসেছে। প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট্ট রূমে কাশেম আলী দু’টানা মন নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন। চোখ দু’টি তার সামনের খোলা দরজার দিকে। এমন সময় নিশাত এসে ঘরে আলো জ্বেলে দেয়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement