বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৬ মে ১৯৮৭

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

মুভি রিভিঊঃ আমার বন্ধু রাশেদ

পন্ডিত মাহী

  • advertisement

    (মূল কাহিনীঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবাল; পরিচালকঃ মোরশেদুল ইসলাম)

    প্রিয় ঔপন্যাসিক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এর প্রতিটি উপন্যাস হৃদয় নাড়িয়ে দেয়। ছোটদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে একটা বড় শূন্যতা ছিলো তা জাফর ইকবাল স্যার দূর করেছেন পরম মমতায়। ছোটদের নিয়ে আসংখ্য বই লিখেছেনও। উল্লেখ্যযোগ্যঃ আমি তপু, বকুল্লাপু, মেকু কাহিনী, আমার বন্ধু রাশেদ, কাজলের দিনরাত্রি, বুবুনের বাবা, হাত-কাটা রবিন, দিপু নাম্বার টু। এর মধ্যে বুবুনের বাবা, হাত-কাটা রবিন উপন্যাস অবলম্বনে তৈরী হয়েছে ধারাবাহিক নাটক। যা দর্শকদের দিয়েছে নির্ভেজাল আনন্দ। চলচিত্র পাড়ায় জাফর ইকবালের পদার্পণ নতুন নয়। অনেক আগেই তিনি মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন জনপ্রিয় উপন্যাস ও চলচিত্র “দিপু নাম্বার টু” দিয়ে। আসধারণ একটা কাহিনী থেকে একটা অসাধারণ চলচিত্র। আর তাই তার আরো একটি উপন্যাস নিয়ে যখন একটি চলচিত্র হবে তখন আলাদা একটা ভালো লাগা ভর করে। অধীর আগ্রহ নিয়ে অনেকদিন অপেক্ষা করেছি সেটি কবে দেখবো।

    যা দেখেছিঃ
    লাড্ডুকে নিয়ে নস্টালজিয়ায় ইবু যখন কর্ম-ব্যস্ততা থেকে ফেলে যাচ্ছে স্মৃতির টানে তখন থেকেই নড়ে-চড়ে বসা। লাড্ডু ততক্ষণে নিস্পৃহ ভঙ্গীতে সপ্তম শ্রেনীর ক্লাসে ঢুকে পড়েছে। তার বাবার পাগলাটে আর উদাসীনতায় ভালো একটা নাম জোটে নাই। তাই ক্লাসের সবাই মিলে নাম দিলো “রাশেদ”। কাহিনী তখন সবে শুরু। তবে প্রথমেই কেন জানি তারাহুড়ো করে চলে গেলো পরপর কিছু দৃশ্য। রাশেদের সাথে তার বন্ধুদের পরিচয়, কাদেরের সাথে ঝগড়া, হাতাহাতি আর ন্যাড়া করার দৃশ্য দেখে তো হেসে পেট ফেটে যাবার দশা। উপন্যাসের প্রতিটি বাক জানা, তাই সাথে সাথে বলে ফেলি, “তোর কপাল ভালো শুধু চুলের উপর দিয়ে গেছে, কাচু ভাইয়ের মাথা যা গরম।“ আর কাদেরের ক্যাপ পড়ার দৃশ্যটা দেখে যে কেউ ভিমড়ি খাবে। 

    এরপর দেখা যায় শফিক ভাই আর অরু আপাকে। ইবু সাথে অরু আপা দুষ্টামি দেখে অবাক হয়েছি সে আগের মতই। কত আন্তরিক ভালোবাসা সবার মাঝে। ছোট বিচ্ছু বাহিনীর এরপর কখনো ঔষধ বানায়, কখনো দেশ নিয়ে উতলা হয়। এদিকে ১৯৭১ এর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সেই অস্থির সময়ের নানা ঘটনা যা হাজারো কিশোরকে ছুয়ে যায় গভীর থেকে। রাশেদ সেখানে একজন প্রতিনিধি। খুব কাছে থেকে দেখে মৃত্যুর মত ভয়ানক দৃশ্য, বেয়নেট চার্জ। পাক আর্মিদের অত্যাচার বাড়তেই থাকে, সে সাথে কাপুরুষ রাজাকারদের। রাশেদ আর তার বন্ধুরা এর মাঝে করে ফেলে একটার পর একটা দূঃসাহসিক কাজ। গোপনে গোপনে পাকিস্তানি ক্যাম্পের ম্যাপ করা। গুলি পৌছে দেওয়া, সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ, হাসপাতাল থেকে বুদ্ধি করে আহত শফিক ভাইকে উদ্ধার করা। প্রতিটি দৃশ্য দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে। যুদ্ধের মাঝে ছোট্ট একটা দৃশ্য খুব মনে দাগ কাটে। সেটা হলো, কাদেরের যুদ্ধে যাওয়া আর ওকে দেখে ইবু আর রাশেদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব হয়ে যায় এক পলকে। বুকের মাঝে জড়িয়ে ওরা যখন অনুভব করে নিজের ভাইয়ের ঘামের গন্ধ। চোখে জল আসে, সে জল মোছার কোন চেষ্টা নেই। যে মানুষগুলো, যে ভাইগুলো নিজের জীবন দিয়ে স্বাধীনতা দিয়েছে তার কাছে এ এক ফোঁটা জল খুব সামান্য। ঐ একটি ঘটনা এত বড় লেগেছে কেন কে জানে! তবে এইটুকু বোঝা যায়, আমরা সে সময় সব আক্রোশ ভুলে, ভেদাভেদ ভুলে এক হতে পেরেছিলাম বলে আমাদের জয় হয়েছিলো। সেটি যে বর্তমান সময়ের দিকেও ইঙ্গিত দেয় তা সহজেই অনুমেয়। শেষের দিকে খুব তারাতারি শেষ হয়ে গেল তাই মন ভরলো না। রাশেদের মুখ থুবরে পরা দেখে আবার একচোট ভেতরে ভেতরে কাঁদলাম। 

    ছোট ছোট ভাললাগাঃ
    “আমার বন্ধু রাশেদ” চলচিত্রে কোনকিছু নিয়েই কোথাও সামান্য বাড়াবাড়ি নেই। উপন্যাসের পড়া হুবহু গল্পই পরিচালক “মোরশেদুল ইসলাম” নিষ্ঠার সাথে তুলে এনেছে। কোথাও নতুন করে ডায়ালগ বা কাহিনীর সংযোজন নেই দেখে ভালো লেগেছে। তবে শেষের শেষ হয়ে যাওয়া অংশটুকুতে এসে মনে হয়েছিলো পরিচালক কেন আরেকটু ধরে রাখলো না!

    যা কিছু চোখে লেগেছেঃ
    এই চোখে লাগার বিষয়টি সোজা চোখে নয়, একটু বাঁকা চোখে। গল্পের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চরিত্রগুলোর মাঝে একটা আড়ষ্টভাব থেকে গেছে। বিশেষ করে মূল চরিত্র “রাশেদ” ও তার বন্ধুদের মাঝে। এর মাঝে ‘ইবু” চরিত্রটিও বাদ যায় না। হতে পারে তারা এর আগে কোথাও অভিনয় করেনি, কিন্তু উচিত ছিলো আরো বেশী পরিচর্যার। সময়ে সময়ে রাশেদ চরিত্রটি পূর্ণতা পেয়েছে, ছোট্ট অভিনেতাও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পেরেছে। শেষদিকে ভালো হবার কারন চরিত্রের মাঝে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। যুদ্ধের দৃশ্য গুলোতে বাঙ্কার দেখা গেছে কিন্তু সেটিতে নীল কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে কেনো বোধগম্য নয়। 

    শেষ কথাঃ
    পুরো ছবি জুড়ে ভালোলাগার শেষ নেই। এমন চলচিত্র অবশ্যই প্রেক্ষাগৃহে সপরিবারে গিয়ে দেখা উচিত। অশ্লীল আগ্রাসনের যুগে এমন চলচিত্রই দরকার ছিলো একটা উদাহরণ হিসেবে। যে পথটি অনেক আগে সূচনা করেছিলেন মুহম্মদ জাফর ইকবালের অগ্রজ হুমায়ুন আহমেদ। সেই সাথে এমন সুস্থধারার চলচিত্র অনুদান দেবার জন্য সরকারও প্রশংসার দাবিদার।

advertisement