বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

রাশীচক্র

লুতফুল বারি পান্না

  • advertisement

    ক্রিকেটে হাত খুলে মারা বলে একটা কমেন্ট্রি চালু আছে। ছোটবেলায় বাক্যটা অবশ্য ব্যাপক ভুগিয়েছে। হাত খুলে আবার কিভাবে মারে? হাত খুলে রাখার কোন সিস্টেম আছে নাকি? থাকলেও হাত খুলে ফেললে মারবে কিভাবে? এ ধরনের প্রশ্ন শুনে যারা ইতোমধ্যেই মনে মনে আমার মাথার নাটবল্টু জাতীয় দুএকটা সংযোগ রক্ষাকারী যন্ত্রাংশ খুলে পড়ার আশংকা প্রকাশ করছেন তাদেরকে উনত্রিশ পাটি দাঁত বিকশিত করে একগাল বিগলিত হাসিযোগে জানাচ্ছি- আরে ভাই রসিকতা করছিলাম। উনত্রিশ পাটি শুনে যারা আবারো ঘাবড়ে গেছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি- আমি বেক্কল নই মানে আক্কেল দাঁত নামক বস্তুটি ব্যাপক যন্ত্রণা দিয়ে আমার আক্কেল তৈরীতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারুক না পারুক যথাসময়েই আভির্ভূত হয়েছিল। তবে যথাসময়ে মর্যাদা বুঝতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব ঘটায় মোটামুটি যন্ত্রণাহীনভাবেই যারা জন্মে উঠেছিল সেই সমস্ত দন্তকূলের জনা তিনেক অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। মর্যাদা না বোঝার এই ভুলটি অবশ্য শুধু দন্তকূলের ব্যাপারেই নয় অনেক ব্যাপারেই আমরা করে থাকি। সেটা নিয়ে পরে নাকানি চোবানি কম খেতে হয় না। এ বিষয়টার আর একটা উপমাও অবশ্য আছে তবে সেটা নিরীহ একটা চতুস্পদ প্রাণীর জীবন রক্ষাকারী তরল ঘোলা করে পান করা সংক্রান্ত কেস বলে আপাতত স্কিপ করে যাচ্ছি।

     

    বরং কলমের ক্যাপ খুলে লেখা বলে একটা নতুন বাকরীতি তৈরী করা যায় নাকি সেটা নিয়ে একটু মনোযোগ দাবী করছি সবার। যারা গল্পকবিতার সাথে একটু ভালরকম সম্পৃক্ত তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এ বিষয়টার সাথে অবধারিতভাবে কোন নামটা চলে আসতে পারে। হ্যাঁ আমাদের পন্ডিত মাহী মতান্তরে পন্ডিত মশাই। তার পন্ডিত নামটি কি তার নামেরই অংশ না বিশেষ কারো প্রদত্ত কিংবা নিজেই নিজের এরকম নামকরণ করা সেটা নিয়ে অনেকের মত আমারো একটু কৌতুহল রয়েই গেছে। বিষয় সেটা না, ইদানিং তার কলমে জোয়ার বা বন্যা নয় রীতিমত মহাপ্লাবন এসেছে।

     

    মনির মুকুল ভাই সেদিন বলছিলেন মাহীর কলমে নাকি চাহিদার চেয়ে যোগান বহুগুণে বেড়ে গেছে। মাহীর সংগে কান টানলে মাথা আসার মত অন্য যে নামটি চলে আসে সেটা নিঃসন্দেহে রনীল। মজার ব্যাপার হল রনীলের কলম আবার চাহিদা অনুপাতে যোগানের পরিমাণ খুবই কম। এসব দেখেশুনে আমার আবার সেই পুরোনো গল্পটা মনে পড়ে গেল। পর্যাপ্তভাবে আদনান সামী ক্যাটগরির একজন মানুষ সেইরকম কাহিল শরীরের একজনকে ধরে ফেলে খুব তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, 'আরে ধূর মিয়া এইরকম স্বাস্থ্য নিয়ে ঘোরাফেরা করতে লজ্জা করছে না। আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে দেশে দুর্ভিক্ষ লেগেছে।' আমাদের চিকনচাকন ব্যক্তিটি তার কঠিন হাতে বন্দী হয়ে কোনমতে চিঁ চিঁ করে বলল, 'ভাই আপনাকে দেখলে তার কারণটা আন্দাজ করাও খুব শক্ত ব্যাপার হবে না বোধ হয়।'

     

    অনেকেই ভাবছেন রাশীচক্র নাম দিয়ে কি সব বাসী বকবক শুরু করলাম। অনেক আগে টিভিতে ইমদাদুল হক মিলনের একটা ধারাবাহিক নাটক দেখেছিলাম, 'বারো রকম মানুষ'। নাটকের একটা বয়স্কা চরিত্রের মুখ থেকেই বোধ হয় এমন একটা সংলাপ এসেছিল, 'দুনিয়ায় বারো পদের মানুষ আছে।' প্রথমে ব্যাপারটার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারিনি। পরে বুঝেছি এটা সম্ভবত রাশীচক্র বিষয়ক। কারণ রাশীচক্রে বারটি জন্মলগ্নের বিষয় উল্লেখ আছে এবং এগুলো নাকি মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

     

    রাশীচক্রের ওপর আমার আগ্রহ এবং বিদ্বেষ দুটোই মোটামুটি সমান। আগ্রহ বোধ হয় কমবেশী সবারই আছে। বিদ্বেষের কারণটা একটু বলি। প্রথমেই নামকরণ- এমন বিচিত্র আর বৈষম্যমূলক নাম যে কারো মেজাজ খারাপ করার জন্য যথেষ্ট। একদিকে পরাক্রমশালী বৃষ অন্যদিকে জবুথবু মেষ। আমার এক বন্ধুকে বাসর রাতে তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, তোমার কি রাশী? বন্ধু উত্তর দিল, আগে তোমারটা শুনি। সে গর্বিত ভঙ্গীতে উত্তর দিল, সিংহ রাশী। কি সাংঘাতিক। এমন একটা রাশী থাকলে গর্ব করে উত্তর দেয়াটাই স্বাভাবিক। আমার বন্ধুটি একটু বিপন্ন বোধ করে মিনমিন করে বলল, 'ইয়ে আমার বাঘ রাশি।'

     

    বুঝতেই পারছেন স্ত্রীর যদি সিংহ রাশী হয় তাহলে বাসর রাতে বিলাই বধ করা কতটা দূরুহ হয়ে ওঠে। আমার বন্ধুটি সেই যে ব্যাকগিয়ারে গিয়েছেন তারপর থেকে বিলাই বন্ধুগৃহিনীর হাতেই রয়ে গেছে। যখন তখন তার ফোঁসফাঁস কিংবা সিংহের গর্জন বন্ধুটিকে এতটাই তটস্থ করে রাখত যে দেখেশুনে কিছুদিন বিয়ে না করার প্রতিজ্ঞায় অটল থেকে যাই। ঘটনা আমার জন্য একটু বেশীই হৃদয়বিদারক কারণ সিংহের মত এমন পরাক্রমশালী একটা রাশীর বিপরীতে আমার রাশীটি নেহাতই তুচ্ছাতিতুচ্ছ বৃশ্চিক অন্য কথায় বিচ্ছু। আরে বাবা সিংহ রাশী যখন আছে তখন বিড়াল প্রজাতির কেউ না হোক অন্তত হাতি বা নেকড়ে রাশি বলে কিছু তো থাকা উচিৎ ছিল।

     

    তা তো নেইই, বরং সিংহের উপস্থিতিতে অন্য রাশীদের একটা হচ্ছে মীন। বলেন তো ভাই সিংহের সাথে জুটি বেধে মিনমিন করা ছাড়া তার কিইবা করার আছে। অন্যান্য নামগুলোর মধ্যে একমাত্র ধনু-কেই সিংহের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয়। নিরাপদ দূরত্বে থেকে নানান কায়দায় তীর ছুঁড়ে মারার ক্ষমতা আছে বলেই হয়ত(!)। তবে এমন ওজনদার একটা জন্তুর সামনে তুলার মত হাল্কা একটা রাশীকে কী হাস্যকরই না লাগে। ব্যাপারটা একেবারে সোনায় সোহাগা হয় যখন এমন রাশীর দাবীদার হয়ে আসে সূর্য। কিন্তু, বিষণ্ণ সুমন থেকে নিরব নিশাচর হয়ে ক্রমশ আহমেদ মুকুল ভাই পর্যন্ত গড়ালে ব্যাপারটা ঠিকই তার ভাবগাম্ভীর্য ফিরে পায়। আর সবচাইতে বেশী আশ্চর্য হল এই তুলা রাশির চারজনের কাঁধেই বিভিন্ন সময়ে বন্ধুমেলার ভার ন্যস্ত ছিল। এটা আবিস্কার করার পরে কিছুদিন আমি আমাদের এখানে বিভিন্ন সংগঠনের মাথায় চড়ে থাকাদের রাশী নিয়ে বেশ একটা রশি টানাটানি শুরু করেছিলাম। বলা যায় না তারাও তুলা রাশী হয়ে যেতে পারেন। তাহলে তুলা রাশীর সাথে নেতৃত্বের একটা যোগসূত্র ঠিক আবিস্কার করে ফেলতাম।

     

    আমার এক বন্ধু ছিল চমৎকার কন্ঠশিল্পী। শিল্পী বলেই হয়ত একটু উদাস প্রকৃতির, একদিন ওর মেসের রুমে গিয়ে দেখি বালিশ ফেটে তুলা বেরিয়ে পুরো বিছানার সংগে সে নিজেও মাখামাখি হয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কিরে দোস্ত তোর এ অবস্থা কেন? সে বলল আর বলিস না, জীবনটাই পুরা তুলাতুলা হইয়া গেছে। আমদের বন্ধুমেলাটারও বোধ হয় কিঞ্চিৎ তুলাতুলা অবস্থা। বৃষ্টিতে ভিজে কয়েকদিন একটু চুপসে ছিল এই যা। আশা করছি তিন তারিখ আবার ফুরফুরে হয়ে আকাশে উড়বে।

     

    রাশী নিয়ে শেষ অধ্যায়টি আমার আর এক বন্ধুকে নিয়ে। বন্ধুটি কন্যা রাশির জাতক। প্রচলিত ধারণা হল কন্যা রাশির জাতকেরা নাকি কন্যাদের মন জয় করতে সিদ্ধপুরুষ। আমাদের এই বন্ধুটি আজীবন কন্যাদের পেছন পেছন আছাড় খেয়েই মরল। কন্যাকূল তার পুরুষালী চেহারা, হ্যান্ডসাম ফিগার, ঈর্ষণীয় উচ্চতাসত্বেও কিছুতেই তাকে মনবাগানের মালির পদে নিয়োগ দিতে নারাজ। আমাদের সংগঠনেরই এক সুন্দরীর প্রেমে তখন তার পুরা আউল ঝাউল অবস্থা। যতদিন বিষয়টা অব্যক্ত পর্যায়ে ছিল তাদের বন্ধুত্ব ছিল চমৎকার। কিন্ত যেই বন্ধু আমার মুখ ফোটাল ব্যাস বান্ধবীটিও ব্যাক গিয়ারে আড় হয়ে রইল। এমন বেকায়দা পরিস্থিতিকে কায়দায় আনতে বন্ধুটি প্রতিদিনই নানান সৃজনশীল পদ্ধতি প্রয়োগ করতে শুরু করল। সর্বশেষ পদ্ধতিটি বেশ অভিনব ছিল। বন্ধুটি একটা রাশীর বইতে আবিস্কার করল, তাদের দুজনের রাশীর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তারা হবে রাশীগতভাবে আদর্শ জুটি। ব্যাস সে রাশীচক্রের বই নিয়ে ঘুরতে শুরু করল। যখনই মেয়েটাকে কাছে পায় বই বের করে সমানে লেকচার দেয়া শুরু করে।

     

    অবস্থা এমন দাঁড়াল তাকে দেখলেই মেয়েটি পালানোর রাস্তা খোঁজে। তাদের সম্পর্কের রশি জোড়া লাগার যে ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল সেটাও এভাবে রাশীর ফাঁসে ফেঁসে গেল। হায় কত সম্ভাবনাময় সম্পর্ক যে আমরা বোকামীর কারণে নষ্ট করে ফেলি।

advertisement