সন্ধ্যার আকাশে তখন মিশে আছে শুকতারা আর ক্ষীণ অন্ধকার। শীতের হাওয়া ধীরে ধীরে নেমে আসছিল কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ছোট্ট গ্রাম শাহাবৃদ্ধিতে। গ্রামটি যেন বাইরে থেকে শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেক গল্প, ভয়, আশা আর স্মৃতির গভীর স্তর জমে ছিল। ঠিক এমন এক সন্ধ্যায় স্কুলশিক্ষক নাজমুল ইসলাম স্যার তাঁর পুরোনো সাইকেলটি ঠেলে বাড়ির পথে ফিরছিলেন। আজ ক্লাসে ভূমিকম্প নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, আর শিক্ষার্থীরা ভয় আর কৌতূহলের মিশেলে নানা প্রশ্ন করেছিল। স্যার যতই বৈজ্ঞানিক ভাষায় ব্যাখ্যা দিতেন, বাচ্চাদের চোখে ততই জ্বলে উঠত অজানা আতঙ্কের আগুন।
বাড়ি ফিরে দরজা খুলতেই তাঁর ছয় বছরের মেয়ে লাবনী দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। তার ছোট্ট মুখে উদ্বেগ—কেন জানি না, এমন দিনগুলোতে তাকে স্যার আরও বেশি অসহায় মনে হয়। রাতের খাবার খেতে বসে লাবনী হঠাৎই বলল, “বাবা, ভূমিকম্প কি আবারও আসবে? আমাদের ঘর ভেঙে পড়বে?” কথাটা যতটা সহজে বলা, তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল পাহাড়সম ভয়ের ছায়া। নাজমুল স্যার স্মিত হাসলেন, বললেন, “ভয় পেলে হবে না মা। ভূমিকম্প আসলেই আমরা নিচু জায়গায় গিয়ে বসব, মাথা ঢেকে রাখব। ভয় পেলেই বিপদ বাড়ে। বুঝলে?”
লাবনী বিশ্বাস করল কি না তা বলা মুশকিল, কিন্তু তাকে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিতে দিতে স্যারের মনের ভেতর জমতে থাকল উদ্বেগের এক অদৃশ্য চাপ। আজ সারাদিন খবর চ্যানেলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হালকা ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার খবর চলছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা নাকি বেড়েছে। এসব কথা তিনি মাথা থেকে সরাতে পারছিলেন না।
রাত গভীর হলে গ্রামটিও গাঢ় নীরবতায় ডুবে যায়। হঠাৎ, ঠিক ভোরের আগে, এক অদ্ভুত কম্পনে স্যার ঘুম ভেঙে উঠলেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো স্বপ্ন দেখছেন, কিন্তু পরক্ষণেই চারপাশে শোনা গেল মানুষের চিৎকার, বাসনপত্রের ঝনঝন, বিছানার নিচে নেমে আসার হাহাকার। পুরো ঘর দুলে উঠেছে—দুলছে যেন মানুষের নয়, সময়ের টানাটানিতে ছিঁড়ে যাওয়া নিঃশব্দ এক পৃথিবী।
নাজমুল স্যার তাড়াতাড়ি লাবনীকে কোলে তুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে লোকজন দিগ্বিদিক ছুটছে। কেউ কাঁদছে, কেউ দোয়া পড়ছে, কেউ বা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রাম্য মাঠটিই হঠাৎ করে নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল হয়ে উঠল। সব পরিবার সেখানে জড়ো হলো। দূরে কোথাও কুকুরগুলোর আর্ত চিৎকার, আকাশ যেন আরও কালো হয়ে গেছে, বাতাসে ধুলোর গন্ধ, আর মানুষের ভয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আরও শীতল।
কম্পন থেমে যেতেই সবাই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরতে লাগল। এখনো কেউ জানে না কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গ্রামের কিছু ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে, স্কুলের পুরোনো ভবনটির সামনের দালান চিরে গেছে। নাজমুল স্যার তা দেখে বুকের ভেতর টনটনে এক ব্যথা অনুভব করলেন। তিনি জানেন—স্কুল ভবনটা টেকসই নয়, কিন্তু আর্থিক কারণে নতুন ভবন হচ্ছে না বহু বছর। অথচ প্রতিদিন শত শত শিশুর হাসি, কান্না, আনন্দ, স্বপ্ন সেই ভবনের দেয়ালের ভেতরেই বুনে ওঠে।
সূর্য উঠতেই গ্রামে আতঙ্কের নতুন ঢেউ বইতে লাগল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই সময়ে ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে—খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। রেডিও টিভিতে বিজ্ঞানীরা বলছেন ভূমিকম্পের কেন্দ্র নাকি উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের কাছে। সব শুনে গ্রামবাসীরা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে একত্র হলো। তাদের ভয়—যদি আবার আসে?
গ্রামের বয়স্ক হাফেজ সাহেব বললেন, “আল্লাহ আমাদের সতর্ক করছেন, বদলে যাওয়ার সময় এসেছে।” গ্রামের লোকজন মাথা নেড়ে তার কথা শুনতে লাগল। যদিও এসব কথায় কিছুটা সান্ত্বনা পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যিকারের সমাধান লুকিয়ে আছে প্রস্তুতির ভেতর—এই কথা কেউ বলে না।
সেই বিকেলে নাজমুল স্যার সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি গ্রামের শিশুদের নিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করবেন। কেবল ভয় দেখিয়ে কিছু হয় না—ভয়কে জ্ঞান দিয়ে পরাস্ত করতে হয়। তিনি স্কুলের মাঠে সব ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের ডেকে আনলেন। সবাই তখনো রাতের ঘটনার আতঙ্কে তটস্থ। স্যার দাঁড়িয়ে বললেন, “ভূমিকম্প এমন এক ঘটনা, যা আমরা ঠেকাতে পারব না। কিন্তু সঠিক নিয়ম জানলে প্রাণহানি কমানো যায়। আমাদের বাঁচার শক্তি জ্ঞানের মধ্যে।”
তিনি দেখালেন—কম্পন শুরু হলে কীভাবে নীচু হতে হবে, টেবিল বা বিছানার নিচে মাথা ঢেকে বসতে হবে, দরজা বা জানালার কাছে না যেতে হবে, গ্যাসের চুলা দ্রুত বন্ধ করতে হবে, শক্ত কিছু ধরে রাখতে হবে। বাচ্চারা অবাক চোখে এসব শিখছিল। অভিভাবকেরাও মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
গ্রামের লোহার দোকানদার রহিম মিয়া বললেন, “স্যার, টিভিতে তো দেখি বিদেশে বড় বড় ভবন ভূমিকম্পে পড়ে না। আমাদের ঘরগুলো এত দুর্বল কেন?”
স্যার একটু থেমে বললেন, “কারণ ওদের ঘর নিয়ম মেনে বানানো। আমরা এখনো নিয়ম মানতে শিখিনি। আমাদের দেশ ভূমিকম্পপ্রবণ, কিন্তু ঘরবাড়ি, মার্কেট, স্কুল—বেশিরভাগই নির্মাণ হয় পরিকল্পনা ছাড়া।”
রহিম মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “তা হলে তো আমরা চিরদিন ঝুঁকিতেই রইলাম!”
নাজমুল স্যার জানতেন—রহিম মিয়ার কথাই সত্য। উন্নত দেশের মতো ভূমিকম্প প্রতিরোধী নকশা, শক্তিশালী নির্মাণ, কঠোর মানদণ্ড—এসব এখনো বাংলাদেশের বেশিরভাগ জায়গায় বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি স্বপ্ন দেখলেন—একদিন তাঁর গ্রাম হবে সচেতন, শিশুদের সুরক্ষিত, স্কুল হবে মজবুত, মানুষ হবে প্রস্তুত।
রাত নামতেই লাবনী আবার বাবার কাছে এসে বসল। তার চোখে প্রশ্নের ছায়া, কিন্তু মুখে সাহসের আভা। “বাবা, আজ তুমি যে নিয়মগুলো শিখালে, এগুলো মানলে কি আমরা বাঁচতে পারব?”
স্যার তাকে বুকে টেনে নিলেন। “হ্যাঁ মা, আমরা বাঁচব। মানুষ ভয়কে জয় করতে পারে জ্ঞান দিয়ে। আল্লাহও বলে—সতর্ক থাকো, সাবধান হও। আমরা যদি জ্ঞান শিখি, নিয়ম মানি, তবে বিপদ কমে যায়।”
লাবনী নিশ্চিন্ত হয়ে বাবার কাঁধে মাথা রাখল। নাজমুল স্যার জানতেন—সেদিন রাতের ভূমিকম্প গ্রামবাসীদের চোখ খুলে দিয়েছে। ভয় এখনো আছে, কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে গেছে বেঁচে থাকার ইচ্ছা।
পরদিন সকালে গ্রাম যখন নতুন আলোয় জেগে ওঠে, তখন সবাই যেন আগের চেয়ে একটু বেশি সংযুক্ত, একটু বেশি সচেতন। ভূমিকম্পের মতো বিপর্যয় মানুষের ক্ষতি করে, কিন্তু মানুষের ভেতরের মানবিকতাকে একত্র করেও দেয়। দুর্যোগ মানুষকে শিখিয়ে দেয়—বাঁচতে হলে প্রস্তুত হতে হয়, যুক্তি ও বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করতে হয়, আর পরস্পরের হাত ধরে রাখতে হয়।
তিতাসের সেই ছোট্ট গ্রামটি যেন সেই সকাল থেকে নতুনভাবে বাঁচতে শুরু করল—ভয়ের মধ্যে নয়, বরং জ্ঞানের আলোয়, সাহসের ভিত গড়ে তোলা এক নতুন দিনের প্রত্যাশায়।