তোমার কোমল হাতে আমাকে ধরে রাখতে পারবে তো! অনেক আগে অনিরুদ্ধ বলেছিল অনিমাকে। অনিমা বলেছিল কোমল হাত দিয়ে নয় তোমাকে বাঁধবো আমার কোমল হৃদয় দিয়ে। সেদিন অনিমা এটা বলেছিল দুষ্টুমি করে। সে তখনও অনিরুদ্ধকে নিয়ে তেমন কিছুই ভাবেনি। তাছাড়া যার নাম অনিরুদ্ধ তাকে কি রুদ্ধ করা যায় এমন একটা ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। হয়তো প্রকৃতি আড়ালে ওদের মনে ফুটে থাকা ভালবাসার ফুল দুটিকে মালায় গাঁথার পরিকল্পনা করছিল। তাই বছর না ঘুরতেই কথার কথা পরিণত হয়ে গেল মনের কথায় বাস্তবতায়। প্রজাপতির রঙিন ডানায় ভর করে এগিয়ে গেল সময়। প্রজাপতির বন্ধনে বাঁধা পড়ে কল্পনার রাজপ্রাসাদে রাজপুত্র রাজকন্যার সুখের সময় যেন শেষ হবার নয়। সাত পাকে বাঁধা এ সম্পর্ককে আরো সুন্দর করে দিলো একটি কোমল শিশু অনিমেষ।
শিশুর মুখ অতুল সুখ। শিশুর কোমল ত্বকে আলতো স্পর্শ বুলিয়ে যে অনাবিল আনন্দ তা যেন স্বর্গের সমস্ত আনন্দকে ম্লান করে দেয়। বর্ষার লাবণ্য, শরতের শুভ্রতা, হেমন্তের প্রাচুর্য, শীতের স্নিগ্ধতা, বসন্তের মাধুর্য নিয়ে যে শিশু ভূমিষ্ট হয়েছে তাকেও গ্রীষ্মের রুক্ষতার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতে হয়। প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস করে তার কমনীয়তা। কোমল পায়ে শক্ত মাটির পরশ লেগে হয়ে উঠে কঠিন। কোমলমতি মন অভাব অনটন সহ্য করে হয়ে উঠে কঠোর। কোমল ব্যবহার, মধুর ভাষা, সুন্দর আচরণ সমাজের দর্শনের ঘর্ষণে হয়ে উঠে রূঢ়। কোমলপ্রাণ কিশোর শৈশবের স্নেহ মমতার কথা ভুলে হয়ে উঠে দুরন্ত। আদর শাসনের গণ্ডি পেরুতে শুরু করে। হয়ে পড়ে মোহগ্রস্থ। সরল চিন্তায় জটিল জাগতিক ফাঁদ থেকে মুক্ত হতে পারে না। মতবাদ , মতাদর্শ , মতামত অদৃশ্য শক্তি দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে তাকে।সে হয়ে যায় নির্দিষ্ট জাতির , ধর্মের , বর্ণের , গোত্রের প্রতিনিধি, প্রচারকর্মী, অনুসারী। তৈরী হয় ভেদ। আদর্শের জন্য লড়াই অথবা বড়াই। প্রকৃতির সন্তান হয়ে প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে। তাই শাস্তি হিসেবে নেমে আসে বিপর্যয়।
কৈশোর পেরিয়ে যৌবন আসে অনিমেষের জীবনে। স্বপ্ন জাগে মনে। পূর্বপুরুষের মতো সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ব্যবসায়ী হতে চায় না, সে মুক্ত হতে চায়, বাউল হওয়াই তার লক্ষ্য। তার জীবনেও দুটো কোমল হাতের প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক অবস্থানের উপর নির্ভর করে অনেককিছু। সে কোন রম্ভা, উর্বশী চায়নি, চেয়েছে সাদামাটা একটা মেয়ে। এসময় পরিচয় হয় অহনার সাথে। অহনা বলল সে একজন মুক্ত মনের মানুষকে চায়। কিন্তু অহনার কোমল হাত অনিমেষকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না। তাদের প্রেম বিবাহে পারিণত না হয়ে বিরহে পরিণত হয়। কোমল আবেগ কঠিন বাস্তবতার কাছে হার মানে। সুকোমল পুষ্প নিষ্ঠুরভাবে পদদলিত হয় অহনার বাবার সামাজিক অবস্থানের কাছে। আত্মসম্মানের কাছে অনুভূতির কোন মূল্য নেই। অহনার জন্ম হয় গহনার মতো ধনী পরিবারের শোভা বর্ধনের জন্য। তার কোমল শরীর বন্দী হয় অলংকারে, আভিজাত্যের অহংকারে ভিনদেশী রাজার কুমার দখল করে নেয় অহনার গোলাপী কোমল অধর ওষ্ঠ। তার কোমল মন অট্টালিকার গহ্বরে চাপা পড়ে হাহাকার করে পারুর মতো। আবেগের আতিশয্যে অনিমেষ হতে পারতো দেবদাস। কিন্তু না কল্পনায় যা মানায় পরিকল্পনায় তা বেমানান। প্রকৃতির হস্তক্ষেপে তার আশ্রয় মেলে অবণীর কোলে। সে তাকে পূর্ণতা দিল। তার বুকে টেনে নিল সহমর্মিতায়। সঙ্গী হল জীবনের। উপহার দিল পিতৃত্ব। সকল কষ্ট ধূলায় মিশিয়ে দিয়ে জন্ম হল অনির্বাণের। অনিমেষ আর অবণীর শক্ত হাত ধরে বেড়ে উঠে অনির্বাণ। কোমলতা, সরলতা, সৌন্দর্যের পসরা নিয়ে চিরকোমল ঘাসের বিছানার উপর কোমলতার পরম্পরায় যুক্ত হলো এক নতুন অভিনয় শিল্পী।