একটু আধটু লেখালেখি করার অভ্যেস আছে বলে সেদিন একটা ক্লাবে মা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিচারকদের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গেলাম। বিতর্কের বিষয় "মা বনাম আদর্শ মা"। ঘন্টা বাজতেই পক্ষদলের প্রথম বক্তা সবাইকে সালাম জানিয়ে শুরু করল। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত। সনাতন ধর্মে আছে- মাতৃদেব ভব অর্থাৎ মা-কে দেবতার আসনে আসীন করে তাঁকে শ্রদ্ধা করতে বলা হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মে মা সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সমান মর্যাদা পেয়েছে। খ্রীষ্টান ধর্মে যিশু খ্রীষ্টের মা মেরী রীতিমতো গীর্জায় স্থান করে নিয়েছেন। সমস্ত দার্শনিক, এমনকি অনেক বিশ্ববরেণ্য রাষ্ট্রনায়কও জাতিগঠনে মায়ের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।

সর্বোপরি দশমাস দশদিন গর্ভধারণের কষ্ট, প্রসবকালীন বেদনা, শৈশবের পরিচর্যার কথা মনে করলেই সন্তানের মাথা মায়ের পায়ে নত হয়ে যায়। একটি শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে কত মা প্রাণ হারায়, সন্তানকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের সুখ বিসর্জন দেয় কত মা, অসুস্থতার সময় মায়ের সেবা, রাত জেগে থাকার কথা কোন সন্তান কখনও ভুলতে পারে না। সন্তানের শত বিপদে মায়ের দোয়া সর্বদা রক্ষা করে। যাদের মা আছে তারা যেন এক শীতল ছায়া অনুভব করে। যারা মাকে হারিয়েছে তারাও মায়ের আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করে। না বুঝে মায়ের মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করে। মা নাই একথা ভাবতেই চোখ জলে ভরে উঠে। তাই প্রতিটি সন্তানের কাছে তার মা শ্রেষ্ঠ। মায়ের আদর্শ বিচার সন্তানের কাজ নয়।

কথা বলতে বলতে প্রথম বক্তার কণ্ঠ ভারি হয়ে এল, চোখের পানি কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। অশ্রু সংবরণ করতে করতে সে বলল আমার মা নেই তাই আমি বুঝি মা না থাকার বেদনা। দয়া করে মা-কে নিয়ে বিতর্ক করবেন না।ওর কথা শুনে আমার চোখেও জল চলে এল। পরিবেশটা যেন হঠাৎ করে অন্যরকম হয়ে গেল। যারা শুনছেন তাদের অনেকে মাথা নীচু করে কান্না গোপন করছিলেন।

একটু পরেই বিপক্ষদলের প্রথম বক্তা প্রথমে পক্ষদলের প্রথম বক্তাকে সান্তনা দিয়ে সকলকে যথাযথ সম্মান জানিয়ে যুক্তিখণ্ডন করতে শুরু করল। সে বলল- মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত-এটি কোন সহীহ হাদীস নয়। বরং মা যদি পৌত্তলিকতার কারণে দোজখে যায়, ছেলে পরহেজগার হয়ে বেহেশতে যায় তখন মায়ের পা কোথায় থাকবে সেটাই চিন্তার বিষয়। এটা মায়ের সেবা করার প্রতি জোড় দিতে গিয়ে মানু্ষের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে। যেমন ছড়িয়ে আছে স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত-এর মতো জাল হাদীস।

দ্বিতীয়ত মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। জ্বীন, ফেরেশতার মতো দেবতাও মহান স্রষ্টার একটি সৃষ্টি। তাই মা-কে দেবতা বা ব্রহ্মার সাথে তুলনা করে সম্মানের বদলে অসম্মান করা হয়েছে। যারা দেবতা বা ব্রহ্মাকে মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে এসব তাদের চিন্তাপ্রসূত। আর মা মেরীকে যীশু নিজে গীর্জায় বসাননি। ধর্মব্যবসায়ীরা পিতা-মাতা-পুত্র নামক ত্রিতত্ত্ব বানাতে গিয়ে গোলমাল বাঁধিয়েছে। তদুপরি আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব-এ কথায় মা এর সাথে শর্তযুক্ত আছে বলে পক্ষদলের বক্তা সুকৌশলে কথাটি এড়িয়ে গেছেন। মাতৃসাধক ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন-যে মা সন্তানের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে বাঁধা হয়, সে মা বাঘিনী।- যদিও বাঘিনী তার সন্তানকে বাঘের হাত থেকে রক্ষা করে। পরশুরাম অবতার হয়েও মাতৃহন্তা হয়েছিলেন।

বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনে সন্তানের জন্ম। কণা থেকে শুরু করে সর্ববৃহৎ প্রাণী পর্যন্ত সবাই বংশবৃদ্ধির চেষ্টা করে। শুধু প্রক্রিয়া বিভিন্ন। কোনটা বিভাজন প্রক্রিয়ায়, কোনটা অঙ্গ থেকে, কোনটা বীজ থেকে, ডিম থেকে, গর্ভ থেকে, কোষ থেকে, শুক্রাণু-ডিম্বাণু থেকে, টেষ্টটিউব থেকে হয়। উন্নত দেশের মানুষ গর্ভ ভাড়া নেয়। লালন পালনের জন্য আলাদা কেন্দ্র আছে। তাই বলে ওরা কি সন্তানের মা নয়? তাছাড়া সন্তান জন্ম না দিয়ে মাদার তেরেসা, মা সারদা জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছেন।

যারা প্রতিদিন বিভিন্ন ক্লিনিকে গর্ভপাত ঘটাচ্ছে, অবৈধ সন্তানের দায় এড়াতে ডাস্টবিনে ফেলে যাচ্ছে, পরকীয়ার মোহে সন্তানকে হত্যা করছে, বিবাহ বিচ্ছেদ ও একাধিক বিয়ের কারণে সন্তানের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে সন্তানের ঘৃণা থাকতেই পারে। অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত কোন মায়ের সন্তান বিচারক হলে কি মায়ের বিচার করবে না? তাই শুধু জন্ম দিলেই হবে না শ্রদ্ধা পেতে হলে মা-কে হতে হবে একজন আদর্শ মা।

আমাদের দেশে সন্তান বিপথগামী হওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের অন্ধ স্নেহের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। প্রায়ই দেখা যায় সন্তানের দোষ মায়ের চোখেই পড়ে না। বলে আমার ছেলে এমন কাজ করতে পারে না। এভাবে শৈশবে নৈতিক শিক্ষা ও অপরাধের শাস্তি না পেয়ে সে ক্রমে বড় অপরাধী হয়ে উঠে। পক্ষদলকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি আবেগের দৃষ্টিতে না দেখে বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টি দিয়ে দেখুন এবং স্বীকার করুন আদর্শ মা-ই জন্ম দিতে পারে আদর্শ সন্তান।

বিপক্ষ দলের প্রথম বক্তার বক্তব্য শুনে আমার নিজেরই খেই হারিয়ে যায় অবস্থা। সাংঘাতিক বিশ্লেষণ। এভাবে আমিতো কখনও ভাবিনি। একেবারে দশে দশ দিয়ে দিলাম। যেমন তার উপস্থাপন, তেমনি যুক্তি খণ্ডন।

পক্ষদলের দ্বিতীয় বক্তা তেমন কিছুই বলল না। স্বাভাবিক ভাবে সম্বোধন করে অনেক কথা বলে যে বিষয়টা উপস্থাপন করল তার সারমর্ম হল-ব্যতিক্রম কখনো দৃষ্টান্ত হয় না।বিপক্ষদলের বক্তা বংশবৃদ্ধির কথা বলে মায়ের ঋণ অস্বীকার করেছেন। মাদার তেরেসা, মা সারদা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়।গর্ভপাত, পরকীয়া সমাজ স্বীকৃত কোন কর্ম নয়।অপরাধী যেই হোক অপরাধের বিচার হবে বিচার প্রক্রিয়ায়। তার সাথে মায়ের কোন সম্পর্ক নাই।
সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ থাকাই স্বাভাবিক।নৈতিক শিক্ষা মানুষ সমাজ থেকেই পায়। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে মা নয় সমাজ কাঠামোই দায়ী।তাছাড়া আদর্শ শব্দটি একটি আপেক্ষিক শব্দ। এর কোন সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নেই।সবচেয়ে দুঃখের বিষয়- তিনি প্রকাশ্যে ধর্মের অবমাননা করেছেন। যাঁর নিজেরই কোন আদর্শ নাই। তিনি মায়ের আদর্শের কথা কী বলবেন?

আমি লক্ষ্য করলাম পক্ষদলের বক্তা প্রকাশ্যে ধর্ম অবমাননার কথা বলে সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে।

বিপক্ষদলের দ্বিতীয় বক্তা যথাযথ সম্বোধনপূর্বক বক্তব্য শুরু করল। বলল পক্ষদলের দ্বিতীয় বক্তা বিতর্কে হেরে যাওয়ার ভয়ে ধর্মের বর্ম পড়ে নিয়েছেন, ধর্মের অবমাননার ধুয়ো তুলে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। কোন বিষয়ে সঠিক যুক্তি খুঁজে না পেলে তাঁরা এই সহজ রাস্তাটা বের করে সবার দুর্বলতার সুযোগ অনুসন্ধান করেন। যুক্তি খণ্ডন না করে ব্যতিক্রম বলে পাশ কাটিয়ে গেলেন। মাতৃঋণের কথা বলে শ্রদ্ধা ও সম্মানের বদলে দায়বদ্ধতার সম্পর্ক স্থাপন করলেন।মা-কে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাইরের অসহায় অবহেলিত রাঁধুনীর পর্যায়ভুক্ত করলেন।তারপর আদর্শের সঠিক সংজ্ঞা না জানলেও অন্যের আদর্শ আছে কি নেই সেই বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে গেলেন।বিতর্কের বিষয়ের আশেপাশেও গেলেন না কারণ মায়ের পক্ষে ছাফাই গাওয়ার মতো ওদের তেমন কোন তথ্য নেই।

আমাদের সমাজে ত্রয়োদশী বালিকা হয়ে যায় বধু তারপর চতুর্দশ বছর না পেরোতেই হয় মা। যার পুতুল খেলার বয়স সে সন্তান পালন করে। এ যেন শিশুর কোলে শিশু দোলে অবস্থা। মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দিবেন তিনি বলে বলে প্রতিবছর একটি করে সন্তান প্রসব করে। একটু বড় হলে চুরি করতে, কারখানায় কাজ করতে অথবা ভিক্ষা করতে পাঠায় উপার্জনের আশায়। এটা কি মাতৃত্ব নাকি ব্যবসা? অধিক সন্তান অধিক আয় করবে। অন্যের জমি দখল করবে। দলভারী হওয়ায় বেশী সুবিধা পাবে এমন পরিকল্পনা করে একাধিক সন্তানের জন্ম দিয়ে তাদের কষ্টে ফেলে দেয়ার দায় কি মায়ের উপর বর্তায় না? যদি মা হয় সচেতন, শিক্ষিত, আদর্শ মা তবে একটি আদর্শ সমাজ গঠন সহজ হয়। উন্নত দেশে সুস্থ সন্তানের জন্মদানের জন্য মায়ের অনেক পরীক্ষা করানো হয়। একাধিক সন্তান জন্মদানের অনুমতি দেয়া হয় না।তাই আমাদেরও আদর্শ মা তৈরি করতে হবে।

প্রধান বিচারক তিনজনের দেয়া নম্বর যোগ করে গড় করলেন। দেখা গেল পক্ষের দল জয়ী হয়েছে। কারণ সবাই অসহায়। ধর্ম বিষয়টা খুব স্পর্শকাতর। যুক্তি তর্কের উর্ধ্বের বিষয়। তাই যখন অবমাননার প্রসঙ্গ এলো তখন সবার টনক নড়লো। রায় ঠিক হয়ে গেল।