নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর পার্থিব বিপর্যতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর পর্যায় হলো পরিবারের কোনো সদস্যের অযাচিত আগন্তুকের হাত ধরে বাড়ি থেকে চলে যাওয়া। এই পার্থিব নিষ্ঠুরতার অদ্ভুত অপার্থিব বোধ নিয়েই এই গল্প যা বর্তমান বিষয়ের জন্য প্রাসঙ্গিক।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ জুন ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - পার্থিব (আগস্ট ২০১৮)

তিরু, তোর জন্য
পার্থিব

সংখ্যা

সাদিয়া সুলতানা

comment ৭  favorite ০  import_contacts ২৭৬
১.
তিরু নেই। ও চলে গেছে।

তিরুর চলে যাওয়া আমি দেখিনি। তখন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হয়তো মাঝরাতেই ও বিছানা ছেড়েছে। যাবার আগে ওর প্রিয় নকশীকাঁথাটা আমার শরীরের ওপর দিয়ে গেছে। অথচ এই কাঁথা নিয়ে রোজ ওর সাথে আমার কত ঝগড়া হয়! রাতে ঘুমাতে যাবার আগে কাঁথা নিয়ে ওকে অন্তত একবার না উস্কালে আমি মনে শান্তি পাই না। এই নকশীকাঁথাটা তিরুর খুব প্রিয়। কিছু জিনিসের প্রতি মানুষের অদ্ভুত একটা মায়া কাজ করে; এই কাঁথার প্রতি ঠিক তেমনই মায়া তিরুর। এই প্রিয় জিনিসের সাথে নিজের সব কিছু ফেলে তিরু চলে গেছে। হয়তো এখন এই প্রিয়সব জিনিসের চেয়েও অনেক প্রিয় কিছু পেয়ে গেছে ও। কিন্তু তিরু প্রতিজ্ঞা করেছিল, কাঁথাটা ও কিছুতেই হাতছাড়া করবে না।

নকশীকাঁথাটা আমাদের ঠাকুমা ভুবনমোহিনী তার যৌবনকালে তৈরি করেছিল। তবে ঠিক কবে কাঁথার বুনন শুরু করেছিল ঠাকুমা তা তার মনে নেই। আমাদের ‘নাই’‘নাই’ অভাবের সংসারে একমাত্র শৌখিন জিনিস আর আভিজাত্য বলতে এই কাঁথাটাই। কাঠের ঠাকুরঘরের নকশার আদলে লতা-পাতা, তুলসি তলা, কলসি কাঁখে নারী, শিশুর মুখের আদলে ফুল, ফুলের কলি, লাল জবা, গোলাপ, কাঁটাতার, আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি কী নেই এই নকশীকাঁথায়! সাদা কাঁথায় হরেক রঙিন সুতোর বুননে সব কিছু আছে সেখানে। এ যেন ঠাকুমার গোটা জীবনবৃত্তান্ত। কাঁথাফোঁড়, তেছরি, ভরাট, চেইন, জিরা ফোঁড়ের বাহারি নকশায় কতকিছু জীবন্ত হয়েছে এতে! যেদিন ঠাকুমা ট্রাংকের ভেতর থেকে সাত রাজার ধনরত্ন খুঁজে পাবার মতো তিরুকে কাঁথাটা বের করে দিলো সেদিন সত্যিই আমার খুব ঈর্ষা হয়েছিল। এমনিতে ওকে নিয়ে আমার ভেতরে তেমন কোনো প্রতিহিংসা কাজ করতো না। হাজার হোক তিরু আমার ছোট বোন। ওকে সবার মতো আমিও বাড়তি আদর দেওয়ার চেষ্টা করতাম। তিরু কিন্তু সারাক্ষণ আমার পেছনে লেগে থাকত।

আসলে তিরুকে বরাবর সবাই বেশি ভালোবাসে। মা, বাবা, বড়দা, ঠাকুমা, মণি পিসি, জুয়েল কাকা। এমনকি পাড়া-প্রতিবেশি সুদ্ধ। নিতাই কাকা তো বাবার কাছে তার বাড়ির বউ হিসেবে তিরুকে নেয়ার জন্য আগেভাগেই বায়না করে রেখেছে। আর অফিসফেরত বাবা? তিরুর হাত থেকে শেষ পাতে খানিকটা তেঁতুল বা আমের টক না পেলে তো বাবার পেটের ভাতই হজম হয় না। সে সবও আমার সয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঠাকুমার দেয়া উপহারে তিরুর পানপাতার মতো ফর্সা মুখটা যখন আনন্দআলোতে গোলাপি হয়ে উঠেছিল তখন আমি সিনডারেলার সৎ বোনের মতো হিংসাতে জ্বলছিলাম। আমার ইচ্ছে করছিল এক ছুটে গিয়ে তিরুর কাছ থেকে কাঁথাটা নিয়ে জ্বলন্ত চুলোর ওপর ফেলে দিই। এই তো ক’দিন আগেরই ঘটনা।

আজ তিরু নেই। ওর প্রিয় নকশীকাঁথা, কাঁচের চুড়ি রাখার বাকসো, টিপের পাতা, জুয়েল কাকাকে দিয়ে কোলকাতা থেকে আনানো সুগন্ধী তেল, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি, লিপিস্টিক, লাইনার, জামাকাপড় সবকিছু রেখে ও চলে গেছে। অথচ কোনোদিন বাইরে যাবার আগে নিজের চিরুনি না পেয়ে ওরটাতে হাত দিলেও তিরু ভীষণ রেগে যেতো। নিজের জিনিস ও কখনো হাত ছাড়া করতো না। আর আমরা কেউ কখনো যদি ভুল করেও ওর কিছুতে হাত দিতাম, ভীষণ রেগে যেতো ও। তিরুর হলো চন্ডাল রাগ। বরাবর সেই রাগের কাছে হার মানতে হয় আমাদের সবাইকে। আমার সাথে বাড়াবাড়ি করলে আমি মায়ের কাছে কখনো নালিশ করতে গেলে মা আমার হাত চেপে ভীরু গলায় বলে, বাদ দে না রাধা, তুই তো বড় আর জানিসই তো ও এমনই!

হুম তিরু এমনই। তাই আমি, আমরা মেনেও নিতাম। মেনে নিইও। তবু সেই তিরু চলে গেছে।

২.
তিরুর চলে যাওয়ার সময় মা’সহ বাড়ির সকলেই ঘুমিয়ে ছিল। সবাই যে যার মতো দেরি করে উঠলেও মার সকাল শুরু হয় ভোরের আলো না ফুটতেই। সকালে মার শরীরটা খারাপ লাগছিল বলে মা দ্বিতীয় দফায় বিছানায় গিয়েছিল। একটু গা এলিয়ে নিয়ে নাস্তা তৈরি করতে উঠবে বলে ভাবছিল। কিন্তু ক্লান্তিতে মায়ের দুচোখ বুঁজে এসেছিল। অথচ মা অন্যদিন সকালে কোনো অলসতা করে না। মা রোজ খুব ভোরবেলা পূজার ফুল তুলতে যায়। এখন অবশ্য ফুল তুলতে বেশি দূর যাওয়া লাগে না। আমাদের বাড়ির ছাদেই মা আর তিরু বাগান করেছে। আট-দশটা টব ছাড়াও সয়াবিন তেলের তিন বা পাঁচ লিটারের জারিকেনগুলোর এখন উপযুক্ত ব্যবহার হয় ফুল বা সবজির গাছ লাগিয়ে। বেলি, নয়নতারা, শিউলি, টগর, জবা ছাড়াও ধনেপাতা, শিম, শসা এসবের গাছও আছে। মা রান্না সেরে তরিতরকারির খোসা থালায় করে সোজা ছাদে চলে যায়। এসব উচ্ছিষ্ট প্লাস্টিকের একটা পুরনো ভাঙা বালতিতে রেখে সার তৈরি হয়, সেই সাথে ফেলে দেওয়া সবজির বীজ থেকে একটা-দুটো করে দারুণ সব সবজি চারা গজিয়ে ওঠে। সেসব নিয়ে মা আর তিরুর গবেষণার অন্ত থাকে না।

আমার মায়ের নাম সন্ধ্যামালা। ভোটার আইডি কার্ডে মায়ের স্বামীর টাইটেল রায় দেয়া আছে। এমনিতে মাকে সবাই ডাকে রাজেশের মা। আমার বড় দাদার নাম রাজেশ। দাদা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার পর মায়ের পূজা-আচ্চনা করা খুব বেড়ে গেছে। মায়ের ঠাকুরের প্রতি ভক্তি বরাবরই বেশি। কোনো অমঙ্গলের আশংকা করলেই মা উপোস করার সাথে সাথে পূজার সময়কালও বাড়িয়ে দেয়। মা পূজার আয়োজনের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। তুলসি পাতা, চন্দনের সাথে একেবারে অস্পর্শী ফুল চাই মায়ের পূজার থালায়। খুব ভোরে কৃষ্ণপূজার আয়োজনে সাদাটে ফুল চাই'ই চাই। বেলি, শিউলি, টগর বা কামিনী। সেই ফুল আবার গাছের নিচ থেকে কুড়ানো যাবে না, গাছ থেকেই ছিঁড়তে হবে। একেবারে তরতাজা, কোমল ফুল। পূজার ফুল তোলার ব্যাপারে মা তাই আমার বা তিরুর ওপর ভরসা করে না। মা রোজ পূজার ফুল তুলে এনে পূজা পর্ব সেরে রান্নাঘরে ছোটে। আর ঠিক তখনই বাড়ির বাদবাকি সকলের সকাল হতে শুরু করে।

ঠাকুমার সকাল হয়েছে টের পেয়ে আমাদের দুবোনের সকাল হয়। ঠাকুমা রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় মাদুর পেতে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে হামানদিস্তাতে পান ছেঁচতে বসেন। ঠাকুমার হামানদিস্তার টুকটুক শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তিরুরও। তিরু ঘুম থেকে উঠেই চোখ রগড়াতে রগড়াতে বারান্দায় গিয়ে ঠাকুমার সাথে পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করে। ঠাকুমাও অবশ্য কম যায় না। নাম ভুবনমোহিনী হলে কী হবে তার মুখের কথায় মোহিত হবার কোনো বিষয় নেই। খুব খিটমিটে মেজাজ বুড়ির। দুই মেজাজী মানুষের কথোপকথন শুনে আমি আর তাদের কাছে ভিড়ি না।

-এ্যাই বুড়ি। একটাও তো দাঁত নাই, অত পান খাওয়া লাগে ক্যান তোমার? আর এখানেই এসে আস্তানা গাড়া লাগে সাতসকালে? আর কোনো ঘাট চোখে দেখো না? শান্তি মতো ঘুমাতেও দেয় না একটু!
-এ্যাই ছেমড়ি! চোখ গরম করবি না একদম! তোর বাড়িতে আস্তানা গাড়ি? আমার ছেলের ঘরদোর। যা যা! ঘরের কামে মায়ের সাথে হাত লাগা। এত ত্যাজ দেখাইস না, পুছি না।
-উহ! তোমারেও আমি দুই ট্যাকা দিয়া পুছি না বুড়ি?
-আরেকবার বুড়ি বলবি তো এই জাঁতি দিয়া সুপারির মতো টুক কইরা তোর আঙুল কাইটা দিমু। যা, যা। ভাগ।
-এ্যাই অমন গালমন্দ করবা না। তোমার নাশা’র কথা বাবারে বইলা দিমু। গেলাম এক্ষুনি...

তিরুর গলাবাজিতেও যেখানে কাজ হয় না, সেখানে নাশা’র নাম শুনে জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো ঠাকুমা চুপ হয়ে যায়। ঠাকুমা চুপিচুপি তামাক পাতা খায়। সে এক অদ্ভুত পদ্ধতি। শুকনো তামাক পাতা হাতে ঢলে গুঁড়ো করে। এরপর নিউজপ্রিন্ট ছিঁড়ে তার ভেতর তামাক গুঁড়ো দিয়ে বিড়ির মতো মাথার দুপাশ মুড়ে সেটার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে একদম বিড়ির মতো টান দেয়। এরই নাম নাশা। এসব খাওয়া ডাক্তারের বারণ। হাঁপানির টান বেড়ে যায় ঠাকুমার। তাই বাবা নাশার গন্ধ টের পেলে ভীষণ কা- বেঁধে যায় বাড়িতে। তিরুর হুশিয়ারি শুনে ঠাকুমা তার হামানদিস্তা অচল করে গনগনে চোখে তিরুর দিকে তাকায়, কিছু বলে না।

আজ ঘুম ভেঙে আমি এদের কোলাহল শুনতে পাইনি। নিজের গায়ে কাঁথাটা দেখে আমি যেমন অবাক হয়েছিলাম তেমনি বাসার নিস্তরঙ্গ পরিবেশে আমার মনের ভেতর কেমন একটা গুঞ্জন তুলছিল, কিছু একটা হয়েছে, কিছু একটা হয়েছে। আসলেই আমাদের জন্য খুব বড় একটা ঘটনা ঘটেছে আজ।
ঘটনাটা যখন টের পেলাম তখন আমরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই ঠাকুমা হৈচৈ করে বাড়ি মাথায় তুলেছে।
-ও সতীশ! কই গেলরে...ও সতীশ, মাইয়্যা কই গেলরে!
আমি আর মা তাকে কিছুতেই থামাতে পারছিলাম না।
-ও ভগবান, তুমি সাক্ষী। নিতে নিতে সব নিলা! মাটি নিলা, ঘটি নিলা। আমার তিরুরেও নিয়া গেলা!

ঠাকুমার বিকট ডাক-চিৎকারে আমাদের বাড়ির বিপন্নতার ঝড় আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। আমি আর মা ঠাকুমাকে ধরে তার বিছানায় শুইয়ে দিয়েছি। কিন্তু শুয়ে শুয়েও ঠাকুমা বিলাপ করছেন। তার কারণে মা নিজে মেয়ের শোকে কাঁদার সময় করে উঠতে পারছেন না। তবু দুপুরের দিকে মায়ের ঘরে ঢুকে দেখেছি মা ঝরা পালকের মতো বিছানায় পড়ে আছে। বাবা বাড়িতে নেই। বাবা তিরুকে খুঁজতে গেছে। সাথে নিতাই কাকা আছেন। আমি জানি বাবা তিরুকে খুঁজে পাবে না। যে ইচ্ছে করে হারিয়ে যায়, তাকে কী সহজে খুঁজে পাওয়া যায়!

৩.
নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর পার্থিব বিপর্যতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর পর্যায় হলো পরিবারের কোনো সদস্যের অযাচিত আগন্তুকের হাত ধরে বাড়ি থেকে চলে যাওয়া। এরপর যা হয়, আমাদের পরিবারেও তাই হয়েছে। আশেপাশের দশ বাড়ির আলাপচারিতার প্রধান চরিত্র এখন তিরু আর সেই সাথে আমিও। ‘সতীশ বাবুর বড় মেয়ে রাধা ক্রমাগত আইবুড়ো হচ্ছে আর ছোট মেয়ে তিরু কোন বখাটে ছেলের হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। ছিঃ ছিঃ! কেলেংকারি, কী কেলেংকারি! এক মেয়ে পালানোর পর সতীশ অন্য মেয়ের বিয়ে দেবে কী করে?’ এই সব বিষয় নিয়ে মানুষের কথা বলার সুযোগ যত সহজে সৃষ্টি হয় তা কিন্তু ততো সহজে শেষ হয় না। আর কথা বলার সময়কালও শেষ হয় না।


সকাল থেকে কত আবোল-তাবোল ভাবছি। কিছুই ভালো লাগছে না। হঠাৎ গান শুনে আমি চমকে যাই।
আমি কখনো যাইনি জলে, কখনো ভাসিনি নীলে;
কখনো রাখিনি চোখ, ডানামেলা গাঙচিলে।
আবার যখন তুমি সমুদ্রস্নানে যাবে,
আমাকেও সাথে নিও, নেবে কি আমায়;

মা-বাবার ঘর থেকে গানের সুর ভেসে আসছে। অনেকদিনপর বাসায় টিভি চলছে। মা রোজ সন্ধ্যায় টিভিতে সিরিয়াল দেখে। আমাদের মায়ের জীবনে এই একটাই বিলাসিতা; নতুবা টানা এক-দেড় ঘন্টা কোথাও স্থির বসে জিরোবার দুদ- উপায় তো নেই তার। তিরু চলে যাবার পর থেকে এই বাড়ির বাতাস থমথমে হয়ে আছে। তাই মায়েরও টিভি দেখার ফুরসৎ মেলেনি। আজ যেন আবার বাড়ির মধ্যে পুরনো সব সুর। আর হবেই বা না কেন। দিন চলে যাচ্ছে। ঠাকুমার আর্তনাদের ধারাবাহিকতায় আমরা সবাই যে রকম অস্থির হয়ে উঠেছিলাম, তাও আজ বন্ধ হয়ে গেছে। তার ঘর থেকে হামানদিস্তায় পান ছেঁচবার টুকটুক শব্দ ভেসে আসছে। আর আমি তো বরাবরই স্বাভাবিক ছিলাম। স্কুলে যাচ্ছি, ছাত্রী পড়াতে যাচ্ছি। কিছুই থেমে থাকেনি আমার জীবনে।

তিরুর স্বামীর নাম কী যেন? মনে হয় রতন। সেই রতন যে আমাদের বাড়িতে ডিশের লাইনের মাসিক টাকা নিতে আসত। ঝাকড়া চুলের, দুই গালে ব্রণ ভর্তি ফরসা ছেলেটা। প্রতিমাসে একটা স্লিপ দিয়ে যেত রতন। সেই স্লিপের সাথে আরও কিছু থাকত বোধহয়, যা তিরুর চলে যাওয়া ত্বরান্বিত করেছে। তিরু চলে গেছে চার মাস হলো। নভেম্বরের তিন তারিখ ছিল সেদিন। আমার আবার দিন তারিখের ভুল হয় না। যেকোনো কিছু মনে রাখতে আমি পটু। আসলে আমি বাবা-মায়ের মেধাবী সন্তান। যদিও সেই মেধা নিয়ে স্কুলের দিদিমণি হওয়া ছাড়া খুব বড় কিছু হয়ে উঠতে পারিনি। তাও আবার এমপিওভূক্ত না এমন এক স্কুলের। গতবছর এমপিওভূক্ত একটা স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষিকা পদের জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। সাক্ষাৎকারের দিন কর্তৃপক্ষের একজন জানালেন, চার লাখ টাকা ডোনেশন লাগবে। এরপর থেকে আর কোথাও আবেদন করি না। এখন বাড়ির কাছেই একটা হাইস্কুলে পড়াই। এখানে দুমাস বেতন পেলে এক মাস বেতন বন্ধ থাকে।


থেকেই তিরু পড়ালেখায় মহা ফাঁকিবাজ। ওর সাজগোজের প্রতি খুব ঝোঁক ছিল। আমাকে বলতো, ‘বোকার মতো পড়াশুনা করে লাভ নেই দিদি। বিয়ে হবার জন্য ইন্টারমিডিয়েট পাশ করা দরকার ছিল, তাতো দিব্যি করেছি। ওসব অনার্স-ফনার্স আমাকে দিয়ে হবে না। এর চেয়ে রূপচর্চা করলে কাজে দিবে।’ পূজার সময় ওর বায়নার শেষ ছিল না। এই স্টাইলের জামা চাই, সেই স্টাইলের জুতো চাই। আমার পাওয়া উপহারের কোনোটা পছন্দ হলেই ও চেয়ে নিত, ‘আমাকে দিয়ে দে না দিদি, এটা তোকে একদম মানাচ্ছে না রে...। তোর গায়ের কালো রঙের সাথে এই রঙ মানায় না।’ ওর কথা শুনে আমি রাগ করতাম না। অবোধ শিশুকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলতাম, ‘আমি কী এসব পরি ছাই, সব তুই..ই..তো নিবি! সবই তোর।’

আজ কেন তিরুর কথা মনে পড়ছে? এটা কি গতকাল বিকালের প্রভাব? কাল বিকালে প্রপাকে পড়াতে যেতে আমার একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল। প্রপা পড়াশুনায় বেশ ভাল, তবে খুব চঞ্চল। তিন মাস হলো আমি ওকে পড়াচ্ছি। আমার সাথে খুব ভাব প্রপার। প্রপার বোন প্রজাপতি মেয়েটা দেবীর মত সুন্দরী। সুন্দরী দেবী সদৃশ মেয়েটা দেবীর মতই ধ্যানমগ্ন থাকে সারাক্ষণ। বোনের সাথে বয়সের পার্থক্য থাকায় বা ওর অহেতুক ধ্যানমগ্নতার কারণেই হয়তো আমাকে আপন করে নিয়েছে প্রপা।

নিষ্পাপ মুখে গতকাল প্রপা বলছিল, ‘রাধাদি তুমি খুব ভালো। আমার ফেভারিট।’ প্রপা পাঁচটি ফুলের নাম শিখেছে। দুলে দুলে ও পড়ছিল, লোটাস, রোজ, ওয়াটার লিলি, চায়না রোজ, টিউব রোজ। ঠিক তখন দ্বিধান্বিত পায়ে নাস্তার ট্রে হাতে একটা মেয়ে ঘরে ঢুকেছিল। মেয়েটার সিঁথিতে সিঁদুরের রেখা তার মুখের মতোই ম্লান। রোগাটে শীর্ণ চেহারার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার দৃষ্টিশক্তি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। যেন খুব অচেনা একটা চেহারা চেনা হতে হতে পুনরায় অচেনা বৃত্তে আটকে গিয়েছিল। তিরু!

৪.
মেয়েটাকে তিরু মনে হওয়ায় আমার বুকের রক্ত ছলকে উঠেছিল! সত্যি ওকে একদম তিরুর মতো দেখাচ্ছিল। সেই গোলমতো ফর্সা মুখ। টানা টানা চোখ দুটিতে নীলচে মণি। যেই মণিজোড়ায় একসময় নীলাভ এক আকাশের বিস্তৃতি ছিল। ওর চোখে একবার তাকালে যে কোনো মানুষের দ্বিতীয়বার তাকাতে মন চাইবে। আমার বা মায়ের চোখ তিরুর মতো না। চেহারাও না। তবে যৌবনকালে ঠাকুমা নাকি তিরুর মতো সুন্দরী ছিল। কেবল ভুবনমোহিনীর গায়ের রঙ না, তার মেজাজমর্জিটা তিরু একেবারে ষোল আনা পেয়েছে।

সত্যি তিরুর এই দাম্ভিকতা আর ঔদ্ধত্যই যেন ওকে আরও সুন্দরী করে তুলতো। যেখানেই তিরু থাকত সেখানেই যেন একটা আলোর ফুল ফুটে থাকত। কিন্তু আমি যে মেয়েটাকে প্রপাদের বাড়িতে দেখেছি সে বড় নিষ্প্রভ ছিল। যদিও প্রথম দর্শনে আমার মনে হয়েছিল ও আমাদের তিরুই। মেয়েটার মুখের আদল অনেকটা তিরুর মতো। জংলি ছাপা শাড়ির ঘোমটার আড়ালে থাকা মেয়েটার মুখটা কেবল বিকালের শাপলার মতো অনুজ্জ্বল ছিল। নাহ্ আমাদের তিরু অত বর্ণহীন নয়। তাছাড়া ও কেন তিরু হতে যাবে! আমি নিজের নিচ ভাবনার চক্করে পড়ে নিজেই ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলাম। ছিঃ ছিঃ! আমি কেন অন্যের বাড়ির গৃহ পরিচারিকাকে তিরু হিশেবে ভাবছি! তার মানে আমার মন অবচেতনেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে যে, তিরু সুখে নেই! হয়তো ও এখন রাস্তার ভিখিরি; নয়তো ধোঁকা খাওয়া বিবর্ণ এক প্রজাপতি।

এমনও তো হতে পারে, তিরু অসম্ভব সুখে আছে। নকশী কাঁথার চমৎকার নকশার মতো দারুণ একটা জীবন পেয়েছে ও। যেখানে কোনো ‘না’ বাচক শব্দ নেই। সুখ সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে তাই তিরু রক্তের সব বন্ধন ভুলে গেছে। ভুলে গেছে ফেলে যাওয়া সকল সম্পর্কের উষ্ণতা। আলগোছে ফেলে যাওয়া প্রিয়সব প্রসাধনীর মতো তিরু আমাদের সাথে লেপ্টে থাকা স্মৃতিগুলোও চিরতরে ত্যাগ করেছে। আর আমরা মনে মনে এই ভেবে আবেগে আপ্লুত হচ্ছি যে, বেশ হয়েছে, এবার ঠ্যালা বুঝুক! সমাজে আমাদের হেয় করার মজা বুঝুক এখন! ওর জন্য নিত্যদিন কম হেনস্তা তো হচ্ছি না আমরা। এখন তিনবেলা করে ঠাকুমা ওকে রাজ্যের অভিশাপ দেয়। অসুখী হবার অভিশাপ। যা শুনে আমার বুকের ভেতর হিম হয়ে আসে। যদিও আমাদের দুর্ভাগ্যের জন্য কেবল ঠাকুমা নয়, আমাদের পরিবারের সবাই মনে মনে খুব গোপনে তিরুকে অভিশাপ দিই।

এই যে আগে বড় দাদা বৌদিকে নিয়ে এ বাড়ি ছাড়লেও পূজা-পার্বনে বাড়ি আসতো। তিরু চলে যাবার পর বৌদির কোথাও মুখ দেখানোর উপায় নেই বলে দাদাও এই বাড়ি ত্যাগ করেছে। আর পাড়ার লোকের কথার অত্যাচার তো বাড়তি উপদ্রব।

সেদিন গোকূল কাকার স্ত্রী শ্যামা কাকী বাড়ি বয়ে এসে মাকে যা নয় তা বলে গেছে। বাড়ি থেকে পালানোর আগে তিরু নাকি অন্তসত্ত্বা ছিল। কাকী ওর চলন-বলন দেখে অনেক আগেই তা আন্দাজ করেছিলেন। প্রায় পাঁচ মাসের পেট...আর মা কিনা নিজের মেয়ের দুর্দশা টের পেল না! আসলে তলে তলে আমরাই নাকি তিরুর কু-কীর্তি ধাপাচাপা দিতে ওকে রাতের আঁধারে সরিয়ে ফেলেছি। কাকীর নিজের পেটের মেয়ে হলে তিনি পালানোর আগে লাথি দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতেন।

মা কাকীর কথা শুনে কানে হাত চাপা দিয়েছিল। সেদিন সারাদিন মা কারো সাথে কোনো কথা বলেনি। বিছানা থেকেও ওঠেনি। আমি স্কুল থেকে ফিরে এসেও দেখেছি রান্নাঘরের মেঝেতে বাসন-কোসন, মাছ-সবজি পড়ে আছে। ঠাকুমা কী খেয়েছে না খেয়েছে, বিছানা থেকেই শরীর তোলেনি। তার ঘরভর্তি নাশার ধোঁয়া আর মায়ের ঘরজুড়ে ভেজা অন্ধকার।

ধীরে ধীরে আমরা এই বাসার সবাই সচেতনভাবেই তিরু নামটা পরিত্যাগ করতে চাইছিলাম। যেভাবে তিরু পরিত্যাগ করেছে আমাদের। বাবা, মা, দাদা, ঠাকুমা। যেন কারো জীবনে তিরু নামের কেউ কোনোদিন ছিল না। সেভাবেই আমরা খাবার টেবিলে বসে নিশ্চুপ খাচ্ছি, ঘুমাতে যাচ্ছি। দৈনন্দিন কথোপকথনে ভুল করেও তিরুর কথা মনে করছি না। তিরুকে মনে পড়বে বলে ওর প্রিয় নকশি কাঁথাটিও তুলে রেখেছি।

তিরুকে আমরা সচেতনভাবেই ভুলে আছি। তবে আমাদের পড়শীরা এখনো ভোলেনি আর তাই আমাদেরও রোজ তিরুর কথা মনে করিয়ে দেবার জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছে। বিয়ের পরপর দুতিনটে প্রস্তাব আসার পরও প্রতিবেশীদের অতিরিক্ত দায়িত্বশীলতার কারণে এখনো আমার ‘যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম। যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব ’ মন্ত্র শোনা হয়নি।

এভাবে তিরু আমাদের বুকের ভেতর দুর্ভেদ্য তীরের মতো বিঁধে আছে। উপড়াতে গেলে প্রাণ যায় আর অস্পর্শ রেখে দিলে দূরগামী ব্যথায় কাতরাই। তাই আমাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বিষয় ছিল, তিরুকে ভুলে যাওয়া। এভাবে একদিন আমরা যখন তিরুকে ভুলে গেলাম সেদিনই তিরু ফিরে এলো।

চৌকাঠে দাঁড়ানো সুখে ভরপুর তিরুর শরীরে সেদিন ভেজা শিউলির সুঘ্রাণ ছিল। ওর কপালে জ্বলজ্বলে পয়সার মতো গোল সিঁদুর টিপ, পরনে ইস্ত্রিভাঙা নতুন শাড়ি, দুহাতে সোনায় মোড়ানো শাঁখা-পলা দেখে আমি বা আমরা কেউই উচ্ছ্বসিত হইনি। বরং আমাদের বুকের অতলে ক্রোধের এক চিমসে বোধ ছড়িয়ে পড়েছিল।

সুখী আর প্রাণোচ্ছল তিরুকে দেখে খুব সংগোপনে আমরা নিজেদের ধিক্কার দিয়েছি, ‘ওহ...আমাদের মুখে চুনকালি দিয়ে আমাদের ছাড়া তিরু তবে ভালই ছিল!’

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement