গল্পের নায়ক মামুন ও নায়িকা রোজীর দেখা হয় মামুনদের বাড়িতে। নায়িকা গ্রামের একটি সহজ সরল মেয়ে। মামুনও গ্রামেরই ছেলে। মামুন তাকে পছন্দ করে। সেও তাকে পছন্দ করে। তারপর তাদের মধ্যে বিয়ের কথাবার্তা শুরুর পর দ্বিতীয়বার তাদের সাক্ষাৎ হয় মামুনের ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে। মামুনের ভাবির খালাতো বোন রোজী। সেই সময়ের নায়িকার লাজ নম্র আচরণের বর্ণনা গল্পে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া গল্পের নায়ক মামুনও বেশ লজ্জাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। নায়িকার লজ্জার কারনে তার কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারে প্রথমে মামুন আহত হয় ও ভুল বোঝে। কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে যে সেটা নায়িকার লজ্জা থেকে উদ্ভুত। পরে নায়ক অনুধাবন করতে পারে যে লজ্জা খারাপ নয়, লজ্জা আছে মানে তার প্রতি রোজীর প্রবল অনুভুতি আছে। আর লজ্জাই তো নারীর ভূষণ। কাজেই লজ্জার কারনে নায়িকা রোজী আকাংখিত কাজগুলো প্রথমে না করতে চাইলেও তাতে ভুল না বুঝে খুশী হওয়া উচিৎ। গল্পের বিষয় হলো লাজ। আর এই গল্পে রোজী ও মামুনের লাজ বা লজ্জাজনক কিছু ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে নারীর লাজ পুরুষের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান বিষয়, কারণ লজ্জা না থাকলে অনুভুতি কম থাকে, তাতে সম্পর্কও হতে পারে উষ্ণ নয় শীতল। সুতরাং আমার আশা যে আমার গল্পটি বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ২৭টি

সমন্বিত স্কোর

৩.০৮

বিচারক স্কোরঃ ১.২৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - লাজ (জুন ২০১৮)

এটাই হয়তো শেষ দেখা
লাজ

সংখ্যা

মোট ভোট ২১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.০৮

ওয়াহিদ মামুন লাভলু

comment ১০  favorite ০  import_contacts ৪৭৩
বাড়ি গিয়ে শুনলাম, মুস্তাফিজ ভাইয়ের স্ত্রী ও তার শিশু ছেলে রাহাত খানমাহমুদপুর বেড়াতে গেছে। ঐ গ্রামেই ভাবির বাবার বাড়ি। তাদের অনুপস্থিতিতে বাড়িটা অনেক প্রাণহীন লাগলো।

রাতে মুস্তাফিজ ভাই জানালেন যে তিনি পরদিন খানমাহমুদপুর যাবেন। ইচ্ছে করলে আমিও সেখানে যেতে পারি। কথাটা শুনে খুব খুশি হলাম। কারণ ওখানে গেলে রোজীর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। রোজী ভাবির খালাতো বোন। সাঁথিয়া মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছে সে। কলেজটা ভাবিদের বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় সে ভাবিদের বাড়িতেই থাকে। কিন্তু সে কি এখন সেখানেই অবস্থান করছে নাকি তাদের বাড়িতে? মুস্তাফিজ ভাইকে বিষয়টা জিজ্ঞাসা করতে খুব লজ্জা লাগলো। তাই একটু ঝুঁকি নিয়েই সঙ্গে সঙ্গে ওখানে যাওয়ার জন্য রাজী হয়ে গেলাম।

মুস্তাফিজ ভাই একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষকতার পাশাপাশি বেড়া বাসস্ট্যান্ডে ইলেক্ট্রনিকস-এর দোকান দিয়েছেন। সকালে তিনি তার দোকানের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলেন।

পরে আমি তৈরি হয়ে ঘর থেকে নেমে উঠোন দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মা তার ঘরের বারান্দা থেকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তুই আবার সেজেগুঁজে কোথায় যাচ্ছিস?’’
আচমকা প্রশ্নটা শুনে আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আমতা আমতা করে জবাব দিলাম, ‘‘কোথায় আবার যাবো, এই একটু কাশিনাথপুর যাচ্ছি।’’
কাশিনাথপুর আমার সেজ ভাই থাকেন। আমার জবাব মা’র বোধহয় মনঃপুত হলো না। তাই তিনি মুখে কেমন যেন একটু টিটকারির অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুললেন। তা দেখে খুব বিব্রতবোধ করলাম। আর কিছু জিজ্ঞাসা করার সুযোগ না দিয়ে আমি দ্রুত তার দৃষ্টির সামনে থেকে পালালাম।

বেড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে মুস্তাফিজ ভাই আর আমি রিকশায় চড়লাম। পশ্চিম দিকে মাইল চারেক যেতে হবে। কিন্তু রিকশা ও ভ্যানই এই রাস্তায় সবচেয়ে নিরাপদ যানবাহন। মুস্তাফিজ ভাইয়ের চাকরি, ব্যবসা ও আমার চাকরি ইত্যাদি নিয়ে কিছু কথাবার্তার পর আমাদের কথা আপাতত ফুরিয়ে গেল।

রোজীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিনগুলির কথা মনে পড়লো। মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে বাড়িতে আসার পর একদিন সকালে জানালা দিয়ে অন্য ঘরের বারান্দায় দৃষ্টি যেতেই দেখি, কালো পোশাক পরা, খুব ফর্সা, হালকা-পাতলা, বেশ লম্বা, সিল্কি চুলওয়ালা একটি মেয়ে রাহাতকে কোলে নিয়ে আদর করছে। তাকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল, যেন একটি কুমড়োলতা-পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ আরো ভালো করে উপভোগ করার জন্য হঠাৎ পোড় ছেড়ে অনেকটা লম্বা হয়েছে, কিন্তু এখনো পরিপুষ্ট হয়নি। পরে জানলাম, সে ভাবির খালাতো বোন। এস. এস. সি. পরীক্ষা দিয়েছে। তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সেই সকলের বড়। তার মামার সঙ্গে বেড়াতে এসেছে। একসময় রোজীর সঙ্গে আলাপ পরিচয় হলো। তার মামা পরদিনই চলে গিয়েছিল। কয়েকদিন পরে মুস্তাফিজ ভাই তাকে তাদের বাড়িতে রেখে এসেছিলেন। আমিও ঢাকা চলে গিয়েছিলাম।
তারপর একটি গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজে যোগদান করলাম। অফিস তেজগাঁও। কিছুদিন পর আবার বাড়িতে এলে ভাবি বলেছিলেন, ‘‘রোজীকে তো তুমি দেখেছো। যদি পছন্দ হয় তবে তার সঙ্গে তোমার বিয়ের ব্যাপারে বাড়িতে কথা বলবো।’’
তিনি আবার বললেন, ‘‘তুমি যদি রাজী থাকো তাহলে আমি মোটা অংকের টাকাও এনে দিতে পারবো।’’
ভাবির কথায় মন্তব্য করবো কি, আকস্মিকভাবে এত প্রত্যাশিত প্রস্তাব পাওয়ায় আমার মনের মধ্যে তুমুল আলোড়ন তখন!
ভাবির কন্ঠে আকুতি, ‘‘রোজী দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি ওর মনটাও খুব সুন্দর। তোমার সঙ্গে বিয়ে হলে মেয়েটা শহরে থাকতে পারতো!’’
উৎফুল্ল কন্ঠে আমি জানিয়েছিলাম, ‘‘আমার খুবই পছন্দ।’’
ভাবি বলেছিলেন, ‘‘রোজীর বাবা কিন্তু চাষা।’’
আমি বলেছিলাম, ‘‘আমার দাদাও তো মূর্খ চাষাই ছিলেন।’’
তারপর ঢাকায় গিয়ে রোজীকে নিয়ে অনাগত দিনের অনেক সুখ স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। ঈদের সামনে অফিসের ঠিকানায় রোজীর নিকট থেকে একটা কার্ড এলো। আমিও তাকে কার্ড পাঠালাম। তারপর থেকেই আমাদের মধ্যে পত্র যোগাযোগ চলছে। রোজী তার ছবি পাঠিয়েছে। আমিও আমার ছবি পাঠিয়েছি। রোজীর ছবি স্ক্যান করে কম্পিউটারে ঢুকিয়ে ইচ্ছা হলেই দেখি আর ভাবি, সে আমার বউ হলে খুবই ভালো হবে।
কিন্তু বাবা-মাকে রোজীর বিষয়টা জানালে উনারা কিছুতেই রাজী হননি।

রিকশা নন্দনপুর এসে গেছে। রিকশা থেকে নেমে আমরা উত্তরদিকে হাঁটতে লাগলাম। আমি মুস্তাফিজ ভাইকে চিন্তিত স্বরে বললাম, ‘‘বাড়ির কেউই তো রাজী হচ্ছে না।’’
তিনি বললেন, ‘‘তোরা সুখে থাকবি মনে করেই আমরা প্রস্তাবটা দিয়েছিলাম। কিন্তু সবাই যে এরকম অবস্থান নেবে তা তো আগে ভাবিনি।’’
নদীর ধারে পৌঁছালাম। নদীর ওপারেই খানমাহমুদপুর গ্রাম। নৌকায় নদী পার হয়ে ওপারে নামতেই উত্তেজনা অনুভব করলাম। বিয়ের কথাবার্তা শুরুর পর রোজীর সঙ্গে এই প্রথমবার হয়তো দেখা হবে।

কয়েকটা বাড়ি অতিক্রম করে ভাবিদের বাড়ি পৌঁছালাম। ভাবি ও তার ছোট বোন লাকি এগিয়ে এলো। আমাদেরকে ঘরে বসানোর পর তাদের মধ্যে অনেক ব্যস্ততা লক্ষ্য করলাম, বিশেষ করে লাকির মধ্যে। আমার দৃষ্টি রোজীকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। ভাবি জানালেন, রোজী এ বাড়িতেই আছে। কিছুক্ষন পর লাকি অনেক ধরণের নাস্তা নিয়ে এলো।

হঠাৎ পাশের রুম থেকে শচীন দেব বর্মণের গাওয়া গানের আওয়াজ ভেসে এলো, ‘তুমি এসেছিলে পরশু কাল কেনো আসোনি।’ সঙ্গে সঙ্গে আমি ঐ রুমের দিকে তাকালাম। মাঝের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, একটা টেবিলের সামনে রোজী, লাকি ও ছোট একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রোজী একটা নীল পোশাক পরে আছে। সে টেবিলের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। তার ডানপাশটা দেখা যাচ্ছে। তার আলগা চুলগুলি ঝুলছে। ওখান থেকেই গানের আওয়াজ আসছে। গানটি আমারই দেওয়া। আমি রোজীকে আমার পছন্দের কিছু গান সম্বলিত কয়েকটা ক্যাসেট উপহার দিয়েছিলাম। তাই গানটি শুনে আমার ভীষণ লজ্জা লাগলো। কারণ ওটা তো আমাকে উদ্দেশ্য করেই বাজানো হচ্ছে। আর এটা আমার কাছাকাছি থাকা মুস্তাফিজ ভাইয়েরও প্রিয় একটা গান, তিনি ভার্সিটিতে পড়ার সময় তার কাছ থেকেই এ গানটি সম্পর্কে প্রথম জেনেছিলাম। তিনি নিশ্চয়ই আন্দাজ করছেন যে বেশ দুর্লভ এই গানটি অজ পাড়া গাঁয়ে বাস করা রোজীর নিজের সংগৃহীত নয়।

একসময় ভাবি আমাকে পাশের রুমে নিয়ে গেলেন। রোজীর সঙ্গে দেখা হলো। মনে হলো, সে আগের চেয়ে রোগা হয়ে গেছে। সে আমাকে সালাম দিলো। আমি জিজ্ঞাশা করলাম, ‘‘কেমন আছো রোজী?’’
সে কুশলে আছে জানানোর পর জানতে চাইলো, ‘‘আপনি কেমন আছেন?’’

ভাবি চলে গেলেন। রোজী খাটের পশ্চিম কোনটিতে বসলো, আর আমি তার থেকে অনেকখানি পূর্বে। সে লজ্জায় আমার দিকে ভালো করে তাকাতেই পারছিল না। হঠাৎ রাহাত উলঙ্গ অবস্থায় রুমে প্রবেশ করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে টেনে টেনে মজার স্বরে বলে উঠলো, ‘‘কাকু, রোজীর সাথে নাকি তোমার বিয়ে।’’
এরকম অনাকাংখিত কথা শুনে আমি একেবারে থ বনে গেলাম! একথা বলার মতো বুদ্ধি তার হলো কিভাবে? সে কথাটা আবার বলে উঠলো। লজ্জায় আমি দিশাহারা হয়ে গেলাম। রোজী আরো জড়সড় হয়ে গেল। আমি এটা সেটা বলে রাহাতের মনটা অন্য কিছুর দিকে ফেরানোর চেষ্টা করলাম। একসময় সে চলে গেল। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
আমি রোজীকে বললাম, ‘‘আশা করি শুনেছো যে বিয়েতে আমার বাবা-মা রাজী হচ্ছেন না?’’
প্রথমে রোজী কিছু বললো না। কিছু মুহূর্ত কেটে গেলে তারপর সে বললো, ‘‘আমার বাবা বলেন যে যত টাকা লাগুক না কেন মামুনের সাথেই রোজীর বিয়ে দিবো।’’

আমার বাবা-মা রাজী নেই বলে তার মনে ব্যথা থাকাটা স্বাভাবিক, তাই ওর ব্যথা দূর করতে ও যাতে অনুপ্রাণিত হয় সেজন্যে বললাম, ‘‘তোমার মতো এতো ভালো মেয়ের ব্যাপারে উনাদের ইতিবাচক মত না দেওয়ার কোনো কারণই নেই। শুধুমাত্র আমাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে বলেই উনারা রাজী হচ্ছেন না। কিন্তু আমি যদি অন্য মেয়ের সাথে বিয়েতে রাজী না হই তবে একসময় ঠিকই উনারা রাজী হতে বাধ্য হবেন।’’
রোজী অস্ফুট শব্দে একটু হাসলো। লজ্জা লাগায় কিছু বললো না। আমি আবার বললাম, ‘‘কিন্তু শেষ পর্যন্ত উনারা যদি নিরাশ করেন তবে উনাদেরকে বাদ দিয়ে বিয়ের আয়োজন করলে তোমার কি তাতে আপত্তি আছে?’’
রোজী তার হাঁটু ও হাত দিয়ে লাজে রাঙা হয়ে যাওয়া মুখটি ঢাকার চেষ্টা করতে করতে টেনে টেনে শুধুমাত্র ‘‘আমি আর’’ উচ্চারণ করে তার কথা অসম্পূর্ণ রেখে শরীর মোচড়াতে লাগলো।
আমি বললাম, ‘‘তা করলে কিন্তু প্রথমে কিছুদিন বাড়ির বাইরে থাকা লাগতে পারে। তারপর ধীরে ধীরে হয়ত সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’’
হঠাৎ পিছন থেকে একটা নারীকন্ঠ শুনতে পেলাম। সে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠলো, ‘‘ওসব পরে ঠিক হয়ে যায়।’’
চট করে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখলাম, জানালার কাছে শাড়ি পরা মাঝ বয়সী সুশ্রী একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখেমুখে নির্মল ও দুষ্টামির হাসি। আন্দাজ করলাম, সে ভাবিদের প্রতিবেশী। তাকে দেখে আমাদের লজ্জা আরো বেড়ে গেল।

বিকাল হয়ে গেছে। গাছপালা, বাতাস, শুন্যতাসহ প্রকৃতির সবকিছুতে বিষণ্ণতার ছাপ। এবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে হবে। মুস্তাফিজ ভাই আজ এখনেই থাকবেন। আমি সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘর থেকে নামলাম। আমার সাথে ভাবী ও রোজী এলো। অন্যেরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো। বাড়ির আঙ্গিনা থেকে রাস্তায় নামার সময় রোজী দাঁড়িয়ে পড়লো। আমাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য ভাবি তাকে আমাদের সঙ্গে আসতে বললো।
রোজী আমতা আমতা করে পরিস্থিতিটা এড়ানোর চেষ্টায় বললো, ‘‘আপনিই যান।’’
রোজীর কথা আমাকে খুব আহত ও অবাক করলো। তার অবজ্ঞায় আমি খুব অপমানিত বোধ করলাম ও লজ্জা পেলাম। আমাদের সাথে আসতে সে রাজী হলো না কেন? তাহলে কি আমার প্রতি তার কোনো অনুভুতি নেই! ভাবি ও আমি বাড়ির ঢাল বেয়ে রাস্তার কাছে চলে এসেছি। রোজী ঢালের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। আশ্চর্য হয়ে তার অভিব্যক্তির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সে সরাসরি আমার দিকে তাকাতে পারছে না, তার মুখাবয়বও রক্তিম। আর পিছনে বাড়ির অন্যরাও আছে। এতক্ষণে বুঝলাম, এটা অবজ্ঞা নয়, এটা ওর দ্বিধা লাজ। কিন্তু ভাবির পীড়াপীড়িতে সে তার দ্বিধা লাজ ভুলে গেল, চলে এলো আমাদের সঙ্গে।

নদীর ধারে ভাবির বড় বোনের বাড়ি। ভাবি আমাদেরকে সে বাড়িতে নিয়ে গেল। সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটে ছিল। ভাবি রোজীকে বললো আমাকে একটি ফুল উপহার দিতে।
কিন্তু রোজী উশখুশ করতে লাগলো। ওর অনীহার কারণটি অনুধাবন করতে পারলেও আবার কিছুটা আহত হলাম। কিন্তু ওর অবয়বের মুখচোরা পলায়নপর আভা আমাকে আশ্বস্ত করলো। মনে পড়লো, লজ্জা নারীর ভূষণ। সেই বৈশিষ্ট্যই ওকে চরমভাবে পেয়ে বসেছে। তাছাড়া ভাবলাম, ওর এই লাজ নিশ্চয়ই আমার প্রতি প্রবল আকর্ষণবোধ থেকে জন্মাচ্ছে, আর প্রবল আকর্ষণবোধ মানে আমার প্রতি ওর দূর্বার অনুভুতি আছে অর্থাৎ আমার প্রতি সে শীতল নয় চরম উষ্ণ। অবশেষে ভাবিই একটা লাল গোলাপ ছিঁড়ে ওর হাতে দিলো। ও আমার দিকে ফুলটি বাড়িয়ে ধরলো। সেটা নিয়ে ওকে ধন্যবাদ দিয়ে আমিও ওকে একটি ফুল দিলাম। তারা দুজনই হেসে উঠলো।

নদীর ধারের উঁচু রাস্তায় তারা দাঁড়িয়ে রইলো। আমি নীচে নেমে নৌকায় উঠলাম। নৌকা থেকে রোজীর দিকে তাকিয়ে আমি অভিভুত হয়ে গেলাম! দাঁড়ানো অবস্থায় লম্বা গড়নের রোজীকে অপরূপ লাগছিল।

নৌকা ছেড়ে দিল। বৈঠা দিয়ে নৌকা চালাচ্ছিল মাঝি। তাই ওপারে যেতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে গেল। আমি নৌকা থেকে নেমে নদীর পারে দাঁড়িয়ে নদীর ওপারে তাকালাম। কল্পনাও করতে পারিনি যে এত বড় একটা চমক ছিলো আমার জন্য। ভাবি ও রোজী এখনো ওপারে দাঁড়িয়ে আমার চলে আসা দেখছে! ভাবলাম, যে আমাকে এতটা চমক দিলো আমি কি পিছন ফিরে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ প্রতিদান তাকে দিতে পারলাম?

রিকশা স্ট্যান্ডে গিয়ে রিকশায় চড়লাম। অভিভাবকদের কথা মনে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ আমার পুরো আমিত্বটাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। আমার অভিভাবকরা কি তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবেন আদৌ?
হাফিজ ভাই রোজীর কথা শুনে বলেছেন, ‘‘মেয়ে কি শুধু ওই বাড়িতেই আছে? তাছাড়া গ্রাম থেকে ওই অশিক্ষিত বস্তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ঢাকায় বাস করা যাবে না।’’
বাবা বলেছেন, ‘‘হাফিজের অমতে মুস্তাফিজের বিয়ে দিয়ে আমি যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম, তোমার বিয়ে দিয়ে আমি ঐরকম পরিস্থিতিতে পড়তে চাই না।’’
মুস্তাফিজ ভাইয়ের বিয়ের পর হাফিজ ভাই বাড়ি আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
একবার আমি বাড়ি আসার পর লিলি ভাবি আমাকে জানিয়েছিলেন যে আমার একমাত্র আপা বাড়ি আসার পর আমার ইমীডিয়েট বড় ভাইয়ের স্ত্রী মোমেনা ভাবি তার কান ভারী করতে গিয়ে নাকি বলেছিলেন, ‘‘মামুন কিন্তু অনেক দূর এগিয়ে গেছে।’’ এ কথা শোনার পর তাকে আমি অনেকগুলি কথা শুনিয়ে দিয়েছিলাম। আর তিনি কেঁদে কেঁদে বাবার কাছে নালিশ পর্যন্তও করেছিলেন।
বড় ভাবি বলেছেন, ‘‘মামুন কি লিলির বোনকে বিয়ে করে দল ভারী করতে চায় নাকি?’’
একবার আমাদের গ্রামের এক ছেলে ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়ার সময় আমার ছাত্রজীবনের কিছু ছবি দিয়েছিলাম লিলি ভাবির কাছে পৌঁছানোর জন্য। সে ঢাকায় ফিরে এসে ছবিগুলো আমাকে ফেরত দিয়ে বলেছিলো যে ভাবি বাড়িতে ছিলেন না, আর আমার মা ছবিগুলো রাখেননি! মা হয়ত অনুমান করতে পেরেছিলেন যে ছবিগুলো আমি কার উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছি। এতে আমি খুব দুঃখ পেয়েছিলাম।

সকলের স্বার্থ, হিংসা ও ঈর্ষাই হয়ত ভিন্ন। কিন্তু তাদের স্বার্থ সিদ্ধির পরিণতি মিলিত হয় একই বিন্দুতে। আর তা হলো, আমার ইচ্ছার, আকাংখার ও সযত্নে রচিত স্বপ্নগুলোর কবর রচনা করতে অনুপ্রাণিত করা যাতে ভবিষ্যতে অনুভুতি ও স্বপ্নহীন আমার জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকার পথটি পরিষ্কার হয়। কিন্তু আমি তো তাদের কারোরই পর নই, তাদের মতো আমারও তো একটা জীবন আছে! তবে কেন আমার ইচ্ছাগুলো বেঁচে থাকুক এবং আমার মধ্যে আরো নতুন নতুন স্বপ্ন তৈরী হোক এবং আমি সুখি হই এই চিন্তা কারো মধ্যেই নেই? এটাই আমার আফসোস।

অভিভাবকদেরকে বাদ দিয়ে বিয়ের কথা রোজীকে বলেছি ঠিকই কিন্তু আমি কি সত্যিই তা পারবো?

যেদিন ঢাকায় গেলাম সেদিন রাতে মিরপুর বারো নাম্বারে মেসে বসে পাশের বাড়ির বাল্য বন্ধু জাহাঙ্গীরকে রোজীর সঙ্গে দেখা হওয়ার বিষয়টা অনেক উৎসাহ নিয়ে বললাম। রোজীর কথা বলার সময় নিজের মধ্যে অনেক উত্তেজনা অনুভব করলাম। আমাদের বিষয়ে জাহাঙ্গীর সবকিছুই জানতো। নদীর ধারের বিদায় পর্বটি ওকে যখন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বললাম ও তখন অনাকাংখিত একটা হাসি ওর চোখে, মুখে তথা অবয়বে ফুটিয়ে তুলে বললো, ‘‘রোজীর সঙ্গে তোর এটাই হয়তো শেষ দেখা।’’
ওর কথাটি শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। বললাম, ‘‘তাই!’’
ও সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। বিব্রতকর পরিবেশের সৃষ্টি হলো। এত নির্দয় একটা কথা বললো জাহাঙ্গীর? ওর এটা কি ইর্ষা? নাকি বাস্তবতা? অথবা এটাই কি আমার অদৃষ্টের লিখন যা ওর মুখ দিয়ে আগামভাবে প্রকাশিত হলো? বিষয়টা আমাকে খুব ভাবিয়ে তুললো।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement