লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৫.০৪

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমি (নভেম্বর ২০১৩)

জলেশ্বরীতলা লেন, থার্টিন বাই টু, একান্ত আপন
আমি

সংখ্যা

মোট ভোট ১২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.০৪

আশরাফ জুয়েল

comment ৯  favorite ১  import_contacts ৯৭৪
শুরুটা ছিল খুবই সাদামাটা, অনেকটা শীতের হাভাতে বিকেলের মতো। যাযাবরের ছন্নছাড়া জীবনে ভাললাগার মতো যে কেউ কোনোদিন আসতে পারে তা ধারনায় নিয়ে আসার মতো সক্ষমতা তৈরি হয়নি তখনো ।বয়সের খাতায় অলরেডি পঁচিশ গেঁড়ে বসেছে । হন্যে হয়ে ঘুরছি এদিক সেদিক মার মুখে দুমুঠো হাসি ফুটানোর জন্য।
কিসের কি? অবস্থাদৃষ্টে যা বোঝা যাচ্ছে তাতে চিরাচরিত সংকটের অতলে ডুবে থাকা মধ্যবিত্ত আর কোন দিন হাসতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না, বিপদে পড়ে সামাজিকতা রক্ষার্থে হাসলেও তাদের মুখটা হয়ে যায় কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা রোগীর মতো।
বাবা শিখিয়েছেন,পরিশ্রম নাকি কিসের চাবিকাঠি, অতএব চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখলে তো তার মান আর থাকে না। দেখাই যাক না মধু ঝরে কিনা ? মাস তিনেক আগে শ্বাসকষ্টে ভোগা ঘাম চিটচিটে স্বপ্নকে, প্লাস্টারহীন সিঁড়ি বানিয়ে মফঃস্বল থেকে পাড়ি জমিয়েছি রেডকার্পেটবিহীন রাজপথে। মুকুটহীন নিধিরাম বেকারপুত্রের পদার্পণ ঘটলো শহরে । সম্বল, বাপের চিরাচরিত উপদেশের বাণ্ডেল, যথারীতি সেটা তার মতোই এক্সপায়ার ডেটেড, উপদেশের বাণ্ডেলকে মনে জায়গা না দিয়ে ঘাড়ে ঝুলিয়ে শুরু হল যাত্রা, যদিও এই বিশিষ্ট ভদ্রলোকের প্রতি আমার বিশ্বাসের কোন কমতি ছিল না কখনো। কিন্তু তার উপদেশ শোনা আর গান্ধীজীকে আবার এই বাংলার বুকে ইনভাইট করে আনা একই কথা। অবশ্য যা শুরু হয়েছে তাতে একজন ঐ টাইপের কাউকে খুব দরকার এই অসভ্য ইতরের দেশে।
ভার্সিটির প্রাক্তন বড় ভাইয়ের কল্যাণে এক টুকরো আশ্রয় মিলল এক চিলেকোঠায়। আচ্ছা, কবরের কি কোনও ফিক্সড সাইজ আছে, কারো কি জানা আছে এর লেংথ অ্যান্ড ওয়াইডথ ? আমি তো কবরে কখনো ঘুমাইনি ,বলতে পারব না ! চিলেকোঠার সাইজ অনেকটা একটা কবরের সমান ! চৌকির মাপ যা তাতে কাউকে কাফন পরিয়ে আঁটসাঁট করে বেঁধে দিলে যেরকম হয় ঠিক সেভাবে শুয়ে না থাকলে ধপাস হবার সম্ভাবনা আছে বইকি। সাঁট হয়ে ঘুমালেও পা দু ইঞ্চি বাইরে থাকে! রুমে তো আমি একা না, রুমমেট আর একজন আছেন ? তিন ফিট বাই আড়াই ফিট অ্যাটাচড টয়লেট।
আমি তাতেও খুশি! কম্প্রমাইজ করা রক্তে মিশে আছে। ছোটোবেলায় তিন ভাই আর ছোটো চাচা একসঙ্গে অনেকটা গোয়াল ঘরের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে বড় হয়েছি , কোন অসুবিধা ছাড়ায় তো দিব্যি পার করে দিয়েছি। কলেজের হোস্টেলে তো গণকবরে ছিলাম বেশ কিছু দিন ! আটাশ জন জীবন্ত লাশ এক হল রুমে!
শহরে নতুন, এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছি, তাতে স্বাস্থ্যটাও ঝুকিমুক্ত। শহরের গুহামুখ, গোড়ালি, হাঁটু, কোমর, পেট , বুক, ঘাড় সবটাই চিনে নেবার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি । টিউশন জুটেছে দুটো, তাতে যা আসে ডায়রিয়ার মতো খসে যায়, তবুও চলছে। এই শহরে কথা শুনতে গেলেও টাকা লাগে, বাতাস পানি কোন কিছুই বামহাতের লেনদেন ছাড়া নড়ে না। এই সিস্টেমে এই শহর খুশি থাকতে পারলে আমি কেন পারব না।
রোজ রোজ চাকরি বানানটা কমপক্ষে উনত্রিশ বার আওড়ায়, তসবীর গুটিতে আল্লাহর নাম জপা বাদ গিয়ে মামা চাচা খালুর নাম জপতে হবে মনে হচ্ছে। রাতদিন মামা চাচা খালু খুঁজে বেড়াই, প্রাক্তন বড় ভাই উধাও! অ্যাপ্লিকেশান করি, ইন্টারভিউ দেই, না গিঁট খোলে না।
সৌভাগ্য কখন মুঠিবন্দী হয় তা কেউ জানে না ? তাই ছুটে চলা বন্ধ হয় না, বখতিয়ারের ঘোড়ার খুরের মতো শত চড়ায় উৎরাই এ পা দুটো সর্বদা ফিট।
সেদিন তুমুল বৃষ্টি হল, মনে হল আকাশের মা মরেছে! চারিদিক সয়লাব। বৃষ্টির পানি আর ম্যানহোলের কনটেন্ট মিলেমিশে একাকার, তাদের উচ্চতা হাঁটু ছড়াল কি ছড়াল! বস্তিতে হাজারো স্বপ্ন ডুবে ছারখার, ফুতপাত ডুবোডুবো, নৌকা শহর দখল নেবে, তাতে অবশ্য একদল যারপরনাই খুশি, আর একদল গলা ফাটাচ্ছে যে এটা দলীয়করণ ও ষড়যন্ত্র।
ছ্যাপ ছ্যাপ আওয়াজ তুলে এই শহরের রোবটগুলো ছুটছে আর বিড়বিড় করে কি যেন বলছে, মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে গালি ছুঁড়ে দিচ্ছে ! হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়লাম, না শরীরের ফুয়েল এখনো গ্রিন দাগেই আছে।
একটা সার্কাস হচ্ছে বলে মনে হল। এরমধ্যে বেশ দর্শক জুটে গেছে, এই শালা বাঙালী খুব খারাপ জাত, মা মরার খবরও যদি আসে, আর পথে যদি কোন হকার,কবিরাজ বা কোন জটলা দেখে, দাঁড়িয়ে পড়বেই। আমি তো তাদেরই দলের একজন।
হকার কবিরাজ না, এতো সাক্ষাত মা দুর্গা, মা রুদ্র মূর্তি ধারন করে। তাকে ঘিরেই এই জটলা। তুমুল বৃষ্টিতে চারিদিক সয়লাব। রাস্তার পাশে নোংরা পানিতে হাফ ডুবো একটা চকচকে প্রাইভেট কার মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে। দরজায় দুর্গা, উনি পদার্পণ করবেন কিন্তু নামতে পারছেন না ডুবো নোংরা জলের জন্য। বহুত চেষ্টা হল, নাহ কোন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, পা যদি একবার এই পানিতে লাগে তবে তো নির্ঘাত পচে যাবে। আহাম্মক ড্রাইভার দাঁড়িয়ে বহুত কসরত করে যাচ্ছে, ঠেলাঠেলি করেও কিছু হচ্ছে না, সে তো আর কাজের সংজ্ঞা জানে না!
বয়স কতো হবে ? আন্দাজের বাইরে, বয়স ঠাওরানোর রিস্ক নেয়া যাবে না, এই আজব চিড়িয়াখানায় মাঝে মাঝে মাকে মনে হয় মেয়ে আর মেয়ে কে মা ! তারপরও এতো সুন্দরও কেউ হয়! ভয়ে তাকাতে পারছিনা । এর ওর ঘাড়ের ফাঁক গলে দৃষ্টি তবু ঠিকই খুঁজে নিচ্ছে। অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে ইতিমধ্যে, আর একজন সুন্দরী মেয়েছেলেকে সাহায্য করতে পারলে তো জীবন সার্থক।
হঠাৎ মুখ খুললেন তিনি, যেন মুক্তো ঝরছে, হাতও নাড়লেন, নেড়ে বললেন এই যে এদিকে আসুন, সব উৎসুক দৃষ্টি স্থির হল সেই দিকে, যেন মন্ত্র মুগ্ধ করেছেন দেবী। এই যে আপনাকে বলছি, এদিকে আসুন। কেউ একপাও এগোলো না, যেন সব জমে বরফ ! আপনাকেই তো, হ্যাঁ হ্যাঁ আপনাকেই, এই যে টি শার্ট এদিকে আসুন। সামনে পেছনে ডানে বামে তাকিয়ে টি শার্ট খুঁজতে লাগলাম হন্যে হয়ে। এতক্ষনে সবার টার্গেট আমি, অ্যাঁ অ্যাঁ, আমাকে বলছেন, নীচের দিকে একটা টান টান ব্যাপার অনুভব করলাম। আমি কেন ট্রিগারের মুখে ! কি দোষ করলাম বাবা, আমার তো ছেঁড়ে দে মা কেন্দে বাঁচির মতো অবস্থা, আবার একটু গর্ব হচ্ছিলো, কোনোদিন তো কেউ ডাকেনি, এ ডাকে সাড়া দিয়ে মরলেও শান্তি, আসেপাসের মুখগুলো পাংশু হয়ে গেলো, সাহস করে এগিয়ে গেলাম! জি আমাকে বলছেন। হ্যাঁ আপনিই তো, এগিয়ে আসুন এদিকে, এমন দৃঢ়তার সাথে বলল যেন আদেশ মান্য করা ছাড়া এই মুহূর্তে মরণ ডাকে সাড়া দেওয়াও হবে চরম গর্হিত অপরাধ । লোক দেখানো কনফিডেনস দিয়ে এরা সব কিছু দখলে নিয়ে নিবে!
মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে এগিয়ে গেলাম। তিনি যা বললেন তা অনেকটা এরকম, তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে হবে এবং এটা মহারানীর আদেশ। পচা পানিতে হড়হড়িয়ে নামতে যাবো, হৈ হৈ করে বললেন, স্যান্ডেল খুলুন, প্যান্ট গুটিয়ে এদিকে আসুন। আমার ঘাড়ে ভর দিয়ে নোংরা স্পর্শ না করেই উদ্ধার পেলেন, আমার ঘাড় কি এতো চওড়া ? ঘাড় থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফুটপাতে নেমে রাম্পে হাঁটার মতো করে সামনের অফিসের লিফটের দরজা পর্যন্ত চলে গেলেন হনহন করে, কিছু না বলে, একবারও পেছনে না তাকিয়ে। আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলাম চলে যাওয়া, আমার প্যান্ট চুয়ে নোংরা ঝরছে এখনো, এরা কি এভাবেই আমাদের ব্যাবহার করে যাবে !
ভিড় ততক্ষনে যার যার ঠিকানা খুঁজে নিচ্ছে। নিজেকে এর চেয়ে বড় আহাম্মক আর কোনও দিন মনে হয়নি। লিফট বন্ধ হল, আমি নিস্পলক অবোধ বালকের মতো নিঃস্ব, আরে কি অদ্ভুত !

লিফট ব্যাক করলো কি মনে করে, হঠাৎ ঝড়ের বেগে কাঁপুনি তুলে আবার এগিয়ে আসছেন আমার দিকে, আবার কি আদেশ হয়।
আপনার নাম্বারটা বলুন তো, তাড়াতাড়ি। আমি কোন কিছু না ভেবে গড়গড়িয়ে বলে গেলাম নাম্বার। ওকে বাই, বলে যথারীতি বিদায়। কিছু বুঝলাম না।
ধুর শালা বলে নোংরা ছড়াতে ছড়াতে শব যাত্রায় মিশে গিয়ে ছুটলাম গন্তব্যে।
যতই রাগ উঠছে, ততই মনে পড়ছে মুখটা, যতবার আহাম্মক হবার কথা মনে হচ্ছে ততবার সেই ডাকটা শুনতে পাচ্ছি, এই যে টি শার্ট এদিকে আসুন! যন্ত্রনা! বাবামার দেয়া নামটা হল টি শার্ট। মনের মধ্যে একটা ছটফটানি ভাব আসছে! কি হল আমার ? কেউ কি নোনা জলের মতো অযাচিত ঢুকে পড়ছে!
দৌড়ঝাঁপের মধ্যে কয়েকদিন ভালই ছিলাম। মাঝে মাঝে এলেও খুব বেশী পেয়ে বসেনি, বেঁচে যাচ্ছি বোধ হয়! আস্তে আস্তে বিসৃত হয়ে চর পড়ে যাচ্ছে মনে, সেই দেবী চেহারা আর কোন ঝামেলা পাকাতে পারছেনা, যাক বাবা !
বিপত্তি এলো কল হয়ে। আমি বলছি, আপনি সেই টি শার্ট তো ?
বুকের মধ্যে ধাক্কা খেলাম, মনে হল হাতি লাত্থি মারল !
হ্যাঁ, না , মানে জি জি!
কি হ্যাঁ না মানে জি জি করছেন!
মনের মধ্যে সেই ছটফটানি ভাবটা আবার আসছে! কি যে হল আমার ? কেউ কি তবে নোনা জলের মতো অযাচিত ঢুকে পড়ছে! তবে বাঁধ কি ভেঙে গেলো! এই শালা মধ্যবিত্ত কে নিয়ে যতো ঝামেলা!
কাল আপনি ফ্রি আছেন? উত্তরের ধার না ধরেই বলে চললেন, আগামীকাল নিউমার্কেটের গেটে থাকবেন , বিকাল সাড়ে তিনটার সময়, আর হ্যাঁ ঐ টি শার্টটাই পরবেন, আপনার চেহারা আমার মনে নাই, টি শার্ট দেখে আমি ঠিক চিনে নেবো!
নিজেকে খুব অপাংতেও মনে হচ্ছে, কে বড় টি শার্ট না আমি, আমি না টি শার্ট ?
আভিজাত্যের তোড়ে এরা আমাদের এভাবে নিলামে চড়াবে?
সিদ্ধান্ত ফিক্সড, কোথাও যাবো না, কিসের নিউমার্কেটের গেট, কিসের টি শার্ট, গুষ্টি কিলায়! মেজাজটা খিচড়ে গেলো!
যতই রাগ বাড়ছে, ততই মনে পড়ছে মুখটা, যতবার আহাম্মক হবার কথা মনে পড়ছে ততবার সেই ডাকটা শুনতে পাচ্ছি, এই যে টি শার্ট এদিকে আসুন! যতবার নিলামের কথা মনে হয়ে কষ্ট পাচ্ছি ততবার বিকাল সাড়ে তিনটা ডাকছে, যতবার মনে পড়ছে সে কথা, আপনার চেহারা আমার মনে নেই, ততোবার টি শার্ট গায়ে জড়াতে ইচ্ছা করছে, নিউমার্কেটের গেটকে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে দর্শনীয় স্থান !
কি যন্ত্রনা! মনের মধ্যে ছটফটানি ভাবটা তোলপাড় করছে! কি হল আমার ? কেউ কি নোনা জলের মতো অযাচিত ঢুকেই পড়ল!
পরদিন ঘড়ির কাঁটাকে সাড়ে তিনটায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসবার জন্য কি হাপিত্যেশ। আগে তো কখনো এরকম হয়নি!
দুপুর বারটা নাগাদ টি শার্টের মধ্যে ঢুকে বসে আছি! মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে দর্শনীয় স্থানে দর্শনীয় সৃষ্টি দেখবার জন্য আর তর সইছে না! যদি না আসে, যদি পুরোটায় বিশ্বাস নিলামে চড়ানোর আর একটা খেলা হয়! মধ্যবিত্তের কনফিউসন দূর হবে না, এটাই কুরে কুরে শেষ করে দিচ্ছে এদের!
আশাই আবার এদের বাঁচিয়ে রেখেছে। টি শার্ট সমেত আমি দুপুর দুইটা থেকে নিউমার্কেটের গেটে, মনের ভেতর থেকে কেউ একজন বলছে তুই তো শেষ! বাতিলের খাতাই নাম লেখালি।
হাতে ঘড়ি নাই, পুরো হার্টটাই পেন্ডুলামের মতো দুলছে!
উঠুন, একটা রিক্সা এসে পাশে দাঁড়িয়ে সেই দখল করে নেয়া টোনে আবারো বলল এই যে টি শার্ট উঠুন !
গুরু ভক্তিতে নতুজান ভক্তের মতো উঠে গেলাম, এই প্রথম কোনো পরী এতো কাছে!
কি জানি হয়ে গেলো, টিশার্টের বদলে তার পছন্দের তালিকায় কিভাবে যে প্রবেশ করলাম জানি না!
দিনে এগার বার রিং এর মধ্যে সাত বার মিসড কল, সপ্তাহে সাড়ে তিন বার দেখা, মাঝে মাঝে হাতের মধ্যে , মাসে একবার চিলেকোঠায়, নেহাত মন্দ না।
এগুলোই যদি প্রেমের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে তবে মনে হয় প্রেম করছি খুব !
একটা প্রশ্নের উত্তর আজো দেইনি সে, সেদিন কি জন্য টি শার্টকে ডেকে নিয়েছিলো ?
উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আছি !
জলেশ্বরীতলা লেন, থার্টিন বাই টু ,একান্ত আপনের গেট মাঝেসাঝে দীনহীন মধ্যবিত্ত টি শার্টের জন্য উদোম হচ্ছে ইদানীং...
দেখা যাক মধ্যবিত্ত টি শার্ট কোথায় গিয়ে ঠেকে ?
দেখি কি হয় ? ...............

ভালোবাসার প্রারম্ভিক চুক্তিগুলো সম্পন্ন হবার পর আমাদের প্রেম একটা চেহারা নিয়েছিলো, ইলেক্ট্রিক রেলের গতিতে না চললেও চলছিল অন্তত । দিনে এগার বার রিং এর মধ্যে সাত বার মিসড কল, সপ্তাহে সাড়ে তিন বার দেখা, মাঝে মাঝে হাতের মধ্যে , মাসে একবার চিলেকোঠায়, নেহাত মন্দ না। কিন্তু কে এফ সি, অ্যানড্রয়েড ফোন, সিনেপ্লেক্স ছাড়া এ প্রেম জমবে কেন?
তবে কি যতি!
গত তিনদিন তোমাদের জলেশ্বরীতলা লেনের থার্টিন বাই টূ ,একান্ত আপনের পাশে দাড়িয়ে ছিলাম ঠাই। গত তিনদিন তোমার দেখা পাইনি। জলেশ্বরীতলা লেন, থার্টিন বাই টূ ,একান্ত আপন। নবার প্রদক্ষিণ করেও কালো বাটনের কলিং বেলটাকে ডিস্টার্ব করার সাহস জোটেনি। অ্যালসেসিয়ানটা যদি ফুঁড়ে আসে আভিজাত্যের তোড়ে !
গত তিনদিন তোমার দেখা পাইনি। এদিক সেদিক ঘুরেছি, কর্পোরেশনের ঊনত্রিশ নাম্বার ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়েছি , যেখান থেকে তোমার জানালার উলঙ্গপনাকে দেখা যায় দিব্যি, যদি একবারও দেখা হয়ে যায়, যদি মুক্তি মেলে অদ্ভুত আসক্তি থেকে! মোবাইলে কল করব! যাকে চাইনা সে হাজারো ফিরিস্তি শোনায়, বাংলায় চাইলে এক, ইংরেজিতে দুই । দাড়িয়েই ছিলাম। সারা দুপুর পেটে শুধু ইঁদুর খেলা করেছে, অবশেষে বিষ পর্যন্ত না পেয়ে শুন্য গুদাম থেকে ফিরে গেছে নিঃশব্দে, খিস্তি আওড়াতে আওড়াতে। মানিব্যাগের তলানি ঘেঁটে পাঁচ টাকার একটা কয়েন বের করেছিলাম, তা দিয়ে কটা বাদাম কিনেছি, ফ্রি পানিটা জুটেছিল দেড় টাকার চায়ের দোকানিটার কাছ থেকে, এক কাপ চা খাইয়েছিল কি মনে করে ? তিন দিন গত হল, দেখা পাইনি তবুও ? ক্লান্তিহীন অপেক্ষায় দিন কাটছে। আর কতকাল অপেক্ষায় কাটাতে আমাদের। গত তিনদিনে লোহার রাশভারী গেট গলিয়ে তোমাদের নতুন মডেলের এলিয়েন টা শহরের দিকে ছুটেছে ব্যস্ত ভঙ্গিমায়, আশেপাশে ভ্রুক্ষেপ না করেই। সুযোগ বুঝে একবার গাড়ীর জানালায় চোখ মেলেছিলাম, জানালার কাঁচ আমার চেহারাকে কাবাব বানিয়ে আবার আমাকেই ফেরত দিয়েছিল।
ইদানীং তুমি নাকি লাল গ্লাসে ঝড় তুলছ? তবে সবই কি সত্যি? গত তিনদিন সৌরভ যা যা দেখেছে সবই সত্যি! গত তিনদিনই নাকি তুমি নীল আলোর নীচে,সঙ্গে কে ছিল টা সৌরভ দ্যাখেনি। তবে তার পকেটের মানিব্যাগের দাম্ভিক হাসি নাকি দেখেছে? তিন দিনে নয়শো উনষাট টাকা টিপস পেয়েছে সে , কতো বড় ব্যাপার ! ও সৌরভ? সৌরভ কে তুমি চিনবে না, আমার বন্ধু, এক কালের ব্রিলিয়াণ্ট ছাত্র, বরাবরই ক্লাশে প্রথম।গতবার মাস্টার্স কমপ্লিট করে চাইনিজে সেকেন্ড ম্যানেজারের চাকরি জুটেছে। তবে কি এও সত্যি! তোমার শরীরের মাংশপিণ্ডগুলো নাকি অনেকের চোখের খোরাক জুগিয়েছে। আমি বিশ্বাস করিনি, সৌরভই বলেছে, সত্যি আমি বিশ্বাস করতে চাইনি কিছুতেই তবু বিশ্বাস করতেই হল, কি করবো বল মধ্যবিত্তের বিশ্বাসের ভিতটা যে বড্ড নড়বড়ে। ফ্রেমে বাঁধানো প্রেম দেয়ালেই টাঙ্গানো থাক।
জলেশ্বরীতলা লেন, থার্টিন বাই টু ,একান্ত আপন কে আমি ভুলে যাবো।
পৃথিবী প্রস্তুতি নিচ্ছে দ্বিতীয় পর্বের মঞ্চায়নের জন্য।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement