লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৬টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftভোর (মে ২০১৩)

অরুণোদয়
ভোর

সংখ্যা

অদিতি ভট্টাচার্য্য

comment ১৯  favorite ০  import_contacts ১,২১৮
একটা সময় ছিল যখন মানুষ শুধু পৃথিবী নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল। তখনো মানুষ পৃথিবীর সব রহস্য উদ্ঘাটন করে উঠতে পারে নি। মানুষ তখন তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে অবাক হত, খুশী হত, আনন্দ পেত, আবার তুচ্ছ কারণে দুঃখও পেত। জীবন ছিল তখন অনেক সহজ সরল, সোজাসাপটা। বিজ্ঞানের জয়ধ্বজা তখনো এত উঁচুতে ওঠে নি। যখনই কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা বুদ্ধিতে দেওয়া সম্ভব হত না তখনই মানুষ কোনো অতিলৌকিক শক্তির কাছে মাথা নত করত। অনেক ঘটনার কার্যকারণই মানুষের কাছে অজানা ছিল। জীবন ছিল তাই এক রহস্যময় বিস্ময় পরতে পরতে যার হাসি, কান্না, চাওয়া, পাওয়া, না পাওয়া, পেয়েও হারানো, সুখ, দুঃখ, মমতা, ভালোবাসা, ঘৃণা জড়িয়ে ছিল। ভাবলে আজ হাসি পায়, কিন্তু ছিল, ছিল এরকম সময়।
হলুদ হয়ে যাওয়া এক ডায়েরীর পাতায় ছোট্ট ছোট্ট হরফে এ পর্যন্ত লিখে থামলেন আকাশলীনা। পাতা খরচ করতে মায়া হয়, ভয় হয় কালিও যদি ফুরিয়ে যায়। এসব তো এখন প্রাগৈতিহাসিক জিনিস। যখন এসেছিলেন সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। কবে এসেছিলেন এখানে, এই পিইলেভেন গ্রহে? তা আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে, এই গ্রহের সূচনা লগ্নে বলতে গেলে। সঙ্গে ছিলেন স্বামী উদ্দালক আর চার বছরের ছোট্ট ছেলে জিষ্ণু।
পৃথিবী ছাড়া মানুষের বাসযোগ্য গ্রহ উপগ্রহের সন্ধান শুরু হয়েছে বহু বছর। তখন কতগুলো গ্রহ তার প্রাথমিক তালিকায় ছিল। কয়েকশো বছরের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর অবশেষে একটি গ্রহকে করে তোলা যায় মনুষ্য বসবাসযোগ্য, বরং বলা ভালো তৈরী করে তোলা হল একেবারে নিঁখুত করে। তারই নাম হল পিইলেভেন। এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন উদ্দালক। তাই যখন পিইলেভেনে মানুষ আসতে শুরু করল এক নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনের সন্ধানে উদ্দালকও এলেন নিজের স্ত্রী, পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে। আকাশলীনার মনে অজানা আশঙ্কা ছিল, আবার নতুন গ্রহে বসবাসের উত্তেজনাও ছিল। পৃথিবীকে তিনি ভালোবাসতেন, না বাসতেন নয়, এখনো বাসেন। নানান অসুবিধে সত্ত্বেও পৃথিবী তাঁর প্রিয় ছিল।
তাই উদ্দালক যখন বলেছিলেন, ‘দেখবে পিইলেভেনে সব কিছু নিঁখুত ভাবে চলবে, ঘড়ির কাঁটা ধরে। কোথাও কোনো বিচ্যুতি থাকবে না, কোনো কিছু নিয়মের বাইরে যাবে না। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসবে না, এত অসুখ বিসুখ থাকবে না। সব কিছু মানুষই নিয়ন্ত্রণ করবে,’ আকাশলীনা বলেছিলেন, ‘তাহলে কি বাঁচার আনন্দও থাকবে? সব কিছু নিখুঁত নিয়মে চললে হাঁফিয়ে যাবে না মানুষ? লাগবে না একঘেয়ে?’
উদ্দালক বিরক্ত হয়েছিলেন। আসলে তিনি আর তাঁর সহকর্মীরা তখন পিইলেভেনে এক অদ্ভুত নিখুঁত পরিবেশ সৃষ্টির আনন্দে বুঁদ হয়ে আছেন। তিনি তো পিইলেভেনে আগেও এসেছেন। সর্বসাধারণের বাসযোগ্য হওয়ার ছাড়পত্র পাবার পর সপরিবার গেলেন।
আশ্চর্য, অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছিলেন আকাশলীনা পিইলেভেনে এসে। আছে তো সবই এখানে। কিন্তু কি অদ্ভুত পরিবেশ। অদ্ভুত এক আচ্ছাদন এই গ্রহের চারদিকে, এটা নাকি সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার, আকাশলীনার অবাক হওয়া দেখে গর্বের হাসি হেসে বলেছিলেন উদ্দালক। এখানে রাত হয় না, তাই ভোরও হয় না, দুপুর গড়িয়ে বিকেলও হয় না। এক মৃদু, স্নিগ্ধ আলো এই গ্রহে চব্বিশ ঘন্টা থাকে। ঠিক যতটা মানুষের দরকার লাগে, তার এক চিলতে বেশীও নয়, কমও নয়। কড়া রোদ্দুর এখানে গা পুড়িয়ে দেয় না, ভোরের নরম আলো এখানে মন ভালো করে না, চাঁদের হাসির এখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
‘দিন রাত হয় কি করে এখানে?’ আকাশলীনা জিজ্ঞেস করেছিলেন।
‘দিন, রাত, সকাল, দুপুর, সন্ধ্যে এত অহেতুক ভাগের দরকার কি? চব্বিশ ঘন্টা সময়কে কাজ আর বিশ্রামের মধ্যে ভাগ করে নিলেই তো হল। সারাক্ষণ আলো পাওয়া যায় এখানে, আবার শক্তির অপচয়ও নেই,’ বলেছিলেন উদ্দালক।
ধীরে ধীরে পিইলেভেনে গড়ে উঠল এক নতুন রাষ্ট্র, তৈরী হল তার নিয়ম কানুন। এখানে মানুষ কাজ করতে লাগল যন্ত্রের মতো। অসুখ বিসুখ প্রায় কেই বললেই চলে। যদিও বা কারুর অসুস্থ হওয়ার খবরও আসে, অতি দ্রুত অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় তাকে সুস্থ করে তোলা হয়। কর্মক্ষমতাও এখানে অনেক বেশী।
‘মানুষ কি তাহলে এখানে অমর?’ একদিন প্রশ্ন করেছিলেন আকাশলীনা।
‘না যতদিন মানুষ কর্মক্ষম থাকবে অথবা তার পরিবার বা সমাজের প্রয়োজনে সে লাগবে ততদিনই তার বাঁচার অধিকার। প্রয়োজন ফুরোলে যদি সে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ না করে তাহলে সে দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে।’
চমকে উঠেছিলেন আকাশলীনা। একি নিষ্ঠুরতা! মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নির্ধারিত হবে তার প্রয়োজনীয়তার মাপকাঠিতে? কিন্তু প্রতিবাদ করে লাভ নেই, প্রতিবাদের শাস্তি এখানে ভয়ংকর।
ইতিমধ্যে পিইলেভেনেও যথেষ্ট লোক সমাগম হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় পৃথিবী থেকে পূর্ণ বয়স্ক মানুষ এনে তাদের পুরোনো অভ্যাস ভুলিয়ে তাদের নতুন গ্রহের নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত করার পরীক্ষা নিরীক্ষাও শুরু হয়ে গেছে। অবশ্য যারা স্বচ্ছায় মানিয়ে নিয়েছে তাদের কথা স্বতন্ত্র। জিষ্ণুও এই পরিবেশে বড়ো হতে থাকে। ওর মতো আরো ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদেরও পৃথিবীর স্মৃতি মুছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আকাশলীনার মাঝে মাঝে দিশাহারা লাগে। অসহ্য লাগে চব্বিশ ঘন্টা জেগে থাকা এই অদ্ভুত আলোকে। একেক সময় মনে হয় যদি নিভে যায় এই আলো, যদি রাতের অন্ধকার নেমে আসে, যদি ভোর হয় তারপর! কিন্তু হয় না। এখানে হঠাৎ করে ঈশান কোণ থেকে হুহু করে ঝড় ওঠে না, এখানে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে না, এখানে শরতের সোনা রোদ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে না। কোনো ঋতুই তো নেই এখানে, তাই ঋতু বৈচিত্রও নেই। সর্বত্র সব সময় এক নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। এটাই নাকি মানুষের পক্ষে সবচেয়ে উপকারী।
এখানে শুধু যা দরকার তাই পাওয়া যায়। যা মানুষের প্রয়োজন তাই হয়। কোনো অকারণ, অহেতুকের স্থান নেই এখানে। অপ্রত্যাশিত কিছু হয় না, তাই তার সঙ্গে জড়িত কোনো আবেগও নেই কারুর মনে। পিইলেভেনে সব কিছুই প্রত্যাশা মতো, প্রয়োজন মতো, তার বাইরে কিছু নয়।
জিষ্ণু বড়ো হল, তার বাবার মতোই সেও বিজ্ঞানকে বেছে নিল। আকাশলীনা জিষ্ণুকে যেন ঠিকঠাক বুঝতে পারেন না। একেক সময় মনে হয় পিইলেভেনের এক নিখুঁত যন্ত্র মানব যে নিখুঁত ভাবে সব কাজ ঘড়ির কাঁটা ধরে করে যাচ্ছে। আবার কখনো কখনো মনে হয় না শুধু যন্ত্র নয়, বোধহয় যন্ত্রের কঠিন খোলসের ভেতরে মনও আছে।
সেদিন আকাশলীনা দেখলেন কাজের শেষে বাড়ি ফিরে জিষ্ণু চুপচাপ জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আছে।
‘কি রে? কি হয়েছ? বিশ্রাম করবি না?’ আকাশলীনা জিজ্ঞেস না করে পারলেন না।
‘আমাকে খুব শিগগিরি পৃথিবীতে পাঠানো হবে। কিছু কাজের জন্যে, অত্যন্ত গোপনীয়। মনে হয় বছর দুয়েক থাকতে হবে।’
আকাশলীনার বুক কেঁপে উঠল। পৃথিবীতে যাবে জিষ্ণু!
‘পৃথিবীতে যাবি? কবে? কিন্তু ওখান থেকে ফেরার পর তো আবার সেই যন্ত্রনাদায়ক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে সব কিছু ভোলার জন্যে।’
‘যাওয়ার আগেও অনেক প্রিকোশন নিতে হবে, বলতে পারো ভ্যাকশিনের মতো যাতে পৃথিবীতে গিয়ে কোনো খারাপ প্রভাব শরোরে বা মনে না পড়ে,’ জিষ্ণু হাসল, ‘ফিরে এসেও হয়তো আরো অনেক কিছু করতে হতে পারে। কিন্তু যেতে হবেই। ওপরতলার হুকুম যখন এসেছে আর আমাদের এই রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, এই পিইলেভেনের প্রয়োজনে যেতেই হবে।’

গেল জিষ্ণু। খবরাখবরও পেতেন আকাশলীনা মাঝে মাঝেই। কিন্তু দু তিন মাসের পর থেকেই উদ্দালককে কেমন যেন গম্ভীর লাগত। জিজ্ঞেস করলে পরিষ্কার করে কিছু বলতেন না, শুধু বলতেন, জিষ্ণু ভালো আছে। তবু অজানা উৎকন্ঠায় দিন কাটত এক মায়ের। অবশেষে প্রায় বছর দুয়েকের মাথায় যখন সময় হল জিষ্ণুর ফেরার তখন সব জানতে পারলেন।
উদ্দালকই বললেন, জিষ্ণু পৃথিবীতে গিয়ে একটি মেয়েকে বিয়ে করেছে। তাদের একটি পুত্র সন্তানও হয়েছে কিন্তু সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মেয়েটি মারা গেছে। মাস খানেকের বাচ্ছাটাকে নিয়ে জিষ্ণু ফিরছে। জিষ্ণু যেহেতু একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে পৃথিবীতে গেছিল এবং অনেক গোপন তথ্য তার কাছে আছে তাই তাকে পিইলেভেনে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পিইলেভেনে ফেরা মাত্রই তার স্থান হবে সংশোধনাগারে। বিনা অনুমতিতে পৃথিবীবাসী কোনো মেয়েকে পৃথিবীতে বিয়ে করা এক গর্হিত অপরাধ। উদ্দালকের আশা বিচারে হয়তো জিষ্ণুকে কয়েক বছর সংশোধনাগারে থাকতে হবে, পৃথিবীর সব স্মৃতি ভুলতে হবে, কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী এবং তার কর্মনিপুণতার জন্যে হয়তো চরম শাস্তি হবে না।
‘কেন তোমরা তো সব ব্যবস্থা নিয়ে পাঠিয়েছিলে ওকে পৃথিবীতে যাতে ওখানকার কোনো প্রভাব ওর ওপর না পড়ে, ওখানকার কোনো কিছুই ওর না ভালো লাগে, তাহলে? ছোটো থেকে বড়োও তো হয়েছে ও এই নিখুঁত ব্যবস্থার মধ্যে। তার মানে ছিল না তোমাদের সব ব্যবস্থা নিখুঁত, স্বীকার করো। তার শাস্তি কেন ভুগতে হবে ওকে?’ এই প্রথম ক্ষোভে ফেটে পড়লেন আকাশলীনা।
উত্তর ছিল না উদ্দালকের কাছেও। জিষ্ণু পিইলেভেনে ঢোকা মাত্রই তাকে সংশোধনাগারে নিয়ে যাওয়া হল আর বাচ্ছাটাকে এক হোমে। শুরু হল বিচার। জিষ্ণুর নাকি কোনো অনুশোচনাই নেই কৃতকর্মের জন্যে। বরং ও নাকি পিইলেভেনের নিয়মকানুনের অনেক ত্রুটি বার করেছে, প্রতিবাদ করেছে এভাবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়ার। ফলে জিষ্ণুর বাঁচার কোনো আশাই রইল না, এরকম ব্যক্তি রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক। বিচারে তাই মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হয়ে গেল।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগের দিন উদ্দালক, আকাশলীনা গেলেন দেখা করতে। জিষ্ণু যথেষ্ট শক্ত, শান্ত, স্থির।। দেখে মনেই হচ্ছে না যে চব্বিশ ঘন্টারও কম ওর আয়ু।
‘মা, পৃথিবীতে চব্বিশ ঘন্টা আলো থাকে না। অন্ধকার নামে, রাত হয়। এতদিন সেটা কত বাজে শুনে এসেছি। কিন্তু দেখলাম তার অন্য মানে। আঁধার কেটে যখন প্রথম আলো ফোটে, ভোর হয়, মনেও তখন নতুন আশা জাগে, এক নতুন দিনের। এক অদ্ভুত অনুভূতি মা! আগে যা কখনো বুঝি নি। সারা রাতের অস্থিরতা, ভয়, উত্তেজনার পর যখন আমার ছেলে জন্মাল, ওর মা আর নেই। কিন্তু আমি ওকে দেখলাম, দুঃখের মধ্যেও আমার আনন্দ হল। বাইরে তখন সবে সূর্য উঠেছে। ওর নাম রাখলাম অরুণোদয়। ওকে হোম থেকে কবে ছাড়বে জানি না। কিন্তু দেখো ও তোমাদের কাছে ফিরে আসবে, এই পিইলেভেনেও একদিন ভোর হবে।’

ছ’বছর পরে বয়েসে অরুণোদয় ছাড়া পেল হোম থেকে। এল আকাশলীনার কাছে। উদ্দালক তখন নেই। এই নিঁখুত ব্যবস্থার মধ্যেও কেন কে জানে উদ্দালকের স্ট্রোক হয়েছিল। জিষ্ণুর মৃত্যুদণ্ডের ক’মাস পরেই। আগে থেকে কিছুই বোঝা যায় নি। হঠাৎই স্ট্রোক, হঠাৎই মৃত্যু। নেহাতই আদ্দিকালের পৃথিবীতে ঘটা একটা ঘটনার মতো। পিইলেভেনে তো হঠাৎ করে কোনো কিছুই ঘটে না, হঠাৎ শব্দটারই কোনো মানে নেই এখানে। এখানে সবাই সব কিছু জানে, কখন কে জন্মাবে, কে মারা যাবে, কখন কি ঘটবে। কিন্তু তাও হয়েছিল। উদ্দালক হঠাৎই মারা গিয়েছিলান। আকাশলীনা একাই থাকছিলেন। বোধহয় অরুণোদয়ের কথা ভেবেই রাষ্ট্র তাঁকে বাঁচার অধিকার দিয়েছিল।
অরুণোদয় এল। যেন ছোটো জিষ্ণু। আকাশলীনা আবার আশায় বুক বাঁধলেন। প্রায় জন্ম থেকে হোমে থাকার কারণে অরুণোদয় একদম পুরোপুরি পিইলেভেনের নতুন প্রজন্মের এক মানুষ। কিন্তু তাও মাঝে মাঝে ওর প্রশ্ন আকাশলীনাকে চমকে দেয়। যেমন একদিন ওর নামের মানে জিজ্ঞেস করে বসল। পৃথিবী কত বাজে আর পিইলেভেন কত সুন্দর জানা সত্ত্বেও পৃথিবীর প্রতি ওর অদ্ভুত কৌতূহল। আকাশলীনা ভয় পান। আকাশলীনা ওর মন থেকে এসব তাড়াতে চেষ্টা করেন। জিষ্ণুর পরিণতি আরেকবার দেখার ইচ্ছে তো দূরের কথা, সহ্য করার ক্ষমতাও নেই।
অরুণোদয় বড়ো হচ্ছে, আকাশলীনা বৃদ্ধা। আজকাল চারপাশ থেকে মাঝে মাঝে উড়ো খবর পান। পিইলেভেনের এখানে ওখানে নাকি অসন্তোষ জমছে। এই নিঁখুত, নির্ভুল ব্যবস্থাতেও অসন্তোষ? এত তাড়াতাড়ি? ক’টা প্রজন্ম বাস করল এখানে? এই স্নিদ্ধ, মায়াবী, মৃদু আলোও এত সহজে অসহ্য হয়ে উঠল? এখানে রোদে পুড়তে হয় না, জলে ভিজতে হয় না, খরা হয় না, বন্যা হয় না – তাও লোকের ভালো লাগছে না? কেন? আকাশলীনা ভাবেন। চিন্তা হয় অরুণোদয়কে নিয়ে। তার পড়াশোনা শেষের পথে। সেদিন খবর পেলেন সে নাকি তার বন্ধুদের বলেছে, ‘এভাবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়ার ফল ভালো হবে না, প্রকৃতি একদিন না একদিন এর বদলা নেবেই। বিজ্ঞানের উন্নতি মানে প্রকৃতিকে বদলে দেওয়া নয়। যেদিন ঝড় উঠবে সেদিন নাকি পিইলেভেনের কিছুই টিঁকবে না।’
আকাশলীনা চমকে উঠলেন। এসব কথা কে শেখাল অরুণোদয়কে? বাড়ি ফিরলে অরুণোদয়কে বোঝাতে বসলেন আকাশলীনা। চুপচাপ শুনল অরুণোদয়, আকাশলীনা থামলে বলল, ‘তাহলে তুমি এখনো কেন ওই হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে পৃথিবীর কথা লেখো ঠাম্মা? আমি একদিন দেখেছি, তুমি লেখা ফেলে উঠে গেছিলে, তখন। তুমি ভয় পেও না, আমার কিচ্ছু হবে না।’
আকাশলীনা আর সামলাতে পারলেন না, অরুণোদয়কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন।
দিন যায়। ভেতরে ভেতরে যেন চাপা অসন্তোষের আঁচ পাওয়া যায়। অরুণোদয় এই গ্রহের, এই রাষ্ট্রের ব্যবস্থার বিরূদ্ধে প্রচার করে বেড়াচ্ছে। তাকে একদিন গ্রেপ্তার করা হল। প্রত্যাশিতই ছিল এটা। খবর শুনেই আকাশলীনা জ্ঞান হারালেন।
কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলেন, কি করে জ্ঞান ফিরল কিছুই জানেন না আকাশলীনা। যখন ফিরল দেখলেন নিজের ঘরেই শুয়ে আছেন, পাশে অরুণোদয় দাঁড়িয়ে। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। অরুণোদয় হেসে পাশের জানলার পর্দাটা সরিয়ে দিল। নরম আলোয় ঘর ভরে গেল।
‘দেখো ঠাম্মা ভোর হয়েছে, পিইলেভেনেও ভোর হয়েছে!’
সংক্ষেপে যা শুনলেন তা হল হঠাৎই অন্ধকারে আবৃত হয়েছিল পিইলেভেন। শুরু হয়েছিল তুমুল ঝড় বৃষ্টি যার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পিইলেভেনের নিখুঁত ব্যবস্থাও পারে নি। ক্ষতি হয়েছে অনেক, কিন্তু প্রলয় শেষে ভোর হয়েছে, সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। যারা বেঁচে আছে তারা সাক্ষী হয়েছে পিইলেভেনের প্রথম প্রত্যুষের। কি করে সম্ভব হল আকাশলীনা জানেন না, কিন্তু হয়েছে সম্ভব। জিষ্ণুর কথা সত্যি হয়েছে, ভোর হয়েছে।
আকাশলীনা নিশ্চিন্তে চোখ বুজলেন।

গেটের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই এক নিশ্বাসে নিজের লেখা গল্পটা পড়ে ফেলল সমীরণ। মাসিক সৃজন পত্রিকায় নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখতে যে কি ভালো লাগছে। কত বার নাকচ হওয়ার পর এইবার বেরোল। চারদিকে তাকাল ও, না আজকের ভোরটা সত্যিই খুব সুন্দর।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মামুন ম. আজিজ
    মামুন ম. আজিজ হেভ্ভি একটা সাইফাই......লাষ্টে আবার বাস্তবতার জাস্টিফিকেশন দিলেন লেখক..ওটা নেহাতই অদরকারী....সে যা হোক..ভোর কত প্রয়োজন তা স্পষ্ট হলো....
    প্রত্যুত্তর . ৯ মে, ২০১৩
    • অদিতি ভট্টাচার্য্য অনেক ধন্যবাদ। শেষের জাস্টিফিকেশন মানে গল্পের ভেতর গল্পটাকে বলছেন? আসলে সমীরণের লেখা না প্রকাশিত হওয়ার অন্ধকার কেটে ভোর হল সেটাই বোঝাতে চেয়েছি। লেখা প্রকাশিত হওয়া যে লেখকের কাছে কত আনন্দের সেটা তো বলাই বাহুল্য। এরকম সমালোচনাই সব সময় কাম্য।
      প্রত্যুত্তর . ৯ মে, ২০১৩
  • লুতফুল বারি পান্না
    লুতফুল বারি পান্না বেশ অনেকগুলো স্তর আছে গল্পটায়। দারুণ আইডিয়ায় সাজানো চমৎকার একটা ফিকশন। সমালোচনা বলতে ঠিক স্পষ্ট বোঝাতে পারছি না তবে- কিছু টেকনিক্যাল ভাষার ব্যবহার হলে আরো ভাল লাগত বোধ হয়।
    প্রত্যুত্তর . ৯ মে, ২০১৩
    • অদিতি ভট্টাচার্য্য পড়ার জন্যে অনেক ধন্যবাদ। টেকনিকাল টার্ম কিছুটা সচেতন ভাবেই ব্যবহার করি নি। তবে ভবিষ্যতে এরকম লিখলে এই ব্যাপারটা অবশ্যই মাথায় রাখব।
      প্রত্যুত্তর . ৯ মে, ২০১৩
  • তানি হক
    তানি হক ভোর সংখ্যার জন্য সাইফাই গল্প ...চমৎকৃত হলাম ... আকাশলীনা নামটি এবং চরিত্র দুটোতেও মুগ্ধ হয়েছি ...শেষের হাল্কা চমক আর সুন্দর কাহিনী মিলে ... খুব খুব ভালো লাগলো গল্পটি ... আর বুঝতেই পারছি যে এই টাইপের গল্পতেও আপনি দারুণ পারদর্শী তাই আগামীতে এমন গল্প আরও ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১১ মে, ২০১৩
  • এশরার লতিফ
    এশরার লতিফ ভালো লাগলো গল্পটি। মানব জাতিকে প্রকৃতির সাথে সমন্বয় রেখেই এগোতে হবে , প্রকৃতিকে এড়িয়ে অথবা ধংস করে নয়।
    প্রত্যুত্তর . ১৭ মে, ২০১৩
  • ekaki jobon
    ekaki jobon এই সংখ্যার জন্য পারফেক্ট ।
    প্রত্যুত্তর . ২০ মে, ২০১৩
  • স্বাধীন
    স্বাধীন সুন্দর গল্প ভাল লাগল।
    প্রত্যুত্তর . ২০ মে, ২০১৩
  • ইন্দ্রাণী সেনগুপ্ত
    ইন্দ্রাণী সেনগুপ্ত বাহ.. .সুন্দর লাগলো :)
    প্রত্যুত্তর . ২২ মে, ২০১৩
  • মোঃ আক্তারুজ্জামান
    মোঃ আক্তারুজ্জামান আপনার লেখায় অভিনবত্ব থাকে যা লেখাকে আকর্ষনীয় করে তোলে আর বক্তব্যটাও খুব স্পষ্ট করে তুলে ধরেন যা আমার খুব ভালো লাগে| অনেক অনেক ধন্যবাদ|
    প্রত্যুত্তর . ২৯ মে, ২০১৩
  • রোদের ছায়া
    রোদের ছায়া পৃথিবীর এই দিন-রাত , ভোর হওয়া এগুল যে আমাদের জীবনে কতো প্রয়োজন সেটা আপনার গল্পটি পড়ে আবারও ভীষণ ভাবে বুঝলাম । ভোর সংখ্যায় সাইন্স ফিকশন পাবো ভাবিনি , সুন্দর সত্যি পুরস্কার পাবার মতই গল্পটি ( যদিও ভোট বন্ধ তবু আমার পক্ষ থেকে ৫/৫ )
    প্রত্যুত্তর . ২৯ মে, ২০১৩
  • সূর্য
    সূর্য পিইলেভেন আর সমীরণ এর দুটো ভোরই এল আনন্দ বার্তা নিয়ে। সুন্দর, চমৎকার জমজমাট একটা গল্প।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ মে, ২০১৩

advertisement