১.

বুলা আমার ফুফাতো বোন। এ পৃথিবীতে কেউ কেউ স্রষ্টার করুণায় আশ্চায সুন্দর পরিপূর্ণতা পায়। বুলা সেটা পেয়েছে। ঠিক অনিন্দ্য সুন্দর বলতে যা বুঝায়, আমার ধারণা; বুলা তাই! আমি ওর অসামান্য সন্দরয নিয়ে বাড়তি কোন কথা বলতে চাইনা।
বুলা আমার চোখে একটি বিস্ময়!
ওর সবচে বড় গুণটি হল; ওর কথা বলার ঢঙ। টিভির ঘোষিকা মতো ওর কণ্ঠ। গুছিয়ে অদ্ভুত সুন্দর করে কথা বলে বুলা। আমি সব সময়ই ওর কথার মুগ্ধ শ্রোতা।

বুলার একটি দুঃখজনক দিকটি হল- নিজেকে নিয়ে সে সুখি নয়। অবশ্য নিজেকে দুখি ভাববার যথেষ্ট কারণ আছে ওর। সেই সঙ্গে সে অনেক গর্বও করতে পারে।
বুলার বাবা নেই; নেই কথাটা বলা বোধ হয় ঠিক হলনা। কারণ বুলার বাবা কে তা আমরা কেউই জানিনা। বুলাও না। ওর জন্মটা ঠিক কাঙ্ক্ষিত নয়।

বুলার মা ১৯৭১ সালের একজন বীরাঙ্গনা। আর বুলা হল ’৭১ এর অনাকাঙ্খিত এক সন্তান। ’৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে রোকেয়া হলে যে ক’জন মেয়ে নির্মম পাশবিকতার স্বীকার হয়েছিলেন, বুলার মা, মানে আমার মিনু ফুফু তাদেরই একজন।

অত্যাচারিত সেই সব মেয়েদের অনেকেই পরে আত্মহত্যা করেছিলেন কিংবা অন্য কোন পথ বেছে নিয়েছিলেন। বুলার মা বেছে নিয়েছিলেন অস্ত্র। সরাসরি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে সম্মুখ সমরে অংশ গ্রহন করেছেন।

আমার ফুফু একজন মুক্তিযোদ্ধা- কথাটা ভাবতে আমার ভারি আনন্দ হয়। বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা অনুভুতি হয়!

২.

মিনু ফুফু ছিলেন ভীষণ জেদী ধরনের মানুষ। নিজের জীবনের উপর কারো সিদ্ধান্ত তিনি কখনো মেনে নেননি। নিজে যা ভাল মনে করেছেন তাই করেছেন।
ফুফুর জীবনটাও অন্য রকম। জন্মের ৩ মাস আগে তিনি হারিয়েছেন বাবাকে আর জন্মের মাত্র ২ ঘন্টা পর মাকে। তাঁকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন আমার বড় চাচী।

বরাবরই ভাল ছাত্রী ছিলেন তিনি। অর্থনীতি ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন অনারস শেষ বর্ষের ছাত্রী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন উত্তাল, উত্তাল সারা বাংলাদেশ।

৩.

মানুষের প্রতি গভীর মমতা ছিল তাঁর। সেই জন্যই সাবার অনুরোধ সত্ত্বেও মিনু ফফু তাঁর গর্ভের ভ্রুন হত্যা করতে রাজি হন নি।
১৯৭২ সালের ৩১ শে জানুয়ারী মিনু ফুফু কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে মা হলেন। তেমন কেউ জানলও না। সুন্দর ফুটফুটে একটি মেয়ে হল তাঁর। জন্মের ঠিক সাত দিনের মাথায় ফুফু মেয়ের নাম রাখলেম- বুলা।
৪.

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের অবস্থা অনেকের মতো মিনু ফুফুকে হতাশ করলেও দেশের প্রতি বা দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা কিছুমাত্র কমেনি। সবাই দেশকে ভালবাসেন মায়ের মতো আর মিনু ফুফু দেশকে ভালবাসেন সন্তানের মতো! সেকারনেই মেজ চাচার শত পিড়াপিড়ি সত্ত্বেও তিনি তাঁর কাছে আমেরিকা যেতে রাজি হন নি। বুলাকে বুকে চেপে এ দেশেই দীর্ঘ একটি জীবন মুলতঃ একা একাই কাটাতে চাইলেন। বিয়ে করলেন না।

তাঁর কথার উপর কেউ কথা বলেন না। ফলে সবাই ফুফুর সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন এক সময়। আসলে সবাই যার যার মতো ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ফুফুর নিঃসঙ্গতা ক্রমশঃ দারুন কষ্টের হয়ে উঠল। একদিন কী হল; খাবার টেবিলে তিনি হঠাট ঘোষণা করলেন, তিনি আর এদেশে থাকবেন না।
ফুফু কাজ করছিলেন একটা বেসরকারী প্রতিস্টানে। রাতারাতি সেই চাকরি ছেড়ে তিনি ক্যানাডায় সেবিকার একটা চাকরি যোগাড় করে ফেললেন। দেশে তখন এরশাদ বিরোধী আন্দলন তুঙ্গে। ১৯৮৯ সাল।

৫.

খুব দ্রুততার সাথে ফুফুর যাবার সব আয়োজন রেডী হয়ে গেল। আগামীকাল দুপুরে ফ্লাইট।
এখন রাত সাড়ে বারোটা।
বুলা আমার কাছে বিদায় নিতে এসেছে। ওর কিছু বলা উচিত; আমারও। কিন্তু কী আশ্চারয আমরা কেউ কোন কথা বলতে পারছিলাম না।
বুলার চোখে ছিল গাঢ় বিষাদের ছায়া। ওর মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। ওর চোখে টলটল করছিল পানি। আমারও বুকের ভেতরটা হু হু করছিল। যদিও আমার চোখে কোন পানি ছিল না। আসলে কান্না সহজে আমার আসেনা। কিন্তু বুলার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না।
আমি বুলার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। দীর্ঘক্ষণ!
বুলাও আমার দিকে।
যেন অনন্ত কালের দেখাদেখি দুজনের। চোখের পলক পড়লেই বুঝি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো। কেউ আর কাউকে কখনো দেখতে পাবনা! আমি আমার দুহাতের তালুতে বুলার মুখখানি তুলে ধরলাম মোনাজাতের মতো করে। বুলা চোখ বন্ধ করল। আর সাথে সাথে ওর দু গাল বেয়ে চমৎকার দুটি পানির ধারা নেমে গেলো। আমি বুলার মুখটা আমার বুকে চেপে ধরলাম। আর কী অবাক কাণ্ড আমার এই জীবনে কারো সামনে সর্ব প্রথম আমার চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো তপ্ত লোনা পানি।
আমার বুকের ভেতরটা কেমন খালি খালি লাগছিল।
আমি বাস্পরূদ্ধ কণ্ঠে বুলাকে প্রশ্ন করলাম-
বুলা, তুই কি আমাকে ভুলে যাবি?
বুলা কোন জবাব দিল না। সে ফুপিয়ে কেঁদে ফেলল। ওর কান্নায় আমার খুব কষ্ট হতে লাগল। ইতিমধ্যে আমার বুকের কাছটা ওর কান্নার পানিতে ভিজে গেছে।

বুলা আমার চেয়ে ৪/৫ বসরের ছোট। ওর সাথে আমার সম্পর্কটাকে ঠিক প্রেম বলা যাবে না। আবার প্রেমের চেয়েও কিছু কম না! যদিও ওকে নিয়ে আমার ভবিষ্যতের কোন প্ল্যান এখনও নেই। প্রেমে একটা প্ল্যান থাকে। আমার অবচেতন মন কী ওকে নিয়ে কোন প্ল্যান করেছে? আমি জানি না।
আমি যেটা বুঝি, বুলা আমার খুব কাছের কেউ। প্রগাঢ় ভালবাসার মানুষ। ওর হাতে হাত রেখে আমি সুখ দুখের কথা বলি, চোখে চোখ রেখে আমার চলার পথে সাহস খুঁজি, বুলা পাশে থাকলে যে কোন অসাধ্য সাধন করে ফেলতে দ্বিধা করিনা!
রাগ কোরে ওকে একবার একটা চড় মেরেছিলাম, তারপর ওকে শান্ত করতে গিয়ে আদর করে চুমু খেয়ে খুব লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলাম। বুলা দৌড়ে পালিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল সেদিন! এ সব মিলে কী প্রেম হয়! বুলা আর আমার সম্পর্কটা কী তবে প্রেম! আমি বুঝতে পারিনা। আমি বুলাকে জিজ্ঞাসা করলামঃ

- ক্যানাডা গিয়ে তুই কি আমাকে ভুলে যাবি?
অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে তারপর বুলা আমার চোখের পানি মুছে দিল। বললঃ
- তুমি বুঝতে পারো না?
আমি ধরা গলায় বললাম-
- না, বুঝতে পারিনা।
বুলা অবাক হল একটু। ওর চেহারায় অবাক হবার ছাপ ছিল। তারপর বললঃ
- পারভেজ ভাই, তুমি তো জানো, এ পৃথিবীতে পুরুষ মানুষের প্রতি আমার কোন উঁচু ধারণা নেই। ঘৃণা বোধ করি; এক রকম করুণাও হয়! শুধু তুমি ই একমাত্র পুরুষ যাকে আমি ব্যতিক্রম জানি। তোমার অজান্তেই তোমার তীব্র ভালবাসা আমাকে দিন দিন তোমার প্রতি চিরকালের মতো দুর্বল করে দিয়েছে। আমার অস্তিত্তের একটা বিশাল অংশ তুমি।
- বুলা তুই কি আমার কাছে ফিরে আসবি?
- আসব। আমি শুধু তোমার জন্য তোমার কাছে ফিরে আসবো।

আমি বুলার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। ঠিক সেই সময় ফযরের আজান দিল। সারাটা রাত কোথা দিয়ে চলে গেল আমরা তা কেউ টের পেলাম না।
“আরে! সকাল হয়ে গেল যে!” – ঠিক এই আসচারয বোধক বাক্যটি বলে বুলা প্রায় ছুটে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি অনেক্ষন ওর চলে যাওয়া পথটির দিকে চেয়ে রইলাম!

৬.

দুপুর।
বুলা আর মিনু ফুফুকে বিমান বন্দরে বিদায় জানাতে গেলাম। আমার সঙ্গে আমার ছোট বোন কেয়াও গেল। মিনু ফুফু আমাকে আর কেয়াকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। চুমু খেলেন। তারপর যান্ত্রিক গলায় বললেন,
- যা তোরা বাড়ি ফিরে যা।
বুলা মাটির দিকে তাকিয়ে ছিল। মুখ তুলে বলল- “ভাল থেকো।“
তারপর সে তার গত রাতের না ঘুমান দুটি টকটকে লাল চোখ দিয়ে তাকিয়ে রইল; সেই চোখে ভাষা ছিল। ওর চোখ যেন আমকে বলছেঃ “আমি আবার ফিরে আসব, তুমি দেখে নিও, ঠিক ই ফিরে আসব। আমাকে যে আসতেই হবে।“

ফুফু তাড়া দিলেন, যা তোরা বাড়ি ফিরে যা।দেরি করিস না। আমি কিংবা কেয়া কেউ এক চুলও নড়লাম না। তারপর অনেক ভেবে চিন্তে মনে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে মিনু ফুফুর কাছে প্রায় ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলামঃ
- তোমরা কবে ফিরে আসবে?
ফুফু কোন আবেগ দেখালেন না। নির্লিপ্ত গলায় বললেন
- না, আর ফিরে আসব না।
আমি প্রানপনে তাঁর ‘না’ শব্দটিকে ‘হ্যাঁ’ হিসেবে গ্রহন করতে চাইলাম; কিন্তু আমার তীব্র শ্রবন শক্তির কাছে শেষ পরযন্ত হেরে গেলাম।

৭.

বুলারা চলে গেছে অনেক দিন হল। আমি প্রতিদিন বুলার ফিরে আসবার প্রতীক্ষা করি। কারণ বুলা বলে গেছে- সে আসবে। আবার যখন মনে পড়ে যুদ্ধজয়ী অসিম সাহসী একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা, যিনি বলেছেন আর ফিরে আসবেন না। তখন আমি সত্যিই দ্বিধাদন্ধের দোলায় দুলতে থাকি।


** অভ্র ফন্টে লিখবার কারণে কিছু বানানের ভুল কিছুতেই শোধরানো গেল না। প্রিয় পাঠক, সে জন্য ক্ষমা চাইছি।