ভীষণ ক্লান্ত লাগছে । মাঝে মাঝে মনে হয় আর কত , কত দিনই ত হল এ পৃথিবীর বুক থেকে আলো হাওয়া নিয়ে বেঁচে থাকা ।চলে যাওয়াটা খুব কি কঠিন ? না ; কতোগুলো ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে নিলেই চলে ।এর থেকে শান্তির চলে যাওয়া আর নেই ।ফানের সাথে ওড়না ঝুলিয়ে বিদায় নেয়ার দৃশ্য বহুবার দেখেছি টিভি তে অথবা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়া ।খবরের কাগজ গুলোর কমন খবর গায়ে আগুন ধরিয়ে গৃহ বধূ হত্যা , স্বামী পলাতক। পৃথিবী কে বিদায় জানাতে এমন কিছু ও করা যায় ।কিন্তু না পৃথিবীর মায়া কিছুতেই ছাড়তে পাড়ি না । এভাবে হেরে যাওয়ার কি মানে হয় ?

আমার যেদিন জন্ম হল সেদিন কারো মুখেই হাসি ছিল না পরপর তিন মেয়ে , তাই আমাকে পৃথিবীতে আসার জন্য কেউ অভিনন্দন জানাইনি ।মার মুখে শুনেছি আব্বা নাকি শিশু সন্তান টিকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। এখনকার দিন হলে নিশ্চিত সেই ভ্রূণটির আর নারী হয়ে ওঠা হত না । আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান শিশু জন্মের আগেই জানিয়ে দেয় সে মেয়ে না ছেলে । তাই অনায়াসেই হত্যা করা যায় ভ্রূণটিকে । ভ্রূণ হত্যার দায়ে কারো ফাঁসি হয়েছে কিনা আমার জানা নাই।
খুব হাবিজাবি চিন্তা মাথাই আসছে । সৃষ্টিকর্তার উপর ভীষণ অভিমান হচ্ছে , সেই ভ্রূণটিকে যদি নারীই বানাবে তবে কেন ফর্সা বানালে না । পাত্র পক্ষের সামনে নিজেকে প্রদর্শিত করতে করতে আমি ক্লান্ত ।রঙ মেখে সং সাজার পক্ষে আমি কখনই ছিলাম না। টিভি তে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হয় সব সমস্যার সমাধানই ক্রিম ।সত্যিই কি ক্রিম দিয়ে সমস্যা মেটে ? কি জানি !

কত ধরনের পুরুষ যে আছে সেটা পাত্রপক্ষের সামনে ইন্তারভেউ দিতে যেয়ে বুঝেছি ।কারো আগ্রহ আমার শরীরের প্রতি আর কারো বা আমার চাকরির । আমার সত্ত্বাটার উপর কেন কারো আগ্রহ জন্মে না !

ছোট বেলায় দাদির কাছে রাজকুমারের গল্প শুনতাম আর স্বপ্ন দেখতাম আমি রাজকুমারী , কোন এক রাজকুমার পঙ্খীরাজ ঘোড়াই চড়ে আসবে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে তার রাজ্যে ; ভালোবাসার বন্ধনে করবে আবদ্ধ । কিন্তু আমার সে রাজকুমার আর আসেনা । চলতে পথে শুধুই রাক্ষস । রাক্ষসের হাত থেকে বাজতে ছুতে চলেছি ।শুধু ছুটছি আর ছুটছি কোথায় রাজকুমার ? রাজকুমার আমার স্বপ্নের রাজকুমার আসো আমাকে বাঁচাও ।

গল্পের রাক্ষসের ইয়া বড় নখ, শিং , দাঁত থাকে । বাস্তবের রাক্ষসেরা কি ভদ্র, কি সুন্দর তাদের বেশভূষা দেখলে বুঝা যাই না এরা রাজকুমার না রাক্ষস !

একদিন আমার সেই রাজকুমারের দেখা পেলাম।কি যে ভাললাগার ছিল প্রতিটি মুহূর্ত ! একটুখানি স্পর্শ এনে দিত স্বর্গ সুখ । মনে হতো প্রকৃতির সকল আয়োজন যেন শুধুই আমাদের দুজনের জন্য। ভালোলাগা আর ভালবাসাই ভেসে বেড়াতাম দুজন ।পৃথিবীর কাছে আর কিছুই চাওয়ার ছিল না তোমাকে ছাড়া ।

কিন্তু নারীর কপালে সুখ সইলো না । শুনেছি নারীরা নাকি মায়াবিনী হয় । কৈ আমি তো তোমাকে মায়াতে বাঁধতে পারিনি ।তুমি মধুকর হয়ে মধু নিয়ে চলে গেছো অন্য মধুর খোঁজে । তোমরা পুরুষেরা এক এক জন জাদুকর তোমাদের জাদুতে বশ কর নারীকে আর মধু নিয়ে চলে যাও অন্য নারীর খোঁজে । কে বেশি উত্তম বলতে পারো রাক্ষস না তুমি রাজকুমার ?
** ৮ মার্চ , নারী দিবস । সকল নারীর বেড়ে ওঠা কণ্টক মুক্ত হয় যেন ।