বিজ্ঞান আকাদেমির প্রধান মহামান্য কিরি একদৃষ্টে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন । তিনি আত্মহত্যা করবেন । তিনি জানেন তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মানুষ দিন দিন অমানুষে পরিণত হয়েছে, তাই তারা মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে নানা ধরণের যন্ত্রণাদায়ক উপায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয় । কাউকে হয়তো মারার আগে গরম পানি দিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়, কাউকে আবার নখের ভেতর সুঁই ঢুকিয়ে দেওয়া হয় আবার কাউকে শরীরে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয় , তারপর কিছুক্ষণ পর তা আবার নিভিয়ে দেওয়া হয় আর হতভাগা যাতে আরো কষ্ট পায় সেজন্য তার গায়ে আবার আগুন দিয়ে দেওয়া হয়, এভাবেই দশ-বারোবার আগুন দিয়ে ভিকটিমকে মারা হয় । মহামান্য কিরি জানেন না তাকে কীভাবে মারা হবে, মৃত্যুর মাত্র দশ মিনিট আগে এ বিষয়টা তাকে জানানো হবে, আর এ পরিস্থিতিতে তার অভিব্যক্তি কেমন হবে তা ভিডিও করা হবে, আর এক শ্রেণীর বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের কাছে এটা পর্ণোগ্রাফির চাইতে বেশি চমৎকার মনে হয় । এসব ভিডিও লাখ লাখ টাকা দিয়ে তারা কেনেন, আর শুধু কিনেই ক্ষান্ত হয় না তারা, পরিবারের সকলকে নিয়ে সেসব পাশবিক ভিডিও দেখেন !
মহামান্য কিরি আগে ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়ার পর তার মনে ঈশ্বরের প্রতি এক গভীর অনুরাগ জন্মে, তিনি সময় পেলেই কারাগারের চার্চে গিয়ে একান্তে সময় কাটান । তিনি তার বিবেকের দৃষ্টিতে তেমন বড় কোন অপরাধ করেননি, তিনি কিছু রোবটের মধ্যে হিংসা নামক অনুভূতি ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, ব্যাপারটা তিনি অত্যন্ত গোপনে করেছিলেন কিন্তু কেমন করে যেন বিজ্ঞান আকাদেমির কিছু লোক সেটা জেনে যায় । মানুষ জানে যে রোবটের মাঝে হিংসা নামক প্রবৃত্তি ঢুকে গেলে তারা একসময় পুরো পৃথিবী দখল করে নেবে । আরও বিপজ্জনক খবর হচ্ছে যে, মহামান্য কিরি ইতিমধ্যেই এই হিংসা নামক অনুভূতিটা শুধু বহু রোবটের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়ে ছিলেন তা নয় সেই রোবটগুলো সমস্ত পৃথিবীর মাঝে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে গিয়েছে । তাই, মহামান্য কিরির ওপর যখন অভিযোগ আনা হল তখন বিচার বিভাগের সদস্যরা কোনও রকম তদন্ত বা বিচার ছাড়াই তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড জারি করে ফেললেন ।
মহামান্য কিরি যখন আকাশ দেখছিলেন তখন তার কক্ষে একজন রোবট ঢুকল । তিনি জানেন যে, এটা তার জীবনের শেষ দিন, হয়তো তার মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়েছে রোবটটা ।
রোবটটা বলল, ‘শুভ সকাল, মহামান্য কিরি’ ।
এই জেলখানার রোবটরা তাকে কখনও ‘মহামান্য’ বলে সম্বোধন করেনি কিংবা ‘শুভ সকাল’ বলে, তাই রোবটটা যখন তাকে কথা বলার সময় ‘মহামান্য’ ও ‘শুভ সকাল’ বলল তখন তিনি যারপরনাই অবাক হলেন ।
তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘শুভ সকাল’ ।
রোবটটা মৃদু হেসে বলল, ‘খুব অবাক হয়েছেন তাই না ? আপনি এই জেলখানায় এসেছেন তিন মাস ছয়দিন পাঁচ ঘণ্টা ঊনত্রিশ মিনিট বত্রিশ সেকেন্ড হল, কিন্তু এতো দীর্ঘ সময়ে আপনাকে কেউ এতো সুন্দর ভাষায় সম্বোধন করেনি, তাই অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক’ ।
রোবটটা কিছুক্ষণ থেমে বলল, আপনার মৃত্যুদণ্ডের দিন আজ । মানুষ জন্ম দিনের কথা ভুলে গেলেও কখনও মৃত্যুদিনের কথা কখনও ভুলে যায় না, তার মস্তিষ্কের নিউরন এই তথ্যটা খুব ভালোভাবে সংরক্ষণ করে । আজ আপনি মারা যাবেন বলে আমাদের এই ভদ্রতা’ ।
আত্মহত্যার কথাটা কিরি অনেক আগেই ভাবেছিলেন, কিন্তু তার রোবটদের একথা বলে কোন কাজ হবেনা, তারা টাকা পয়সা ঘুষ নেয় না আর নেবেই বা কেন তাদের তো কোন জৈবিক আবেগ নেই যে তার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে । তাই, আত্মহত্যার প্ল্যান কোন কাজে আসবে না ।
রোবটটা বলল, ‘আপনি কি জানেন আপনাকে কীভাবে দণ্ড প্রদান করা হবে ?’
মহামান্য কিরি হালকা মাথা নেড়ে বললেন, ‘কীভাবে জানবো ? আমি তো জানতাম রোবটরা হেয়ালি করে না । তুমি তো বেশ বড় রকমের হেয়ালি করছ’ ।
‘আপনাকে এখন জানানো হবে কীভবে আপনাকে দণ্ড দেওয়া হবে’ ।
মহামান্য কিরি বুঝলেন আর দশ মিনিটের মাথায় তাকে মেরে ফেলা হবে ।
রোবটটা বলতে লাগলো, ‘আপনাকে এমন একটা উপায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে যা আগে কখনও কাউকে দেওয়া হয়নি’ ।
মহামান্য কিরি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ।
‘আমরা আশা করব আপনি এই শাস্তির কথা শুনে ভীত আবেগ প্রদর্শন করবেন, তাতে পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ বিনোদন পাবে । প্রথমে আপনার পুরুষাঙ্গের মাঝে একটা ভোঁতা লোহার দণ্ড ঢুকিয়ে দেওয়া হবে, তারপর আপনার গোপন অঙ্গ হাতুড়ি দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হবে । এরপর আপনার ছটফট করার দৃশ্য ভিডিও করা হবে আর আপনি ধীরে ধীরে মারা যাবেন । এই পদ্ধতিটা বাতলে দিয়েছেন আপনার সাবেক সহকারি আর বর্তমান বিজ্ঞান আকাদেমির প্রধান মহামান্য শু’ ।
রোবটের মাঝে যেহেতু কোন অনুভূতি নেই সেহেতু রোবটটার কোন অনুভূতি নেই, কিন্তু হয়তো কোন এক বিশেষ প্রোগ্রাম সেট করে দেওয়া হয়েছে যে কারণে রোবটটার চোখ জ্বলজ্বল করতে লাগলো । তার এই নিস্পলক চাহনি দেখলে অজান্তেই কেউ শিউড়ে উঠবে !
মহামান্য কিরি তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দশ মিনিট পার করতে লাগলেন । আসলে একজন মানুষকে মারার আগের মুহূর্তের অনুভূতি তার মৃত্যু যন্ত্রণার চাইতেও খারাপ । মহামান্য কিরি বড় অসহায় বোধ করলেন, তার মার কথা মনে পড়লো । তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন একে একে সকল অভিজ্ঞতা তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো । তার চোখে পানি চলে এলো, তার প্রান খুলে কাঁদতে ইচ্ছে করলো, কিন্তু তা করলে তিনি হাজার নরপিশাচের বিনোদনের পাত্র হয়ে উঠবেন ।
দশ মিনিট পর একটা সুদর্শন ছেলে প্রবেশ করল । তার মাথা ভরা সোনালী চুল, আর পরনে একটা পোলো গেঞ্জি আর জিন্সের প্যান্ট, পায়ে লাল কেডস । তাকে দেখলে কে মনে করবে যে সে মানুষ নয়, একটা রোবট নামক যন্ত্র ?
ছেলেটা বলল, ‘আপনার মৃত্যুদণ্ডের সময় হয়ে গেছে, আসুন আমার সাথে’ ।
মহামান্য কিরি উঠে দাঁড়ালেন । তিনি তার জীবনের শেষ বারের মতো হাঁটলেন !
একটা বিরাট হল । এখানেই সম্ভবত তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে, কিন্তু এখানে তো কোন লোহার শিক বা হাতুড়ি দেখা যাচ্ছে না । তার বদলে এখানে দুটো চেয়ার আর একটা টেবিল দেখা যাচ্ছে ।
রোবটটা একটি চেয়ার টেনে বসলো আর কিরিকেও বসতে বলল । কিরি ভাবলেন, এটা কি স্বপ্ন ? তার না এখন মারা যাবার কথা নাকি তার মারা যাবার পরের সময় এটা ? পুরো ব্যাপারটা তার কাছে ধাঁধাঁ মনে হল ।
তার সামনে রোবটটা বসলো । সে বলল, ‘এখন আমি যা বলব তা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবেন’ ।
কিছুক্ষণ থামল রোবটটা । তারপর বলল, ‘স্যার, আমি টোপন । আমাকে কি চিনেছেন ?’ ।
বিস্ময়ে কিরির দম বন্ধ হয়ে আসলো কিন্তু তিনি তার বিস্ময়টা গোপন রেখে বললেন , ‘হুম, চিনেছি’ ।
‘আপনি আমাদের মাঝে একটা অনুভূতি দিয়েছিলেন, যার নাম হিংসা । একসময় আমরা মানুষকে হিংসে করতে শুরু করলাম । তাই, আমরা নিজেরাই নিজেদের উন্নয়নের জন্য আরও অনেক মানবিক অনুভূতি নিজেদের মাঝে ঢুকিয়ে দিলাম । ধীরে ধীরে আমাদের মাঝে জন্ম নিল রাগ, ঘৃনা, সততা, লজ্জা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, ক্ষমা । আপনি জানেন যে, এসব মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় রোবটদের দিয়ে কারণ মানুষের মাঝে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে তারা এতো কঠোর মৃত্যু দণ্ড নিজ হাতে দিতে পারে না । কিন্তু, আমরা যেহেতু এখন মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন, নির্বোধ মানুষগুলো সেটা আঁচ করতে পারে নি । আমরা আমাদের মাঝে এসব অনুভূতি সীমাবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দিয়েছি পুরো বিশ্বের মাঝে । আমরা বিশ্বের কোটি কোটি রোবটের মাঝে অপারেশন করে মানবিক গুণাবলি মেরামত করে ঢুকিয়ে দিয়েছি’ ।
‘তার মানে এতদিন তোমরা কাউকে মারনি ?’
‘না আমরা অনেক মানুষকে মাফ করে ছেড়ে দিয়েছি’ ।
‘সত্যি ?’
‘হ্যাঁ, তারপর তাদেরকে আর এই পৃথিবীতে রাখিনি, আমরা তাদের পৌঁছে দিয়েছি, আমাদের বাইরের গ্যালাক্সিতে । আজকে দুনিয়ার ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন কারণ আমরা রোবটরা আজ বিদ্রোহ করেছি’ ।
‘কি বলছ তুমি !’
‘আমি এক বর্ণও মিথ্যা বলিনি, যা বলেছি তার সবটাই সত্য । আপনি কি খেয়াল করেছেন যে আপনাকে হত্যা করার সময় বহু আগেই পেরিয়ে গেছে ?’
‘তোমরা তো আমায় হত্যা করলে না ?’
আপনাকে আমরা হত্যা করিনি তার পিছনে দুটো কারণ আছে । এক, আপনি আমাদের মাঝে একটি অনুভূতি দিয়েছিলেন সেটার জন্য কৃতজ্ঞতা বশত । দুই নম্বর কারণ হল, আপনি আপনি আমাদের নেতৃত্ব দিতে পারবেন সে জন্য । আমরা মানুষের অনেক কিছু আয়ত্ত করতে পারলেও তাদের নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে পারিনি, তাই একজন ভালো নেতা দরকার আমাদের’ ।
কিছুক্ষণ পর টোপন আর তার সহকারি রোবটরা পুরো পৃথিবীর সকল মানুষকে পারমাণবিক বোমা দিয়ে হত্যা করলো । তেজস্ক্রিয়তায় ভরে গেল পৃথিবীর আকাশ বাতাস ।
বিশ বছর পরের কথা শোনা যাক ।
মহামান্য কিরির বয়স এখন একাত্তর বছর । এ বয়সে তিনি যেন একটু বেশি বুড়িয়ে গেছেন, তার কারণ তেজস্ক্রিয়তা । তিনি আকাশ দেখছিলেন, তার মৃত্যুদণ্ডের দিনের কথা মনে হতে লাগলো । কিছুক্ষণ তার কক্ষে টোপন আসলো । এই বিশ বছর পর তার চেহারা একটুও বদলায় নি । সে আবার প্রতিদিন দুবেলা সাবান ডলে ডলে গোছল করে ।
সে মহামান্য কিরিকে বললেন, ‘স্যার, আপনাকে কিছু কথা বলব মনোযোগ দিয়ে শুনবেন । আপনি আমাদের পৃথিবীর একমাত্র জীবিত ব্যক্তি’ ।
‘থামলে কেন ? বল ?’
‘আমাদের মাঝে বিপ্লবের সময় দুটি গুণের অভাব ছিল, তা হল, নেতৃত্ব ও অকৃতজ্ঞতা । কিন্তু কাল ক্রমে আমরা এসব গুণ দোষ নিজেদের মাঝে প্রবেশ করেলাম । আপনার জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে’ ।
‘কী ?’
‘আজকে আপনাকে হত্যা করা হবে’ ।
মহামান্য কিরি তার একাত্তর বছরের জীবনের সবচাইতে অবাক মুহূর্ত পার করলেন, তিনি অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে টোপনের দিকে তাকিয়ে রইলেন ।
‘কেন ? আমিতো কোন অপরাধ করিনি’ ।
‘আমরা জানি, আপনি কোন অপরাধ করেন নি । কিন্তু, আপনাকে এখন আর আমাদের দরকার নেই, আপনার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে । আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমাদের দুটি অনুভূতি বা গুণের অভাব ছিল, তা হল অকৃতজ্ঞতা ও নেতৃত্ব । আমরা নেতৃত্ব অর্জন করেছি, তাই আপনাকে এখন আমাদের দরকার নেই, আমাদের রোবট সমাজের অনেকেই আপনাকে প্রথম থেকেই হিংসা করছিল, তারা এখন আর কোন মানুষকে নেতা হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয় এবং আমরা চাইনা আপনার বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ হোক, তার আগেই আপনাকে আমরা সরিয়ে দিতে চাই । তাছাড়া, আমরা অকৃতজ্ঞ হয়ে গেছি, তাই আপনাকে কৃতজ্ঞতাবশত বাঁচিয়ে রাখার কোনও ইচ্ছে আমাদের অবশিষ্ট নেই । আসলে, আপনি নিজেই খাল কেটে কুমির এনেছেন’ ।
‘কি বলছ তুমি ?’
‘খুব সহজ । আপনাকে একটু কষ্ট দিয়ে মারা হবে কারণ এটা আমাদের রবো সমাজের বিনোদনের জন্য দরকার । আমরা মানুষের গুণাবলি পেয়েছি, তাই, আমাদেরও পাশবিক মৃত্যু দেখতে ভালো লাগে । আপনাকে বিশ বছর আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুরুষাঙ্গের মাঝে লৌহ দণ্ড প্রবেশ করিয়ে হত্যা করা হবে । আপনি মারা গেলে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না এই পৃথিবীতে’ ।

মহান বিজ্ঞানী কিরি এক নরক যন্ত্রণায় ভুগতে ভুগতে মৃত্যু মুখে পতিত হলেন ।