লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ৭৯টি

সমন্বিত স্কোর

৩.২৯

বিচারক স্কোরঃ ১.৫৬ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৭৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাংলার রূপ (এপ্রিল ২০১৪)

জিম বাবু
বাংলার রূপ

সংখ্যা

মোট ভোট ২৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.২৯

জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

comment ১৪  favorite ০  import_contacts ১,৫৪৯


আমি বাইরে যাব-------
আমি বাইরে যাব------
আমি বাইরে যাব------ আমি ঘরে থাকব না , আমি ঘরে থাকব না , আমি বাইরে যাব ------ এই ভাবে অনবরত কান্না আর চেঁচামেচি চৈতি হাওয়ায় ভেসে আসছে । পুরান ঢাকার আগামাসি লেনের একটি বাসা থেকে । প্রায় ঘণ্টা
দুয়েক যাবত মহা হুলস্থূল চলছে বাসার ভিতরে । প্রচুর খেলনা রুমের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । এর কোনটা ভাল আর কোনটা সদ্য ভাঙা চোরা । শিশুটির মা কিংকর্তব্যবিমুঢ় ! কখনও শিশুটিকে আদর করছেন আবার সাথে সাথেই ধমক দিচ্ছেন । কোন ভাবেই তার কান্না থামাতে পারছেন না । কখনও বা তিনি নিজেই কান্না করছেন । রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে, অনুশোচনায় তিনি পাগল প্রায় । কখনও নিজের মাথার চুল নিজেই ছিঁড়তে চাইছেন । কখনও বা প্রাণ
প্রিয় সন্তানকে গভীর স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরছেন । এই ভাবে দীর্ঘ ক্ষণ ধরে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ক্লান্ত, অবসন্ন শিশুটি গভীর নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ে । আর পুরো বাসা জুড়ে নেমে আসে রাজ্যের নীরবতা !

এই শিশুটির নাম জিম । বয়স প্রায় তিন বছর । সুন্দর ফুটফুটে চেহারা । ভারী মিষ্টি ।খুব সুন্দর করে হাসে । তুলতুলে গাল। আধো আধো বোলে বেশ পাকামোও করে । প্রতিবেশিরা সকলেই জিমকে পছন্দ করে । সবাই আদর করে ডাকে জিম বাবু বলে । বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান । নয়নের মণি । জিমের মা মরিয়ম বেগম । গৃহিণী । লেখাপড়া জানা শিক্ষিত ভদ্র মহিলা । ইডেন কলেজ থেকে অনার্স মাস্টার্স পাস করেছেন । অর্থনীতিতে । বিয়ের আগে একটি স্কুলে
শিক্ষকতা করতেন । এমনকি বিয়ের পরও কিছুদিন করেছেন । কিন্তু জিম পেটে আসার পর জিমের বাবা উনাকে আর চাকুরি করতে দেন্ নি । সেই থেকে তিনি পুর দস্তুর গৃহিণী । জিমের বাবা কফিল উদ্দিন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে মাস্টার্স । অত্যন্ত মেধাবি মুখ । পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ।
নিয়মিত কবিতা লিখতেন । আবৃত্তি করতেন । এখনও অসংখ্য পুরস্কার আলমারিতে শোভা পাচ্ছে । বর্তমানে তিনি একটি
মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করেন । হাই সেলারি পান । অনেকটা ইচ্ছে করেই সরকারি চাকুরি নেননি । এখন অনেকেরই ধারনা সরকারি চাকুরি করে আর সংসার চালানো সম্ভব না । আগের দিন আর নেই । টানা হেঁচড়া লেগেই থাকবে ।
কফিল উদ্দিন সাহেবের বাসা সাত তলা ভবনের ছয় তলা । তিন ফুট গলির ভিতরে । মেইন রোড থেকে বেশ ভিতরে ।
বাসায় কোন লিফট নেই । পায়ে হেঁটেই ছয় তলা থেকে নামতে হয়; আবার পায়ে হেঁটেই উঠতে হয় । কোন দিন দু এক বার বেশি উঠানামা হলেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা । বাসার ছাদে রেলিং নেই । নিচের দিকে তাকালেই ভয় ভয় লাগে । মনে হয়
এই বুঝি পড়ে গেলাম ! মরিয়ম বেগম সহজে ছাদে উঠতে চান না । শুধু জিমের কান্না থামানোর জন্য মাঝে মাঝে না উঠে
পারেন না । কাপড় চোপড় শুঁকাতে অনেক কষ্ট করতে হয় । বাসার ভিতরেই এতোটুকুন বারান্দার গ্রিলে নিদারুণ কষ্ট করে, এক কাপড়ের উপর আরেক কাপড় দিয়ে কোনোরকমে টানিয়ে রাখেন । বারান্দাও আবার উত্তর দিকে । সারা দিনেও এক মুঠো বাতাসের দেখা মেলে না । কখনও গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে আবার কখনও ফ্যান ছেড়ে দিয়ে ভেজা কাপড়ের উষ্ণতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন । তার উপর গ্যাস আর বিদ্যুতেরও যাচ্ছেতাই অবস্থা । কখন আসল আর কখন গেল অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না ।
মরিয়ম বেগম শান্ত শিষ্ট ভদ্র মহিলা । চুপচাপ থাকতেই তিনি বেশি পছন্দ করেন । ইদানিং তিনি মহা সমস্যায় দিন পাড়
করছেন । স্বামীর সাথে তাঁর মিষ্টি মধুর ভালোবাসার সম্পর্ক । অবশ্য ঝগড়া করার সুযোগও নেই । বেচারা সাত সকালে
অফিসের উদ্দেশ্য বের হয় আবার ফিরতে ফিরতে রাত সাত আটটা । মাঝে মাঝে নয়টা দশটা । উনার অফিস মতিঝিলে ।
গুলিস্থান ক্রস করে যাওয়ার কারণে সব সময় যান জটে ভুগতে হয় । বাসায় এসে ছেলে বউয়ের সাথে সোহাগ করার খুব একটা সময় তিনি পান না । শুধু সপ্তাহে এক দিন ; সেই শুক্রবার ।বাজার ঘাট, গোসল, নামাজ করতে করতেই দিন পার । অতঃপর রেগুলার একটি ডিউটি আছে । ছেলে জিম আর বউকে নিয়ে বিকেলটা কোথাও বেরিয়ে আসা । এই যেটুকু সময়
জিম বাইরে থাকে ; ততটুকু সময় সে খুব ভাল থাকে । কোন ধরনের সমস্যা করে না । লক্ষ্মী ছেলে । আর জিমকে নিয়েই মরিয়ম বেগমের যত সমস্যা ।
সে একদণ্ডও ঘরে থাকতে চায় না । সারা দিনই এক কথা বাইরে যাব, বাইরে যাব । কান্নাকাটি, চিল্লাচিল্লি, ভাংচুর । ছয়
তলা থেকে কয় বার বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় । এক দোতলা হলেও একটা কথা ছিল । আর বাইরে নিয়ে যাবেই বা কোথায় ? তিন ফিট চওড়া রাস্তা । রাস্তা তো নয় গলি । বলা চলে কানা গলি বা অন্ধ গলি । দু পাশে উঁচু উঁচু ভবনের
সারি । এতো টুকু আলো বাতাস প্রবেশের সুযোগ নেই । নেই কোন গাছ গাছালি । একটু দূরে মেইন রোডের অবস্থা আরও
খারাপ । রিকশা, অটো, সি এন জি, আবার কখনও কখনও বাস, ট্রাক । জ্যাম, হর্ন আর কালো ধোঁয়া । যে কোন সময়
যে কোন কিছু ঘটে যেতে পারে ! আশে পাশে কোন খেলার মাঠ নেই, নেই কোন ফাঁকা জায়গা । অবশ্য কয়েকটি স্কুল আছে ; কিন্তু স্কুল সংলগ্ন কোন মাঠ নেই । এ যেন ডিজিটাল ব্যবস্থা ! দু একটি মসজিদও এলাকায় আছে, কিন্তু স্কুলের
মতই একই অবস্থা । একটুও ফাঁকা জায়গা নেই । তিনি ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাবেন ? নিকটে কোন আত্নীয় স্বজনের বাসা
নেই । আর বাসায় গেলেও তো জিমের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না । হয়ত কিছুক্ষণের জন্য ভালো থাকে । একটু পরেই আবার সেই একই কান্না, আমি বাইরে যাব
আমি ঘরে থাকব না
আমি বাইরে যাব ------ ! কিছুদিন যাবত মরিয়ম বেগমের শরীরটাও নেই । আর মানসিক
অবস্থা তো আরও খারাপ । জিমের কষ্ট তিনি বুঝেন । আর সেই বুঝাটাই তাঁর জন্য আরও কষ্টের । এই অবস্থায় কী করতে পারেন তিনি ? কী করার আছে তাঁর ? তিনি চেয়ে ছেলের কান্না শুনছেন ; কিন্তু কোন কিছুই করতে পারছেন না !

এখন বাজে দুপুর সাড়ে বারটা । মরিয়ম বেগম রান্নার আয়োজনে ব্যাস্ত । তিনি খুব তাড়াহুড়া করছেন । জিম কখন ঘুম
থেকে উঠে পড়ে এই ভয়ে । উঠে পড়লে আর রক্ষে থাকবে না । আজ বৃহস্পতিবার । জিমের বাবাও অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবেন । জিম অঘোরে ঘুমাচ্ছে । রান্না শেষ করে মরিয়ম বেগম গোসল করবেন । অতঃপর বসবেন ড্রেসিং
টেবিলের সামনে । ইচ্ছে মতো সাজাবেন নিজেকে । লম্বা চুলে বেনুনি করবেন । আই ভ্রুতে কাজল দিবেন । ঠোঁটে হালকা
মেরুন রঙের লিপস্টিক । গত সপ্তাহে বিবাহ বার্ষিকীতে কফিল উদ্দিন সাহেব যে শাড়িটা তাকে গিফট দিয়েছেন; সেই শাড়ীটা
পরবেন । আর এই সব কিছুই স্বামীর জন্য । স্বামীকে তিনি প্রাণাধিক ভালবাসেন । এই যুগে এমন নিখাদ ভালোবাসা খুব
কমই দেখা যায় । কফিল উদ্দিন সাহেবও কম যান না । তিনি খালি হাতে কখনও বাসায় আসেন না । প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য
কিছু না কিছু নিয়েই তবে বাসায় ফিরেন । স্বামীর কথা মনে হতেই মরিয়ম বেগমের শরীর মন এক সাথে কথা বলে
উঠল । তিনি মনে মনে ভাবলেন, আচ্ছা এমন হল কেন ? এরই নাম কী তবে ভালোবাসা ! একটা সুখের আবেশ মুহূর্তে
ছড়িয়ে পড়ল তাঁর সারা দেহ মন জুড়ে ।
মরিয়ম বেগম তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে বাথ রুমে ঢুকলেন । বিশাল বাথ । চারপাশের দেয়ালে নানা বর্ণের কার্টুন । জিমের জন্যই এই স্পেশাল ব্যবস্থা । জিম সহজে গোসল করতে চায় না । কিন্তু একবার বাথ ট্যাবে নামার পর আর সহজে উঠতেও চায় না । তখন খেলার নেশায় পেয়ে যায় । সর্দি কাশির পরওয়া তার নেই । মরিয়ম বেগম বেশ আয়েশ করে গোসল সারলেন । জিম এখনও ঘুমাচ্ছে । যে কোন সময় উঠে পড়তে পারে । আজ জিমকে গোসল দেওয়া হয়নি ।অবশ্য ঘুম ভাঙলেই দেওয়া হবে । কলিং বেলের শব্দ শোনা গেল । মরিয়ম বেগম আস্তে করে দরজার ফাঁক গলিয়ে দেখেন ময়লা নিতে আসা ছেলেটি ।। এই ছেলেটি খুব ভাল । প্রতিদিনই জিজ্ঞেস করে, ম্যাডাম কিছু আনতে হবে ? ছেলেটির নাম অন্তু । বেশ মিষ্টি চেহারা ।পরিষ্কার শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে । এই বয়সে স্কুলে পড়ার কথা ! কেন জানি ছেলেটির প্রতি মরিয়ম বেগমের খুব মায়া হয় । প্রতিদিনের দিনের মত আজও অন্তু জিজ্ঞেস করল,
কিছু আনতে হবে ম্যাডাম ?
না । কিছু আনতে হবে না । তোমাকে আজ এত শুকনা লাগছে কেন ? কিছু খাওনি ?
অন্তু কিছু জবাব দিল না । মাথা নিচু করে রইল । মরিয়ম বেগম যা বুঝার বুঝে নিলেন । বললেন, ভিতরে আস । কিছু
একটা খেয়ে যাও ।
অন্তু না সূচক মাথা নাড়ল । মুখে বলল, আজ খাব না ম্যাডাম । এখনও অনেক বাসার ময়লা আনা বাকি ।
না খেয়ে কতক্ষণ কাজ করবে ?
সে আমি পারব । এসব আমার অভ্যাস আছে ম্যাডাম । জিম কোথায় ? ওকে দেখছি না যে ?
জিম ঘুমাচ্ছে । দুপুরে বাইরে যাওয়ার জন্য অনেক কান্নাকাটি করেছে । ওকে নিয়ে আর পারি না অন্তু !
ওর কী দোষ বলেন ম্যাডাম ? চার দেয়ালের ভিতর কতক্ষণ বন্দি থাকা যায় ? ঘরের ভিতর কতক্ষণ খেলা যায় ? ঘর কী খেলার জায়গা ? এই যে আমি সারাদিন বাইরে বাইরে থাকি তবু আমার কাছে নিজেকে বন্দি বন্দি লাগে !
অন্তুর কথার গভীরতায় মরিয়ম বেগম থ মেরে গেলেন । অন্তুকে তাঁর নিজের সন্তানের মত মনে হয় । তাঁর মাতৃ হৃদয় অন্তুর জন্য কেঁদে উঠে । তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে অন্তুর দিকে তাকিয়ে রইলেন । আর অন্তু বেশি কথা বলে ফেলেছে এই
ভয়ে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল । অবশেষে মরিয়ম বেগমকে কোন কথা না বলতে দেখে আস্তে আস্তে শুধু বলল,
আমি যাই ম্যাডাম ------ ।
মরিয়ম বেগম খাওয়ার জন্য জবরদস্তি করলেন না । সম্মতি সূচক মাথা নাড়লেন । অন্তু ময়লার ঝুড়ি হাতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো । তাঁর পায়ের একেকটা আওয়াজ মরিয়ম বেগমের বুকে ধপ ধপ করে বাজতে লাগলো । অনেক ক্ষণ তিনি
ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন । আচ্ছন্ন মন । কিছু ক্ষণ পড়ে কায় মনে নামাজ পড়লেন । খেতে বসলেন । খেতে ইচ্ছে করল না ।
অন্তুর শুকনো মুখ চোখের তারায় ভাসতে লাগলো । একটি বই হাতে নিয়ে জিমের পাশে শুয়ে পড়লেন । পরম মমতায় জিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন । একটু পরে আড় মোড়া ভেঙে জেগে উঠল জিম । দু এক বার এদিক সেদিক
তাকিয়ে চিতকার করে উঠল, আমি বাইরে যাব, আমি বাইরে যাব ----------।
মরিয়ম বেগম বললেন, ঠিক আছে । এখন গোসল করে খাওয়া দাওয়া কর । একটু পরে তোমার বাবা আসবে । তারপর
আমরা সকলেই বাইরে বেড়াতে যাব ।
জিম কিছুই শুনতে চাইল না । শুধু বলল, না আমি এখনই বাইরে যাব । এখনই বাইরে যাব ।
মরিয়ম বেগম, জোর করেই জিমকে নিয়ে বাথ রুমে ঢুকলেন । জিম না না করতে লাগলো । আমি গোছল করব না । আমি গোছল করব না । এই মুহূর্তে কোথা থেকে একটি টিকটিকি ডেকে উঠল । মরিয়ম বেগম কোন কথা শুনলেন না ।
ঝরনা ছেড়ে দিলেন । জিমও মেতে উঠল গোসল গোসল খেলায় । মাকে ভিজিয়ে দিতে লাগলো । দেয়ালের টম ও জেরীকে
ভিজিয়ে দিল । ওরা কিছু বলল না । জিম এক মনে জল কেলি করছে । কিছুক্ষণ পরে মরিয়ম বেগম এক প্রকার জোর করেই জিমকে বাথ রুম থেকে বের করলেন ।

কফিল উদ্দিন সাহেব খুব প্রফুল্ল মনে বাসায় ফিরছেন । আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভাঙলেন । একবার উনার ব্যাক পেইন হয়েছিল ।
আজও সে কথা মনে পড়লে ভয়ে গা ছমছম করে । কী কষ্ট ! ডাক্তার বিভিন্ন টেস্ট দিলেন । কোন সমস্যা ধরা পড়ল না । তাহলে কী হল ! ডাক্তার বললেন, নানা কারণে হতে পারে । পেইন কিলার খেতে থাকেন । কয়েক দিন বিশ্রাম নেন ।
গরম পানির সেক দেন । ঠিক হয়ে যাবে । অবশেষে ঠিক হয়ে গেল ; তবে সেটি বাড়িওয়ালার ছেলে শিহাব সাহেবের কল্যাণে । শিহাব সাহেব একটি নরমাল ব্যায়াম শিখিয়ে দিলেন । দুই হাত নির্দিষ্ট নিয়মে উপর -নিচ করা । ভোজ বাজির
মত ফল পাওয়া গেল । কফিল উদ্দিন সাহেব সুস্থ হয়ে উঠলেন । সেই থেকে তিনি খুব সাবধানে চলা ফেরা করেন ।

বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়েই জিমের কান্না শুনতে পেলেন । মহা হুলস্থূল চলছে । মনটা খারাপ হয়ে গেল । কলিং বেল টিপলেন । বাজল না । তারমানে বিদ্যুত নেই । কাঠের দরজায় টুকটুক শব্দ করলেন । মরিয়ম বেগম হন্ত দন্ত হয়ে দরজা
খুলে দিলেন । মন ভালো নেই । তবু স্বামীকে দেখে হাসার চেষ্টা করলেন । চোখে চোখে কিছু একটা হল । একটি খুশির
ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল সারা মুখে । কফিল উদ্দিন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কখন থেকে কান্না কাটি চলছে ?
বেশিক্ষণ হয়নি । ঘুমিয়ে ছিল । ঘুম থেকে উঠেই শুরু করল ।
তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও । চল ওকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি ।
কোথায় যাবে ?
আর ------কোথায়; শিশু পার্ক ।
জিম বাবাকে দেখে কান্নার গতিবেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে । সেই সাথে সমানে চেঁচাচ্ছে , আমি বাইরে যাব বাবা ----
আমি বাইরে যাব বাবা ----- । কফিল উদ্দিন সাহেব জিমকে কোলে তুলে নিলেন । আলতো করে কচি গালে চুমো দিলেন । জিম এসবে কান্না থামাচ্ছে না । ওর শুধু এক কথা, বাইরে যাব বাবা । নন স্টপ বলে যাচ্ছে । কফিল উদ্দিন সাহেব
বললেন, ঠিক আছে বাবা । আমরা এখনই বাইরে যাব । তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও ।
আমি রেডি ---- সাথে সাথে বলে দিল জিম । মরিয়ম বেগম হা হা হা করে হেসে উঠলেন । কফিল উদ্দিন সাহেব প্যান্টের পকেট থেকে কিছু একটা বের করে মরিয়ম বেগমের হাতে দিলেন । জিম ওটা নিতে চাইল । কফিল উদ্দিন সাহেব
বললেন, ওটা নেয় না বাবা । ওটা বড়দের ।
জিম বলল, আমিও বড় ---- ।
ঠিক আছে; তুমিও বড় । তোমার জন্য একটি মজা এনেছি । এই বলে অন্য পকেট থেকে একটি চকলেটবার বের করে জিমের হাতে দিলেন । জিমের কান্না থেমে গেল । সে এখন খুশিতে লাফাচ্ছে । মরিয়ম বেগম ইতোমধ্যে ডাইনিং টেবিলে খাবার দিয়েছেন । স্বামীকে আদুরে গলায় ডাকলেন, বাপ ব্যাটা খেতে আসুন ।
আমি এখন খাব না মণি । কফিল সাহেব স্ত্রীকে আদর করে মণি নামে ডাকেন ।
খাবে না কেন ?
আজ খেয়ে এসেছি ; একটি পার্টি মিটিং ছিল । তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও ।
আমি রেডি । চলো বেরিয়ে পড়া যাক ।
চলো চলো ------ ।

এখন সাড়ে পাঁচটা বাজে ।আগামাসি লেন থেকে রিকশা নিলেন । অটো রিকশা । প্যাডেল চালাতে হয় না । শিশু পার্ক । ভাড়া ৬০ টাকা । এই কয়েক বছর আগেও ২০-২৫ টাকায় যাওয়া যেত । এখন রিকশাওয়ালারা ওই দিকে যেতেই চায় না । যানজটের ভয়ে । মরিয়ম বেগমও সিএন জি তে চড়তে চান না । বোরিং লাগে । তারচেয়ে রিকশা অনেক খোলামেলা । জিম হরিণ শাবকের মত উল্লাস প্রকাশ করছে । এদিক ওদিক থাকাচ্ছে । নানা প্রশ্ন করছে । কফিল সাহেব বললেন,
একটি সুখবর আছে ।
কী ?
দু দিনের ছুটি নিয়েছি । আগামীকাল তোমাদের নিয়ে লং টুরে যাব ।
কোথায় ?
বলতো কোথায় হতে পারে ? কফিল সাহেব একটু রহস্য করতে চাইলেন ।
কোথায় আবার মোল্লার দৌড় তো মসজিদ পর্যন্তই ! বললেন মরিয়ম বেগম ।
তার মানে ?
মানে হল, আমার শুশুর বাড়ি, জিমের দাদুর বাড়ি আর তোমার বাপের বাড়ি ! কী ঠিক হয়নি ?
কফিল উদ্দিন সাহেব হা হা হা করে হেসে উঠলেন । বললেন, এই না হলে আমার বউ । দুর্দান্ত আই কিউ !
এতে আই কিউর কী আছে ?
জিম জিজ্ঞেস করে বসল, বাবা আই কিঊ কী ?
সে তুমি বুঝবে না বাবা ।
জিম আবার জিজ্ঞেস করল, মাম্মা, আই কিউ কী ?
বুদ্যাংক ।
সেটা কী মাম্মা ?
মরিয়ম বেগম বললেন, আই কিউ হল, মানসিক বয়স ।
মান--সিক বয়স কী ?
মহাবিপদে পড়লেন মরিয়ম বেগম । কফিল উদ্দিন সাহেব হাসতে লাগলেন । বললেন, ছাত্র খুব মেধাবী । এবার টিচারের বারটা বাজবে । কি বলেন ম্যাডাম ?
মরিয়ম বেগম কৃত্তিম রাগ করে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা । এই বলে জিমকে বললেন, তোমার বাবা তোমার সব প্রশ্নের জবাব দিতে জানে । বাবাকে জিজ্ঞেস কর জিম ।
জিম সাথে সাথে জিজ্ঞেস করল, বাবা সেটা কী ?
কোনটা বাবা ?
এই যে মাম্মা বলল !
সেটা শিশু পার্কে গেলেই দেখতে পাবে বাবা । অনেক সুন্দর আর বড় । স্বামীর কথায় মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগলেন মরিয়ম বেগম । জিম আর কোন প্রশ্ন করল না । রিকশা এতক্ষণ ভালই চলছিল । এখন জ্যামে পড়েছে । ফুলবাড়িয়া মার্কেটের একটু আগে । জিম অস্থির হয়ে উঠেছে । রিকশা থেকে বার বার নেমে যেতে চাইছে । আশে পাশের গাড়ি গুলোকে
ছোট ছোট বকা দিচ্ছে । জিম ইতিমধ্যে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে । সবার চাওয়া চাওয়িতে জিমের মন
কিছুটা ভাল হয়েছে । সে এখন আনমনে একটি গান ধরেছে -------- আমি তো বড় হব
বাবার মত বড় হব
বাবার মত মুচ হবে
বাবার মত দাঁড়ি হবে
আমি তো বড় হব --------- !!
রিকশাওয়ালা একমনে জিমের গান শুনছে । গানটি তারও খুব পছন্দ হয়েছে । সাথে সাথে গুন গুন করে গাইতে শুরু করে দিল, আমি তো বড় হব ----- বাবার মত বড় হব -------- ।

জিম ক্ষেপে উঠেছে , বাবা আমার গান রিকশাওয়ালা বলে কেন ?
তোমার গান যে, ওর খুব পছন্দ হয়েছে তাই ।
কেন পছন্দ হবে ?
না, ও বলতে পারবে না ।
ঠিক আছে ও আর বলবে না । কফিল উদ্দিন সাহেব ইশারায় রিকশাওয়ালাকে বলতে নিষেধ করলেন । সে চুপ করে গেল ।
জ্যাম এখনও ছাড়েনি । মরিয়ম বেগম রিকশা ছেড়ে হেঁটে যাওয়ার পক্ষে । জিমও । কফিল উদ্দিন সাহেব আর একটু অপেক্ষা করতে চান । একটি ট্রাক রাস্তার মাঝ খানে ঘুরানোর চেষ্টা করছে । ট্রাফিক পুলিশের চেষ্টার অন্ত্য নেই । তবু কিছু কাজ হচ্ছে না । তাঁরা রিকশা থেকে নেমে পড়লেন । ৫০ টাকার একটি নতুন নোট রিকশাওয়ালার দিকে বাড়িয়ে দিলেন । সে বলল, স্যার ৬০ ট্যাকা দেন । আমি তো কন দোষ করি নাই । আমি তো যাইতেই চাই ।
কফিল সাহেব কথা বাড়ালেন না । পকেট থেকে আরও দশ টাকার একটি নোট বের করে দিলেন । নোট ময়লা ও আংশিক
ছেঁড়া । সাথে সাথে রিকশাওয়ালা বলল, স্যার এইডা বদলাইয়্যা দেন । এইবার কফিল উদ্দিন সাহেবের রাগ উঠল । তিনি
বেশ কর্কশ গলায় বললেন, তোমাকে যে ১০টাকা দিয়েছি সেটাই তো বেশি ।
রিকশাওয়ালাও সাথে রেগে উঠে বলল, ভিক্ষা দিছেন নাকি আমারে ?
কিছুক্ষণ আগের হাসি খুশি ভাবটি আর নেই ।পুরো পরিবেশ এখন থমথমে । আশেপাশের লোকজন তাকিয়ে আছে । লজ্জার
ব্যাপার । কফিল উদ্দিন সাহেব এক মুহূর্তের জন্য কী যেন ভাবলেন । তারপর পকেট থেকে আরেকটি নোট বের করে রিকশাওয়ালার হাতে দিতে দিতে আস্তে আস্তে বললেন,
এই নাও; ভিক্ষাই দিলাম !
মরিয়ম বেগম স্বামীকে চুপ থাকতে বললেন । রিকশাওয়ালাও আর কথা বাড়াল না । কফিল উদ্দিন সাহেব জিমকে কোলে নিয়ে রিকশা থেকে নেমে পড়লেন । কোনমতে রাস্তা পাড় হয়ে ফুটপাতে পৌঁছলেন । হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন । যেন কোন বন্দি
এই মাত্র কারাগার থেকে বেরিয়ে এলেন । জিম কোলে থাকতে চাচ্ছে না । নেমে পড়তে চায় । স্বাধীন ভাবে হাঁটতে চায় ।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর আবার রিকশা নিলেন । কিন্তু ভাগ্য দেবী আজ মোটেই সুপ্রসন্ন মনে হচ্ছে না । শিক্ষা ভবনের পেছেনের
রাস্তায় আবার জ্যামে পড়লেন । পাশেই জাতীয় ঈদগাহ । পুরো মাঠ জুড়ে সবুজ ঘাসের বিছানা । খুব সুন্দর লাগছিল দেখতে । কয়েকটি গাছে দু একটি পাখিও দেখা গেল । কিছুক্ষণ পর নিয়ন বাতি গুলো এক সাথে সব জ্বলে উঠল । নয়নাভিরাম দৃশ্য ! সূর্য্যি মামা অস্ত যাচ্ছে । পরিষ্কার আকাশ । দু এক জায়গায় সাদা মেঘের ভেলা । কফিল উদ্দিন সাহেব
স্ত্রীকে বললেন, মণি, কাল সকালে উঠতে হবে । সকাল ৭ টায় ট্রেন । এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস ।
টিকেট কাটতে হবে না ? মরিয়ম বেগম জিজ্ঞেস করলেন ।
সে আমি কেটে রেখেছি ।
সে আমি জানি ।
কিভাবে জানলে ?
আরও কিছু জানি ----- মরিয়ম বেগম রহস্য করলেন !
আর কি জানো ?
আজ সারারাত তোমার ঘুম হবে না --!বলেই ফিক করে হেসে ঊঠলেন । কফিল উদ্দিন সাহেবও সেই হাসিতে যোগ দিলেন।

ইতোমধ্যে রিকশা শিশু পার্কের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে । জিমের চোখে শিশু পার্কের উঁচু উঁচু রাইড গুলো ভাসছে । ওর আর তর সইছে না। রিকশা থেকে একাই নেমে পড়তে চাইছে । কফিল উদ্দিন সাহেবের মাথা নষ্ট । টিকেটের জন্য লম্বা লাইন । নারী পুরুষের জন্য আলাদা । দুটো লাইনই প্রায় সমান লম্বা । নারীদেরটা একটু বেশি । এই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটলে কতক্ষণ লাগবে সে কেবল আল্লাহ তায়ালাই জানেন । তবে বিকল্প কিছু করারও নেই । স্বামী স্ত্রী দুই জন দুই লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন । যেই লাইনে আগে হয় !এ যেন অঘোষিত প্রতিযোগিতা । দেখা যাক এই লড়াইয়ে কে হারে আর কে জিতে । জিম ছুটাছুটি করছে । অনেকটা মুক্ত বিহঙ্গের মত । কিছুক্ষণ পর পর জিম মায়ের হাত ধরে টানাটানি করছে আর বলছে, আসো ----আসো --- আমি ওইটাতে উঠব ---- ।
টিকেট লাগবে যে বাবা । একটু দাঁড়াও ।
না, টিকেট লাগবে না । সবাই তো উঠছে । আমিও উঠব ---- ।
অবুঝ শিশু । তাকে এই কথা বুঝানো কঠিন । তাই মরিয়ম বেগম বললেন, ঠিক আছে তোমার বাবাকে নিয়ে যাও । জিম
বাবার কাছে ছুটল । পেছন থেকে কে যেন মরিয়ম বেগমকে সালাম দিল ।
ম্যাডাম, আসসালামু আলাইকুম ---- । ওয়ালাইকুম বলতে বলতে মরিয়ম বেগম ডানে ঘুরলেন । চমকে উঠলেন । মাথা নিচু করে অন্তু দাঁড়িয়ে আছে ।
আরে অন্তু যে ! তুমি কখন এলে ?
কয়েক মিনিট হয়েছে । জিম কোথায় ?
ঐ লাইনে । ওর বাবার কাছে ।
অন্তু জিমের কাছে চলে গেল । মরিয়ম বেগমের চোখ দুটি কেন যেন খুশিতে ভিজে উঠল । অন্তুকে পেয়ে জিমও মহাখুশি । মরিয়ম বেগম কাউন্টারের কাছে প্রায় কাছাকছি চলে এসেছেন । স্বামীকে দুই আঙুল তুলে বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন । কফিল উদ্দি সাহেব মুচকি হাসলেন । মরিয়ম বেগম টিকেট নিলেন । একটি বেশি । অন্তুর জন্য । এই একটি টিকেট বেশি কিনে তিনি অন্তরে অনেক প্রশান্তি অনুভব করলেন । তাঁর চিরন্তন মাতৃ হৃদয় জেগে উঠল ।
কফিল উদ্দিন সাহেবও অন্তুকে খারাপ চোখে দেখেন না । অবশ্য মরিয়ম বেগমের মত ততটা স্নেহের চোখেও না । জিম আর
অন্তু হাত ধরাধরি করে হাঁটছে । কফিল উদ্দিন সাহেব বিষয়টি খুব সুনজরে দেখছেন না । মরিয়ম বেগমকে বললেন,
জিম কি অন্তুর বন্ধু নাকি ?
ও কথা বলছ কেন ?
দেখছ না কেমন হাত ধরাধরি করে বন্ধু মত করে হাঁটছে !
হেলে মানুষ, ওতে কি হয় ?
ওতে কিছু হয় না, তবে বিষয়টি আমার খুব পছন্দ না । তুমি জিমকে ------- । মরিয়ম বেগম স্বামীকে আর কথা বলতে দিলেন না । বললেন, তুমি চুপ করো । এখন তুমি কিছুই বলবে না । বিষয়টি আমি পরে দেখব । তাছাড়া অন্তু
খুব ভাল ছেলে । মানুষ গরিব হয় না । গরিব হলেই কি তারা অমানুষ হয়ে যায় ? তাদের সাথে জন্ত জানোয়ারের মত
আচরণ করতে হবে ?
কফিল উদ্দিন সাহেব আর একটি কথাও বাড়ালেন না । স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় তাঁর মন ভরে উঠল । জিম ট্রেনে
উঠতে চাইছে । সেখানেও লাইন । অন্তু আর জিমকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল । একটু পর পর জিম লাইন থেকে
দৌড়ে চলে আসছে; আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছে । এ যেন মন না মতির খেলা ! কিছুক্ষণ পর ট্রেন ছাড়ল । জিম আর অন্তুর
সেকি উল্লাস ! জিম বার বার বাবা মায়ের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছে । ট্রেন থেকে নেমেই অন্তু একটি অভাবিত কাজ করে বসল । পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বের করে মরিয়ম বেগমের উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দিল । মরিয়ম বেগম এবং কফিল উদ্দিন সাহেব বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে গেলেন । মরিয়ম বেগম স্বামীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন । অতঃপর
বললেন, একি করছ অন্তু ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ?
না ম্যাডাম । মার কাছ থেকে এই টাকাটা নিয়ে এসেছি । ফেরত দিলে মা কি ভাববে ?
বলবে যে, আমি দিয়ে দিয়েছি ।
তাহলে মা খুব মাইন্ড করবে !
মাইন্ড করবে না । তুমি আমার কথা বলবে ।
অন্তু আর কিছু বলল । মাথা নিচু করল । কফিল উদ্দিন সাহেব ফ্যাল ফ্যাল করে অন্তুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল । মনে
মনে অন্তুকে তাঁর শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে হল ।
আর বেশিক্ষণ সময় নেই । শিশু পার্ক বন্ধ হয়ে যাবে । সব রাইডের সামনেই লোকজনের ভিড় । কফিল উদ্দিন সাহেব মনে
মনে ভাবতে লাগলেন, এই আমাদের প্রিয় দেশ । বাংলাদেশ । বাসে, ট্রেনে, পার্কে, স্কুলে, কলেজে, মসজিদে, লাইব্রেরিতে, মার্কেটে যেখানেই যাই ; শুধু ভিড় আর ভিড় ! যেখানেই যাই মনে হয় সব মানুষ বুঝি সেখানেই ! একলক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এই দেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাস ! কী আশ্চর্য ! তারপরও আমাদের দেশ থেমে নেই । দ্রুতই উন্নতি হচ্ছে । আগে মানুষ না খেয়ে মারা যেত, এখন যায় না ।
জিমের ক্ষুধা লেগেছে । তাঁরা একটি ফুসকার দোকানে বসলেন । মরিয়ম বেগম ফুসকা খুব পছন্দ করেন । কফিল উদ্দিন
সাহেব কিছুই খেলেন না । শুধুই এক গ্লাস পানি । জিম এক পিস কেক অনেকক্ষণ ধরে খেয়ে চলেছে । আর শেষ হতে চাইছে না । অন্তকে জোর করেও কিছু খাওয়ানো গেল না । অন্তু যে কেন খেল না; সে বিষয়টি আর কেউ না বুঝলেও
মরিয়ম বেগমের বুঝতে বাকি থাকল না । তাঁর চোখ ছল ছল করছে । তারা বাসার দিকে রওনা দিলেন । তাদের রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে অন্তও আপন মনে হাঁটতে লাগলো । তাঁরও দু চোখ জুড়ে রাজ্যের খুশি !

এখন সাড়ে ছয়টা বাজে । সকাল । কফিল উদ্দিন সাহেব সপরিবারে স্টেশনে পৌঁছে গেছেন । কমলাপুর রেলস্টেশন । পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । বেশ বড় এবং নয়নাভিরাম । বিভিন্ন লাইনে ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে । তবে এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস এখনো ফ্ল্যাটফরমে এসে পৌঁছায়নি । কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছে যাবে । মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে --- অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই কিশোরগঞ্জগামী এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ১ নং ফ্ল্যাটফরমে এসে দাঁড়াবে । কফিল উদ্দিন সাহেবরা ওয়েটিং চেয়ারে বসে আছেন । জিম এখনও ঘুমাচ্ছে । মায়ের কোলে । হকাররা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । আজকের পত্রিকা তাদের হাতে হাতে । গরম
গরম সব খবর । তাজা তাজা খবর । এইভাবে একেক জন একেক ভাবে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে চাইছেন । এমনিতে কফিল উদ্দিন সাহেব পত্রিকা কিনতে চান না । এর কারণ দুটো । এক- পত্রিকার অনেক সংবাদের উপরই তাঁর আস্থা নেই । দুইঃ অফিসে পত্রিকা পান । আজ কফিল উদ্দিন সাহেব একটি দৈনিক পত্রিকা কিনলেন । নিজের জন্য নয়; প্রিয় বাবার জন্য । তিনি পত্রিকা পড়তে খুব পছন্দ করেন ।এই পত্রিকাটি তিনি এমন ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বেন যে, এর চেয়ে আর
সুখপাঠ্য কোন কিছু বুঝি আর এই জগতে নেই ।
কফিল উদ্দিন সাহেবের পিতার নাম রফিক উদ্দিন । কর্মজীবনে একজন আদর্শ শিক্ষক । মনে প্রাণে শিক্ষক । এখনও সবাইকে ছাত্র মনে করেন । অবশ্য আশেপাশে চার -পাঁচ গ্রামে এমন কোন শিক্ষিত মানুষ নেই; যিনি তাঁর ছাত্র নন । বয়স
প্রায় নব্বই বছর । পরিষ্কার চোখে দেখেন । খালি চোখে পত্রিকা পড়েন । কোরআন পড়েন ; অথচ কফিল সাহেবের চশমা লাগে । একজন সাদা মনের মানুষ । একনিষ্ঠ একজন পাঠক । হয় নিজে বই পড়ছেন নতুবা কাউকে পড়াচ্ছেন । এই তাঁর ধ্যান ; এই তাঁর জ্ঞান।
এই মাত্র জিমের ঘুম ভেঙেছে । চোখ মেলল । কিছু বুঝল কী বুঝল না, তা বুঝা গেল না । মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, মাম্মা, আমি বাইরে যাব ।
মরিয়ম বেগম হাসতে হাসতে বললেন, আমরা তো বাইরেই বাবা । তোমার দাদু বাড়ি যাচ্ছি ।
জিম চারপাশ ভাল ভাবে তাকিয়ে নিল । তারপর খিল খিল করে হেসে ঊঠল । বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা হিসু করব ।
কফিল উদ্দিন সাহেব প্রমাদ গুনলেন । ট্রেন আসি আসি করছে । ওয়েটিং রুম বেশ দূরে । যেতে, হিসু করতে আর ফিরে
আসতে সময় কাভার করবে কিনা ভাবছেন । এরই মধ্যে জিম এবার হুমকি দিয়ে বলল, এখানেই হিসু করে দেই বাবা ?
মরিয়ম বেগম ব্যস্ত হয়ে বললেন, না না ; এটা হিসু করার জায়গা না । অতঃপর স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন, তাড়াতাড়ি নিয়ে
যাও ।
কফিল উদ্দিন সাহেব জিমকে কোলে নিয়ে দ্রুত পা চালালেন । জিম কোলে যেতে চাইছে না । হেঁটে যেতে চায় । প্রায় জোর
করেই নিয়ে গেলেন । কিন্তু টয়লেটের সামনে গিয়ে পড়লেন মহাবিপদে । কোনটিই ফাঁকা নেই । সব গুলোর সামনে মানুষের
ভিড় । বলা চলে দীর্ঘ লাইন । কফিল উদ্দিন সাহেবের মাথা গরম হয়ে গেল । তবে তিনি বুঝতে পারছেন, এই মুহূর্তে মাথা গরম করলে চলবে না । ঠাণ্ডা রাখতে হবে । রাগ কমানোর জন্য মনে মনে ইন্না লিল্লাহি অ ইন্না ইলাইহি রাজিউন
পড়ছেন । রাগ একটু কমলো বলে নিজের কাছে মনে হল । টয়লেটের সামনে দাঁড়ানো সব গুলো মানুষের মুখের দিকে একবার করে তাকালেন । নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে চিন্তা করলেন কাকে রিকোয়েস্ট করা যায় ! ব্যর্থ হলে ট্রেন মিস হতে পারে । তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে । অবশেষে শান্ত ভদ্র দেখে একজনের কাছে গিয়ে বিনয়ের সহিত বললেন,
ভাই, আমার ছেলেটির খুব হিসু পেয়েছে । যে কোন সময় ট্রেন ছেড়ে দিবে । এখন তো আপনার সিরিয়াল । যদি কাইন্ডলি একটু -------- । আর বলতে হল না । লোকটি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন । এক মুহূর্ত পরেই আবার মুখ ফিরিয়ে
কফিল উদ্দিন সাহেরের কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ভাই কিছু মনে করবেন না; আমার অবস্থা খুব খারাপ ---- । যে কোন সময় বেরিয়ে যেতে পারে ।
কফিল উদ্দিন সাহেব কী বলবেন ভেবে পেলেন না । জিম বাবা হিসু, বাবা হিসু করছে । হাত দিয়ে নুনু ধরে রেখেছে । মনে হচ্ছে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে । যে কোন সময় মুষলধারে নামতে পারে । এদিকে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে । তাঁর মাথায় কিছুই কাজ করছে না । মনে হল এমন বিপদে জীবনে পড়েননি । আর কাউকে বলতেও সাহস পাচ্ছেন না । এমন
একটি লোক তাঁকে এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করলেন । যিনি সাহায্য করলেন; টয়লেট রুমে ঢুকার পর কফিল উদ্দিন সাহেবের কাছে এই লোকটিকেই সবচেয়ে খারাপ বলে মনে হয়েছিল । এখন কফিল উদ্দিন সাহেবের কাছে মনে হচ্ছে, মানুষ চেনা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ । জিম একটি বাথ ঢুকল । দরজা বন্ধ করতে চাইল । কফিল উদ্দিন সাহেব বন্ধ করতে দিলেন না । জিমকে তাগাদা দিলেন, বাবা তাড়াতাড়ি করো ------ ।
এদিকে হিসু করতে বসে জিমের হাগু বের হয়ে গেল । জিম বাবাকে ডাকল, বাবা হাগু, বাবা হাগু ----- । কফিল উদ্দিন
সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল । মরিয়ম বেগম বার বার রিং দিচ্ছেন । এখন কী করবেন তিনি ? নিজেকে প্রবোধ
দিলেন, যা হবার তাই হবে ---- হতে থাক, থাক -----। নিয়তির উপর সব ছেড়ে দিলেন । এখন আর এতটা চিন্তিত
নন । ট্রেন চলে গেলে যাবে । ঠাণ্ডা মাথায় জিমকে নিয়ে টয়লেট থেকে বের হয়ে আসলেন । মরিয়ম বেগমের ফোন রিসিভ
করলেন । হ্যালো, কি ব্যাপার ----- ?
একটু টিস্যু পেপার নিয়ে এসো ।
ট্রেনের খবর কী ?
কোন খবর নেই ; এখনও আসেনি --- ।
যাক বাবা বাঁচা গেল !
কেন কি হয়েছে ?
আর বলো না । মহাবিপদে পড়েছিলাম ।
মরিয়ম বেগম অস্থির হয়ে বললেন, কী বিপদ ?
ফিরে এসে সব বলছি । আর কিছু আনতে হবে ?
না । কফিল উদ্দিন সাহেব লাইন কেটে দিলেন । মনে মনে আল্লাহ তায়ালাকে ধন্যবাদ দিতে লাগলেন । এই আমার প্রিয় বাংলাদেশ; এখানে কি হয় আর কি হয় না বুঝা বড় মুশকিল । ৭ টায় ট্রেন ছাড়ার কথা । এখন প্রায় ৮ টা বাজে ।
ছাড়ার নাম নেই । ইঞ্জিন গো গো করছে । শব্দ শোনে মনে হয় গোস্যা করেছে ! জিম এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে । কোন
চিন্তা নেই । মরিয়ম বেগম পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাচ্ছেন । কিছু ভাল লাগছে না ।

ঠিক সাড়ে আটটায় ট্রেন ছাড়ল । যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যাত্রীরা । জিম জানালার পাশে বসেছে । উদোম বাতাস তার গায়ে আছড়ে পড়ছে । ঝলমলে রোদ । সুন্দর আবহাওয়া । ভ্রমণ বান্ধব । টঙ্গী জংশন পার হতেই অন্যরকম পরিবেশ ।
বাংলার চিরাচরিত আবহমান রূপ । এই বাংলার প্রেমে পড়েই কবি বলেছিলেন,

বাংলার মুখ দেখিয়াছি আমি, পৃথিবীর রুপ আর দেখিতে চাহি না !

কী গভীর বক্তব্য !অথচ এখন সে বাংলা আর নেই । বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ গুলো খেয়ে ফেলছে মানুষ । মানুষের ঘর বাড়ি।
এখন ঘর আছে । দুয়ার নেই । গোহাল নেই । গোহাল ভরা গরু নেই । গোলা ভরা ধান নেই । পুকুর ভরা মাছ নেই ।
বন নেই । জংগল নেই । ঝোপ নেই । ঝাড় নেই । কাশফুল নেই । বকের সারি নেই । দোয়েল নেই ।টুনটুনি নেই । সজনে নেই । আতা নেই । হিজল তমাল নেই ।তাল নেই । মায়ের আদুরে গাল নেই । খাল নেই, বিল নেই, নদী নালা নেই । সাপ নেই, ব্যাঙ নেই । ঘ্যাঙ ঘ্যাঙ নেই । শিয়াল নেই, শিয়ালের ডাক নেই । আশ্বিন-কার্তিকের ঝড় নেই । কাল বৈশাখী নেই । ভরা বাদল নেই । বাদল দিনের মাদল নেই। আগের মত শীত নেই । গ্রীষ্ম নেই । বসন্ত নেই । হেমন্ত নেই । বর্ষা নেই । বন্যা নেই । রোদ পোহানো নেই । মেলা নেই । বেলাও নেই । জারি নেই । সারি নেই । ভাটিয়ালি নেই । মুর্শিদী নেই । পালতোলা নৌকা নেই । গরুর গাড়ি নেই । চার বেয়ারার পালকি নেই । ধান কাটার গান নেই । নবান্নের পিঠা নেই । পুলি নেই । ভোরের শুভ্র বাতাস নেই । বাবার সেই শাসন নেই । বারেক স্যারের জালি বেতও নেই । এই সব ভাবতে ভাবতে কফিল সাহেব যেন অন্য কোন জগতে হারিয়ে গেলেন ।নিজের অজান্তেই ভিজে উঠেছে তাঁর অবাধ্য চোখ । অথচ কত দিন আগের কথা ! তাঁর কাছে মনে হলো এই তো দিন ! যখন সোহাগ ছিল । মানুষে মানুষে ভালোবাসা ছিল । বন্ধন ছিল । আত্নীয়তা ছিল । হৃদয়ে হৃদয়ে ব্রিজ ছিল । অধিকার ছিল । কর্তব্য ছিল । মূল্যবোধ ছিল । ছোটদের প্রতি স্নেহ ছিল, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল, ভয় ছিল, লজ্জা ছিল । ধৈর্য ছিল ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement