২০.০৩.২০১২
আমি প্রেমে পড়েছি
আকণ্ঠ ডুবে আছি
অনিঃশেষ মুগ্ধতায়...

...অনেকদিন হয়ে গেল ডায়রি লেখা হয় না। আজ ওর সাথে প্রথম দেখার একমাস সেলিব্রেট করলাম। আমার ভালবাসার মানুষটিকে দেখেছিলাম বইমেলায়। প্রথম দেখায় প্রেম, এমনটাই ঘটেছিল আমার ক্ষেত্রে। তেইশ বছরের জীবনে প্রেমের আগমন...না, বার বার না.. এবারই প্রথম হয়েছিল। সেদিন ওর বান্ধবীর সাথে এসেছিল। কলাপাতা সবুজ রঙের সালোয়ার-কামিজ পড়েছিল।ওর এলোমেলো চুল আর দৃষ্টির উদাসীনতা খুব টানছিল আমাকে। নিতান্তই ফিচকে টাইপ ছেলের মতো পিছু নিয়েছিলাম।... তারপর ওরা মেলা থেকে টি.এস.সি তে গিয়ে বসল। যথারীতি আমিও। বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হলো। খুবই অন্যরকম লাগল ওর দৃষ্টি। এমনটা অন্য কোন মেয়ের চোখে দেখিনি।

কফি খেতে খেতে ওদের পেছনে গিয়ে বসলাম। অনেক সাহস নিয়ে আচমকাই বলে বসলাম_ 'আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?'
চোখমুখ কুঁচকে তাকাল। বিরক্ত সে?
বললাম- 'আপনি কি আমাদের ক্যাম্পাসের?'
- হ্যাঁ
- কোন ডিপার্টমেন্ট?
- ইতিহাস
- কোন ইয়ার?
- সেকেন্ড ইয়ার।কেন?
বানিয়ে বানিয়ে বললাম-'আপনাকে কেন যেন খুবই পরিচিত লাগছে।.. কয়েকবার দেখা হলো আমাদের..এতো পরিচিত লাগছে..।আচ্ছা, নাম জানতে চাইলে অসুবিধা কি?'

পুরোটাই মিথ্যে বলেছিলাম। এই মেয়ের মুভমেন্ট ভীষণ অপরিচিত মানে আর দশটা মেয়ের মতো মোটেই লাগছে না। চোখে চশমা লাগলেও সবকিছু সুৰ্নভাবে দেখতে চাই। কিন্তু ঠিক কী, কেন এমন অচেনা লাগছে বুঝতে পারছিলাম না। তবে বুঝতে পারছিলাম, মেয়ে আমার সর্বনাশ করে দেবে। তো আমাকে অবাক করে দিয়ে ঝরঝরিয়ে হাসল মেয়ে।
- আমি ফারাবী
- ঝরনা..? চঞ্চলা হরিণী,বিদ্যুৎ বর্ণ
ওর বান্ধবী হেসে ফেলল। কিন্তু ওর চোখেমুখে অদ্ভুত আকুতি নিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কি কবি?'
বেশ একটু ভাব নিয়ে বললাম- 'হ্যাঁ। কেন?'
- যারা কবিতা ভালবাসে তাদের ভাল লাগে।
...তো এভাবেই কথা বলতে বলতে, চলতে চলতে ক্যাম্পাসের আর দশটা জোড়াপাখির মতো আমাদেরও প্রেম হয়ে গেল। কিন্তু আজও বুঝতে পারলাম না কেন ওকে এতো অন্যরকম লাগে। হুম...কয়েকটা কারণ বের করেছি_

১. অসম্ভব স্নিগ্ধ একটা মেয়ে। (সেদিন বইমেলার ক্যাটক্যাটে গরমেও ওকে দেখে মনে হচ্ছিল এক টুকরো মেঘ। জলবতী মেঘ!)
২. বেশ স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলে।
৩. অনেক স্মার্ট। (আমার চেয়ে বেশি কি?)

আছে, আছে আরও অনেক কারণ আছে। সে যাই হোক আজ ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। ফারাবীর বাবা নেই। ওর মা জামাইয়ের মতো করেই আপ্যায়ন করেছিল। লজ্জা পাচ্ছিলাম। ওর দাদাভাই, উফ্ আল্লাহ... পর্বতের মতো মৌন, সৌম্য-সুদর্শন একজন। এই ছেলেকে এখনও কেন মেয়েরা একা থাকতে দিয়েছে কে জানে? এমন স্পেশাল দিনে ফারাবী এতো সুন্দর হয়ে এসেছিল ...! কী বলবো..! সাদা শাড়ী, নীল ব্লাউজ। রূপার চুড়ি.. কপালে নীল টিপ। সেই অগোছালো চুল... কবিতার মতো একটি মেয়ে! আমার ফারাবী, আমার রহস্য।

১৩.০৩.২০১২
আজ আমার মন খারাপ। ভীষণ মন খারাপ। বিকেলে নিশাত ফোন দিয়ে বলল যে, ফারাবী না কি ধানমন্ডির এক ক্লিনিকে ঢুকেছে, হাতে একগাদা সাদা অর্কিড। কেউ অসুস্থ কি না, জানতে চাইল নিশাত। কোনমতে কাটালাম ওকে। যে ক্লিনিকের নাম বলল, ওখানকার একজন ডাক্তার ফারাবীর বন্ধু। ৩৭ বছর বয়সী, বিবাহিত, ৪ বছরের এক ছেলের পিতা, ডাক্তার অমি ফারাবীর বন্ধু-ব্যাপারটা তেমন কিছু মনে করতে না চাইলেও, অমির প্রসঙ্গ এলেই ফারাবীর উচ্ছ্বাস কষ্ট দেয় আমাকে। ইদানীং প্রায়ই ফোনে এনগেজড পাই ওকে। কী এত কথা ফারাবীর? কার সাথে?

২৭.০৩.২০১২
ফারাবীর সাথে বোধহয় সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখতে পারলাম না। 'অমি' বিষয়টা বড় বেশি নাজুক হয়ে গেছে। ও ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলছে অমির সাথে। ফারাবী অদ্ভুত সব কথা বলে।এসব মেনে নেওয়া যায় না। ও কেমন করে বলে, 'আদনান আই এম ইন লাভ। অমির সাথে কথা বলতে ভাল লাগে আমার। ওর কণ্ঠ শুনলে কষ্ট ভুলে যাই।ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না।' প্রচণ্ড রাগ হয়। বলি- 'তাহলে আমার সাথে এতদিন কী ছিল?'
অসহায় চোখে ও বলে- 'তোমাকেও ভালবাসি। সত্যি বলছি। কাউকেই ছাড়তে পারছি না। বিশ্বাস করো আদনান, বুঝতে পারছি না কেন এমন হয়? কী করব এখন একদম বুঝতে পারছি না।'
রাগে গা জ্বলে যায়। যতোসব ফাজলামো। কিন্তু ওর দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য লাগে।এতো নিষ্পাপ কেন এই বিশ্বাসঘাতিনীর অভিব্যক্তি?

০৪.০৫.২০১২
কতদিন কথা নেই ফারাবীর সাথে! মিস করছি.....ওকে...!

০৭.০৫.২০১২
কী হচ্ছে এসব? এমনও হয়? ভেবে ভেবে পাগল হয়ে যাচ্ছি। ফারাবীর দাদাভাই ফোনে ডেকেছিল। গেলাম। ভাইয়া সব জানে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বললেন, 'তুমি সম্ভবত এর আগের ঘটনা জানো না।'
-না জানি না। কী ঘটনা?

-হ্যাঁ, পুরোটা শোন, কেমন? আমাদের ফারাবী ছোটবেলা থেকে ঘরকুনো স্বভাবের ছিল। ওর কোন বন্ধু ছিল না। বাবাই ছিল একমাত্র জানালা। এমনকি মা কিংবা আমি, আমাদের সাথেও কোনকালে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত না। স্কুল থেকে ফিরে ওর রুমে চুপচাপ অপেক্ষা করত বাবার জন্য। বাবা ওর সবটা জুড়ে ছিল। অন্য কাউকে, অন্যকিছুর প্রয়োজনই হতো না ফারাবীর। বাবা ওকে কবিতা শোনাত, যেমন শোনাও তুমি। গভীর ছিল বাবার ভয়েসটাও। ফারাবী খুব বাবাঘেঁষা মেয়ে ছিল। এসব নিশ্চয়ই বলেনি তোমাকে, ঠিক?
আমি মাথা নাড়াই। কেন বলোনি পাখি?

_ও যখন ক্লাস এইটে পড়ে, বাবা মারা যান এক্সিডেন্টে। স্কুল থেকে ফিরে সেদিন আর ওকে অপেক্ষা করতে হয়নি। বাড়িভর্তি এতো লোকের ভিড়ে আমাদের ফারাবী কুঁকড়ে গিয়েছিল। ইরেশ আঙ্কেল ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলেন। কাছে টেনে নিয়েছিলেন ফারাবীকে। ভয়ার্ত ফারাবী আঙ্কেলকে বড় বড় চোখে দেখছিল। তারপর নিশ্চিন্ততা এসেছিল ওর দৃষ্টিতে। দু'টো বছর ফারাবীকে আগলে রেখেছিলেন উনি। তারপরও হয়ত রাখতেন। কিন্তু ফারাবী এলোমেলো করে ফেলল পুরো ব্যাপার। আমার কী মনে হতো জানো? এই যে বাবা চলে যাওয়ার পর ফারাবী মোটামুটি মেনে নিয়েছিল, আঙ্কেলকে নিয়ে ভালই ছিল...এসব ঠিক স্বাভাবিক না। সত্যি ছিল কথাটা। ইরেশ আঙ্কেলের বিয়ের পর ফারাবীর পাগলামো শুরু হয়েছিল। আন্টিকে সহ্য করতে পারত না, নানাভাবে আঙ্কলকে কাছে টানার চেষ্টা করত। এতো ঘোলা করেছিল সব যে বিব্রত আঙ্কলকে শেষে প্রবাসী হতে হয়েছিল। শোন আদনান, আমি সাইকোলজির স্টুডেন্ট না। তবে ফারাবী সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন কী জানো, বাবাকে অসম্ভব ভালবাসত মেয়ে। তাঁকে হারাবার পর ও যেহেতু খুব দুর্বল মানসিকতার মানুষ...ভেতরে ভেতরে ব্যাপারটা মেনে নেয়নি। ইরেশ আঙ্কেল যে ওকে আগলে রাখত সেটার ভেতরেই সান্ত্বনা খুঁজে নিত। কিন্তু বাবার সবটা অন্য কেউ দিতে পারে না। তো ফারাবী পুরোপুরি স্যাটিসফাইড ছিল না। না থাকায় আঙ্কেলের জীবনে আরেকজনের ছায়া দেখে ভয় পেয়েছিল। এবং ওর একটা চেষ্টা ছিল সবকিছু ঠিক কওে ফেলার। যেটাকে সবাই ভুল বুঝেছে। কারণ ক্লাস এইটে পড়া একটি মেয়ের মন, একটি ভালবাসায় ও আটকে থাকলেও সময় গড়িয়ে গিয়েছে অনেক। ও বড় হয়েছে। সবাই ওর ভালবাসাকে ভুল নাম দিয়েছে। একটা সময় ও নিজেও তেমনই ভাবতে শুরু করল। সরল মনে বাবার প্রতি ভালবাসাকে বিভিন্ন পুরুষের মাঝে খুঁজতে চেয়েছে। কোথাও সম্পূর্ণতা পায়নি। শান্তিও পায়নি।

ভেতরে ভেতরে বাবাকে মিস করেছে। সেটা কাটাতে এর ওর মধ্যে বাবার ইমেজ কল্পনা করেছে। তোমার কাছে কবিতা শোনা, অমির সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার ছলে ওর জলগভীর স্বরে... বাবাকে পেতে চেয়েছে। খেয়াল করলে দেখবে ওর দৃষ্টি, আচরণে অস্থিরতা কাজ করে। একাকীত্ব ওকে জড়িয়ে রাখে, যেটা ওর বয়সী অন্য মেয়ের ভেতর পাবে না। তুমিই পারো ওকে ওর সত্যিকারের বয়সটাতে ফিরিয়ে আনতে।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়নি আর আমিই বা কেন? অন্য কেউ কেন পারে না কাজটা করতে? স্মিত হেসে ভাইয়া বলেছিলেন, 'সে চেষ্টা কি করিনি? ও খুব রিঅ্যাক্ট করেছিল। কন্টিনিউ করা সম্ভব হয়নি। ভাইয়া বলেছিল আমাদের দেশে নাকি বেশিরভাগ মানুষ বুঝতেই পারে না তারা কোন সাইকোলজিক্যাল প্রোবলেমে ভুগছে কী না। অনেকে আবার সেটা মেনেই নিতে পারে না। ভাইয়া বললেন, 'ফারাবী চেতনে হোক, অবচেতনে হোক যাদের সাথে জড়িয়ে গেছে তাদের ভেতর কেবল তুমিই, আমার মনে হয় তুমিই ওকে সারাজীবন বেঁধে রাখতে পারো।'
...ওদের বাসা থেকে ফিরে এসে কত কী ভাবলাম এ পর্যন্ত। ভাবনাগুলো শুধু দিক বদল করে। কী করব আমি?

আচ্ছা,ফারাবী কী করছে এখন? অমির সাথে কথা বলছে? নাকি সেই প্রিয় তারাটা দেখছে?
এমনিতে ফারাবী বাবাকে নিয়ে তেমন কিছুই শেয়ার করত না। তবে একদিন হঠাৎ উদাস হয়ে বলেছিল, যেদিন ওর বাবা চলে গিয়েছিল.. অচেনা অভিজ্ঞতা ওকে কীভাবে স্তব্ধ করেছিল। বলেছিল, আগরবাতির গন্ধ আজও ভয় পাইয়ে দেয় ওকে। বলেছিল, ইরেশ আঙ্কেল ওই তারাটা চিনিয়েছিল। সেটা নাকি বাবা। আনমনা ফারাবী আমাকে বলেছিল, 'বাবাকে তো দূর থেকে দেখি,স্পর্শ নিতে পারিনা। আচ্ছা আদনান, মরে গেলে কী তারা ছুঁয়ে দিতে পারব?'

সেদিন বকেছিলাম। আজ ও ফোনে কত কথা শোনালাম। ও বলল, অমির বউ কিসব কথা শুনিয়েছে। মায়া জাগে একটা ঝরনার জন্য। বুকের মধ্যে শ্বাসগুলো ধাক্কা খায় কোথায় কোথায়...... কেমন আছে সে? আনচান করছে মন। ফোন করব কি? না। ওর কাছেই যাবো।

১০.০৫.২০১২
"কথা বলো না,প্রশ্ন করো না
কাছে এসো, কান পেতে শোন,
তার নিঃশ্বাসের শব্দ পাও কি?"

কবিতা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গিয়েছি ফারাবী। এরই ফাঁকে ডায়রি লিখছি।ওর ঘুমন্ত মুখে ক্লান্তি। সেদিন ভাগ্যিস গিয়েছিলাম ওদের বাসায়। বোকা মেয়ে সবাইকে ফাঁকি দিতে চেয়েছিল। জানেই না, বাবা চলে গেলেও আরও কত্ত ভালবাসা রয়েছে শুধুই ওর জন্য। এখন আমি প্রতিদিন বিকেলে একটা করে কবিতা শোনাই ওকে। ও ঘুমিয়ে যায়। আমি বসেই থাকি। আজ বুদ্ধি করে ডায়রি এনেছিলাম, তাই লিখতে পারছি। ঘুমিয়ে পরলেও ওর দুর্বল হাত আলতো করে ধরে রাখে আমার একটা হাত।আমি কী পারি এই ভালবাসাপ্রবণ হাতটি সরিয়ে চলে যেতে?

না। পারি না। কখনই না।