লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ১৬টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা (জুন ২০১২)

গলুই
বাবা

সংখ্যা

আরমান হায়দার

comment ২৪  favorite ৩  import_contacts ১,১৮৪
মহা তার খেয়ানৌকার গলুই বরাবর মাথা রেখে পাটাতনের উপর একবারে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। পেটে তার ব্যথা হচ্ছে। এমন ব্যথা এখন প্রায় প্রতিদিনই দেখা দেয় । এমনিতেই ছোটবেলা থেকে তার দু'পায়ে বল কম, হেঁটে ভারি কোন কাজ করতে পারে না। এখন আবার নতুন রোগ শুরু হয়েছে। সেদিন ডাক্তারের কাছে গেলে পেট পরীক্ষা করে ঔষধ লিখতে লিখতে ডাক্তার সাহেব বলেন, ভেজাল খাবার খাওয়া ছাড়তে হবে মহানন্দ! তা না হলে ওষুধ বেঁটে খাওয়ালেও রোগ যাবেনা। মাছ,মাংস,দুধ,তেল সবকিছুতেই এখন ভেজাল। বিশেষ করে বাজারের তেল। তাহলে খাব কি? বলতেই ডাক্তার হেসে বলেন ,খাবে না কিছুই। তারপর গম্ভীর মুখে বলেন, যেগুলো আমাদের বাপদাদারা আগে খেত সে সব তেল খাবে। ডাক্তারের কথা শুনে,সেদিন অনেকদিন পর মহা'র তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। মা তিল,তিষি আর কুসুম ফুলের তেল দিয়ে তরকারি রাঁধতেন। এ তেল কি এখনও দোকানে পাওয়া যায়? খুঁজতে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয় মহা। না গো পাটনির পুত সে সব এখন আর পাওয়া যায় না এ ডেমরার হাটে _দোকানিদের এমন কথা শুনে মহা ফিরে আসে । বাপদাদাদের পছন্দের এসব তেল কেনা হয় না তার।

গতরাতে খাবার পর থেকে মহা'র পেটের ব্যথাটা বেড়েছে। কিন্তু তাতেও কি বাড়িতে বসে থাকার উপায় আছে তার মত হতদরীদ্র ঘাটমাঝির। তাকে আসতে হয়েছে নদীতে । কি আর করা। অন্যদিন যা করে বড়জোর তাই করতে হয় মহাকে। এরকম ব্যথা হলে মহা পিছনের গলুইয়ের উপর মাথা রেখে সোজা শুয়ে পড়ে। পেটের উপর চাপা দেওয়ার কিছু পায় না। মাঝে মাঝে বৈঠার হাতল দিয়ে আস্তে আস্তে চেপে ধরে ,গড়াগড়ি খাওয়ায়। এক সময় ব্যথা কমে আসলে আবার নৌকা চালায়। এরকম একটা ব্যথা নিয়ে আজ এইমাত্র মহা সটান শুয়ে পড়ল।

এখন শুয়ে শুয়েই মহা শুনতে পায় তার অনুভবের শোনা। হাটের গমগম শব্দ, চায়ের কাপের টুং টাং শব্দ, মানুষের কোলাহল ভেসে আসছে যেন তার দিকে। মহা সেদিকে তাকানোর চেষ্টা করে না। বরং সে আকাশের দিকে তাকানো চোখটাও বন্ধ করে এবার । চোখ বুঁজে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। শীর্ণকায় বড়ালের উপর দিয়ে ভেসে যাওয়া বাতাসে কুসুম ফুলের ঘ্রাণ খুঁজতে চেষ্টা করে। হ্যাঁ, ঠিকই গন্ধটিকে খুঁজে পায় সে। আর তখনই চিন্তার মধ্যেই আর একটি চিন্তা এসে হাজির হয়। আচ্ছা ! হঠাৎ কুসুমফুলের ঘ্রাণ পেল কেন সে ? আশে পাশে তো কুসুম ফুলের চাষবাস আছে বলে মনে হয় না । তা'ছাড়া কুসুম ফুলের গন্ধ এত তীব্র নয় যে তা দুর থেকে ভেসে আসবে। তা হলে এটা কি অন্য কোন কুসুম? সেই ঘোষ পাড়ার কুসুমের কথা মনে পড়ছে তার? সেই যে ছোট বেলায় মহা তার বাবার সাথে গিয়ে ঘোষপাড়ার যে বাড়ি থেকে পারানি হিসেবে তিষি,তিল আর কুসুমফুলের দানা নিয়ে আসতো; তারপর এগুলো ঘানি থেকে তেল করে সেই তেলে রান্না করতো মা। সেই ঘোষবাড়িতে গেলেই দেখা হত কুসুমের সাথে। কুসুম এটা করতো ,ওটা করতো আর সবচেয়ে বেশী করতো যা তা হল মহা' র দিকে তাকিয়ে থাকতো । কুসুম ফুলের মত চোখ তুলে তাকিয়ে থাকতো মেয়েটি। আচ্ছা কি হল সেই কুসুমের ? বিয়ে হয়ে গেল বোধ হয়? সেই বিয়ের নেমন্তন্নে মহা গিয়েছিল কি। নাহ! ঘোষ বাড়ির কোন বিয়ে বা পার্বণে তো তাদের মত ,পাটনি ঋষিদের নেমন্তন্ন করা হয় না। নিচ বংশের কেউ এ বিয়েতে যে যায়নি এ বয়সে এসে মহা অন্তত এতটুকু বোঝে। এরকম কোন অনুষ্ঠানে যেতে চাইলে বাবা বলতেন মাটির তৈরি মানুষকে সবখানে যেতে হয় না বাপ। মানুষ কি মাটির তৈরি, মহা জিজ্ঞাসা করায় বাবা উত্তর দিয়েছিলো, হ্যাঁ সব কিছুই একভাবে না একভাবে মাটি দিয়েই তৈরি হয়। মানুষ, ফসল, নৌকা,গলুই, বৈঠা, লগি সবই মাটির। শুধু মানুষের মনটা বাদে। তখন একথা বুঝতো না মহা । এখনো যে খুব বোঝে তাও নয়। কিন্তু একথা মহা'র মনে আছে। হয়তো বাবার কথা বলেই তা মনে আছে তার।

কয়েকটি পাখির ডাক কানে আসতেই কুসুমের ভাবনা সরে যায় । মহা'র মনে হয় একটি, দুটি বা কয়েকটি গাংচিল টি- টি, পিক- পিক শব্দ করে উড়ছে তার মাথার উপর দিয়ে। বাতাসে আরো একটা কিসের গন্ধ যেন আসছে। এটা কি তিষি ফুল। কি সুন্দর নীল তিষি ফুটে আছে। মহা'র মনে হল সে অনেক ছোট হয়ে গেছে। ফিরে গেছে সেই শৈশবে। গ্রীষ্মের এই সময়টাতে সে তার বাবার জন্য খাবার মাথায় করে বড়াল গাঙের পার দিয়ে তপ্ত মাটির উপরে বড় বড় পা ফেলে হাঁটছে। ঘোষেরা পাশের তিষির জমিতে লাল-হলুদ কুসুম ফুল বুনেছে কয়েক সারি করে। গরু-ছাগল ঢুকে যাতে ফসলের ক্ষতি না করতে পারে, এ জন্যই কুসুম ফুলের কাঁটা বেড়া। কুসুম ফুলের কি বড় বড় কাঁটারে বাবা। উহ্ ! হঠাৎ একটা কাঁটা ফুটল মনে হয়। দিবা স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল মহা'র । চোখ খুলে তাকাল মহা তার পায়ের দিকে। একটা লাল পিঁপড়া এসে কামড়ে দিয়েছে । মহা মাথাটা একটু উঁচু করে তাকিয়ে দেখে। নৌকার ফাটল দিয়ে জল উঠে নৌকার পেটে অনেকটা জল জমেছে। নৌকার তলায় রাখা ভাতের গামলা সেই জলে ভাসছে। সম্ভবত পিঁপড়ার সারি গামলার খাবার থেকে বঞ্চিত হয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। সেই সারিরই একটি পিঁপড়া মহাকে এইমাত্র কামড়ে দিয়ে গেল। পিঁপড়াটা যেন ধমক দিল মহাকে। ভাঙ্গা নৌকা তাড়াতাড়ি ঠিক কর। তোর নৌকায় উঠে ভাতটি পর্যন্ত ঠিক মত খেতে পারলাম না। মহা'র বুঝতে বাকি থাকে না যে এ পৃথিবীতে একজন খাবার না পেলেই অন্যকে হামলে ধরে, কামড়ে দেয়। আর দেরি করা ঠিক নয়, এখনই দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়া দরকার। কিন্তু মহা'র আজ উঠতে ইচ্ছে করে না। সে শুয়ে থাকে। যতক্ষণ কোন লোক, কোন হাটুরে পারাপারের জন্য না ডাকছে ততক্ষণ উঠবে না সে । মহা আবার সটান হয়ে শুয়ে পড়ে। এভাবে কতক্ষণ আছে, কতক্ষণ থাকতে হবে, ঠিক জানে না মহা। জানার ইচ্ছেও তার নেই।


হঠাৎ কেউ একজন ডেকে উঠে, মহানন্দ ! মহানন্দ! ---- তাকাল সে এদিক ওদিক। কেউ পার হবে নাকি? দুরে ওপার থেকে কেউ একজন বোধ হয় ডেকেছিল। তা মহা'র নৌকায় দেরি হবে ভেবে ইঞ্জিনের নৌকায় চলে যাচ্ছে হয়তো। আজ হাট বার। লোকজন যাচ্ছে দুরের ঘাট দিয়ে ইঞ্জিনের দ্রুত চালিত বোটে। ও ঘাটের টোল বেশী । মহা'র নৌকা সেখানে ভিড়তে পারে না। তাই দুরের ফাঁকা ঘাটে থাকে মহা । হঠাৎ হঠাৎ দু'একজন পারাপার হয়। সেটা মহা জানে । কিন্তু তাকে মহানন্দ বলে ডাক দিলো কে? সবাইতো তাকে মহা নামে ডাকে। বাবার বয়সী পরিচিত লোক হলে কেউ কেউ মহানন্দ নামে কখনো কখনো ডাকে। আর মহানন্দ নামে ডাকতেন একমাত্র তার বাবা । কখনোই সংক্ষেপ করে অন্যদের মত মহা নামে ডাকতেন না। বাবা মহিম তার সব ছেলেকেই পুরো নামে ডাকতেন। বড় ছেলে আনন্দ, মেঝো সদানন্দ, ছোটছেলে মহানন্দ। পিসি শুনে মাঝে মাঝে বলতেন, তোর বাবা কোন ছেলেকেই আনন্দ দিতে ভুল করেননি। সবার নামের সাথেই আনন্দ। বাবা বলতেন ওদেরকে নিয়েই তো আমার সব আনন্দ। তাই ওদের সবার নামের সাথে আমার আনন্দটাকে যোগ করে দিয়ে গেলাম।

বাবার কথা মনে পড়তেই সামনের আগা গলুইয়ের দিকে তাকায় মহা। বাবা বলতেন, আনন্দ! সদানন্দ, মহানন্দ তোদের জন্য আর কিছু রেখে যেতে পারলাম না। তোর ঠাকুরদা'র দেয়া এই নৌকাটি ছাড়া। তোরা তিন ভাই মিলে মিশে এই নৌকা চালাবি। এতেই তোদের চলে যাবে। আর এই যে নৌকার গলুই এটা তোর ঠাকুরদা কোন এক বিশাল শাল গাছের সবচেয়ে সারকাঠ দিয়ে বানিয়ে রেখে গেছেন। এটাই তোদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটা এত শক্ত গলুই যে নৌকার সব কাঠ দু'বার করে পাল্টিয়েছি তারপরও নতুন গলুই কিনতে হয়নি। পুরনো এই কাঠের গলুই দুটোকে মিস্ত্রি দিয়ে লাগিয়ে নিয়েছি মাত্র। তোর ঠাকুরদা বলতেন গলুই শক্ত হলে নৌকা ঠিকমত নদীর পারে গিয়ে ভিড়বে; নদীপারের মাটির ধাক্কায় নৌকার কোন ক্ষতি হবে না। আমাদের যখন এই নৌকা বেয়েই খেতে হবে তখন গলুইটা শক্ত হওয়া চাই । একে শক্ত রাখতে হবে। কত ধাক্কা যায় ,কত ধকল যায় এই গলুইয়ের উপর দিয়ে। এখানেই নৌকার হাল ধরতে হয়, দাঁড়ের বৈঠা ঘসটাতে হয়ে । এটার সাথে কাছি দিয়ে খুঁটি বাঁধতে হয়। এটার যত্ন নিবিরে মহানন্দ, সদানন্দ,আনন্দ । বাবা এবার ছোট ছেলের নাম আগে উচ্চারণ করেন। মহা'র তা স্পষ্ট মনে আছে।


নৌকার পিছনের গলুইয়ে শুয়ে এসব কথা একের পর এক চিন্তা করে চলেছে মহা। বাবা একদিন বললেন , ওরে আনন্দ ! আমি মরে গেলে তোরাতো এই নৌকায় করেই শ্মশান ঘাটে নিয়ে যাবি, তাই না! শুনে আনন্দ দা বলেছিল_ বাবা যে কি বল না!

_' ঠিকই বলছি। আমাদের নাক ডেমরায় তো আর শ্মশান নেই যে সেখানে নিয়ে পোড়াবি। পোড়াতে হলে নদী পারি দিয়ে এই শ্মশান ঘাটেই আসতে হবে। হলোও তাই কয়েক মাস পড়ে বাবা মারা গেলেন । তার কয়েক মাস পড়ে মা । সবাইকেই এই নৌকাই বহন করেছে। শ্মশানে নেয়া সহজ হয়েছে। নৌকা না থাকলে কোথায় কার কাছে ধার চাইতো হতো।

বড়দা আনন্দকেও ইন্ডিয়া যাওয়ার সময় এই নৌকায় করে বড়াল ব্রিজ পর্যন্ত রেখে এসেছিল সদা ও মহা দুই ভাই। রেলস্টেশনের পাশে বড়াল ব্রিজের গোড়ায় নৌকা ভিড়তেই দাদা গড় হয়ে প্রনাম করলো গলুই দু'টোকে। তারপর দুই ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
_' ওরে সদা, মহা! আমি ছিলাম বাবার বড় ছেলে । বাবার দেওয়া নৌকা ছেড়ে আজ চলে যাচ্ছি। রাখতে পারলাম না নিজেকে নৌকার সাথে ধরে। তোরা যত দিন পারিস নৌকাটাকে দেখে রাখিস। গলুইয়ের কাঠ দুটো কিন্তু ঠাকুরদা'র দেওয়া। এ দুটো যাতে ভেঙ্গে না যায় খেয়াল রাখিস। এরপর এভাবেই একদিন এদেশ ছাড়লো সদানন্দ। বললো , মহা এভাবে এক নৌকা দিয়ে তো দু'সংসার চলে না রে। তুই একাই চালা। নৌকা চালা, সংসার চালা। আমি বরং দাদার খোঁজ নিয়ে আসি। সদা দা সেই যে গেল বড়দার খোঁজে! একেবারেই গেল। এখন ভাঙ্গা নৌকা নিয়ে বংশের গলুই নিয়ে মহা কাজ করছে। কাজ করছে মানে পারের লোকের অপেক্ষায় পেটের ব্যাথা নিয়ে শুয়ে আছে ভাঙ্গা নৌকার শক্ত গলুইয়ের উপর।

চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা মহা এবার তার মুখটাকে কাত করে তাকায় শান্ত নদীর দিকে। জল শুকিয়ে নদী মরে যাচ্ছে । কাত হয়ে শোয়ায় একটি কান এবার গলুইয়ের কাঠের উপর জায়গা নেয়। একটা কির-কির,কির-কির আওয়াজ শোনা যায়। অন্য কানটির উপর হাত রেখে বাইরের কোলাহলকে ঢেকে খুব নিবিষ্ট মনে শব্দটা খেয়াল করতে থাকে মহা। হঠাৎ বুকের ভিতর যেন ধকধক করে ওঠে। এতদিনের পুরোনো শাল কাঠের অক্ষয় গলুইয়েও তাহলে কি ঘুণ ধরলো! ঘুণপোকাগুলো মহাসুখে শাল কাঠের শক্ত অাঁশ গুলোকে খেয়ে চলেছে। কির-কির কির-কির। মহা এই নির্জন নদীর বুকে ঘুণপোকার গান শুনে ডুকরে ওঠে। চোখের কোণে দু' ফোটা জল জমে।
মহা'র গলুইয়ের নীচে বড়ালের জল আর চরের ধুধু বালি মৌন পড়ে থাকে। তার উপর দিয়ে অজস্র বাতাস বয়ে চলে। সেই বাতাসে দম নিতে নিতে মহা'র মনে হয় সে বড় একা। এই গলুই, এই খেয়ানৌকাটাকে আর বোধ হয় রক্ষা করা গেল না। কি করে খাবে মহা। তার বাবা তাকে তো আর কিছু শিখিয়ে দিয়ে যায়নি। মহা'র মুখ দিয়ে সেই শেষ ডাক বের হয়ে আসে _'বাবারে তুই কনে ? বাপরে তুই কনে বাপ?'

মহানন্দ ! মহানন্দ ! _এবার মহা সত্যি সত্যি শুনতে পায় তাকে কে যেন মহানন্দ নামে ডাকছে। মহা তাকাতে চেষ্টা করে ওপারের দিকে, কেউ পার হওয়ার জন্য ডাকছে হয়তো। নিশ্চিত হওয়ার জন্য শোয়া থেকে আস্তে আস্তে উঠে বসে মহা। ভারী সুন্দর দৃশ্য তার সামনে,বাবা । বাবা বসে আছে তার নৌকার সামনের গলুইয়ের কাছে চরাটের উপর। তাকে যেন বলছে , মহানন্দ! এইতো জীবন। নৌকা ছাড় বেটা। ওপারে লোক দাঁড়িয়ে আছে। আজ হাটবার পারাপার শুরু কর। আমি সামনে আছি তুই লগি দিয়ে ঠেলা দে। নৌকাটাতো পানিতে ভরে গেছে বাপ। এভাবে কি নৌকা চালায়! তোর দেখছি কোনদিকে খেয়াল নাই। একটু থেমে বাবা আবার বলে,তোর এত মন খারাপ কেনরে মহানন্দ। মনে কখনো ঘুণ ধরতে দিবি না। গলুইয়ে ঘুণ ধরবে দুনিয়ার সবকিছুই ক্ষয়ে যাবে ,তাই বলে মন ভাঙ্গতে দিবি না। নিরানন্দ হবি না কখনো। বাবা সেই আগের মত সাহস দিয়ে বলে, বাবারে! আমিতো আছি এই গলুইয়ে বসে। ভাবছিস অন্য কেউ নাই কেন? এই দুনিয়ায় পরিচিতরা কে কোথায় হারিয়ে যায়, বোনদের বিয়ে হয়, ভাইরা পৃথক হয়ে চলে যায়। শুধু বাবা থাকে। তাকে থাকতে হয় সন্তানকে পথ দেখানোর জন্য, কাজ শেখানোর জন্য । নে! বেটা নৌকা বাইরে দে । ওভাবে কেন বাবা লগি ঠেলা , বৈঠা মারা! তোকে যেভাবে শিখিয়েছি সেভাবে কর। '

পেটে ব্যথা হলে , মন খারাপ হলে এভাবে প্রায়ই বাবাকে স্মরণ করে মহা। চুপ করে নৌকার গলুইয়ে শুয়ে চোখ বুঁজে আশ্রয় খোঁজে। বাবা ঠিকই মহা'র সামনে এসে সান্তনা দেয়,অভয় দেয়। বরাবরের মত আজ এই মুহুর্তেও বাবার কথামত মহা নৌকার পিছনের গলুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে লগি দিয়ে নৌকা ঠেলে দিয়েই সামনে পড়ে থাকা বৈঠাটা হাতে তুলে নেয়। মহা যাত্রা শুরু করে নদীর ওপারের দিকে। লগি বৈঠার মিছিল শুরু হয়, জীবনে বেঁচে থাকার মিছিলে যোগ দেয় মহা। তার নাকে সেই কুসুমফুল,তিষিফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসে। যে কুসুম,তিষি,তিলের তেলে রান্ন্া করতো তার মা। আর বড়ালের তপ্ত মাটির উপর ঢ্যাঙা পায়ে হেঁটে বাবার জন্য খাবার নিয়ে আসতো মহা সেই সব দৃশ্য অবিকল ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। গাংচিল গুলো যেন সত্যি সত্যি উড়ে উড়ে বড়ালের জ্যান্ত মাছ শিকারে মত্ত হয়ে উঠেছে। উড়ন্ত গাঙচিলের পিকপিক শব্দের নীচে মহা তার যৌবনের সমস্ত তেজ নিয়ে নৌকা বেয়ে চলেছে। ভ্যাপসা বাতাস ঠেলে মহা মহানন্দে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। জীবন সংগ্রামে মহা একা নয়, তার বাবা আছেন আগা গলুইয়ে বসে। সামনের গলুই যেদিকে যায় পিছনের গলুইও সেদিকে ধায়।


মহা ! মহানন্দ! তাড়া তাড়ি আয় বাবা হাট ধরতে হবে । মহার গলুই বীর দর্পে গিয়ে ঠেকে ঘাটের মাটিতে। মৃত্তিকাজাত মহা'র গলুইয়ের ধাক্কায় নদীপারের মাটি কেঁপে ওঠে বার কয়েক। মহা'র ঘোর কেটে যায়। মহা তাকিয়ে দেখে ঘোষপাড়ার খূড়ো। সাথে অনেক লোক। খেয়া পারের অপেক্ষায় আছে তারা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • স্বাধীন
    স্বাধীন খেটে খাওয়া মানুষের গল্প মহানন্দদের মতোই হয়, (আচ্ছা আনন্দ আর সদানন্দের মতো যদি মহারও শারিরীক শক্তি থাকতো সেও কি ইন্ডিয়া চলে যেত নাকি বাপ-দাদার স্মৃতি নিয়ে সেই গলুইয়ে পড়ে থাকতো এখন যেভাবে আছে?)
    প্রত্যুত্তর . ৯ জুন, ২০১২
    • আরমান হায়দার আনন্দ আর সদানন্দ হয়তো বাবার অন্য কোন স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে।অথবা গলুইতে বসে থাকার আহ্বান পালন করতে না পারার দুঃসহ সৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে যা তাদের জীবন সংগ্রামে কাজে লাগছে। তাদের মনোভাবটা জানা গেলে হয়তো তাদের কাহিনী নিয়েও আরো এক বা একাধিক বাবাবিষয়ক গল্প লেখা যেত।//// ধন্যবাদ আপনাকে তিন আনন্দের গল্প পড়ার জন্য।
      প্রত্যুত্তর . ৯ জুন, ২০১২
  • তানি হক
    তানি হক নদীর পানির গন্ধ , উড়ে যাওয়া গাঙ্গচিল , মহার আবেগ ..মহার কষ্ট সবই অনুভব করলাম ...ভাইয়াকে ধন্যবাদ অসাধারণ এই গল্পটির জন্য ...
    প্রত্যুত্তর . ১০ জুন, ২০১২
  • সঞ্চিতা
    সঞ্চিতা বাহ! আরমান ভাই দারুন এক কথায়--মন ভরে গেল.
    প্রত্যুত্তর . ১১ জুন, ২০১২
  • মামুন ম. আজিজ
    মামুন ম. আজিজ সুন্দর দৃশ্য বর্ননা....বাবার স্মৃতি নৌকার যতন ..বেশ লিখেছেন দাদা।
    প্রত্যুত্তর . ১২ জুন, ২০১২
  • সোমা মজুমদার
    সোমা মজুমদার khub sundar kore byakta kara hoyechhe jeebaner kichhu jatil ebang sahaj tathya gulo, khub valo laglo
    প্রত্যুত্তর . ১৮ জুন, ২০১২
  • আনিসুর রহমান মানিক
    আনিসুর রহমান মানিক ভালো লাগলো /
    প্রত্যুত্তর . ২৩ জুন, ২০১২
  • সূর্য
    সূর্য স্মৃতিকাতরতা বোধ হয় আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষগুলোরই সবচে বেশি। তাইতো শ্রমিক বাবার ছেলে শ্রমিকই রয়ে গেলাম, হঠাৎ বদলে যাওয়ার পথে স্মৃতি আর সম্মান এসে দাড়ায়। আপনার হাতে সাদামাটা গল্পও হয়ে ওঠে অসাধারণ কিছু। অনেক ভাল লাগলো গল্প।
    প্রত্যুত্তর . ২৩ জুন, ২০১২
  • sraboni ahmed
    sraboni ahmed অসাধারণ লিখেছেন । স্যালুট বস
    প্রত্যুত্তর . ২৪ জুন, ২০১২
  • পারভেজ রূপক
    পারভেজ রূপক দারুণ, দারুণ একটা গল্প।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ জুন, ২০১২
  • রোদের ছায়া
    রোদের ছায়া মনে হলো একটা সুন্দর নাটক দেখলাম , সাবলীল ভাষায় সুন্দর উপস্থাপনা .......আপনার লেখার ভক্ত হয়ে যাচ্ছি বলতেই হবে ........অনেক অনেক ভালো লাগা থাকলো..( দেরী করে আসার জন্য দুঃখিত )
    প্রত্যুত্তর . ২৮ জুন, ২০১২

advertisement