ভোরের শিশিরে তুমি

সবুজ সংখ্যা

তানজির হোসেন পলাশ
  • ১৫
টিক্ টিক্, টিক্ টিক্। ঘড়ির কাঁটার শব্দ। নিস্তব্ধ রজনীতে বেশ জোরেই শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ শব্দটা থেমে যায়। ঢং ঢং আওয়াজ। ঠিক বারটা। কোনটাই পৌঁছল না ঘুমিয়ে থাকা তন্ময়ের কর্ণ গুহরে। ১২টা ০১ মিনিটের সংকেত দিচ্ছে ঘড়ির কাঁটা। একটা টিকটিকিও ডেকে উঠল করুণ কণ্ঠে। ক্যালেন্ডারের তারিখ পরিবর্তন হয়েছে দুই অঙ্কে। প্রথম দুই অঙ্ক পাশাপাশি বসলে যা হয় আর কি ! এক আর শূন্য অর্থাৎ ১০ তারিখ। অন্য যে কোন তারিখ থেকে ১০ তারিখ তন্ময়ের কাছে বেশ সমাদৃত। মোবাইল Remainder কানের কাছে তন্ময়কে স্মরণ করায়ে দেয় তোমার প্রিয় ১০ তারিখ এসে গেছে। সুখ-দু:খের স্মৃতি ঘেরা ১০ তারিখ তন্ময়ের শ্বাস-প্রশ্বাসের বার্তা বাহক। প্রতি মাসের এই তারিখ তন্ময়কে দেখা যায় পর্যটন মোটেল ‘শিশির ইন্টারন্যাশনাল’ এর ১০ নং কামরায়।
ওযূ করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে তন্ময়। তারপর টেবিলের উপর রাখা ফুলগুলো হাতে নেয়। মধ্য রাতের অন্ধকারে ধীর গতিতে এগিয়ে যায় একটা কবরের পাশে। যেখানে চিরনিদ্রায় আছে তন্ময়ের প্রাণপ্রিয় তম। পেছনে ফুলের তোড়া রেখে পশ্চিমমুখী হয়ে বসে তন্ময়। দু’হাত তুলে আল্লাহ্র দরবারে দোয়া করে কবরবাসীর জন্য। ইহজনমে তার দেখা না পেলেও পরজনমে যেন তার দেখা পায় তন্ময়। দোয়া শেষে অপেক্ষায় থাকে ভোরের সূর্যদ্বয়ের। এই সময়টুকু শুধু নীরবতায় কাটে। দু'চোখের অশ্রু আর শিশির একাকার হয়ে যায় কবরের মাটিতে।
পাখিদের কলকাকলীতে সূর্যদ্বয়ের আভাস পায় তন্ময়। পেছন থেকে শিশির সিক্ত ফুলগুলো হাতে নেয়। আলতোভাবে কবরের উপর রাখে। ভেজা ভেজা কণ্ঠে বলে - ঃ
Happy Birthday to You Tomo. শুভ জন্মদিন তম। তম, ক্ষমা করে দিও। শুধু শুনেছিলাম ১০ তারিখ তোমার জন্মদিন। মাস, বছর কিছুই জানা হয় নি। তাই তো প্রতি মাসের এই দিনটিতে তোমাকে শুভেচ্ছা জানাতে আসি। কি অদ্ভুত মিল ভেবে দেখেছো তম? তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছে ১০ তারিখে। আমার ভালবাসার কথা জানিয়েছিলাম ঐ একই দিন। তোমার চিঠিতে আমার ভালবাসার স্বীকৃতি পেয়েছিলাম ১০ তারিখেই। কিন্তু দু:খের বিষয় কি জানো তম? তোমার ভালবাসায় আমি সিক্ত ছিলাম কয়েক ঘন্টা। তারপর তোমার লাল বেনারসি তোমাকে আনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম না ঐ ১০ তারিখ আমার জীবন থেকে তোমাকে কেড়ে নেবে। এবার তুমিই বল তম, কি করে এই দিনটি আমি ভুলে থাকি? কি করে এই দিনে তোমার কাছ থেকে দূরে থাকি? না তম, আমি কিছুতেই পারবো না তোমাকে ভুলে থাকতে, আমার ভালবাসাকে ভুলতে। এই তম, তুমি কি পারো না আবার জেগে উঠতে? পারো না তবে আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যেতে? এভাবে আমি আর পারি না তম। আমি তোমার কাছে যেতে চাই। তোমার কোলে মাথা রেখে থাকতে চাই। একবার আমাকে দেখ তম। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। আমি একা, শুধু একা।
কিছুক্ষণ তন্ময়ের চোখ হতে অঝোর ধারায় লবণাক্ত কষ্টগুলো বের হয়। তারপর দু’হাতে আলতোভাবে চোখ মুছে পকেট থেকে সাদা একটা কাগজ বের করে। তাতে লেখা একটা কবিতা। ঃ
তম, তোমার জন্য একটা কবিতা লিখেছি। রেখে গেলাম। তুমি নীরবে পড়ে নিও। এখন আমাকে বিদায় দাও তম। আবার দেখা হবে এই দিন। যেদিন তোমাকে মাল্য দিয়ে বরণ করতে আসব। তুমি অপেক্ষায় থেকো তম।

তমাদের পারিবারিক কবরস্থান। এখানে শুয়ে আছে তমার দাদা-দাদীসহ তাদের আত্মীয়-স্বজন। সাধারণত কবরস্থানে মেয়েদের আসা ঠিক নয়। তবুও মাঝে মাঝে দেখা যায় ওদের পরিবারের কাউকে কাউকে। যাদের বেশ ভূষা থাকে বোরকা। অথচ এ রকম তো কাউকে দেখা যায় না। ঠিক ফজরের নামাজের পর। সূর্য সবেমাত্র উঁকি দেওয়ার কথা ভাবছে। আর তন্ময় অপেক্ষায় আছে টি.টি.পাড়া স্টেশনে ট্রেনের জন্য। ওখান থেকে দেখা যায় তমাদের কবরস্থান। ট্রেনে উঠলে আরো ভালভাবে দেখা যায়। ট্রেনে যাওয়ার সময় চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে তন্ময়। ট্রেন এসেছে স্টেশনে। ব্যস্ত সবাই। তন্ময় গিয়ে বসে ওর সিটে। তাকিয়ে থাকে বাইরে। চোখ স্থির ঐ কবরে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। কে ওখানে? তবে কি ওর তম কবিতা পড়ছে? তা কি করে সম্ভব? দু’হাতে চোখটা পরিষ্কার করে নেয়। না না, এ তো সেই আকাশী রঙের স্যালোয়ার কামিজ, সোনালী-কালো বর্ণের কেশরাজী, দূর থেকে যতটা বোঝা যায় তাতে ওর তম। ট্রেনের মধ্যে ছুটাছুটি করে তন্ময়। মাথায় শিকল টানার বুদ্ধি দেয় একজন। তাড়াতাড়ি নামে। দৌড়ে যায় কবরের কাছে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। এমন কি তন্ময়ের দেওয়া ফুল, কবিতা কিছুই নেই। তাহলে কি আমার তম বেঁচে আছে? না কি বিধাতা ওকে পাঠিয়েছে আমার ডাকে সাড়া দেবার জন্য? আর কিছুই ভাবতে পারে না তন্ময়। মাথাটা ভীষণ ধরেছে ওর। ট্রেনটাও ফেল করল। ঢাকায় ফিরে যাওয়ার ট্রেন আবার বিকেলে। সোজা বাস স্ট্যান্ডে যায় তন্ময়। ঢাকা ফিরে আসে মাথার মধ্যে একগোছা প্রশ্ন নিয়ে। হয়ত ওর তমা ফিরে এসেছে।

কবরস্থান থেকে বাসায় ফিরে ঘরের দরজা লাগিয়ে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে একটা ভাজ করা কাগজ খোলে। ওখানে গোটা গোটা অক্ষরে সাজানো আছে একটা কবিতা। মনোযোগ দিয়েই কবিতাটা পড়ে মেয়েটি।

তন্ময়

হাজারও কথামাল্য নিয়ে অপেক্ষা করছি
তোমাকে বলার জন্য।
এই তম, কথা বল-
তুমি না বললে
থেমে যাবে শিল্পী কণ্ঠের গান
সকাল-সন্ধ্যা শুনবে না কেউ পাখিদের কলতান।

হাজারও চোখের জ্যোতি এনেছি
তোমাকে দেখার জন্য।
এই তম, একটু দেখো-
তুমি না দেখলে
পৃথিবীর আলো নিভে যাবে চিরতরে
ভোরের সূর্য ফিরে যাবে গভীর অন্ধকারে।

হাজারও পূজার অর্ঘ্য এনেছি
মোর দেবতার তরে।
এই তম, গ্রহণ কর-
তুমি যদি না নাও
ফুলগুলো সব ঝরে যাবে অভিমানে
মন:দেবতার পূজার অর্ঘ্য থাকবে না কোনখানে।

হাজারও হৃদয়ের স্পন্দন এনেছি
তোমায় ভালবাসব বলে।
এই তম, একটু ভালবাসা দেবে
তুমি ভাল না বাসলে
সফল হবে না কারো মনের আশা
তুমিই আমার পূজার অর্ঘ্য, তুমিই ভালবাসা।

* * *

কবিতা পড়ে চোখের জল স্থির রাখতে পারে না মেয়েটি। তবে মনে প্রশ্ন জাগে কে এই তন্ময়? আর কেনই বা কবরের কাছে প্রতি মাসে ফুল রেখে যায়? কী সম্পর্ক ছিল তমার সাথে তার? এগুলো জানতেই হবে মেয়েটি। প্রয়োজনে দেখা করতে হবে তন্ময়ের সাথে। যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে তন্ময়কে। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এল তমার ডায়েরী। হ্যাঁ, বহু কষ্টে তমার ডায়েরী খুঁজে বের করে। পড়তে থাকে।
১০ মার্চ, ২০০৪ খ্রি. রাত-১১.২০টা।
আজ হঠাৎ একজন চেনা মানুষের সাথে দেখা হল। চেনা বলতে তানিয়ার কাছে শুনতে শুনতে চেনা হয়ে গেছে। তার নাম তন্ময়। প্রথম সাক্ষাতে যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, তাতে মনে হয় আমাকে আর কখনো দেখেনি। অনেকটা সময় কাটালাম তার সাথে। তেমন কোন কথা হল না। শুধু চেয়ে থাকা। আর পরিচয়। সন্ধ্যা হয়ে গেল। ফিরে আসা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। এখন তো ঘুম আসছে না। জানি না তারও এমন হচ্ছে কিনা?
১০ মার্চ, ২০০৫ খ্রি. রাত-১২টা।
একজন প্রিয় মানুষের সাথে দেখা হওয়ার এক বছর পূর্তি। কেন জানি সে আমার প্রিয় মানুষদের তালিকায় এসে গেছে। আমার প্রিয় মানুষদের তালিকায় মামা-বাবা, ছোট বোন। ফ্যামিলির আর কাউকে আমার ভাল লাগলেও প্রিয় মানুষ হতে পারে নি। অবশ্য একজনের কথা না বললেই নয় আমাদের তানজীর স্যার। এছাড়া যতদুর মনে পড়ে আমার তন্ময়। ডায়েরী লেখা আমার স্বভাবে নেই। কিন্তু মনের কথাগুলো তো তন্ময়কে জানাতে পারবো না। তাই ডায়েরীর পাতায় এঁকে রাখবো। অবশ্য মাসে একবার। সেই ১০ তারিখ। কারণ ঐ দিন তন্ময়ের সাথে আমার প্রথম দেখা।
১০ এপ্রিল, ২০০৫ খ্রি. সকাল-৯টা।
স্কুল বন্ধ। বাসায় একা একা মন বসছে না। বাবা-মা কেউই বাসায় নেই। সবাই ছোট ভাইকে নিয়ে শপিং এ গেছে। তাই তো তাকে লিখছি। প্রতি মাসের ১০ তারিখ তার কথা বেশি মনে পড়ে।
১০ মে, ২০০৫ খ্রি. সকাল-৬টা।
বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। আম্মা খিচুড়ি রান্না করেছে। বেশ মজা করে খাওয়া যাবে। কিন্তু খাওয়ার টেবিলে যদি তন্ময় থাকতো কি মজাই না হত!
১০ জুন, ২০০৫ খ্রি. রাত-১২টা।
আজ কিছুতেই দু'চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। অপেক্ষায় থাকলাম তার ফোনের। ঠিক বারটায় সে আমাকে ফোন দিল। সারা রাত তার সাথে কথা হল। কিন্তু আমি একবারও তাকে তুমি বলতে পারলাম না।
১০ জুলাই, ২০০৫ খ্রি. রাত ১টা।
প্রায়ই আমাদের ফোনে কথা হয়। আর প্রতিদিন দেখা হয়। কারণ আমি তার কাছে পড়তে শুরু করেছি তানিয়ার সাথে।
১০ আগস্ট, ২০০৫ খ্রি. রাত-১২টা।
আজ আমার জন্মদিন। কেউ আমাকে ঈবষবনৎধঃব করল না। সে তো জানেই না। অবশ্য বেশ কয়েকদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। কিন্তু আমি তাকে জানাই নি। পাছে আমাদের বাড়িতে আসে এই ভয়ে।

১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৫ খ্রি. সন্ধ্যা-৬টা।
একটু আগে তার সাথে দেখা করে এলাম। আজকে তন্ময়ের সাথে অনেক গল্প করেছি। ওদের বাসার ছাদে ছিলাম। ওর বন্ধুদের সাথেও আমার পরিচয় করিয়ে দিল। অবশ্য পরিচয় করার সময় বলেছিল ওর ছোট বোন তানিয়ার বান্ধবী। তখন আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলাম আমার সাথে তো তার কোন সম্পর্কের কথা হয়নি। তবে ছাত্রী বলেনি এটা আমার ভাগ্য।
১০ অক্টোবর, ২০০৫ খ্রি. দুপুর-২টা।
মা খাবার জন্য খুব ডাকছে। কিন্তু আমি যাচ্ছি না। কারণ জানি না। তবে মনে হচ্ছে তন্ময়ের জন্যে মনের মধ্যে কোন স্থান ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
১০ নভেম্বর, ২০০৫ খ্রি. বিকেল-৪.৩০টা।
বাইরে যাওয়ার প্রস্ত্ততি নিলাম। মা নিষেধ করলেন। তাই তো মন খারাপ করে শুয়ে থাকলাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি। দেখলাম আমার তন্ময় যাচ্ছে। মনটা আপনা-আপনিই ভাল হয়ে গেল।
১০ ডিসেম্বর, ২০০৫ খ্রি. রাত-১০টা।
আজ শুক্রবার। আগামীকাল আমার গণিত পরীক্ষা। তানজীর স্যার বলেছেন, গণিত পরীক্ষার আগের রাতে বেশি রাত জাগা উচিত নয়। তাই এখন ঘুমোবো।
১০ জানুয়ারি, ২০০৬ খ্রি. রাত-১টা।
জানি না তন্ময়কে আমি ভালবাসি কি না? তবে ওর জন্য মন কেমন কেমন করে তা বুঝতে পারি। আজও তা করছে।
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ খ্রি. রাত-৩টা।
বাবা আমাকে বললেন ওষুধটা খেয়ে ঘুমোতে। কিন্তু ঘুম যে আসছে না। কি করে বাবাকে বোঝাবো আমার ঘুম আর আসবে না। আমি একবারেই ঘুমোবো। গত কয়েকদিন আমি হাসপাতালে ছিলাম। বাবা-মা ছাড়া আর কেউ জানে না আমার কি হয়েছে। শুধু আমি জানি আমার ক্যান্সার হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন ছয় মাস থেকে এক বছর আমি সুস্থ মানুষের মত বেঁচে থাকতে পারবো। তার পর .........। যাহ্ চোখে পানি এসে গেল। ডাক্তারের সাথে বাবার যখন আলাপ হয়, তখন আমি শুনেছিলাম। তবে আমি কাউকে বুঝতে দিই নাই। মাঝে মাঝে মাকে দেখি নীরবে কাঁদতে। মায়ের কান্না আমাকে খুব কষ্ট দেয়। তবু আমি মাকে বলি মা, আমাকে নিয়ে এত কান্না কর কেন? দেখো মা, আমি ঠিকই অ+ এনে দেবো। সেদিন মা আমাকে জড়িয়ে ধরে এত কেঁদেছিল। তা এখন বুঝছি। আমার কোন কাজেই মা-বাবা না করেন না। আমাকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে বলে আমি স্বাধীন। আর এতদিন ছিলাম পরাধীন। আমার এই কথাটি কিছুতেই তন্ময়কে বলতে পারবো না। কোনদিন না। ওকে ভালবাসার কথাও বলতে পারবো না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর চোখের আড়ালে যেতে হবে। আল্লাহ্কে বলি আমার পরীক্ষা পর্যন্ত সুস্থ রেখো।
১০ মার্চ, ২০০৬ খ্রি. রাত- ৯টা।
আমার ভালবাসার ২য় বর্ষপূর্তি আজ। কিন্তু শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোলাম। আর মোবাইলের সাউন্ড অফ করে দিলাম।
১০ এপ্রিল, ২০০৬ খ্রি. রাত-১২টা।
বিগত ১১ তারিখ সকালে দেখলাম মোবাইলে ৫৪৯ টি গরংপধষষং উঠে আছে তন্ময়ের। পরদিন তন্ময়ের মান ভাঙ্গিয়েছিলাম অনেক কষ্টে। তবে সত্যি কথাটা বলিনি তন্ময়কে। কারণ ও যদি জানতে চায়। কি করে বলবো আমার ক্যান্সার হয়েছে? তোমার তমা আর বাঁচবে না।
১০ মে, ২০০৬ খ্রি. রাত-১২.৩০টা।
মাকে জানিয়ে তন্ময়ের সাথে ঘুরতে গেলাম বসুন্ধরা সিটিতে। তারপর ওখানে স্টার সিনেপ্লেক্স এ সিনেমা দেখলাম। রাত এগারোটাই বাসায় ফিরলাম। ঐদিন তন্ময় আমাকে বলেছিল আজ আমাকে একটা কথা বলবে। আমি বললাম এখন শুনবো না। সিনেমা দেখেন। না শুনে যে কতটা কষ্ট পাচ্ছিলাম, তা তোমাকে বোঝাতে পারবো না তন্ময়।

১০ জুন, ২০০৬ খ্রি. সকাল-৬টা।
ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম। ২ মাস তন্ময়ের সাথে দেখা করবো না। তবে চিঠি লিখবো।
১০ জুলাই, ২০০৬ খ্রি. রাত-১১টা।
তন্ময়কে তো চিঠি লিখতে পারলাম না। তবে ডায়েরীর পাতায় লিখে রাখলাম যদি কখনো তন্ময়কে দেখাতে পারি।

ক্ষণকাল পেরিয়ে আজও আবার এসেছি সেই একটি রাতে। ক্ষণিকের জন্য হলেও দেখার আনন্দ খুব মধুর। কিন্তু এখন? বিরহের দিনগুলি গুণতে গুণতে প্রতিটি প্রহর কেটে যাবে। কিন্তু দেখা পাওয়া যাবে না সেই প্রিয় মুখটির। হয়তবা কল্পনার সাগরে অনেক দূরে যাওয়া যাবে। যেখানে থাকবে না পৃথিবীর কোন মানুষ, এমন কি নিজের অস্তিত্ব। কিন্তু বাস্তব কি এতই সহজ? এই নিষ্ঠুর বাস্তবের মোকাবেলা করতে গিয়ে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে, এমন কি জীবনকে ভয়ানক এক বিপদের সম্মুখে ফেলে দেয়। এরই নাম ভালবাসা। যা জীবনের কোন পরাজয় মানতে চায় না। কিন্তু আমি পরাজিত জীবনের এক অধ্যায় রচনা করা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবো না তোমাকে। তাই তো আমাকে মিথ্যার মধ্যে জীবনের কিছু অংশ চালু রাখতে হল। অবশ্য মিথ্যা না ভেবে কল্পনা ভাবাই ভাল হবে। কল্পনার সাগরে ডুব দিলে কত কি-ই না করা যায়। প্রিয়তমর খুব কাছে যাওয়া যায়। তোমাকে আমার ফুলশয্যার সাথী হিসেবে গ্রহণ করেছি। নিশ্চয়ই আমাদের দেখা হবে মরণের পরে।
১০ আগস্ট, ২০০৬ খ্রি. রাত-১২.০১টা।
আজ আমার জন্মদিন। জানি না কবে আসবে আমার মৃত্যু দিন। বিধান দাতার কাছে একটিই চাওয়া এই একই দিন ১০ তারিখ যেন আমার মৃত্যু দিন হয়। যাতে সবাই আমার জন্মদিন মনে রেখে মৃত্যুর কথা ভুলে যায়।
১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৬ খ্রি. রাত-৯টা।
আমার প্রি- টেষ্ট পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা খুব ভালই হচ্ছে। তন্ময়কে বলে দিয়েছি। আমার পরীক্ষা পর্যন্ত বিরক্ত করা যাবে না। তন্ময় তখন খুব মন খারাপ করেছিল। অবশ্য পরে জানিয়ে দিয়েছি ফোন করা যাবে। কিন্তু সর্বোচ্চ কথা বলার সময় ১০ মিনিট। তন্ময় অবশ্য তাতেই রাজি হয়েছে।
১০ অক্টোবর, ২০০৬ খ্রি. সকাল-৯টা।
বাথরুমের সামনে হঠাৎ মাথা ঘুরে পরে গেলাম। মা দৌড়ে এলেন। তারপর কি হয়েছিল জানি না। জ্ঞান ফিরে দেখলাম আমার বিছানায় শুয়ে আছি। হাতে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। মা কাঁদছেন। বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমার মাথার কাছে। বাবাকে বললাম, আমার কি হয়েছিল বাবা? বাবা বললেন, কিছু না মা। তুমি মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিলে। বাবা অবশ্য আমাকে কখনো মা ছাড়া কথা বলেন নি। বাবা বলতেন, তুমি আমার বড় মেয়ে। একেবারে মায়ের মত হয়েছো। আমি না কি দাদী মারা যাওয়ার ৫দিন পর হয়েছিলাম। এই জন্য দাদীর নামের সাথে মিল করে আমার নাম রেখেছিল ইসরাত জাহান তমা।
১০ নভেম্বর, ২০০৬ খ্রি. রাত-১০টা।
সামনে আমার টেষ্ট পরীক্ষা। কিন্তু ডাক্তার বলেছেন রাত জাগা নিষেধ। তাই বেশি রাত লেখাপড়া করি না।
১০ ডিসেম্বর, ২০০৬ খ্রি. রাত-৮টা।
টেষ্ট পরীক্ষায় আমি গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছি। সব স্যাররা আমাকে নিয়ে স্কুলে গর্ব করেন। আমি স্কুলের মান রক্ষা করবো। বিশেষ করে আমার সব সাফল্যের পেছনে তানজীর স্যারের অবদান সবচেয়ে বেশি। এটা অবশ্য সবাই এখন অকোপটে স্বীকার করে।
১০ জানুয়ারি, ২০০৭ খ্রি. দুপুর-১টা।
নববর্ষের দিন বাবা আমাদের সকলকে বলেছিলেন নতুন বছরে সকলের চাহিদা দিতে। সবাই একটা করে লিস্ট দিল বাবার কাছে। যেখানে কারো ছিল নতুন জামা, কারো সাইকেল, কারো খেলনা। শুধু আমি কোন চাহিদা দিলাম না বাবাকে। আমার ঘরে চলে এলাম। বাবা আমার কাছে এসে বলল, ঃ
মারে, রাগ করেছো বুড়ো ছেলের উপর? ঃ
কেন বাবা, রাগ করবো কেন? ঃ
তবে যে ওভাবে চলে এলে? ঃ
ভাল লাগছিল না। ঃ
কেন মা, তোমার কোন চাহিদা নেই?
আমি আর চোখের জল আটকাতে পারলাম না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছি। বাবার বুকের মধ্যে মুখ গুজে খুব কেঁদেছিলাম। কিছুই চাইতে পারি নি। শুধু বাবাকে বলেছিলাম, ঃ
বাবা, আমি বাঁচতে চাই। আমাকে বাঁচাও বাবা। আমাকে তোমাদের কাছে রাখো। শক্ত করে আমাকে ধরে রাখো বাবা। আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না বাবা। এভাবে আমি আর পারছি না বাবা। জীবন থেকে পালিয়ে থাকতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা। ঃ
মারে, তুমি থামো। তুমি না আমার মা। মাকে তো এভাবে কাঁদতে নেই। তুমি বাঁচবে মা। তুমি অবশ্যই বাঁচবে।ঃ
না, বাবা। আমি তোমার মা। মা হয়েই চলে যাবো।
সেদিন বাবার কান্না আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না বাবার সেই কান্নার কথা। বাবা আমাকে এত ভালবাসেন জানতাম না। বাবারা সব কিছু দিতে পারে। কেন পারে না মৃত্যুর হাত থেকে মেয়ের জীবন ফিরিয়ে দিতে? কেন পারে না মায়ের কোলের ধন মাকে ফিরিয়ে দিতে? কেন পারে না? কেন মায়ের বুক খালি করে সন্তানকে কেড়ে নাও পৃথিবী থেকে? কেন মাকে ১০ মাস ১০দিন কষ্ট দিয়ে আবার মায়ের কোল থেকে ঐ সন্তান কেড়ে নাও? এ কোন নিষ্ঠুর নিয়ম বিধাতা? তুমি কি পরীক্ষা কর আমার মাকে? আমাকে কেড়ে নাও। কিন্তু আমার বাবা-মাকে কষ্টে রেখো না। আমি নিজেকে তোমার কাছে সঁপে দিলাম। কিন্তু আমার বাবা-মাকে শান্তিতে রেখো।
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ খ্রি. রাত-১০টা।
বাবা ঘরে এল। আমি কেমন আছি, পরীক্ষা কবে, প্রস্ত্ততি কেমন ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করল। দেখলাম বাবার চেহারাটা নষ্ট হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালো দাগ পরেছে। বহু রাত ঘুমায়নি। বাবাকে বললাম, ঃ
বাবা, তোমার চেহারাটা নষ্ট হয়ে গেছে। শরীরের প্রতি যত্ন নিও। ঠিকমত ঘুমাও না বোধ হয়। ঃ
তা কেন? সবই ঠিক হয়ে যাবে। তুমি এখন ঘুমোও মা।ঃ
বাবা, তোমাকে একটা কথা বলি রাগ করবে না তো? ঃ
বল মা, তোমার উপর আমি কখনো রাগ করেছি? ঃ
আমার পরীক্ষার পর গ্রামের বাড়িতে যাব। ঃ
বেশ তো যাবে। ঃ
না বাবা, আমি একা যাব না। ঃ
তবে? ঃ
আমরা সবাই মিলে যাব। তুমি অফিস থেকে ছুটি নিও। ঃ
ঠিক আছে, মা। নেবো।
প্রতি রাতে বাবা আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যায়। আমি বাবার সাথে গল্প করতে করতে ঘুম আসি। বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর আমি ঘুম আসলে বাবা আমার কপালে আদর দিয়ে চলে যায়। মাঝে মাঝে আমি বাবার সামনে ঘুমের ভান করি। বাবার আদর অনুভব করার জন্য।
১০ মার্চ, ২০০৭ খ্রি. রাত-৯টা।
আমার পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা খুবই ভাল হয়েছে। আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি গোল্ডেন এ প্লাস পাবো। মানুষের দোয়া আর নিজের চেষ্টা থাকলে সবই সম্ভব। তা আমি নিজের জীবনে বুঝেছি।
১০ এপ্রিল, ২০০৭ খ্রি. রাত-১২টা।
আজ তন্ময় আমাকে ভালবাসার কথা বলল। আমি কোন সম্মতি জানালাম না। চুপ করে সব শুনলাম আর নীরবে চোখের জল ফেললাম। একবার ভাবলাম তন্ময়কে বলি আমিও তোমাকে খুব ভালবাসি। কিন্তু আমার যে বিদায় জানাতে হবে তোমাদের পৃথিবীকে। এই ভয়ে তন্ময়কে কিছুই বলতে পারলাম না। আমার নীরবতায় তন্ময় শুধু বলল, ‘‘এই তম, কথা বল’’। তারপর কখন যে লাইনটা কেটে দিয়েছিলাম বলতে পারবো না। সকালে আমাদের ফ্যামিলি সফর। উদ্দেশ্য গ্রামের বাড়ি। তন্ময় জানে তবুও ওকে জানিয়েছিলাম। তবে যেতে বলিনি তাই ও খুব রাগ করেছিল। নিশ্চয় একদিন ওকে আমাদের গ্রামে আসতে বলব সাথে লাল বেনারসি।
০৯ মে, ২০০৭ খ্রি. রাত ৮টা।
বহু দিন পর আজ আমাদের বাড়িতে খুব আনন্দ হচ্ছিল। তাই ওদের আনন্দ নস্যাৎ করতে চাইনি আমি। প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছিল। একবার বমিও হয়েছে। শুধু রক্ত আর রক্ত। আগামীকাল ডায়েরী লেখার দিন। বুঝতে পারছি না কাল সকাল হবে কি না আমার জীবনে। তন্ময়কে চিঠি দিয়েছি। নিশ্চয় কাল পাবে। তারপর আমাকে দেখতে আসবে। যদি দেখে আমার লাশ। তাহলে কি আমার প্রতি ওর ভালবাসা থাকবে? এই ভয়ে আগেই জানিয়ে দিয়েছি সাদা বেনারসির অপেক্ষায়। কিন্তু তনিমা তো বিদেশে আছে বড় ফুফুর কাছে। কি করে ওকে জানাবো? ডায়েরীতে লিখে রাখি। যদি কখনো ওর চোখে পড়ে। তন্ময় যদি ওকে তমা ভাবে, তাহলে যেন ও তন্ময়কে ভুল না বোঝে। আসলে তন্ময় খুব ভাল। একবার ওর সাথে দেখা হলে বুঝবে তনিমা। কিন্তু তন্ময় শুধু তমাকে ভালবাসে। তবে কি ও তনিমাকে গ্রহণ করবে? তনিমার সাথে আমার চেহারার হুবহু মিল। শুধু পার্থক্য ঠোঁটের ঐ তিল। তনিমার ঠোঁটে তিল নেই। কিন্তু আমার আছে। তন্ময়ের কাছে তো এই তিলটা পৃথিবীর স্বর্গ। জানি না কি হবে? আর ভাল লাগছে না। তাছাড়াও অনেক রাত হয়ে গেছে। আজকে বাবার সাথে ঘুমোতে ইচ্ছা করছে।
সেদিন রাতে তমা বাবাকে ডেকে বলে, ঃ
বাবা আজ তোমার সাথে ঘুমোতে ইচ্ছা করছে। ঃ
বেশ তো ঘুমোবে। লোকজন এসেছে। তাদের আপ্যায়ণ করে আসি।ঃ
না বাবা। সবাইকে চাচ্চুর কাছে দিয়ে আসো। আর আমার লক্ষ্ণি মাকে ডাকো।ঃ
ঠিক আছে।
বাবা আর মা আসে তমার ঘরে। বাবা বাম দিকে আর মাকে ডান দিকে নিয়ে বিছানায় শোয় তমা। সারারাত তাদের সাথে কথা বলার অঙ্গিকার করে। মাকে বলে ছোটবেলায় যেভাবে ওকে কোলের কাছে নিয়ে শুয়ে থাকতো আজকেও সেভাবেই শুতে চায় তমা।ঃ
মা হচ্ছে আমার বেহেশ্ত। আর বাবা আমার বেহেশ্তের ঠিকানা।
মেয়ের মাথায় হাত রেখে মা শুধু চোখের জল ফেলে। আর তমা বাবাকে বলে, ঃ
বাবা, মনে কর আমি যদি আজ রাতে মারা যাই।ঃ
ছি: মা, ওসব কথা মুখে আনতে নেই। ঃ
সত্যিই বাবা। আমার শুধু দাদা-দাদীর কথা বেশি মনে হচ্ছে। স্যার বলেছিল মৃত্যুর সময় শুধু মরা মানুষের কথা বেশি মনে হয়। বাবা ? ঃ
বল মা। ঃ
আমার অসুখ না হলেও কি তুমি আমাকে এত ভালবাসতে? ঃ
প্রত্যেক বাবা মা-ই তার সন্তানকে ভালবাসে মা। বাবা-মায়ের ভালবাসায় সন্দেহ করতে নেই। এতে অমঙ্গল হয়। ঃ
আর কি অমঙ্গল হবে বাবা? এর চেয়ে কি বেশি অমঙ্গল আছে পৃথিবীতে? বাবা মায়ের ভালবাসা যেদিন বুঝতে শিখলাম, সেদিন দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে। এ কোন মঙ্গল বাবা, বলতে পারো? ঃ
মারে, একটু ঘুমোনোর চেষ্টা কর। ঃ
হ্যাঁ বাবা। আমি ঘুমোবো। চিরশান্তির ঘুম। তোমার আর মায়ের আর কষ্ট করতে হবে না আমার জন্য। আর না খেয়ে বসে থাকতে হবে না তমার জন্য। মাগো, সেদিন তোমায় না বলে তন্ময়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম মনে করে তুমি খুব রাগ করেছিলে। সত্যি মা, আমি সেদিন তন্ময়ের সাথে দেখা করতে যাইনি। আমি এক বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলাম। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো তো মা? এই মা, আমার সাথে কথা বলবে না?
মা কিছুই বললেন না। শুধু চোখের পানি ফেললেন। আর মেয়ের মুখের উপর মুখ নিয়ে মাথা নাড়া দিয়ে বোঝালেন মা রাগ করেনি। তারপর আর ভোরের আলো দেখেনি তমা।
এই করুণ কষ্ট সহ্য করতে হয়নি তনিমার। সে সময় ও বিদেশে ছিল। দেশে আসার পর আপুকে দেখার জন্য অস্থির হয় তনিমা। ঢাকা থেকে চলে আসে গ্রামে। যে পরিস্থিতি দেখে তাতে স্থির থাকতে পারে না। প্রতিদিন কবরের কাছে গিয়ে কান্নায় বুক ভাসায়। আজ আবার ডায়েরী পেয়েছে আপুর। ঘরে দরজা বন্ধ করে এতক্ষণ ডায়েরী পড়ল তনিমা। খুব আগ্রহ দেখায় তন্ময়ের সাথে দেখা করার। কিন্তু পারে না। অপেক্ষায় থাকে আগামী মাসের ১০ তারিখের। যেদিন তন্ময় আসবে তমার কবরে ফুল দিয়ে আশির্বাদ করতে। তনিমা অপেক্ষায় থাকে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের।

ঘড়িতে ঠিক ১২টা। আজ ১০ তারিখ। তমার জন্মদিন। প্রচন্ড শীতের রাত। বাইরে কোন পাখির শব্দও নেই। অভিসারে নেই কোন প্রিয়া। শুধু তনিমা অপেক্ষা করছে কখন ভোর হবে। তন্ময়ের সাথে দেখা করবে। জানালা খুলে তাকিয়ে আছে কবরস্থানের দিকে। ঘন কুয়াশায় ঘেরা চারিদিক। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবুও তাকিয়ে আছে তনিমা। ওর পরনে সেই লাল বেনারসি। যা কি না তন্ময় এনেছিল তমার জন্য। সে সৌভাগ্য তমার না হলেও তার জায়গা পূরণ করতে অপেক্ষা করছে তনিমা। তনিমা কি তন্ময়কে ভালবেসে ফেলেছে? না কি তন্ময়ের প্রতি করুণা দেখাবে? সামনে গেলে কি ভাববে তন্ময়? কত ভাবনায় পতিত হয় তনিমা। ফজরের আযান শুনতে পায় তনিমা। বাইরে বেরিয়ে পরে তন্ময়ের উদ্দেশ্যে। কবরস্থানের সামনে গিয়ে দেখে তমার কবরের সামনে সাদা পাঞ্জাবী, মাথায় সাদা টুপি পরা এক ভদ্রলোক কি যেন মিনতি করছে। তনিমার বুঝতে বাকি থাকে না এই সেই তন্ময়। কাছে এগিয়ে যায় তনিমা। ঠিক তন্ময়ের পেছনে। কোন কথা বলে না। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আর চোখের জলে বুক ভাসায়। তন্ময়ের প্রলাপ শুনতে পায় তনিমা। তন্ময় বলছে, ঃ
তম, তুমি কি আবার জেগে উঠবে? না কি এখনো বেঁচে আছো? আমাকে কষ্ট দিয়ে তুমি কি সুখ পাও? বল তম। শুনেছি বড় বড় পীর ব্যক্তিরা কবর থেকে জবাব দিতেন। তুমি কি পার না আমার সাথে কথা বলতে? সেদিন তোমাকে এক পলক দেখলাম। সেটা কি আমার ভুল? না কি তুমি আমার কাছ থেকে শুধু পালিয়ে থাকতে চাও? তাই যদি থাকবে, তবে কেন ভালবেসেছিলে? কেন? সবই কি মিথ্যা ছিল তম?
পেছন থেকে জবাব আসে ‘না’। ঃ
না!
চমকে ওঠে তন্ময়। পেছন ফিরে তাকায়। দাঁড়িয়ে আছে তম। তন্ময়ের তম। পরনে লাল বেনারসি। এতদিন পর একটুও পরিবর্তন হয়নি তমার মধ্যে। সেই ঠোঁট, চোখ,নাসিকা, কপলের উপর কয়েকটি চুল। সবই মিল আছে। লাফ দিয়ে দাঁড়ায় তন্ময়।ঃ
তম, তুমি! আমি কি স্বপ্ন দেখছি, না সত্যি? ঃ
সত্যি। ঃ
তুমি আমার তম? ঃ
তা তো জানি না। শুধু জানি তন্ময়ের কাছে আমি তম।ঃ
তার মানে! কী বলতে চাও তুমি?ঃ
ঐ যে বললাম।ঃ
নাহ্। তুমি আমার তম হতে পারো না। ঃ
কেন পারি না? আমার দিকে তাকিয়ে দেখ তোমার তমকে খুঁজে পাবে।ঃ
তোমার সাথে তমর চেহারা হুবহু মিল। তবে তোমার ঠোঁটে তিল নেই। সুতরাং তুমি আমার তম নও। আমার তম ওখানে ঘুমিয়ে আছে। ঃ
হ্যাঁ, তোমার তম ওখানে ঘুমিয়ে আছে। আমি ওর ছোট বোন তনিমা। আপুর মৃত্যুর সময় দেশের বাইরে ছিলাম। ওখান থেকে ফিরে আপুর মৃত্যুর কথা শুনলাম। আপুর প্রতি আমার ভালবাসা একটু বেশি। হয়ত আমরা বাবা-মায়ের জমজ সন্তান ছিলাম তাই। আপুর জন্ম আর মৃত্যুর দিন একই বলে প্রতি মাসের ১০ তারিখে আমি আপুর কবর যিয়ারত করতে আসি। কিন্তু প্রতি বারই আপুর কবরে ফুলের তোড়া পাই। আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না কে আমার থেকেও বেশি আপুকে ভালবাসে? তারপর তোমার কবিতা পেলাম। আপুর তন্ময়কে খুঁজে বের করার জন্য আপুর ডায়েরী পড়লাম। তোমাদের সব কথা জানলাম। মনে হল তোমার সাথে দেখা করা দরকার। ঃ
বেশ তো, দেখা যখন হয়েছে এখন যাও।ঃ
আপুর শেষ অনুরোধটা আমি রক্ষা করতে চাই। ঃ
কি? বল। ঃ
সারা জীবন তন্ময়ের তম হয়ে থাকতে চাই। ঃ
তা সম্ভব নয় তনিমা।ঃ
কেন সম্ভব নয়? ঃ
তুমি তো জীবনের বেশির ভাগ সময়ই বিদেশে কাটিয়েছ। তুমি কি করে বুঝবে মাটির মমতা? বুঝবে না। ভালবাসা শব্দটা বড় পবিত্র। কেউ যদি ভালবাসার মর্যাদা দিতে না পারে, তবে তার বেঁচে থাকা অর্থহীন। তমকে আমি ভালবাসতাম, ভালবাসি এবং ভালবাসব। হতে পারে তোমার চেহারা তমর মত। হতে পারে তোমার পরনের শাড়ি আমার দেওয়া তমর শাড়ি। কিন্তু তোমার মন তো আমার তমর মনের মত নয়। তোমাকে একটা অনুরোধ করবো। রাখবে? ঃ
বল। ঃ
তুমি আমার তম হতে চেও না। ঃ
কিন্তু আপুর শেষ অনুরোধ।ঃ
জানো তনিমা, তম আমাকে একবার বলেছিল ‘‘যদি কখনো আমি মরে, কিংবা চলে যাই কোথাও, তবে কি আপনি আমাকে মনে রাখবেন?’’ আমি সেদিন বলেছিলাম, ‘‘ তোমাকে ভুলে যাবার আগে যেন আমার মরণ হয়।’’ তম আমাকে এত ভালবাসত, অথচ আমাকে তুমি করে বলেনি কখনো। এমন কি ভালবাসার কথাও বলেনি। আমি যেদিন ওকে ভালবাসার কথা বলেছিলাম, সেদিন শুধু কেঁদেছিল। ও জানতো আমি ওকে পাবো না। তাই তো আমি যাতে কষ্ট না পাই, সেজন্য দূরে চলে আসে। আবার তোমাকে লিখে গেছে তমর মতো ভালবাসতে। কিন্তু আমি পারবো না তনিমা। কখনোই পারবো না। আমার তমকে ছাড়া আর কাউকে গ্রহণ করতে পারবো না। তুমি আমাকে ক্ষমা করো তনিমা। পারলে তুমি আবার ঐ দেশে চলে যাও। নইলে তোমাকে দেখে যদি আমি ভুলে যাই আমার তমকে। ঃ
তাই হবে। তুমি যা বলবে তাই হবে। কেউ না জানুক আমি তো জানি তমা তোমাকে কত ভালবাসত। তার ভালবাসার অধিকার নিয়ে শুধু একটাই দাবী, তোমার এই লাল বেনারসি আমি নিয়ে যেতে চাই। আর কবিতা। আপুর শেষ কথাটা রক্ষা করতে না পারলেও জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই তার স্মৃতিকে আগলে রেখে। তোমার কাছে এই অনুমতি ভিক্ষা চাই তন্ময়। ঃ
দু:খ করো না তনিমা। তোমার জীবন তো সবে শুরু হয়েছে। ভোরের আলো আসার সময় এখনো পার হয়ে যায় নি। এই আমাকে দেখো, কীভাবে বেঁচে আছি? এই জীবন, জীবন নয় তনিমা। নতুন করে সাজিয়ে নাও নিজেকে। তোমার জীবনের ভোরকে শেষ হতে দিও না। শুকাতে দিও না ভোরের শিশির।
তন্ময় পেছনে তাকিয়ে দেখে তনিমা চলে গেছে। কুয়াশার আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে ওর চলার পথ। শুধু শিশিরে মিশে আছে পদচিহ্ন। তন্ময় নিজেকে আর স্থির রাখতে পারে না। তমাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ঃ
তম, তুমি আমাকে কোন বিপদের মধ্যে ফেলে গেলে। আমি তো শুধু তোমার হতে চেয়েছিলাম। অন্য কারো নই। তম, তুমি কি শুনতে পাচ্ছ আমার কথা। তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারবো না তম। তম, তুমি তো আমার সেই ভোর। যে ভোরের শিশিরে আমি প্রতিদিন তোমার পদচারণা শুনতে পাই। আমি কিছুতেই পারবো না সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছতে। বিন্দু বিন্দু ভালবাসার শিশিরে যে তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। সেই তোমাকে আমার হৃদয় থেকে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারবো না তম। কিছুতেই না পারবো না। এই তম, চুপ থেকো না। কথা বল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
Haider খুব ভালো লাগলো
আবু ওয়াফা মোঃ মুফতি বেশ ভালো লাগলো নাটকীয়তা|
আহমেদ সাবের ভীষণ আবেগ-ঘন, রোদনভরা, রোমান্টিক একটা কাহিনী। গল্পটা বেশীরভাগ পাঠকের চোখে জল আনতে বাধ্য। বেশ ভাল লাগল গল্প।
Sisir kumar gain সুন্দর গল্প।ধন্যবাদ।
স্বাধীন কষ্টের গল্প অনেক ভাল লাগল
মিলন বনিক অনেকটা নাটকীয়..চোখে জল এলো...খুব ভালো লাগলো এত নিখাদ প্রেমের গভীরতা দেখে...অনেক অনেক ভালো লাগা....
সূর্য ভাল লাগলো গল্পটা।
খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি 1o diye din lipi ...sundor kahini bornona khub valo laglo golpo...polash vai onek suvo kamona sapnar jonno....
মাহবুব খান গল্পকবিতা ডট কম এবার সার্থক / আপনার মত যুইফুল ও জমজ গল্পকবিতার জননী / আপনার ভালোবাসার গল্প মন কেড়েছে
সিয়াম সোহানূর অনন্য গাঁথুনির পরিচ্ছন্ন গল্প। বিষয় ও ভাষা- নৈপুণ্য চমৎকার। ধন্যবাদ পলাশ ভাই।

২২ নভেম্বর - ২০১১ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "একাকীত্ব”
কবিতার বিষয় "একাকীত্ব”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মে,২০২১