লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ নভেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৪৪টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৪

বিচারক স্কোরঃ ২.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ০.৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftউচ্ছ্বাস (জুন ২০১৪)

নৈমিত্তিক কষ্টে উচ্ছ্বাসের মৃত্যু
উচ্ছ্বাস

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৪

জাকিয়া জেসমিন যূথী

comment ১৬  favorite ০  import_contacts ১,৪৩৮
।এক।

কলাবাগান থানার কাছে চারতলা চকচকে দালান। বাড়ির নাম তৈয়েব হোম। বাড়িওয়ালা তৈয়েবুর রহমানের নামে রাখা।

জুলাই দু’হাজার তেরো সাল। জান্নাতুন ও জনাব মেজবাহ ইসলামের বড় ছেলে জহিরের বিয়ে। বাড়িতে সাজ সাজ রব। বিভিন্ন জেলা থেকে দেশের সমস্ত আত্মীয় স্বজন এসে ঘর ভরে যাচ্ছে। বিয়ের এখনও সপ্তাহখানেক বাকী। প্রায় প্রতি দিন ও রাতে বসছে নাচ গান ও বিয়ের কেনাকাটার আলোচনার আসর। এ বাড়িতে জান্নাতুন নিজের বাবা-মা ও চার ভাই–বোন-ভাগ্নে-ভাগ্নি-ভাস্তে-ভাস্তি সবাইকে সাথে নিয়েই থাকে। একেক ফ্লোরে। জান্নাতুন থাকে দোতলায়। এখানে শুধু তার এক বোন থাকে না। সে ইশরাত ও ইশমা দুই মেয়ের মা নসিবাতুন। ওর স্বামী ফয়েজ আলী তবলিগ করে, নবী সাহাবীদের নিয়ম অনুযায়ী চলাফেরা করে। এ বাসার সবাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলেও সাহাবীদের নিয়ম অনুযায়ী চলে না বলে নসিবাতুন তার স্বামীকে এ বাসায় থাকার ব্যাপারে রাজী করাতে পারে নাই। এখানে সবাই নিজেদের ফ্লাটে থাকলেও তাকে তাই স্বামীর সাথে নাখালপাড়া এলাকায় ভাড়া বাড়িতেই থাকতে হয়। সেখানে হোসেন আলী গার্লস স্কুলে মেয়ে দুটো পড়ে সেই প্রথম শ্রেণি হতেই।

নসিবাতুন ও ফয়েজ আলী সম্পর্কে কিছুটা বিবরণ দেয়া যাক। পূর্ব নাখালপাড়া রেললাইন সংলগ্ন মসজিদের পাশেই তিনতলা বিল্ডিঙের দোতলায় ওদের বাসার মূল দরজা দিয়ে ঢুকেই বসার ঘর। সে ঘরে কোন সোফা নেই। বড় শতরঞ্চি পাতা যাতে মেহমান আসলে সবাইকে নিয়ে শতরঞ্চিতে সাহাবাদের মতো করে পা ভাঁজ করে বসা যায়। একটা কাঠের বুকশেলফ, তাতে তিনটা তাক। এক তাকে শুধু জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখা। পাতলা পাতলা দশটি জায়নামাজ। তার উপরের তাকে রাখা রেহেল। থরে থরে কাঠের ও প্লাস্টিকের রেহেল সাজানো। একেবারে উপরের তাকে রাখা আছে কোরআন শরীফ আর এক পাশে হাদিসের কয়েকটি বই। নামাজ শিক্ষা বইও আছে। সেই ঘর থেকে সামনে এগুলে একটা লম্বা করিডর। সেখানে কিছু রাখা নেই। শুধু লোক চলাচলের ব্যবস্থা। আর সেখানে ঘন পর্দা দেয়া। যাতে বাইরের ঘর থেকে ভেতরের ঘরের দিকে কেঊ হাঁটলেও তার ছায়াও দেখা না যায়। করিডর পেরুলে সামনে ছোট একটা ডাইনিং রুম। সেখানে একটি কাঠের চারকোণা টেবিলে বড় বড় গোল ট্রের মতন প্লেট রাখা আছে সারি সারি। ওগুলো দিয়ে তবলিগের জন্য এলাকার মসজিদে আসা মুসল্লীদের খাওয়ার আয়োজন করা হয়। এলাকার মসজিদে যতবার চিল্লার জন্য মুসল্লীরা আসে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা এই বাসা থেকেই করা হয়। এমনকি ওরা চারজন স্বামী স্ত্রী দুই মেয়ে ঐরকম একটি প্লেটে ভাত তরকারী মেখে একসাথে বসে খায়। আর খাওয়া ও তো আরেক ব্যাপার! সেই ফজরের ওয়াক্তে আজানের সময় ঘুম থেকে উঠে নামাজ আদায় করে ঘন্টাখানেক কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া দরুদ পড়তে হবে। তারপরে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিতে ইচ্ছে করলে ঘুমানো। তারপরে বাবা-মায়ের সেবার জন্য ঘর দোর পরিস্কার করা ও গুছানোর ব্যস্ততায় কাটবে। এর মধ্যে কোন নাশতা বা দানাপানি মুখে দেয়া যাবে না। রাতের খাবারের আগে শুধুমাত্র দুপুরে বেলা বারোটার দিকে একটু খেজুর আর কয়েকটা কাঁচা ছোলার দানা পেটে দেয়া যাবে। সাথে খাওয়ার পানি। আর রাতে এশার নামাজ আদায় করে কোরআন তেলাওয়াতের পরে রাতের খাবার খাওয়া। এরকম নিয়ম করার কারণ কি? নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো করে জীবন গড়তে হলে তাদের সম্পূর্ণ অনুসারী হতে হবে। তাদের যুগে তারা যেরকম কষ্ট করতো তাদের মতো হতে হলে সেরকম কষ্ট করেই জীবন চলতে হবে। তাই এই নিয়ম তৈরী করেছে ফয়েজ আলী। নিজে তো বটেই তার পরিবারকেও তার মতো হতেই হবে। রোজ অফিসে যাওয়ার সময় আটা সেদ্ধ করে টিফিন ক্যারিয়ারে করে ভরে নিয়ে যায়। রুটি বানায় না। আটার সেদ্ধ গোলাই চিবিয়ে খায় সে। কষ্ট হয়! তাতে কি? কষ্ট করলেই তো পাওয়া যাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি!

ডাইনিং রুমের পরে এক পাশে বাইরের মানুষের জন্য কমন বাথরুম। এর বাম পাশে একটা ছোট বেড রুম। তাতে একটা বড় স্টিলের আলমারী, একটা ডাবল বেড, একটা স্ট্যান্ড ফ্যান রাখা আছে। দরজায় ভারী পর্দা। ডান পাশে রান্নাঘর। রান্নাঘরে দরজা নেই। কিন্তু জানালা আছে। সেই জানালা ঠিক জানালা নয়,বারান্দার গ্রিলের মতো বাইরের দিকে বলে ওখানেও পাতলা একটা পর্দা দিয়ে পুরোটা ঢাকা যাতে বাইরের কেউ বাসার ভেতরের কাউকে দেখতে না পায়। রান্নাঘরের বাম পাশে আরেকটা শোবার ঘর। সাথে একটা বাথরুম। এই ঘরে কোন খাট নেই। শুধু তোশক পাতা। একটা পড়ার টেবিল আছে। একটা ছোট টেবিল তাতে বিশ পঁচিশটা হাদিস শরীফ। এই ঘরে দুই মেয়ে আর মা থাকে আর আরেকটায় ফয়েজ আলী একাই থাকে। নামাজ কালাম পড়েন। বউ আর সন্তানদের সাথে তিনি প্রায় যোগাযোগহীন হয়ে থাকেন। মেয়েদের ঘরের মেঝেতে ভাত খাওয়া হয়। সেখানে ডাইনিং টেবিল বিছানোর জায়গা থাকলেও ফয়েজ আলী টেবিল বিছানোর পক্ষপাতি নয়। তার ভাষায় টেবিলে খাওয়া সাহাবীদের নিয়মের ব্যত্যয় তাই সে ওটা করবে না। মেঝেতে খাওয়া সুন্নত তাই মেঝেতে চারজনে একসাথে এক প্লেটেই খায়। অন্য কোথাও গেলেও একই নিয়ম অনুসরণ করবে। সেখানের মানুষের কাছে সেটা ভালো লাগুক বা না লাগুক ফয়েজ আলী সেটা করবে যাতে তার দেখাদেখি মানুষের বোধদয় ঘটে। দুনিয়াবী নিয়মে চলাফেরা না করে হাদিসী নিয়মে চলাফেরা করার অনুশীলন করাই সবকিছুর জন্য মঙ্গল।

এ জন্যে মেয়েদুটোকে একেবারে শিশুকাল থেকে হিজাবে মুড়িয়েছে। সেই পিচ্চিকাল থেকেই বোরখা পড়িয়ে স্কুলে যাতায়াত অভ্যাস করিয়েছে। আপন চাচাতো মামাতো খালাতো ভাইদের সাথে বোরখা ছাড়া কথা বলা এমনকি দেখা দেওয়া নিষেধ করে দিয়েছে। ওরা সেই ছোটবেলা থেকেই শীত গ্রীষ্ম সবসময়ের জন্য হাতে পায়ে মোজা পড়ার নির্দেশে বড় হয়েছে যাতে অংগের কোন অংশ দেখা না যায়। আর এখন বউয়ের বড় বোনের ছেলের বিয়ে হবে, সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া যেতে পারে কিন্তু আগেভাগে তাদের বাসার হৈহুল্লোড়ে গিয়ে সুন্নত নষ্ট করার কোন প্রয়োজন নেই ভেবেই জান্নাতুনের বাসায় ইশরাতদের আসার অনুমতি নেই।

এ বাসায় বিনোদন ও সংবাদ মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন নেই। রেডিও নেই। এমনকি কোন দৈনিক পত্রিকাও রাখা হয় না। বাসাতে কোন ছবি ওয়ালা ক্যালেন্ডার নেই। আছে বিভিন্ন আয়াতওয়ালা ক্যালেন্ডার। এক পাশে আলনা আছে। সেখানে সব হিজাব রাখা। কিন্তু বিন্যস্ত না। এলোমেলো। এর পরে বাসার বারান্দা। সেটা পুরোটা কালো পর্দা দিয়ে মুড়ানো। অর্থাৎ বারান্দাটাকেও বোরখা পরিয়ে রাখা হয়েছে যেন আশেপাশে বিল্ডিং বা রাস্তা থেকে কেউ এই বাসার কাউকে দেখতে না পায়, কোন মনযোগও দিতে না পারে এবং এরাও বাইরের কাউকে দেখতে না পায়।

আজ থেকে আঠার বছর আগে নসিবাতুন এর সাথে ফয়েজ আলীর বিয়ের সময় তাদের দুজনের কেউই এরকম ছিলো না। তবলীগ ও হিজাবের বাইরে একজন নামাজ কালাম পড়ুয়া মুসলমান নারী পুরুষের যেরকম শোভন আচরণ ও চলাচল করা প্রয়োজন সেরকমই ছিলো দুজনেই। দুজনের কারো মধ্যেই উগ্রতা ছিলো না। ধর্ম নিয়ে কোন বাড়াবাড়ি রকমের আদিখ্যেতাও ছিলো না।

গ্রীন রোড এর জান্নাতুন এর বাসা থেকে মাঝেমাঝে কেউ এখানে এদের বাসায় বেড়াতে আসে। কিন্তু কেউ রাতে থাকতে চায় না। দিনে এলেও বেশিক্ষণ থেকে আনন্দ পায়না। কেননা বাসাটায় একদমই আলো বাতাসের ব্যবস্থা নেই। কোন বিনোদনের মাধ্যম নেই। শুধু আল্লাহ রাসূলের হিসেবকিতেব করে কতক্ষণ চলা সম্ভব? অন্তত যারা এভাবে চলে অভ্যস্ত নয়!

তো, এ বাসায় সবাই বেড়াতে আসে কিন্তু কেউ রাতে থাকে না। যদি ফয়েজ আলী তিনমাসের চিল্লা দিতে তবলীগে অন্য কোন এলাকায় যায় তখন বছরে এক দু’বার কেউ এসে দু-চারদিন থেকে যায়।




।দুই।

- সতেরো তারিখে এসএসসি’র রেজাল্ট দিবে, জানো তো? টিভিতে দিয়েছে!

- হ্যাঁ, খালামনি শুনছি! দোয়া করবেন।

- অবশ্যই। ফী আমানিল্লাহ! অনেক ভালো রেজাল্ট করো দয়া করি।

ইশরাতের সাথে মিসেস জান্নাতুন কথাগুলো বলে মেয়ে সেজুঁতিকে তাড়া দিলেন-“এই যে চলো। আর বসা যাবেনা। আসরের ওয়াক্তের সাথে সাথেই বের হওয়া প্রয়োজন ছিলো। বাসায় গিয়ে মাগরেবের নামাজ ধরতে হবে। নইলে রাস্তাতেই নামাজ কাজা হয়ে যাবে। ফার্মেগেটে যা জ্যাম লাগে!”

নাখালপাড়া রেললাইন পেরিয়ে হেঁটে হেঁটে এসে ফার্মেগেটের উদ্দেশ্যে রিকশা নিলো মা-মেয়ে। রিকশা চলতে শুরু করলে মা মেয়ে আবার কথা জুড়লো নিজেদের মধ্যে। সেজুঁতি বলে উঠলো-“যেই একটা বাপ! এরা এখানে কিভাবে পড়ালেখা করে সেটাই তো মাথায় ঢুকে না! সায়েন্স থেকে জিপিএ ফাইভ না পেলে তো ভালো কলেজে চান্স নিতে পারবে না!”

ওর মা বলে উঠে-“ভালো কলেজে আর কোথায় পড়াবে? না সামর্থ হবে না রেগুলার কলেজে যাইতে দিবে? ঘনঘন ক্লাস মিস করলে সমস্যা হয় না এমন কোন কলেজেই তো ভর্তি করানো লাগবে!”

সেজুঁতি আবার বলে উঠলো-“তোমরা তো বড়! একটু বুঝাও না ওনারে! এরকম করে আর কতদিন? এভাবে কি কারো লাইফ চলতে পারে? পাগলের বাড়ি! নিজেও পাগল! বউ আর মেয়েগুলারেও পাগল বানাচ্ছে!”

মা-মেয়ের বাসায় ফিরতে সেদিন সন্ধ্যার মাগরেবের আজান দিয়ে দিলো পথেই। বাসায় ফিরে কাজাই পড়তে হলো। ফার্মগেট এর এই পাশে রিকশা থেকে নেমে সেজান পয়েন্টের ব্রিজ অথবা মধুমতী সিনেমা হলে ব্রিজ পার হয়ে এপাশে এসে পুনরায় রিকশা ভাড়া করতে হয়। এমনিতেই তো এই রাস্তাটায় অসম্ভব জ্যাম থাকে তার উপরে এরকম এত লম্বা ব্রিজ পার হয়ে পুনরায় রিকশা ভাড়া করাতেই অনেক সময় ব্যয় হয়ে যায়।




।তিন।

“কয়দিন পরেই তো ইশরাত এর রেজাল্ট। ওই বাসায় থাকলে তো রেজাল্ট আনতে স্কুলেও যেতে পারবে না। ওদেরকে বরং আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতে বলি। কি বলো?” কথাটা বললো সেঁজুতির সেজ খালা খায়রুন।

সেজুঁতি, সেঁজুতির ছোট খালা, মামা, নানী সবার একই মতামত ওদেরকে এ বাসায় নিয়ে আসাই উচিত হবে। নইলে মেয়েটা আনন্দ উচ্ছ্বাসও ঠিকমত প্রকাশ করতে পারবে না। ওর রেজাল্টের জন্য বাসাতে মিষ্টিও আনা হবেনা! খুব কষ্ট পাবে মেয়েটা।

ফোন করা হলো ইশরাতকে। ওরা যেন এ বাসায় চলে আসে আগেই। এখান থেকে অনলাইনে রেজাল্ট বের করে দেবে সেজুঁতি। কথা ঠিক হলো ওরা আসবে।

কয়দিন পরে সতেরো তারিখের আগের দিন জানানো হলো- ওরা আসতে পারবেনা। আসার প্রয়োজন নেই। বাসা থেকেই রেজাল্ট জানতে পারবে। কেননা ঐ সতের আঠারো দুই দিন এলাকার মসজিদে তবলিগ পার্টি আসবে। তাদের সেবায় ওদের বাবা ব্যস্ত থাকবে। ইশরাতকে অতটা খেয়াল রাখতে পারবে না। এই কারণে ও সরাসরি স্কুল থেকে গিয়ে নিজের চোখেই রেজাল্ট জেনে নিতে পারবে।




।চার।

সতেরোই মে দু’হাজার চৌদ্দ সাল শনিবার। মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট ও সমমানের পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ করা হবে। ফলাফল জানা যাবে দুপুর দুইটার পরে। মোবাইল থেকে কোড নাম্বারের মাধ্যমে রেজাল্ট জানার পদ্ধতি সম্পর্কে বিভিন্ন অপারেটরের মুঠোফোনে মুঠোবার্তা আসছে। এমনকি এই সংক্রান্ত তথ্য দৈনিক পত্রিকাগুলোতেও দেয়া হচ্ছে। সেজুঁতিরা এ বাসার প্রায় সব কাজিনরা নসিবাতুন খালার মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগ করে রেজাল্ট জানার পদ্ধতি জানিয়ে দিচ্ছে। এমনকি রেজাল্ট জানার জন্য ওদের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার, রোল নাম্বার নিয়ে রেখেছে যাতে নিজেরাও জানাতে পারে। টানটান উত্তেজনাময় ব্যাপার। আজকে যেন রেজাল্ট নয় আজকে ঈদ! এমনটাই ভাবে এ বাসার সবাই। একটা ভালো রেজাল্টের কারণে ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল একটা ধাপে পৌঁছুনোর প্রচেষ্টার সাক্ষর।


ইশরাত স্কুলের সেরা ছাত্রীদের একজন। কোন প্রাইভেট টিউটর ছাড়া একা একা পড়াশুনা করে সেই প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একটানা সে প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে। এমনকি স্কুলের সৃজনশীল কোন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কেরাত প্রতিযোগিতা ইত্যাদি সব আয়োজনেই ও প্রথম স্থান অধিকার করে অনেক সাফল্যের সনদ কুঁড়িয়েছে। সুতরাং ও তো অবশ্যই জিপিএ ফাইভ পাবে এমনকি গোল্ডেন জিপিএ’ও পাবেই। সবাই নিশ্চিত এবং খুব উৎফুল্ল। গ্রীন রোডের বাসাতেও বাচ্চাগুলোর প্রত্যেকেই ধানমন্ডি বয়েজ, ওয়াইডাব্লিউসিএ, সায়েন্স ল্যাব স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণিতে প্রথম দিকের রোলেই অবস্থানে থাকে।

দুপুরের মধ্যে জানা হয়ে গেলো কার কি রেজাল্ট। ইশরাত থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশি পরিচিতদের রেজাল্ট মিলিয়ে মোট নয়জনের খবর পাওয়া গেলো। তাদের সবার রেজাল্টই জিপিএ ফাইভ। সন্ধ্যায় নাকি জানা যাবে কারা গোল্ডেন জিপিএ পেলো। এখন আবার অপেক্ষা সেটার।

ক্রমে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলে সেজুঁতি নিজের ফোন থেকেই ইশরাতের রেজাল্ট বের করে ফেললো। ওর উচ্ছ্বাস তো বাঁধ মানছিলো না। ওর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো অবশ্যই ইশরাতও গোল্ডেন জিপিএ পাবেই।

কিন্তু নাহ! ওর বুকের ভেতরে কষ্টের তীর এসে বিঁধলো যখন দেখলো সব বিষয়ে এ প্লাস থাকলেও একটায় নেই। আর সে বিষয়ের কোড নাম্বার হলো একশত ছত্রিশ। পরে জানা হলো বিষয়টা হলো পদার্থবিজ্ঞান। সবার মনে কষ্টের ছায়া নেমে এলো। ইশরাতের খুব ইচ্ছা সেজুঁতি আপুর মতো ও’ও বুয়েটে কেমিকেল এঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশুনা করবে। সেজুঁতির সেই কথা মনে করে কষ্ট পেলেও মনে পুনরায় আলো জ্বলে উঠলো। কারণ-যতগুলো রেজাল্ট পাওয়া গেছে তার মধ্যে এই ইশরাতের ছিলো সীমাহীন অন্ধকার পরিমাণ প্রতিবন্ধকতা। কি সেটা? ইশরাতের বাবা ফয়েজ আলী তার সন্তানদের লেখাপড়া করাবেন না। বাংলা মিডিয়ামে পড়াশুনা করাবেন না এই জেদ ছিলো তার গত চার-পাঁচ বছর। তার পরে বাবাটা গোঁ ধরেছে মেয়েদুটোর পড়াশুনা বন্ধ করে দেবে। এ-ই-জি গ্রুপের সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদে বিশ বছরের বেশি সময় ধরে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে চাকরী করছে। ভালো বেতন পায়। সেই বেতনে সংসার, বাড়ি ভাড়া, মেয়েদের শিক্ষার খরচ বহন করা তার জন্যে কোন কষ্টের বিষয়ই না। ইদানিং এক নতুন বাহানা ধরেছে সে। অফিসে প্রোমোশন হয়েছে, বেতন বেড়েছে কিন্তু সে তার বেতনের বাড়তি টাকা নেবে না। এত বেশি বেতন নিলে নাকি বিলাসিতায় পেয়ে বসবে।

মেয়েদুটোকে পড়াবে না। এটা তার ইচ্ছা। কি হবে পড়াশুনা করিয়ে? অযথা! পাপ হচ্ছে আরো। বাইরে যাচ্ছে। পাঁচজন মানুষের সাথে উঠাবসা করতে হচ্ছে। পুরুষ শিক্ষকদের সংস্পর্শে যেতে হচ্ছে। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত পাপের রাস্তায় গমন হচ্ছে। এগুলো তার নিজের জীবন থাকতে তো হতে দিতে পারেন না। সে যে আল্লাহ রসূলের নিয়মে চলায় অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে সেখানে মেয়ে দুটোকে পড়াশুনায় শিক্ষিত করে তুললে হবে কি করে!

বাবা যতক্ষণ বাসায় থাকে ততক্ষণ ওদের স্কুলের বই-খাতা বন্ধ করে বসে থাকতে হয়। নামাজ, কোরআন, হাদিসে ডুবে থাকতে হবে। ওরা তাইই করে। নইলে ওদের সাথে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়। অত্যন্ত হৈচৈ করে বাসায় হুলুস্থুল করা হয়। মেজাজ গরম হয়ে যায় ওদের। হয়তো পরদিন ওদের স্কুলে খুব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা কিন্তু পড়ার বই নিয়ে বসার উপায় নেই। বাবাটা যখন নামাজ কালাম পড়ে একেবারে লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পরে তখন ওরা দরজার নিচে কাপড় বিছিয়ে আলো ঢেকে লাইট জ্বালায় আর পড়া তৈরী করে। তারপরে সকালে বাবা অফিসে চলে যাওয়ার পরে স্কুলে রওয়ানা হয়। স্কুলে যেতে দেখলে অকথ্য ভাষায় বকাঝকা করা হয়। ওদেরকে ওদের বাবার দাস হয়েই এ বাসায় থাকতে হবে। তার তৈরী করা নিয়মেই ওদের চলতে হবে। চলতে পারতে হবে। অভ্যাসে সবই হয়।

কিন্তু ফয়েজ আলীর একবারও মনে হয় না মেয়ে দুটো বড় হয়েছে তাদেরও নিজস্ব মানসিকতা আছে। আর সে পড়ালেখা করাবে না বললেই তো হলো না। তার স্ত্রীর মত আছে কিনা সেটা জানাও তো ইসলামে একজন স্বামীর কর্তব্য। নিজে এমএ পাশ করেও মেয়েদেরকে মূর্খ রাখবে এরকম মা কি আজকের যুগে হয়! স্বামী একচ্ছত্রভাবে নিজে আইন বানাবে আর সবাইকে তা মানতে বাধ্য করবে তা তো হতে পারে না। এই আধুনিক যুগে গরীব দুখী, ফকীর, রিকশাওয়ালা, কাজের বুয়ারা পর্যন্ত তাদের সন্তানদের খেয়ে না খেয়ে পড়াশুনা করাচ্ছে। কারণ-পড়াশোনা, শিক্ষা ছাড়া বর্তমান জীবন অচলতারই নামান্তর। সেখানে একজন শিক্ষিত উঁচু পদে কর্মরত একজন মানুষ আজব এক ধ্যান পেয়েছে মেয়েদেরকে পড়াশুনা করাবে না, বিয়ে দিয়ে দেবে। এর মধ্যে ইশমা মৃগী রোগী। সে কোন প্রেশার নিতে পারে না। যখন তখন অচেতন হয়ে ঠাস করে পরে যায়। তার এই অসুস্থতার কারণে তাকে বাসার কাছের একটা কলেজে ইন্টার পড়ার জন্য ভর্তি করা হয়েছে যেখানে সে মাঝেমাঝে যায় বেশিরভাগ সময়েই যায় না। আর তাতে ওর নামও কাঁটা যায়না।




।পাঁচ।

নির্দিষ্ট সময়ে রেজাল্ট হয়ে গেলো। সেজুঁতিদের এ বাসার সবার খুব মন খারাপ। ইশরাত এটা কি রেজাল্ট করলো! আবার এই বাসার কারও কারও বিপরীত ভাবনাটাও আসলো-যা করেছে ভালোই তো করেছে! এত সীমাবদ্ধতা! এত অসুবিধার মধ্যে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া!

কিন্তু ইশরাত নিজে কি ভাবছে? ও কাঁদতে কাঁদতে বারে বারে ফিট লেগে যাচ্ছে। কারণ- ওকে সবাই ছি ছি করছে। ওর ক্লাসের পেছনের দিকের ছাত্রীরা ওকে শুনিয়ে বলছে-“প্রথম রোল ছিলো তোমার। গোল্ডেন জিপিএ তো পাইলা না। দেখছো, শেষ ভালো যার সব ভালো তার! আমরাই পাইলাম, কিন্তু তুমি পাও নাই! আরো ভালো পড়াশুনা করা উচিত ছিলো তোমার! প্রথম রোল বলে তো তোমার আত্মবিশ্বাস বেশি হয়ে গেছিলো!” ইত্যাদি ইত্যাদি কথায় ইশরাত এর রেজাল্টের উচ্ছ্বাসের পরিবর্তে মন জুড়ে ভর করেছে কান্না! অপমান! জেদ! কষ্ট! ওর বাবার সামর্থ্যের কোন কমতি নেই। এলাকায় ওর বাবাকে তবলীগের মানুষ হিসেবে সবাই কত্ত সম্মান করে। কিন্তু কেউ তো জানে না যে সে যে তার মেয়েদের পড়াশুনা করাতে চায় না! যদি জানতো তাহলে ওর কাছের আত্মীয়-স্বজন-খালাতো-মামাতো ভাই-বোনদের মতো সবাই ওর জন্য আফসোস করতো! আর ওর সীমাবদ্ধ সুযোগ সুবিধার মধ্যে এতটুকু বয়সে ছাত্র পড়িয়ে পড়াশুনার খরচ চালানোর বিষয়ে বরং সম্মান দেখাতো। এখন অপেক্ষা কোন কলেজে ভর্তি হবে? ও যে বিজ্ঞানের ছাত্রী। ওর যে অনেক স্বপ্ন- বড় এঞ্জিনিয়ার হবে। বিদেশে যাবে উচ্চতর ডিগ্রী নেয়ার জন্য। ওকে যে অনেক বড় হতে হবে। অনেক অনেক বড়! কিন্তু পারবে কি সে সব বাঁধা পেরিয়ে অতটা উঁচুতে গিয়ে পৌঁছুতে!

কদিন ধরে তীব্র গরম ছাড়িয়ে বৃষ্টি ঝরছে। ওর মনের ভেতরের অঝোর বৃষ্টির কান্নায় সামিল হয়ে অঝোর ধারায় ঝরছে প্রকৃতিও। ওর বাবাটা বিশ বছর আগে আলাদা মানসিকতার মানুষ ছিলো। আজ এই বিশ বছর পরে হয়ে গেছে এইরকম। আবার বিশ বছর পরে যদি এই লোকটার বোধদয় ঘটে যে যা করেছে ভুল করেছে তখন তো ইশরাতের স্বপ্ন পূরণের সময় থাকবে না। বয়স আর সময় কারো জন্যেই থেমে থাকে না!

সারাদিন সারাটাক্ষণ ইশরাত ভাবে চোখ বুজলেই সব স্বপ্নের মতন পরিবর্তন হয়ে যাবে। কিন্তু না! চোখ খুলে দেখে সব আগের মতই অগোছালো আর কষ্টের রয়ে গেছে!

ও তো ওদের বাবার কাছে কোন দামী কিছু চায়নি। ওদের বিলাসীতাময় জীবন যাপন করতে হয় না! টাকা পয়সা দামী দামী জামাকাপড় গয়নাগাটি চেয়ে ওরা বাবার কান মাথা ঝালাপালা করেনি কোনদিন। শুধু পড়াশোনা করতে চেয়েছে। প্রত্যেকটা বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা কোচিং, শিক্ষক রেখে দেয়ার আবদারও ওরা করেনা। গাইড বই কিনে দিতেও বলে না। শুধু একটু নিশ্চিন্তে স্কুলে যাওয়া আসা আর বাসার মধ্যে পড়াশুনার সুন্দর পরিবেশটাই চেয়েছে ওরা। ওরা তো ওদের বাবার প্রত্যেকটা নিয়ম-কানুন মেনে চলে। এতটুকু বয়সে এত গরমের মধ্যেও কালো রঙের বোরখা পরে গরম সহ্য করে। আশেপাশের কারো বাসায় যায় না। শৈশব কৈশোরের উদ্দাম উচ্ছ্বলতায় জড়িয়ে আর দশটা বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দেয় না। তাহলে বাবা কেন এরকম করে! এর কোন উত্তর খুঁজে পায় না ইশরাত আর ইশমা!

ইশমা কিছুটা শান্ত নরম মনের মেয়ে। তাই কষ্ট পেলেও সেটা প্রকাশ পায় কম। কিন্তু ইশরাত কিছুটা প্রতিবাদী। ও অন্যায়টা মাথা পেতে নিতে রাজী কিন্তু উপর্যুপরী অত্যাচারে জর্জরিত হতে পারে না। ও তাই মাঝেমাঝে মায়ের সাথে খুব রাগ করে। মা তো বাবা নামের মানুষটার বউ। সে কি পারে না বাবাকে শাসন করতে? এতটুকু অধিকারও কি একজন স্ত্রীর থাকেনা? ইসলাম কি এতটাই কঠিন!

বাবাটাকে মোটেই ওর সুস্থ মনে হয় না। লোকটাকে মনোবিজ্ঞানের ডাক্তারের চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। কিন্তু কে ধরে নিয়ে যাবে ডাক্তারের কাছে? মা’ই পারতো। কিন্তু মা’ও যেন কেমন হয়ে গেছে! আল্লাহ রাসূলের ভয়! কি করলে কি পাপ হয়ে যাবে!

মাঝেমাঝে ইশরাতের মনে হয়-সব কষ্ট কেন আল্লাহ ওদের জীবনেই দিলো? তারূণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরা জীবনের কতটাই ওরা প্রকাশ করতে পারে! ইচ্ছে থাকলেও কত ইচ্ছাকে গলা টিপে হত্যা করতে হয় শুধুমাত্র বাবা-মায়ের সন্তুষ্টির জন্য! আর কতদিন এরকম অবস্থা দেখে যেতে হবে! কবে হবে এ থেকে মুক্তি! জানা নেই!

রাতে ঘুমোতে সময় শুয়ে শুয়ে অন্ধকারের সাথে চলে ওর নিরব কথা বলা-


‘রাত গন্ধে আকাশ ভরপুর

নিঃশব্দে নক্ষত্রেরা বাজায় নূপুর

রাত দুপুরে অবিরাম শিশিরের

অজস্র বৃষ্টি

বৃষ্টিতে পথে ভেজা ঘাসফুল,

আদিগন্ত কুয়াশার চাদরে লুকানো

চন্দ্রবালিকার শ্রাবন্তী মুখ

নিঃশ্বেষে কাছে টানে

আহ্লাদী শীতের উশুম।

গাছেদের পাতা ঝরে

অধম পাতা কুড়ানীরা

পাতা কুড়ায়

পাতা পুড়ে নৈমিত্তিক আনন্দে

পোহায় আগুন!’



[কবিতাটি ‘সুমন হাজারী’ রচিত ‘জন্মদাহ’ গ্রন্থ হতে সংকলিত]

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement