লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ নভেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৪৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৪৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftদেশপ্রেম (ডিসেম্বর ২০১৩)

‘দেশ ও আমার স্বপ্নপূরণ!
দেশপ্রেম

সংখ্যা

মোট ভোট ৪৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৪৮

জাকিয়া জেসমিন যূথী

comment ২৬  favorite ০  import_contacts ১,৩১৯
মানুষের জীবনটা কি অদ্ভূত গতিতে চলতে থাকে! বহতা নদীর মত। এঁকেবেঁকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে মিশে। কখনো কখনো স্বপ্নপথে ঠিক পৌঁছে যায় মানুষ। আবার কখনো কখনো যা সে জীবনেও চায়নি, স্বপ্নেও ভাবেনি সেরকম কিছুতেই জড়িয়ে যায় লতায় পাতায়।
আমার জীবনটাকে আমি এই দুইয়ের কোন অংশে ফেলবো বুঝতে পারিনা। হয়তো প্রথমটা। হয়তো দ্বিতীয়টা। অথবা হয়তো দুটোই।
মেডিকেলের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী তখন আমি। পড়াশুনায় তুখোড় ছাত্রী বলে ব্যাচের সমস্ত ছাত্রছাত্রীর কাছে যেমন নিজে ছিলাম চেনা মুখ তেমনি অন্যরাও আমার কাছে। তবে অন্যদের চোখে আকর্ষনীয় ছিলাম কিনা জানি না। কিন্তু, একদিন খুব অবাক হলাম একটা ঘটনায়।
আর মাত্র কয়েক মাস পরে আমার ফাইনাল প্রফ একজাম। পিজি হাসপাতালের লাইব্রেরী সংলগ্ন ক্যান্টিনে বসে আছি। বইয়ের ভেতর নাক ডুবিয়ে আমি আমার আরো চার জন ব্যাচমেটকে সাথে নিয়ে ঝটিতি নাশতা সেরে নিচ্ছি। ফারজানা বলে উঠলো, ‘এরিশা, ঐ বাঁয়ের দিকের টেবিলে এক বড় ভাই তোকে দেখছে। উনি প্রায়ই তোকে খেয়াল করেন। ঘটনা আছে বোধহয়!’ বলে মুখ টিপে হাসলো।
সাইফুলও সায় দিয়ে বলে উঠলো, ‘সোহেল ভাই। কয়েক ব্যাচ আগের। ছাত্র ভালো। কিন্তু পরীক্ষা কেন দেয় না সে এক রহস্য! তোকে বোধহয় পছন্দ করে কিন্তু সাহস করে বলতে পারছে না!’ বলে সেও হাসলো।
বন্ধুদের গল্পটা কৌতুহল জাগালো। যেখানেই অসম্ভব সেখানেই যেন আমি আঠার মত লেগে যাই। এর পর থেকে ক্যান্টিনে গিয়ে ইচ্ছে করে বসে থাকতাম। ভাইয়াটা কেন তাকিয়ে থাকে সেটাও জানতে হবে। কেন পরীক্ষা দেয় না সেটাও।
সেই জানতে গিয়েই বিপত্তিটা বাঁধলো। কিংবা কে জানে এটাই বোধহয় নিয়তি। যেখানে অস্ট্রেলিয়ার ইফতেখারের সাথে আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছিলো সেখানে কোত্থেকে এক আদুভাই আমার জীবনে জুড়ে গেলো। তাও আমার মত প্রত্যেক বছর টপ টেনে থাকা মেধাবী ছাত্রীর জীবনে? এ তো ইতিহাস!
মেডিকেলের পড়াশুনায় রিডিং পার্টনার না হলে পড়াশুনায় গতি আসে না। আমার গ্রুপে সব মেধাবী ছাত্রছাত্রীর সাথে আমি এই সোহেল নামের আদুভাইটাকেও জয়েন করিয়ে নিলাম। এক সাথে পড়তে পড়তে কখন যে রিডিং পার্টনার থেকে মাইন্ড পার্টনার হয়ে গেলাম বিধাতাই জানেন সেই দিন ক্ষণ।
কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধলো বিয়ে করতে গিয়ে। তখন জানা গেলো সে বাইপোলার ডিসঅর্ডার এর এক ক্রিটিক্যাল মেন্টাল পেশেন্ট। বয়স সাঁইত্রিশ হলেও মাঝেমাঝে ক’মাস পর পর ওর মধ্যে চেঞ্জ আসে। একেবারে ছেলেমানুষ হয়ে যায়। বাচ্চাদের মত করে কথা বলে। আচরণ বদলে হয়ে যায় শিশুর মত। অনেক ঘটনাই ভুলে যায়। পুরুষত্ব বোধ থাকলেও কিছু কিছু স্মৃতি লোপ পায়। এমনিতে সারা বছরই ভালো থাকে। একেবারে নরমাল। সেই দু’চারদিন খুব বিগড়ে থাকে। তখন ওকে সামলাতে খুব প্রবলেম হয়। আমার সাথে পরিচয়ের আগে নাকি ওকে কেউই কনট্রোল করতে পারতো না। খুব কাছের মানুষ ছাড়া সমস্যাটা অন্যদের কাছে ধরা পরে না। কেবল আমার সামনে এসেই সে শান্ত হয়ে যায়। এক সময় ওর ফ্যামিলিও আমাকে ছাড়া চলতে পারতো না।

মানুষের ইচ্ছেটাই আসলে প্রধান। সমাজ সংসার লোক লজ্জা বড় বিষয় নয়। মানুষ নিজেই পারে তার চারপাশের প্রতিবন্ধকতাকে দূর করে দিতে। সামাল দিতে। আমি কল্পনাবিলাসী নই। পরিবারের সবার বিরুপ মানসিকতার প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আমি ঠিকই এই মানুষটাকে সাথে নিয়েই চলতে শুরু করলাম। অনেক ভেবেচিন্তে অনেক হিসেব কষে আমি সোহেলকে জীবনসাথী করে নিলাম। আর আজ আমি জানি আমি ভুল করিনি। কারণ আমি ভেবে দেখেছি আমাদের আশেপাশের স্বাভাবিক মানুষ বলে পরিচিত মানুষগুলোর কারো কারো মধ্যেও ছোটখাট মানসিক সমস্যা জড়িয়ে থাকেই। আমি তাই সোহেলের মানসিক সমস্যাটাকে বড় কোন ডিফেক্ট বলে গুরুত্ব দেইনি।

এমবিবিএস আর এফসিপিএস শেষ করে আমি আর ও একসাথে মিলিত হয়ে একটা মানসিক হাসপাতাল করেছি। আমাদের দুজনের নামের সাথে মিলিয়ে হাসপাতালটির নাম দিয়েছি ‘এসো’। এরিশার ‘এ’ আর সোহেলের ‘সো’ মিলিয়ে। এখানে এখন এক সাথে দেড় হাজার মানসিক রোগীকে সেবা দেয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে যারা পরীক্ষায় খারাপ করে তাদেরকে পৃথকভাবে কাউন্সিলিং করে আসি আমরা দুজন। আমরা বাংলাদেশের সকল মেডিকেল কলেজের সাথে যুক্ত হয়েছি। আমাদেরকে সঠিক সময়ে ইনফর্ম করা হয়। আমরা আমাদের নিজস্ব গাড়ি নিয়ে তাদেরকে প্রয়োজনে নিজেদের হাসপাতালের সেবাশ্রয়ের ছায়ায় তুলে নিয়ে আসি। এখানে পঁচিশজন নামকরা প্রফেসরদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও কাউন্সিলর নিযুক্ত আছেন। এনারা প্রয়োজনে কাউন্সিলিং করেন।
এতটা জীবন পেরিয়ে এসে গল্পের মাঝপথে দাঁড়িয়ে আমি অন্তত এই শিক্ষা পেয়েছি জীবনে যদি সুপ্ত অবস্থায়ও থাকে কোন ইচ্ছা তা বোধহয় পূর্ণতা পায়। তা নইলে আজ যেখানে আমার অবস্থান সে তো হঠাত উদয় হয়নি। গল্পের কিছু কিছু কাহিনী দৃশ্যপট জোড়া লেগেছে শুধু। কিন্তু নিজের একটা শক্ত অবস্থানের স্বপ্নটা আজন্মের। কোথাও আমি সবচেয়ে উঁচু আসনে বসবো। আমার অধীনস্তদের দিয়ে কাজ করিয়ে আমি দেশের একটা কিছু হয়ে উঠবো এই স্বপ্ন আমার এই ইচ্ছা আমি পূরণ করে ছেড়েছি। বাবা-মায়ের পছন্দে একটা পরিপূর্ণ একটিভ পুরুষের সাথে বিবাহ হলে হয়তো আমি আমার স্বাধীনতা এভাবে উপভোগ নাও করতে পারতাম। আমার পাশে যাকে আমি পেয়েছি সে নিজে মানসিকভাবে একটু দূর্বল বলেই কিনা জানি না সে তো আমার কোন ইচ্ছার পথে কোনদিনও বাঁধ সাধেনি।
দেশের বর্তমান অবস্থাটা ভালো নয়। হরতাল অবরোধে দিন দিন সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যবসা বাণিজ্যের অবস্থাও ভালো নেই। তাই ইদানিং সবাই এই দেশ ছেড়ে প্রবাসে স্থায়ী হওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। কিন্তু, এই দেশ থেকে আমি নড়বো না। কখনো না। এখানেই মুখ থুবড়ে মাটি কামড়ে পরে থাকবো আমি। যত যাই হোক, আমি আমার এই জন্মভূমি ছেড়ে পৃথিবীর আর কোত্থাও ভালো থাকতে পারবো না। এ দেশের মুক্ত বাতাস ছাড়া শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়তে পারবো না আমি। আধ পাগল বাইপোলার ডিস অর্ডার পেশেন্ট, আমার ভালোবাসার জীবন সাথী, সোহেলকে সাথে নিয়ে সেবা দিয়ে যাবো মানসিক রোগীদের। পৌঁছে দেবো তাদের স্বাভাবিক জীবনে। হাজারো আদু ভাইকে মুক্ত করবো তাদের অভিশপ্ত বেকার জীবন হতে। একদিন এই দেশ থেকেও নামকরা ডাক্তার হয়ে উঠবে। উন্নয়নশীল এই দেশে গড় প্রতি একজনে একজন করে ডাক্তার সেবা দিতে পারবে এই আমার প্রত্যাশা। সেইদিন আর দূরে নয়। আমাদের দুজনের জীবদ্দশায় যদি তা সম্ভব নাও হয়, আমাদের ‘এসো’ এর উত্তরসূরীরা সেই কাজটি সম্ভব করবে বলে আশা রাখি।
হাসপাতালের এক পাশে আমরা নিজেদের আবাস গড়ে নিয়েছি। দোতলা ডুপ্লেক্স ফ্লাট। ছাদের একপাশে নিরালা এক টুকরো শাকসবজির বাগান করেছি। আর একপাশে আমাদের দুজনের কিছুটা অবকাশ কাটানোর জায়গা। একটা দোলনা আছে। প্রতিদিনের কাজ শেষে আমরা দুজনে ঘুমোবার আগে রাতের বেলা এই দোলনায় গিয়ে বসি। আজও আমরা দু’জনে বসেছি। সোহেল আমার জন্য কফি করে এনেছে। শীত নামতে শুরু করেছে। হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের শরীর মন। ছাদ থেকে চেয়ে থাকি আমাদের স্বপ্নের হাসপাতাল এসো’র দিকে। এ সময় আমার গান শুনতে ভালো লাগে। মুঠোফোনে এফ এম রেডিও চালু করি। একটা গান বাজতে থাকে...
এসো হে নীপবনে
এসো এসো... এসো হে নীপবনে... এসো এসো...

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement