তিতলিটা বরাবর এরকমই জেদি আর একগুঁয়ে । বাবা মার অপার ভালবাসায় বড় হওয়া তিতলি ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক পা ও বাড়ায় না । বয়সের সাথে মানানসই রকম পরিপক্বতা আসেনি ওর চিন্তা ভাবনায় শুধু পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জেদ । মার সাথে রাগারাগি , বাবার কথা অমান্য করা আর ছোট ভাই তোতন কে যখন তখন খোঁচানো । এই হল তিতলি ...।

বয়স এবার ২৩ ছুলো । কিন্তু নিজের এই স্বভাব নিয়ে তেমন কোন মাথা ব্যথা নেই বরং নিজেকে ও স্বাধীনচেতা হিসাবে দাবি করে । নাওয়া খাওয়ার ঠিক নেই সারাদিন বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো । আর ওর বন্ধুদের কথা কি বলব ? বন্ধু হিসাবে যারা জুটেছে তারা শুভাকাঙ্ক্ষী নয় বেশির ভাগই সুবিধাভোগী । এই নিয়েই আছে জগতের আর সব কিছুকে পরোয়া না করা তিতলি ।

তিতলির মনে আছে কিনা জানি না কিন্তু আমাদের যখনি কথাগুলো মনে পড়ে বড্ড হাসি পায় । তখন ওর বয়স ৬ কি ৭ বছর হবে , খুব শখ করে দুইটা টব কিনে আনল বৃক্ষ মেলা থেকে , গোলাপের চারা সহ । কিন্তু দিন পাঁচের না যেতেই তিতলি সেই চারাগাছ তুলে ফেলল রাগ করে । কারন কি জানেন ......গাছ কেন বড় হচ্ছে না , কেন ফুল হচ্ছে না গাছে এই ছিল দোষ । মা কিছুতেই বোঝাতে পারলেন না গাছকে তার মতো করেই বড় হতে দিতে হয় , মানুষের ইচ্ছা মতো গাছ হয় না।

তিতলি একবার খুব শখ করে পাখি পুষবে বলে বাবার কাছে বায়না ধরলো , বাবাও আদরের মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করলেন সুন্দর একটা টিয়া পাখি ওর জন্মদিনে উপহার দিয়ে । কিন্তু তারপর তিতলি যা শুরু করেছিল তা আর না বলাই ভালো । পাখির খাঁচার কাছে দিন রাত বসে থাকতো পাখির খাওয়া দেখার জন্য , পাখির ঘুম দেখার জন্য কিন্তু পাখি কি আর শোনে তিতলির কথা । পাখিটা দিন রাত না খেয়ে থাকতে লাগলো ।যেন তিতলিকে রাগাতেই ঝিম ধরে বসে থাকতো ......শেষ পর্যন্ত বেচারি টিয়া জীবনটাই দিয়ে দিল তবু তিতলির কথা মতো নাওয়া-খাওয়া করলনা । স্বাধীনতা যে ওরও খুব প্রিয়......

একটু বড় হবার পর সবাই ভেবেছিলাম এবার বোধ হয় মহারানীর স্বভাব পালটাবে কিন্তু না তা বোধ হয় আর এই জীবনে হবার নয় । ঐ যে কথায় আছে না '' যার নয় বছরে আক্কেল হয়নি তার নব্বুই বছরেও আক্কেল হয়না ।'' শুনুন একবার কি কাণ্ডটাই করলো তিতলি ওর মামাতো ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে । তখন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রি ছিল ।মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে খুব সেজেগুজে গেল কাজিনদের সাথে । ওমা একটু পড়েই কি একটা সামান্য কারণে কেঁদেকেটে বাড়ি মাথায় তুলে রাগ করে শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে একা বাসায় চলে এলো । ও হা মনে পড়েছে , কে যেন বলেছিল ......তিতলির সাজটা ঠিক মানায় নি ওকে , ব্যাস শুরু হয়ে গেল ওর স্বভাব মতো রাগারাগি , কান্নাকাটি । এই হল স্বাধীনচেতা তিতলি । বাবা মার আদরের দুলালী।

ও আচ্ছ সেবার কি হয়েছে সেটাই তো বলা হয়নি । এইত বছর দুই আগের কথা সবে একটা কলেজে স্নাতক কোর্সে ভতি হয়েছে । প্রথম দিন কলেজ থেকে ফিরে তিতলি ঘোষণা দিল ও আর ক্লাশ করবে না! বাসার কেউ প্রথম দিকে তেমন পাত্তা দিলনা ওর কথা কিন্তু তারপরের কয়েকদিন সত্যি সত্যি তিতলি ক্লাশে যাওয়া বন্ধ করে দিল । এক পর্যায়ে তানিয়া রহমান এসে জানতে চাইলেন ঘটনা কি । তিতলি জানাল ওর ক্লাশ টিচারকে ওর পছন্দ হচ্ছে না । দেখতে তেমন ভালো না আর কথার মাঝে আঞ্চলিকতার টান ......এমন টিচারের ক্লাশ করা যায় ? মা কতো বোঝানর চেষ্টা করলেন , এক পর্যায়ে তিতলির নানাকে দিয়েও বোঝান হল , কারণ একমাত্র নানার কথাই তিতলি একটু আধটু শোনে এবং মানে । কিন্তু সেবার নানার কথায় ও কাজ হলনা । তিতলির সেই এক কথা এই কথার আর নড়চড় হয়নি , পরে কিভাবে কিভাবে যেন ও সাবজেক্ট চেঞ্জ করে আবার কলেজে যাওয়া শুরু করেছে ।
এই মেয়েকে নিয়ে বাবা মা সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা করে করেই বাবা তারেক রহমান ব্লাদ প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেছেন । মাঝে মাঝেই প্রেশার বেড়ে গিয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন অথচ কিই বা এমন বয়স হয়েছে তাঁর, ওঁর সমবয়সিরা এখনো কতো ঝরঝরে শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে । আর তানিয়া রহমান মানে তিতলির মার কথা কি বলবো , বেচারিকে মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেই কাটাতে হয়েছে বেশির ভাগ সময় । ছোট থেকেই চঞ্চল তিতলি এ বাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াতো আর এর সাথে দুষ্টুমি ওঁর জিনিস কেড়ে নেয়া , বন্ধুদের অকারনে মারা এসব করে বেড়াতো । তিতলির মা আজকাল কিছুই মনে রাখতে পারেন না , রাখবেন কিভাবে সারাক্ষণ যদি মেয়েকে নিয়ে ভাবেন অন্য নিয়ে ভাবার সময় পান কোথায় ? মাঝে মাঝে তাঁরা ভাবেন ছোট থেকে বেশি স্বাধীনতা দিয়ে মেয়ের ক্ষতিই হয়তো করেছেন , এরকম অবাধ স্বাধীনতা দেয়া হয়তো উচিৎ হয়নি , কিন্তু এখন আর কি করবেন তাও তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না । মাঝে মাঝেই এই নিয়ে তাঁদের আক্ষেপ শুনি, আমার সাথে অনেক কথাই শেয়ার করেন দুজনেই।

কিন্তু তোতন হয়েছে বোনের উল্টো, তিতলির চার বছরের ছোট তোতন ক্লাশ নাইন এ পড়ে ।শান্ত শিষ্ট মা বাবার কথা যথাসাধ্য পালন করে, এক কথায় যে গুনগুলো আমাদের সমাজে মেয়েদের মানায় তার সব কটাই তোতনের মধ্যে আছে । একই বাড়ির দুই সন্তান কিভাবে এরকম বিপরীতমুখী হল তা নিয়ে আমাদের রিলেটিভদের মাঝে প্রায়ই গবেষণা হয় ।

আপনারা ভাবছেন এতো কথা কেন বলছি । বলছি বা বলতে বাধ্য হচ্ছি কারন গত পরশু তিতলি যা করেছে তা ওর আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে । বাসার সবাইকে মহা টেনশনে ফেলে দিয়ে তিতলি গাদা খানেক ঘুমের অসুধ খেয়ে বসেছে । ভাগ্য ভালো বলে কোন বড় রকম সমস্যা হয়নি , মায়ের চোখে ধরা পড়ে গেছে । ভাবছেন কোন প্রেম ভালবাসার ব্যাপার , আরে না , তিতলি করবে প্রেম ! তাহলেই হয়েছে । কাউ কে ওর পছন্দ হলে তো । কাউকেই তো ও নিজের সম পর্যায়ের মনে করে না ।সবাই নাকি ক্ষেত! লেখাপরায় তেমন আহামরি না হলেও স্মার্ট সুন্দর তিতলিকে কতো ছেলেই তো ভালবাসার কথা জানায়, পাত্তাই দেয় না । তাহলে কেন এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ? কারন মায়ের কাছ থেকে স্টাডি ট্যুরে যাবার অনুমতি পায়নি। বন্ধুরা মিলে ৫/৭ দিনের জন্য ইন্ডিয়া যাবার প্লান করেছিল । কিন্তু এবার আর তিতলির বাবা মা কিছুতেই রাজি হলেন না মেয়েকে একা ছাড়তে । ব্যস রাগ করে খেয়ে ফেললো , আগে পরে কি হবে তা ভাবার মতো পরিপক্বতা কোথায় তিতলির মধ্যে । তিতলিতা এরকমই ......জেদি, একগুঁয়ে ...ওর ভাষায় স্বাধীনচেতা । ওর স্বাধীনতায় বাঁধা পড়তে পারে সেজন্য বিয়েও করবেনা বলে দিয়েছে ।

আত্মীয় স্বজন ভেবেছিল বিয়ে দিয়ে হয়তো একটা গতি হতে পারে তাই তিতলি যখন আইচ এস সি পরীক্ষা দিল তারপর বেশ জোর দিয়ে পাত্র খোঁজা শুরু হলে তিতলি সাফ জানিয়ে দিল ও বিয়ে করবে না । কখনোই না । পাঠক বন্ধুরা ভাবছেন আমার এতো মাথা ব্যথা কেন তিতলিকে নিয়ে ? আসলে তিতলিকে নিয়ে ভাবনা শুধু ওর বাবা মার না আমাদের সবার ।
আর আমার মেঝ মামার এই মেয়েটিকে অনেক ছোটবেলা থেকেই কেন জানি আমার ভীষণ ভালো লাগে । ওর সব ছেলেমানুষি, ন্যাকা ন্যাকা কথা সবই । ওকে আমি খুব ভালবাসি কিনা জানিনা কিন্তু কিছু দিন ওকে না দেখলে আমার মন খারাপ হয় , সব কিছু কেমন পানসে লাগে ।মনে মনে পন করেছি ওকে জীবনে পেলে কক্ষনো ওর স্বাধীনতায় বাঁধা দেবনা । কিন্তু কখনো ওকে বলিনি বা বলার সাহস পাইনি , জানি বললেও তেমন লাভ হতোনা । ভালো লাগা , ভালবাসা বুঝবার মেয়ে ও না । ও তিতলি ও এরকমই ও থাকবে মুক্ত বিহঙ্গের মতো .........নিজের নামকরন সার্থক করাই যেন ওর একমাত্র কাজ ।