লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ অক্টোবর ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ২৫টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৭৪

বিচারক স্কোরঃ ২.০৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৯ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকৈশোর (মার্চ ২০১৪)

গদাই সর্দার
কৈশোর

সংখ্যা

মোট ভোট ৩১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৭৪

ইয়াসির আরাফাত

comment ১৫  favorite ০  import_contacts ১,০৭৩
আমাদের পাড়ার দুষ্টু ছেলে গদাই বেশ মোটা সোটা ও তুলতুলে ছিলো বলে তাকে সকলে গদাই বলত ।দুপুরের খাবার সময় হলেও সে যখন বাসায় ফিরতনা তখন তার মা মিষ্টি সুরে ডাকত এই গদা ভাই খাবি আয় ঐ গদাই , গদাইরে ... । আমরাও তার মায়ের মত সুরে মাঝে মাঝে তাকে ডাকতাম বলে তার হাতে উত্তম মধ্যেম এক প্রকারের গদাম খেয়েছি ।তার তুলতুলে হাতের আঘাত সয়েও সূর্যমুখীর মত এক ঝলক হাসির খই ফুটত আমাদের মুখে ।
মনের দিক থেকে গদাই ছিলো হরিণ শাবকের মত চঞ্চল ।আবার ফুলের মত কোমল ও আমাদের গ্রামের মোড়ল মাতব্বররা তো অনেকটা কাগজের নৌকা ও প্লাস্টিকের ধানের শীষের মত । কিন্তু সারাদিন খেলাধুলা ও দুষ্টুমির পাশাপাশি হতদরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা সে ছেলে বেলাতেই অর্জন করেছিলো ।তাই তো সে সবার কাছে দুষ্টুমির সর্দার থেকে গদাই সর্দারে পরিণত হয় ।গ্রামের সকলে তাকে ভালবাসত আমার মত অনেকে সর্দারের দলে যোগ দিত । গ্রামের মানুষদের সুখ দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়াত । কারো খড়ের পালায় আগুন লাগলে তা নেভানোর কাজ , কেউ মারা গেলে কবর খননের কাজ , বাঁশের কাল ভাট মেরামত , কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে সেবার কাজ এক কথায় বিনা বেতনে অনেক সময় নিজেদের সম্পদ বিলিয়ে সে মানব কল্যানের দায়ভার নিত । তখন মনে করতাম গদাইয়ের সাথে অকারন ব্যাস্ততায় কাটত কাটছে আমাদের ।
তবে দুষ্টুমিতে কম ছিলোনা গদাই তার নেতৃতে মাছ ধরার পাশাপাশি আম , পেয়ারা , কুল , জাম, লিচু, বেল , জাম্বুরা ইত্যাদি এর স্বাদ পখর করা ছিলো আমাদের নিত্যদিনের কাজ । নিনজা টেকনিক কাজে লাগিয়ে চুরি করে মোরগ , হাঁস , ছাগল এর ভোজন হতো । গদাই খেতে খেতে বলে আমরা চুরি করিনা গ্রামের কেউ চুরি করেনা শুধু একটু গুনাগুন পরিক্ষা করে মাত্র । গদাইদের বিশাল বাগানের ফলমূল গুলো , তাদের পুকুরের মাছ , খামারের হাঁস মুরগী গরু ছাগল সবকিছু ছিল আমাদের কাছে এমনকি গদাইয়ের কাছে স্বাদহীন । কারন গদাইয়ের মা আমাদের বলে বাবারা তোমরা অন্যদের জিনিস চুরি করিওনা আমাদের গুলো নিয়ে যেও ।আল্লাহ আমাদের অনেক দিয়েছে তোমরা দশ গ্রামের ছেলেরা প্রতিদিন খেয়ে শেষ করতে পারবেনা । আমাদের কখনো বোঝার সাদ্ধ হয়নি যে আমাদের একটি মুরগী চুরির ক্ষতি পুড়ন গদাইয়ের মা দুইটি মুরগী দিত । কয়েক মাস যেতেই আমাদের চুরি করার সুযোগ থাকলোনা কারন সবাই জেচে তাদের জিনিশ চুরি করতে বলে । তাই স্বাদ পাইনা । বুঝেও ফেলি গদাইয়ের মা সকলকে এই কু-বুদ্ধি দিয়েছে । যেখানে সামান্য দুষ্টুমির জন্য আমাদের কান মলা খেতে হয় সেখানে গদাইয়ের মা আমাদের আঁচল তলে লুকিয়ে নেয় । বর্ষার সময় এলে গদাইদের চাল ডাল চুরি করে আমরা গ্রামের গরীব মানুষদের বিলি করি তখন গদাইয়ের মা পাশের বাড়িতে গিয়ে আমাদের বিলি করার পথ খুলে দেয় । আমার মাকে বলে কবরে তো কিছু নিয়ে যেতে পারবোনা গদাইরা আর কত টুকুই বা বিলিয়ে দিতে পাড়বে ।গদাইরা বংশগত এমন এভাবেই কেটে যাচ্ছে এদের জীবন ।
সময়ের স্রোতে একসময় কবি হবার সাধ জাগল গদাইয়ের । লিখতে শুরু করল যা মনে আসে তাই আমি তুমি সে ঝি ঝি পোকা যে । এমন টাইপের ছড়া কবিতা । আরও কিছু দিন যেতেই গদাইয়ের প্রেমের কবি হবার ইচ্ছে জাগল । প্রেমিকা খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত নিশি গমেজ কে পছন্দ করল ।কিন্তু একদিন নিশির বাবা গদাইকে গির্জা কক্ষে নিয়ে গেইট বন্দ করে এমন ভয় দেখালো যে নিশি নামের ভূত তার মাথা থেকে বিদায় নিলো । প্রেমের কবি হওয়া হলোনা গদাই সর্দারের তার মাথায় বেল ভেঙে আমাদের পেট পূজা অনেকটা কমে গেলো । সে এককোণে হয়ে গেলো এই সমাজ সংসারের ছায়া বাঁচিয়ে চলতে শুরু করল সে । বাড়বার সমাপনি পরীক্ষায় গোল্লা খেয়ে একই ক্লাসে পড়ে থাকতে লাগলো সে । আমরাও গদাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই । সে এখন কারো সাথে কথা বলেনা । বন্ধুদের অপমান করে তাড়িয়ে দেয় ।

আমরা সবাই নিজের অবস্থানে ভালো আছি । নিজের গতিতে চলছি । এবার দেশে গিয়ে গদাইয়ের মায়ের সাথে দেখা হলো । সে কেঁদে কেঁদে বলল গদাই পাগল হয়ে গেছে । ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়ে লাভ হচ্ছেনা পাবনা মেন্টাল হসপিটালের ডাক্তার দেখিয়েও লাভ হচ্ছেনা । বিদেশে কোন ভালো ডাক্তারের খোঁজ থাকলে দাও আমি আমাদের সমস্ত সম্পতি বিক্রি করে হলেও গদাইকে .........। আমাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন তিনি । নিজেও খুব কষ্ট পেলাম মনের পর্দায় ভেসে উঠল ২৫ বছর আগের মায়ামমতার দৃশ্য । দুস্তুমির জন্য যখন আমাদের মা হাতে লাঠি নিয়ে তাড়া করত লুকাতাম গদাইয়ের মায়ের আঁচল তলে । আমাদের এক মাত্র দুষ্টুমির প্রশ্রয় দাতা ছিলেন তিনি । তিনি সকলকে বোঝাতেন এরা বড় হলে ভালো হয়ে যাবে । আমরা মায়ের কাছে পিটুনি খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে অ্যান্টির কাছে গেলে তিনি বুকে জড়িয়ে ধরে আমাদের সান্ত্বনা দিতেন । মায়ের মতই সকলকে ভালো বাসতেন । কিন্তু আজ তিনি কাঁদছেন কিন্তু আমি সান্ত্বনা দিতে পারছিনা । অ্যান্টির সাথেই গদাইয়ের কাছে গেলাম ।
আমাকে দেখে সে মুচকি হেসে বলল – আম পাড়তে যাবনা । আমি ভালো ঘরের ছেলে আমাদের অনেক বাগান থাকতে আমি কেন পরের গাছের আম পাড়তে যাবো ? সবাই আমাকে চোর ভাবে ।আমি যার যে পরিমানে ক্ষতি করতাম তোদের নিয়ে আমার মা যে ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিতো তা কেউ মনে রাখেনা । তা ছাড়া আমি মুসলিম পরিবারের সন্তান অন্য ধর্মের মানুষদের ভালো বাসার অধিকার আমার নেই ।আমি নাকি সম্পদের জোরে সবার মান সন্মান নিয়ে খেলি । আমি দুষ্টুদের সর্দার আমি ভালো ভালো ছেলেদের খারাপ করি । এই সমাজে আমার মত মানুষদের কোন প্রয়োজন নেই । চলে যা তুই আমাকে আমার মত থাকতে দে ।
আমি তার পড়ার টেবিলে ও বুকশেলফ এ দৃষ্টি দিলাম । প্রচুর খাতা রয়েছে । ভেবে নিলাম সে অনেক কবিতা লিখেছে কারন কবি হবার উড়ো চিঠি মনে পাবার কয়েক মাস পড় থেকেই সে অন্য রকম হয়েছে । তার কয়েক টি খাতার পাতা উল্টিয়ে দেখে অবাক হলাম কোন কবিতা লেখেনি সে প্রতিটি পাতায় বিভিন্ন ফন্টে হাতেই লিখেছে সে –
আমি দুষ্টুদের গদাই সর্দার
আমি নাকি সম্পদের জোরে যা খুশি তাই করি
কাউকে ভালবাসার অধিকার আমার নেই
আমি নাকি সমাজের কিট
এই সমাজের মানুষ থেকে দুরে থাকা আমার দরকার ।
আমার বুঝতে সমস্যা হলোনা সেদিন নিশির বাবা গদাইকে গির্জা কক্ষে নিয়ে গেইট বন্দ করে মারধোর বা ভয়ভীতি দেখায়নি প্রচণ্ড অপমান করেছিলো । সে অপমান হজম করতে করতে গদাইয়ের জীবন থেকে অতিবাহিত হয়েছে পঁচিশ টি বছর । আমি নিশির বাবা ও নিশিকে গদাইয়ের মুখমুখি নিয়ে আসার জন্য নিশিদের বাড়ির পথে রওয়ানা হলাম ।
নিশির বাবা ও নিশিকে গদাইয়ের ব্যাপারে বললাম । নিশির বাবা প্রচণ্ড অনুতপ্ত হলও নিশির স্বামী পাশের ঘর থেকে সবকিছু শুনে আমাদের সামনে এসে স্বাভাবিক ভাবে বলল – ফাদার আপনার আর নিশির একবার গদায়েই সাথে দেখা করা উচিৎ ।আমার অনুরোধে নিশির স্বামীও আমাদের সাথে যেতে রাজি হলো ।
আমরা একসাথে হেঁটে যাচ্ছি সেই চিরোচেনা আম্র কানন দিয়ে যেখানে দুরন্ত কৈশোরে ছিলো আমাদের আধিপত্ত এখন এর আধিপত্ত গ্রহন করেছে নতুন প্রজন্ম । মুকুলের সুঘ্রাণে মন ভরে যাচ্ছে । এই বাগানে ঘুমিয়েছি কতদিন । সামান্য ঝড় হলেই আম কুড়ানোর নেশায় চলে এসেছি এই বাগানে ।গদাই সর্দারের নেতৃতে সকলের কুড়ানো আম একত্রিত করে ভাগাভাগি করা হত । গদাই সর্দারের কথা কেউ অমান্য করতাম না । অতছ আজ এই সর্দার আর আমাদের সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলেনা । সভ্যতার আলো থেকে পঁচিশ বছর পিছিয়ে আছে সে । গদাইয়ের কথা মনে পড়তে আমার চোখের কোনে জল চলে এলো ।মনে মনে বললাম গদাই যেখানে আজ সমাজের একজন প্রতিনিধি হবার কথা সেখানে সে সমাজ থেকে মুখ লুকিয়ে আছে ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement