১৯৮৩ সালে আমি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষকতা পেশা পরিত্যাগ করে সৌদি আরবে গমন করি। সেখানে দীর্ঘ দিন থাকার সুবাদে বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে চলা , পরিচয় ও কাজকর্ম করতে হয়েছিল। কোন কোন সময় ভিন দেশের মানুষের সাথে স্বাভাবিক ভাবে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে , বন্ধুত্ব সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয়। অথবা আপন স্বার্থ সিদ্ধির বা রক্ষার্থে সম্পর্ক রাখতে হয়। ঠিক এ ভাবে চলতে গিয়ে একজন পাকিস্তানির সাথে আমার পরিচয় হয় চলার পথে স্বাভাবিক ভাবে। পরিচয়ের গল্পটি বলার লোভ এ মুহূর্তে সংবরণ করতে পারিনি বলে এখানে তোলে ধরতে চাই। তাহলে গল্পটি শুরু করি।
আমি ১৯৮৭ সালে আমার বাসস্থান হতে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দুরে একটি কাজ রাখি। কাজটি সমাপ্ত করতে কয়েক দিন লাগবে। তাই যাওয়া আসার নিমিত্তে গাড়ির প্রয়োজন। অনতি দুরের একটি বাসায় পরিবার পরিজন নিয়ে এক পাকিস্তানি বসবাস করে। তার গাড়ি আছে এবং ভাড়ায় গাড়ি চালায়। সুতরাং আমি তার শরণাপন্ন হয়ে যে ক’দিন কাজ হবে , সে ক’দিন আমাকে সকালে নিয়ে যাবে এবং বিকালে গিয়ে আবার নিয়ে আসবে। এ কন্টাক্ট করে নিলাম। দু’দিন এভাবে আসা যাওয়ার পর একদিন পাকিস্তানি কথা প্রসঙ্গে আমাকে জিজ্ঞেস করে আমার বাড়ি কোন জেলায় ? আমার বসবাসের জেলার নাম বলেই তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, তুমি কি চিনো, কিভাবে চিনো ইত্যাদি? তখন সে বলে গেল ইতিবৃত্ত। অর্থাৎ সে ১৯৭১ সালের পূর্ব থেকে বাংলাদেশে ছিল এবং যুদ্ধ করেছে। বেশ কয়েকটি জেলায় গিয়েছে একজন সৈনিক হিসেবে। অত:পর শুরু হল আমাদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা, প্রশ্নোত্তর, যুক্তিতর্ক।
পাকিস্তানি তার স্বপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দিলে ও আমি তা জোরালো ভাবে প্রত্যাখ্যান , খণ্ডন করে যাচিছ। কোন যুক্তি আংশিক মেনে নিলে ও কোন যুক্তি উপস্থাপনে ছিল তার গলাবাজির ধ্যান-ধারণা। এক সময় প্রশ্ন এসে দাড়ায় বাংলা ভাষার কথায়। সে বলছিল বাংলা ভাষা মুষ্টিমেয় জনসংখ্যার ভাষা হিসেবে। আমি যতই যুক্তির উপস্থাপনা করছিলাম। তা সে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইলে আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত তার সাথে কথা বলতে শুরু করি এবং প্রমাণ আমি দিতে পারলে সে মেনে নেবে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হই। সে দিন আমি তাকে নিয়ে আসি আমার বাসায় প্রমাণ দিতে।
ক’দিন পূর্বে আমি এক সৌদি দোকান থেকে বিস্কুট কিনে এনেছিলাম। ঐ বিস্কুটের সাথে আমি মিনি একটি বুকলেট পাই ইংরেজি ভাষায় লিখিত শিশুদের উপযোগী কিছু সাধারণ জ্ঞান সম্পর্কিত। বইটির এক জায়গায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষার একটি তালিকা সংযুক্ত ছিল ক্রমানুসারে ১ম , ২য় এভাবে সাজানো। তালিকার ৫ম স্থানে ছিল বাংলা ভাষার ক্রম। আমার নিকট বইটি ছিল রক্ষিত। সুতরাং উক্ত বইটি বের করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে তাকে দেখিয়ে দিলাম এবং দ্বাদশতম স্থানের উল্লেখ থাকার মধ্যে ও উর্দু ভাষার স্থান নেই দেখিয়ে দেবার পর সে মেনে নিতে বাধ্য হল বাংলা একটি উল্লেখ যোগ্য ভাষা হিসেবে। তখন আমি গেয়ে উঠি , ”বাংলা আমার মায়ের ভাষা , বাংলা আমার প্রাণের ভাষা , আ-মরি বাংলা ভাষা” , বাংলা আমার দেশ , আমি বাঙ্গালী , বাংলায় কথা বলি।